পূর্ণদৈর্ঘ্য (পারিবারিক) প্রেম কাহিনী

বার্ধক্যে উপনীত হওয়া ধনী প্রভাবশালী ব্যক্তি সামাদ শিকদার তার ছেলের ঘরের নাতি জয় শিকদারের সাথে মেয়ের ঘরের নাতনী মিতুর বিবাহের আয়োজনমুহুর্তে স্ট্রোক করেন। জানা যায়, বিশ বছর আগে তার কন্যা শাহানা শিকদার তাদের লজিং মাস্টারকে ভালোবেসেছিলেন যা মেনে নেন নি সামাদ শিকদার, ফলে মেয়ে-মেয়ে জামাই দুজনেই ঘর ছেড়ে যান। গত বিশবছর ধরে তাদেরকে খোঁজ করলেও বের করতে পারেন নি সামাদ শিকদার, ফলে চাপা মানসিক কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছেন তখন থেকেই। দাদুর মানসিক সন্তুষ্টি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নাতি-নাতনী ফেসবুকে খুঁজে বের করে বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত শাহানা শিকদারকে। অতঃপর, কোন ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট না পাঠিয়ে মালয়েশিয়ার রাস্তায়-হোটেলে-অফিসে ফুপু শাহানা শিকদারকে খুঁজে বের করার জন্য জয়ের যে চেষ্টা তা-ই একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রকে পূর্ণদৈর্ঘ্য পারিবারিক প্রেম কাহিনীতে রূপান্তর করে।
গেল ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে সবচে বেশী আলোচিত ছিল পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী। কেন – প্রশ্নের উত্তরে অনেকগুলো কারণ চিহ্নিত করা যায়। এই ছবির কাহিনীকার রুম্মান রশীদ খান, তিনি দীর্ঘদিন প্রথম আলো পত্রিকার বিনোদন পাতায় লিখে পরিচিতি তৈরী করেছেন। এই ছবিতে একই সাথে অভিনয় করেছেন বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের নাম্বার ওয়ান হিরো শাকিব খান, অফট্র্যাক সিনেমার এক নাম্বার হিরোইন জয়া আহসান এবং সিনেমা মুক্তির আগেই বিশাল ক্রেজ সৃষ্টিকারী সুদর্শন মডেল অভিনেতা আরেফিন শুভ। একই সাথে তিন ধরনের দর্শককে সিনেমাহলে নিয়ে আসার বাণিজ্যিক এই চিন্তাকে স্বাগত জানানো উচিত, কারণ এখানে প্রফেশনালিজম টের পাওয়া যায়। তবে, কাহিনী নির্বাচনে এই প্রফেশনালিজম আরও বেশী মাত্রায় থাকা প্রয়োজন ছিল।
রুম্মান রশীদ খান শুরুতেই বড় আকারের গর্ত রেখে গল্পকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়েছেন, পরবর্তী গর্তগুলো আকারে ছোট ছিল। চরিত্রের বয়স নির্ধারণে তিনি খুবই অপরিপক্কতার পরিচয় দিয়েছেন। জয়-জারার প্রেমকাহিনীতে সাকিবকে প্রবেশ করিয়েছেন জোর করে, ফলে, সাকিব কেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহ মসৃণভাবে আগায় নি, পরিণতিও চাপিয়ে দেয়া। অন্যদিকে, ‘বাংলা সিনেমার কাহিনী’ বলার অজুহাতে ‘স্বপ্ন’, ‘মন’ আর ‘মিরাকল’ দিয়ে বিভিন্ন আকৃতির গর্তগুলোর মুখ বন্ধ করার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। মাসুদ পারভেজ-ববিতার আলাপচারিতায় সিনেমার গল্প বলার স্টাইলে যে নতুনত্ব তা প্রশংসনীয়। কিছুটা আদিরসাত্মক ইঙ্গিতবাহী সংলাপগুলোসহ অন্যান্য সংলাপ গ্রহণযোগ্য কিন্তু সংলাপের মাধ্যমে কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চিরাচরিত যে প্রথা তার খুব বেশী ব্যতিক্রম করতে না পারা অবশ্যই নিন্দনীয়।
বাংলাদেশে কাস্টিং ডিরেক্টর (যিনি কোন চরিত্রে কে অভিনয় করবেন তা ঠিক করেন) প্রথা গড়ে উঠেনি এখনো, সম্ভবত পরিচালকই এই দায়িত্ব পালন করেন। যদি তাই হয়, তবে পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনীর বিভিন্ন চরিত্রে পূর্ণবয়স্ক অভিনেতাদের কাস্টিং এর জন্য পরিচালক সাফি উদ্দিন সাফি হবেন অভিযুক্ত। শাহানা শিকদারের মেয়ে আঠারো-উনিশ বছরের তরুণী চরিত্রে জয়া আহসান এবং তার প্রেমাকাঙ্খী যুবক সাকিব চরিত্রে আরেফিন শুভ কতটা বেমানান সেটা কেবল পর্দায় চলচ্চিত্র দেখা সাপেক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব। বাণিজ্যিক চিন্তা থেকেই চলচ্চিত্রে তাদের উপস্থিতি তা শুরুতেই বলেছি, কিন্তু বেমানান কাস্টিং অবশ্যই চলচ্চিত্রে শিল্পগুণকে নিচের দিকে নামিয়ে যায়।
প্রধান এই তিন অভিনেতার মধ্যে স্বল্প সময়ের উজ্জ্বল উপস্থিতি আরেফিন শুভর। অল্প কিছু দৃশ্যে তার অতিঅভিনয় চোখে লাগলেও তিনি চমৎকার অভিনয় করেছেন। গল্প ও চরিত্র বাছাইয়ে মনযোগী হলে আরেফিন শুভ যে খুব শীঘ্রই বাংলা চলচ্চিত্র দাপট বিস্তার করবেন তার ইঙ্গিত স্পষ্ট। জয়া আহসানের মেদবহুল মুখে বয়সের ছাপ ঢাকতে পারে নি দুর্বল মেকাপ, নানা ডিজাইনের রঙ্গীন পোশাক আকর্ষণীয় হিসেবে উপস্থাপন করেছে, কিন্তু চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করে নি। শাকিব খানের কানের দুল এই আছে এই নাই, হেয়ারস্টাইল এই দৃশ্যে একরকম তো পরের দৃশ্যে আরেকরকম – খেয়াল করার মানুষ ছিল না সম্ভবত। অভিনয়ে শাকিব খান ম্যাচিওরড – কিন্তু তার আটোসাটো প্যান্টের সাথে হাতের অবস্থান কোন  ছবিতেই ম্যাচ করে নি, এখানেও নয়। অভিনয়ে ভালো করেছেন জয়ের বন্ধু চরিত্রে সাজু খাদেম।
বাণিজ্যিক ধারার যে কোন চলচ্চিত্রই দেখার সময় ভাবনা জাগে – শুধুমাত্র দশ-বারোটা গান দিয়ে একটা চলচ্চিত্র নির্মান করলে কেমন হবে? চলচ্চিত্র নির্মাতারা যে যত্ন নিয়ে গানগুলো তৈরী করেন, অভিনেতারাও গানের দৃশ্যে যে অভিনয় করেন – তা পুরো চলচ্চিত্রে পাওয়া গেলে প্রত্যেকটা চলচ্চিত্রই অনেকগুন বেশী উপভোগ্য হত। পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী দেখার সময়ও একই অনুভূতি হল। তবে নতুন করে কিছু যোগ হয়েছে আজ প্রথম গানটি দেখার সময় যেখানে শাকিব খান-আনোয়ারা এবং রাজ্জাক-মিমো জুটি বেঁধে নাচ গান করেন। অভিনয় পেশা বলেই হয়তো রাজ্জাক-আনোয়ার মত অভিনেতারা এমন সব গানে/চরিত্রে আজও অভিনয় করছেন, তাদের যৌবনকালের অভিনয়কে চিরঞ্জীব করার স্বার্থে হলেও এ ধরনের ভাড়ামীপূর্ন গানে/চরিত্রে তারা যদি অভিনয় না করতেন!
সব মিলিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী খুব জমজমাট সিনেমা না হলেও উপভোগ্য, সুন্দর কিছু সময় কাটানোর জন্য উপাদেয়। নকল আর নোংরা ছবির ভীড়ে এ ধরনের চলচ্চিত্রগুলো আশার আলো দেখায়। এদেশের চলচ্চিত্রে হঠাৎ ভালো হবে না জানি, কিন্তু রুম্মান রশীদ খান-সাফি উদ্দিন সাফিশাকিব খানজয়া আহসানআরেফিন শুভদের কাজের রেখা যেন প্রতিনিয়ত উর্দ্ধগামী হয় -সেই শুভকামনা সবসময়ের।
রেটিং: ৪/৫

About দারাশিকো

নাজমুল হাসান দারাশিকো। প্রতিষ্ঠাতা ও কোঅর্ডিনেটর, বাংলা মুভি ডেটাবেজ (বিএমডিবি)। যোগাযোগ - darashiko@gmail.com

View all posts by দারাশিকো →

One Comment on “পূর্ণদৈর্ঘ্য (পারিবারিক) প্রেম কাহিনী”

  1. অনেকদিন পর আপনার রিভিউ পরলাম। ভালো আছেন আশা করি।
    চমৎকার রিভিউ। 🙂

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *