কৃষ্ণপক্ষ সম্পর্কে যা বলা প্রয়োজন

গুণী অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন তার প্রথম চলচ্চিত্রটি নির্মান করতে সক্ষম হয়েছেন। ছবির নাম কৃষ্ণপক্ষ। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন রিয়াজ। তার সাথে আছেন মাহিয়া মাহি। এছাড়াও আছেন তানিয়া আহমেদ এবং আজাদ আবুল কালাম। এরা ছবির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। অগুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের অভিনেতাদের মধ্যে কায়েস চৌধুরী, ফেরদৌস, রফিকুল্লাহ সেলিমের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। ইমপ্রেসের প্রযোজনায় নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি মেহের আফরোজ শাওনের প্রথম নির্মিত ‘চলচ্চিত্র’। নানা কারণে বড়পর্দায় এই চলচ্চিত্রটি দেখার সুযোগ হয় নি, ছোটপর্দায় দেখার পর কিছু কথা বলার আগ্রহ বোধ থেকে এই পোস্টের অবতারনা।

মুহিব (রিয়াজ) জেবার (তানিয়া) ছোট ভাই। পিতৃমাতৃহীন সংসারে জেবাই একমাত্র স্বজন। জেবার বিয়ের সময় থেকেই বোনের সংসারে থাকে মুহিব। বেকার। করার মধ্যে কেবল একটি প্রেম, অরুর (মাহি) সাথে। মুহিব আর অরু গোপনে কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ে করে। বিয়ের পর বন্ধুর বাসায় রাত কাটিয়ে সকালে ঘরে ফেরে। দুলাভাইয়ের দেয়া চাকরীতে যোগ দেয়ার জন্য অফিসের গাড়িতে মুহিব রওয়ানা করে চট্টগ্রামের দিকে। মাঝরাস্তায় ট্রাকের সাথে এক্সিডেন্ট করে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌছে যায় মুহিব। হাসপাতালের বাহিরে সকলে তার ফেরার অপেক্ষায় থাকে। এই হল কৃষ্ণপক্ষের কাহিনী।

এই কাহিনী সংক্ষেপ উল্লেখের আগে আমি কোন স্পয়লার এলার্ট দেই নি। প্রথমত, এই নামে হুমায়ূন আহমেদের একটি উপন্যাস অবলম্বনে আছে যা বহুল পঠিত। এই উপন্যাস অবলম্বনেই সিনেমা নির্মিত। তাই এই কাহিনী সবার জানা। দ্বিতীয়ত, সিনেমা মুক্তির আগেই পত্রিকার সাক্ষাতকারে মুহিব যে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর পথে যাত্রা করবে সে ব্যাপারে নায়িকা মাহি জানিয়েছিল। সর্বশেষ, ছবির ট্রেলার দেখুন – ‘খুব খারাপ কিছুর জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে!’

এই সিনেমার স্পয়লার বলে কোন কিছু নেই। যা বলার ট্রেলারেই বলা আছে। এবং, এটা কোন সমস্যাও নয়। বহু সিনেমার গল্পই সিনেমা মুক্তির আগে থেকে জানা যায়। ওইসব সিনেমার মূল আকর্ষণ নির্মানে, গল্প উপস্থাপনে। সুতরাং কৃষ্ণপক্ষও সেরকম হতে পারে।

কৃষ্ণপক্ষ সিনেমা নির্মানে শাওন সবচে বড় বিড়ম্বনায় পড়েছেন ল্যান্ডফোন নিয়ে। হুমায়ূন যে সময় গল্প লিখেছেন সে সময় মোবাইলের দৌড়াত্ম ছিল না, ল্যান্ডফোনে প্রেম চলতো। কিন্তু শাওন সিনেমা বানিয়েছেন এই যুগে যখন মোবাইল আর কথা বলার বস্তু নয়, ইমো-ভাইবার ইত্যাদির কল্যাণে রিয়েলটাইম দেখাদেখিও চলে। অথচ অরুর বড় বোন মিরুর কোন মোবাইল ফোন নেই, (সম্ভবত) তার প্রবাসী বরেরও নেই, তাই ল্যান্ডফোনে ফোন বাজলেই মিরুকে ধরতে হয়। বিব্রতকর অবস্থা!

সিনেমার কেন্দ্রিয় চরিত্র মুহিব চরিত্রে রিয়াজ অভিনয় করেছেন। রিয়াজ ভালো অভিনেতা এবং হুমায়ূন আহমেদের টিমের একজন। কিন্তু কৃষ্ণপক্ষ চলচ্চিত্রে মুহিব যে ধরনের চরিত্র রিয়াজ সে তুলনায় অনেক বয়স্ক। তার একটি ছোট ভুঁড়ি আছে এবং দৌড়ালে তার বুকের মাংস থলথল করে। ঘটনা হল, এই বিষয়গুলোকে চোখের আড়াল করার অনেক ধরনের সহজ টেকনিকও আছে যার প্রয়োগ ঘটলে ভালো হত।

এই সিনেমার সবচে চমৎকার অংশ হল এর ‘ঠিকানা আমার নোটবুকে লেখা’ গানটি। এস আই টুটুলের সুরে ও কন্ঠে গানটি দারুন তৃপ্তিদায়ক। অন্যদিকে সবচে বাণিজ্যিক অংশ হল বৃষ্টিতে ভিজে রিয়াজ আর মাহির গান। কৃষ্ণপক্ষের নির্মাতা যদি স্বয়ং হুমায়ূন আহমেদ হতেন, তাহলে আমরা সম্ভবত শাওনকে এই রূপে দেখতে পেতাম না। মাহি বাণিজ্যিক সিনেমার নায়িকা, এ কারণেই কি এই উপস্থাপন?

প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে শাওন মন্দ করেন নি। চলচ্চিত্র নির্মানের আগে তিনি নাটক নির্মান করেছেন, চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন এবং সর্বোপরি একজন ভালো চলচ্চিত্র নির্মাতার সাথে ঘনিষ্ট সময় কাটিয়েছেন। সে তুলনায় কৃষ্ণপক্ষ ভালো কোন নির্মান হয়েছে বলে মনে করতে পারি না। সত্যি বলতে কি, কৃষ্ণপক্ষ চলচ্চিত্র নির্মানের মত গুরুত্বপূর্ণ অথবা উপযুক্ত কোন গল্প বলেও মনে করছি না। হুমায়ূন আহমেদের গল্প থেকে নির্মিত অন্যান্য চলচ্চিত্রগুলোর সাথে কৃষ্ণপক্ষ চলচ্চিত্রের তুলনা করলে হয়তো যে কোন দর্শকেরও একই সিদ্ধান্তে পৌছানো সহজ হবে। তবে সেক্ষেত্রেও ভালো স্ক্রিপ্ট একটি সাধারণ গল্পকেও অনন্যসাধারণ করতে পারে। ইমপ্রেসের ম্যাগাজিন আনন্দআলো জানাচ্ছে – মাত্র দেড়মাস সময়ের মধ্যে স্ক্রিপ্ট থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র মুক্তির সময় বেঁধে দেয়া হয়েছিল শাওনকে। হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিনে ছবিটি মুক্তির পরিকল্পনা নিয়ে নির্মান কার্যক্রম শুরু হলেও রিয়াজের অসুস্থতাসহ অন্যান্য কাজে নির্মান কাজ শেষ হতে দেরী হয়। এত অল্প সময়ে ছবি নির্মানের উদ্যোগ নিলে স্ক্রিপ্টে দেয়ার মত সময় কোথায়?

অবশ্য এ জন্য শুধু শাওনকে দায়ী করা উচিত হবে না, আমি বরং নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইমপ্রেসকে দায়ী করবো। ইমপ্রেসের বেশিরভাগ চলচ্চিত্র নির্মানের উদ্দেশ্যই থাকে চ্যানেল আইয়ের দর্শক, ফলে নিম্নমানের ছবি বানাতে এর জুড়ি নেই। শাওন ভবিষ্যত চলচ্চিত্রগুলো নির্মানে কিছু বিষয় ভেবে দেখতে পারেন। তিনি হুমায়ূন আহমেদের গল্প উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মান থেকে বিরত থাকতে পারেন, ইমপ্রেসের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে তুলনামূলক বেশি বাজেটে বড়পর্দায় মুক্তির উদ্দেশ্যে ভালো গল্পের চলচ্চিত্র নির্মানের উদ্যোগ নিতে পারেন – কি করবেন একান্তই তার সিদ্ধান্ত। দর্শক হিসেবে আমরা আরও উন্নততর কিছু চাই – এটুকু তাকে জানাতে চাই এবং আশা করি তিনি এ চাওয়াটুকু পূরণে সচেষ্ট হবেন।


দারাশিকো

নাজমুল হাসান দারাশিকো। চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখক ও ব্লগার। কোঅর্ডিনেটর, বাংলা মুভি ডেটাবেজ (বিএমডিবি) যোগাযোগ - darashiko@gmail.com

You may also like...

ফেসবুক মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares