শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে ১ম থেকে ৯ম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি পরীক্ষা (সাধারণ জ্ঞান বা মৌখিক/লিখিত পরীক্ষা) নেওয়া হবে, যা লটারির চেয়ে অনেক বেশি মেধাভিত্তিক। ভর্তি পদ্ধতির উপর শিশুর শিক্ষা ও ভবিষ্যত জীবন গুরুত্বপূর্ণভাবে নির্ভর করে, এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে সরকার অভিভাবক ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের মতামত নিয়েছেন কিনা নিশ্চিত নই, তবে এই সুযোগে আমার অভিজ্ঞতা উপস্থাপন করতে চাই – আশা করি কোন পদ্ধতিতে কল্যাণ সেটা অনুধাবন করা সম্ভব হবে।
বছর কয়েক পূর্বে আমার জ্যেষ্ঠ সন্তানকে ঢাকার নামকরা স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলাম। লটারি পদ্ধতিতে আবেদন করেছি। ফলাফল প্রকাশিত হলে দেখা গেলো আমার সন্তানের অবস্থান ২য় অপেক্ষমান তালিকায়। একে নামকরা স্কুল, তার উপর ১ম অপেক্ষমান তালিকায়ও নাম নেই – ফলে আমি হতাশ হয়ে অন্য আরেকটি স্কুলে আমার সন্তানকে ভর্তি করে দিলাম।
অফিস থেকে ফিরত হলে সেই নামকরা স্কুলের সামনে দিয়ে আসতে হয়। একদিন দেখলাম – ১ম অপেক্ষমান তালিকা থেকে শূণ্য আসনে ভর্তির জন্য আহবান করা হয়েছে। মেধাতালিকার সবাই ভর্তি হয়নি বলে আমি অবাকই হলাম।
তারপর থেকে প্রতিদিন একবার করে নোটিশবোর্ডে চোখ বুলাই। ১ম অপেক্ষমান তালিকা থেকেও শূণ্য আসন পূরণ হলো না। ২য় অপেক্ষমান তালিকা থেকে ৩জনকে ডাকা হলো। ৩য় নম্বরে আমার সন্তানের নাম। স্কুলে সাক্ষাত করে সন্তানকে ভর্তি করে দিলাম।
পরে জেনেছি – মেধাতালিকায় নাম না থাকায় সাধারণত কেউ খোঁজ নেন না। ফলে অপেক্ষমান তালিকায় নাম থেকেও অনেকে ভর্তি হতে পারে না।
আমি যে ভবনে ভাড়া থাকতাম, তার মালিকের অফিস কলিগ একদিন আমার সাথে যোগাযোগ করেছিলেন – কোন জাদুবলে আমার সন্তানকে ভর্তি করিয়েছি জানতে। তিনি প্রত্যেক বছরই নতুন ক্লাসে সন্তানকে ভর্তির জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন, কিন্তু সফল হতে পারেননি বলেই ধরে নিয়েছেন – আলাদিনের চেরাগ ছাড়া সেই স্কুলে ভর্তি হওয়া সম্ভব নয়।
আমার সন্তান সেই স্কুলে গত বছর পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। বাসস্থান পরিবর্তনের কারণে এ বছর আমি নতুন এবং মোটামুটি নামকরা স্কুলে আমার দুই সন্তানকে ভর্তি করেছি। সেটাও এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা।
ঢাকার অল্প কিছু স্কুল সরকারি লটারি পদ্ধতিতে অংশগ্রহণ করে না। তাদের ভর্তি পদ্ধতি নিজস্ব – সেখানে সকলকেই ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয় এবং উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে লটারিতে শিক্ষার্থীদেরকে বাছাই করা হয়।
আমার কনিষ্ঠ সন্তান সেখানে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে লটারিতে মেধাতালিকায় ভর্তির সুযোগ পেয়ে গেলো, আমিও ভর্তি করে দিলাম। বিপত্তি হলো জ্যেষ্ঠ সন্তানকে ভর্তি করতে গিয়ে। সে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীণ হলেও মেধাতালিকায় স্থান পেলো না, অপেক্ষমান তালিকার ১ম অবস্থানে রইল।
মেধাতালিকা থেকে ভর্তি শেষ হয়ে গেলেও অপেক্ষমান তালিকা থেকে আর কাউকে ডাকা হলো না। স্কুলে যোগাযোগ করলে জানা গেলো – উর্ধ্বতন কোন কর্মকর্তার সুপারিশে ভর্তির সুযোগ পাওয়া যেতে পারে। সুপারিশের ব্যবস্থা করা হলো। কিন্তু ডাক এলো না।
জানা গেলো – সবাই-ই সুপারিশ নিয়ে এসেছে, এমনকি ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণই করেনি – এমন শিক্ষার্থীর পক্ষেও সুপারিশ আছে। এদিকে স্কুলে নোটিশ টাঙ্গিয়ে জানিয়ে দেয়া হয়েছে ভর্তি কার্যক্রম শেষ, আর কোন তদবির গ্রহণ করা হবে না। বুঝলাম – স্কুল কর্তৃপক্ষও এই ব্যবস্থায় অভ্যস্ত। ভর্তি পরীক্ষা আর লটারির পর তদবিরের জোর পরীক্ষায় যে জিতবে সেই পারবে সন্তানকে ভর্তি করাতে।
স্কুল পর্যায়ে ভর্তি পরীক্ষার যুগে এটাই ছিল স্বাভাবিক নিয়ম। এই স্কুল তো অন্তত কিছু শিক্ষার্থীকে মেধাতালিকায় ভর্তির সুযোগ দিয়েছে। সেই যুগে নাকি মেধাতালিকায় কার অবস্থান থাকবে সেটা নিশ্চিত হতো পকেটের জোর পরীক্ষায় কি জিতবে তার উপর। প্রচলিত আছে যে – বিগত সরকারের জোটভুক্ত দুইজন সংসদ সদস্যের রুজি রোজগার এই তদবির বাণিজ্যের উপরই নির্ভর করত।
অভিভাবকরাও কি কম যেতেন। আমার এক ভাতিজিকে তার বাবা-মা প্রত্যেক বছরই এক নামকরা মেয়েদের স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করানোর চেষ্টা করতেন। ভাতিজি ভর্তি হতে সক্ষমও হয়েছে – যে বছর তার পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার কথা সে বছর প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার মাধ্যমে।
বয়সে বড় শিক্ষার্থীদেরকে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির চেষ্টা অবশ্য এখনও বন্ধ হয়নি। প্রায় সকল অভিভাবকই সন্তান জন্মের এক বা দুই বছর পরে বয়স কমিয়ে জন্ম নিবন্ধন সনদ তৈরি করেন। যে সব বাচ্চা ২য় বা ৩য় শ্রেণিতে পড়ার কথা, তারা ভর্তি হয় ১ম শ্রেণিতে। তাদের মেধার চাপে অন্যান্য বাচ্চা ও তাদের অভিভাবকদের জীবন জেরবার।
একাধিক জন্ম নিবন্ধন সনদের সংখ্যাও কম নয়। আমার সেই ভবন মালিক তার কনিষ্ঠ সন্তানকে নামকরা স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য বয়স এক বছর কমিয়ে, নাম ও জন্মতারিখে সামান্য হেরফের করে তারপর লটারিতে ভর্তি করাতে সক্ষম হয়েছেন। জন্ম নিবন্ধন সনদের বিচারে বাংলাদেশের জনসংখ্যা কত সেই হিসাব কোনদিন প্রকাশ হলে প্রকৃত চিত্র বোঝা সম্ভব হবে।
সারা দেশে কতগুলো স্কুলে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য চাহিদা রয়েছে সেটাও বিবেচনায় নেয়া দরকার। ঢাকা শহরে হাতে গোনা এক বা দুই ডজন স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে হলেও সন্তানকে ভর্তি করাতে চান অভিভাবকরা। বাকী স্কুলগুলোতে সারা বছরই শিক্ষার্থীকে ভর্তি করানোর সুযোগ আছে।
লটারি পদ্ধতিও এই হাতে গোনা স্কুলগুলোর জন্যই প্রয়োজন। বাকী স্কুলগুলোতে ভর্তির জন্য লটারিতে আবেদন না করলেও চলে – এটি আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ। তা সত্ত্বেও লটারি ও ভর্তি পরীক্ষা – এই দুইয়ের মধ্যে লটারিই কাম্য, কারণ এতে করে বিভিন্ন ক্ষমতার জোরে শক্তিমান এবং ক্ষমতাহীন – একই কাতারে অবস্থানের সুযোগ পায়। ক্ষমতাবানের সন্তানের পাশাপাশি দুর্বলের সন্তানও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পারে।
বরং শিক্ষাব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য যেখানে প্রয়োজন সেখানে মনযোগ দেয়া দরকার। কেন গুটিকয়েক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্তানকে পড়ানোর জন্য অভিভাবকরা উদগ্রীব হয়ে থাকে, কেন জনগনের করের টাকায় পরিচালিত সরকারি স্কুলগুলোতে পড়াতে আগ্রহী হয় না, নামকরা স্কুলগুলোর শিক্ষাদান ও পরিচালনা পদ্ধতিতে এমন কি সব গুণ রয়েছে যার কারণে তারা অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকে, সেই একই বিষয়গুলো অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিশ্চিত করার জন্য কি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন – তা জানার চেষ্টা করতে হবে এবং সেই মোতাবেক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সকল স্কুলে পড়াশোনার মান যেন সমান হয় – সেটা নিশ্চিতের চেষ্টাও জরুরী।
বিগত সরকারের বিপরীত পদক্ষেপ মানেই কল্যাণ নয়। বরং প্রকৃত কল্যাণ বিবেচনায় সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণই একান্ত কাম্য।
সম্পাদিতরূপে দৈনিক সমকাল অনলাইনে প্রকাশিত। ছবিসূত্র: ইনস্টাগ্রাম
