সম্ভাবনাময় ‘মানবতার দেয়াল’

Manobotar Deyal মানবতার দেয়াল

একটি দেয়াল। সেখানে কয়েকটি হ্যাঙ্গার লাগানো হয়েছে। সেখানে ঝুলছে বিভিন্ন ধরনের কাপড়। শার্ট, টি শার্ট, প্যান্ট, পাঞ্জাবি, কামিজ, শিশু পোষাক। একটি ব্যানার টাঙ্গানো আছে। সেখানে কিংবা দেয়ালেই রঙ তুলিতে লেখা রয়েছে – আপনার যা প্রয়োজন নেই এখানে রাখুন। আপনার যা প্রয়োজন এখান থেকে নিন। এটাই মানবতার দেয়াল। ইংরেজিতে ওয়াল অব হিউম্যানিটি অথবা ওয়াল অব কাইন্ডনেস।

ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় মানবতার এই দেয়াল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মহাখালি, মোহাম্মদপুর, উত্তরা, ভাসানটেক, মিরপুরসহ আরও অনেক জায়গায়। ব্যানার থেকেই বোঝা যায় ব্যবহৃত পুরাতন কাপড় যদি মানবতার দেয়ালে টাঙ্গানো হয় তবে গরীব অভাবী লোকজন যারা কাপড় কিনতে পারছেন না তারা এই মানবতার দেয়াল থেকে সংগ্রহ করে নিবেন। কাকরাইলে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের সামনে হ্যাঙ্গারের পরিবর্তে একটি কাঠের আলমারিই রাখা হয়েছে, উদ্দেশ্য সম্ভবত কাপড় ছাড়াও অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিনিময়ের ব্যবস্থা করা। সে হিসেবে একে মানবতার দেয়াল না বলে মানবতার আলমারিও বলা যেতে পারে।

মানবতার দেয়াল ধারনার উৎপত্তি ইরানে, ২০১৫ সালে। আমেরিকা এবং তার মিত্র দেশগুলো ইরানের উপর অবরোধ চাপিয়ে দেয়ায় সেখানকার দারিদ্র‍্য প্রকট আকার ধারণ করে। এমন সময় কোন এক অজ্ঞাত ব্যক্তি মানবতার দেয়াল ধারনার উদ্ভব ঘটান এবং একটি দেয়ালকে মানবতার দেয়াল হিসেবে চিহ্নিত করে শীতের কাপড় ঝুলানোর ব্যবস্থা করেন ও দরিদ্র ব্যক্তিরা সেখান থেকে কাপড় সংগ্রহ করতে শুরু করে। দ্রুত জনপ্রিয়তা পায় এই পদ্ধতি এবং বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশেও ওই একই বছরে মানবতার দেয়াল প্রতিষ্ঠিত হয়। মাগুরার আরপাড়া প্রাইমারি মডেল স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ইয়াসমিন আক্তার শিক্ষার্থীদেরকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য এই উদ্যোগ নেন। তবে ব্যপকতা লাভ করে ২০১৭/১৮ সালে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় মানবতার দেয়াল প্রধানত তরুণদের উদ্যোগে মানবতার দেয়াল তথা পুরাতন কাপড় বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়। বাংলাদেশে এ সকল কার্যক্রম তরুণদের উদ্যোগে পরিচালিত হলেও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এ ধরণের উদ্যোগে সরকারী কর্মকর্তাগণ অংশগ্রহণ করেছেন। একটি সংবাদে দেখা যায় একটি জেলার ডিসি মানবতার দেয়াল উদ্বোধন করছেন। স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার উদ্যোগেও এই ধরনের কার্যক্রমের সংবাদ চোখে পড়ে।

পুরাতন কাপড় সংগ্রহ ও বিতরণের এই উদ্যোগ বাংলাদেশে প্রথম নয়। শত শত বছর ধরেই এই অঞ্চলের মানুষ একে অপরকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। দুর্যোগের সময় এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠে৷ ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর ট্রাক নিয়ে ছাত্র যুবকদেরকে ত্রাণ হিসেবে বিতরণের জন্য পুরাতন কাপড় সংগ্রহ করার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছি। এমনকি ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে মায়ানমার থেকে লাখো শরণার্থী এই দেশে আশ্রয় গ্রহণ করার পর পুরাতন কাপড় সংগ্রহ এবং বিতরণের উদ্যোগ লক্ষ্য করা গিয়েছিল। এছাড়া প্রত্যেক বছর শীতে দরিদ্রদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণের জন্য পুরাতন কাপড় সংগ্রহ করা হয়।

তবে শীতকাল কিংবা জরুরী সাহায্যের প্রয়োজন ব্যতিরেকে পুরাতন কাপড় সংগ্রহ বা বিতরণ সম্ভবত কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে পারছে না। এ ব্যাপারে কোন স্টাডির রেফারেন্স দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ঢাকা ট্রিবিউনের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত মানবতার দেয়াল উদ্যোগগুলো সফলতা অর্জন করতে পারছে না। প্রতিবেদনে উদ্যোক্তাদের বরাতে অগ্রগতি উল্লেখ করে প্রচারের অভাব এবং সাধারণ মানুষের দ্বিধাদ্বন্দকে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকার বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত মানবতার দেয়ালে ঝুলন্ত কাপড় দেখেও এই অবস্থা সম্পর্কে ধারণা করা যায়।

মানবতার দেয়াল কেন বাংলাদেশে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারছে না তার সম্ভাব্য কিছু কারণ ধারণা করা যায়। গত দুই তিন দশকে বাংলাদেশে আর্থ সামাজিক অবস্থার বিপুল পরিবর্তন ঘটেছে। এদেশের মানুষের প্রধান দুটি মৌলিক প্রয়োজন – খাদ্য ও বস্ত্র – দুয়ের অভাব অনেকাংশেই দূর হয়েছে। দেশে খায় উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ। এক দশক আগেও বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভিক্ষার চাল সংগ্রহ করতো ভিক্ষুকরা। গ্রামে মজুরির অংশ হিসেবে নগদ অর্থের পাশাপাশি ধান চাল কিংবা ভাত তরকারি দেয়ার প্রচলন ছিল। কারণ তখন ক্ষুধার কষ্ট ছিল, এখন বরং নগদ অর্থের অভাব প্রকট। এছাড়া গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির সাফল্যে নামমাত্র মূল্যে এখন পড়ার জন্য কাপড় কিনতে পাওয়া যায়। শহরের সর্বত্র তো বটেই, গ্রামে গঞ্জেও এখন সস্তায় পোষাক কেনা সম্ভব হচ্ছে৷ মানবতার দেয়াল কাঙ্ক্ষিত মানের সাফল্য না পাওয়ার এটা উল্লেখযোগ্য কারণ হতে পারে৷

অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নের কারণে যেমন ভাত কাপড়ের কষ্টের উপশম হয়েছে তেমনে অপেক্ষাকৃ সচ্ছল ব্যক্তিদের জন্য সমস্যারও কারণ হয়েছে।বিভিন্ন কারণেই ব্যবহার্য জিনিসপত্রের আয়ু ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে, ফলে অপ্রয়োজনীয় কাপড় থেকে শুরু করে প্লাস্টিক পণ্য, আসবাবপত্র, ইলেক্ট্রনিক্স সরঞ্জামাদি ইত্যাদি বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ছে। ইলেক্ট্রনিক্স এবং লৌহজাতীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কিছু ক্ষুদ্র উদ্যোগ দেশে শুরু হলেও তা উল্লেখযোগ্য নয় এবং প্রয়োজনের তুলনায় বেশ অপর্যাপ্ত।

অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নের কারণে যেমন ভাত কাপড়ের কষ্টের উপশম হয়েছে তেমনে অপেক্ষাকৃ সচ্ছল ব্যক্তিদের জন্য সমস্যারও কারণ হয়েছে।বিভিন্ন কারণেই ব্যবহার্য জিনিসপত্রের আয়ু ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে, ফলে অপ্রয়োজনীয় কাপড় থেকে শুরু করে প্লাস্টিক পণ্য, আসবাবপত্র, ইলেক্ট্রনিক্স সরঞ্জামাদি ইত্যাদি বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ছে। ইলেক্ট্রনিক্স এবং লৌহজাতীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কিছু ক্ষুদ্র উদ্যোগ দেশে শুরু হলেও তা উল্লেখযোগ্য নয় এবং প্রয়োজনের তুলনায় বেশ অপর্যাপ্ত।

উন্নত বিশ্বে এই সমস্যা আরও প্রকট হওয়ায় সেখানে সমাধানেরও বিভিন্ন পন্থার প্রচলন ঘটেছে৷ প্রথম বিশ্বের দেশগুলোতে এ ধরণের গার্হস্থ্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য মুনাফা এবং অমুনাভোগী অনেক সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উৎপত্তি হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো শুধুমাত্র কাপড় নয়, পুরাতন আসবাবপত্র এবং অন্যান্য সরঞ্জামাদি সংগ্রহ করে এবং বিতরণের ব্যবস্থা করে। এরকম একটি প্রতিষ্ঠান হলো অক্সফাম

অক্সফাম একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। ইংল্যান্ডের বিভিন্ন জায়গায় তাদের ডোনেশন সেন্টার রয়েছে। সব সেন্টার একই সাথে ডোনেশন সংগ্রহ এবং বিক্রয় – দুই কাজই করে থাকে। তবে, সব সেন্টার সব জিনিস গ্রহণ করে না, তাই অক্সফামের ওয়েবসাইটে কোন সেন্টার কী গ্রহণ করে তা উল্লেখ করা আছে। সাধারণত তারা যা ডোনেশন হিসেবে গ্রহণ ও বিক্রয় করে থাকে তার মধ্যে কাপড় (এমনকি মেয়েদের অন্তর্বাসও), ব্যাগ, বই, মিউজিকের সরঞ্জাম, সিডি, ডিভিডি, ছবি, অলংকারাদি, রান্নাঘরের সরঞ্জামাদি, খেলনা, মোবাইল ফোন, হালকা ও ভারী ফার্নিচার ইত্যাদি ইত্যাদি। ব্যবহার উপযোগী নয় এমন কাপড় রিসাইকেল করে বিভিন্ন উপকরণ তৈরি করে বিক্রয় করা হয়। এই বিক্রয় যেমন তাদের ডোনেশন সেন্টার কাম শপ থেকে করা হয়, তেমনি তৃতীয় বিশ্বেফ দেশগুলোতেও করা হয়। এমনকি, অক্সফাম অনলাইনেও বিক্রি করার ব্যবস্থা রেখেছে। ডোনেশন হিসেবে পাওয়া এইসব সামগ্রী বিক্রয় করে পাওয়া অর্থ তারা দুঃস্থদের জন্য, বিশেষতঃ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে, পরিচালিত দারিদ্র‍্য বিমোচনমূলক বিভিন্ন কার্যক্রমে ব্যয় করে।

ডোনেশন সংগ্রহের জন্য আরেকটি অত্যন্ত জনপ্রিয় পন্থা হলো ডোনেশন বিন স্থাপন। আবাসিক এলাকার রাস্তার মোড়ে মোড়ে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে ডোনেশন বিন স্থাপন করা হয়। প্রতিষ্ঠান ভেদে বিভিন্ন রকম জিনিসপত্র ডোনেশন হিসেবে সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত ডোনেশন বিক্রি করে কেউ মুনাফা অর্জন করে, কেউবা অন্যান্য সামাজিক কাজে ব্যয় করে। কিছু প্রতিষ্ঠান আছে তারা সরাসরি তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিতরণের ব্যবস্থা করে।

ঘরের পুরাতন কাপড়, আসবাবপত্র ইত্যাদি ব্যবস্থাপনার এই মডেল বাংলাদেশেও অনুসরণ করা যেতে পারে। প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় এই উদ্যোগ গ্রহণ করা যায়। সেক্ষেত্রে, উদ্যোক্তাদের অবশ্যই মুনাফালোভী হওয়া উচিত হবে না এবং সর্বক্ষেত্রে সততার পরিচয় দিতে হবে৷ ডোনেশনভিত্তিক এ কার্যক্রমের বিস্তৃতি ঘটলে একদিকে যেমন স্বল্প আয়ের ও দরিদ্র মানুষের বেঁচে থাকা সহজতর হবে তেমনি অপেক্ষাকৃত সচ্ছল ব্যক্তিদের মধ্যেও কল্যাণকামীতার মানসিকতার বিস্তৃতি ঘটবে।

দৈনিক দেশ রূপান্তর এ ‘মানবতার দেয়াল ও দানের ঝুড়ি’ শিরোনামে প্রকাশিত

About দারাশিকো

নাজমুল হাসান দারাশিকো। প্রতিষ্ঠাতা ও কোঅর্ডিনেটর, বাংলা মুভি ডেটাবেজ (বিএমডিবি)। যোগাযোগ - [email protected]

View all posts by দারাশিকো →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *