ভাংতি টাকার সংকট ও ক্যাশলেস সমাজ

ভারতে ক্যাশলেস সমাজ

‘ভাংতি নাই, ছোট নোট দেন’ – এই কথা কখনও শুনেন নাই, এমন মানুষ পাওয়া অসম্ভব। এর সাথে আছে পুরাতন, ময়লা ও ছেঁড়া নোট বদলে দেয়ার অনুরোধ। সম্প্রতি ভারতের নয়াদিল্লী ভ্রমণে ছেঁড়া নোট বদলের অনুরোধ না শুনলেও ভাংতির সংকট মোকাবেলা করতে হয়েছে বেশ। দুয়েকটি ঘটনা শেয়ার করতে চাই।

রাতের খাবারের জন্য গিয়েছি। ১৭৯ রুপীর খাবার অর্ডার করে ৫০০ রুপীর নোট দিয়েছি। ক্যাশিয়ার বলে – নো চেঞ্জ! কার্ড বা মোবাইলের মাধ্যমে পেমেন্ট করতে পারবো কিনা জানতে চাইল, না উত্তর পেয়ে অর্ডার ক্যান্সেল করে দিল – খাবার বেচবে না!

আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম। আরও কয়েকজন খদ্দের খাবার কিনলেও আমার জন্য ভাংতি হলো না। না খেয়ে থাকতে হয় কিনা এই ভয় পেতে শুরু করেছি – তখন তার একটু দয়া হলো। ১৭৯ রুপিকে বাড়িয়ে ১৯০ রুপির খরচ করিয়ে নিজের পকেট থেকে মিলিয়ে তারপর ৫০০ রুপীর ভাংতি এবং খাবার দিল!

ভাংতি টাকার এই সংকট দিল্লীর সর্বত্র। এমনকি সুপারস্টোরে কেনাকাটা শেষেও ভাংতির জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। একাধিক গন্তব্যে পৌঁছে বাড়তি ভাড়া দিতে হয়েছে গাড়িচালককে। দুয়েকবার সকলের পকেটের খুচরা মিলিয়ে মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে।

এই সংকটের কারণ ও সমাধান খোঁজার চেষ্টা করতে গিয়ে বুঝেছি – এই সংকট সরকারেরই সৃষ্ট! ভারতের মতো বিশাল দেশে ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট একটি ব্যয়বহুল ও বিশাল কর্মযজ্ঞের বিষয়। ফলে তারা ডিজিটাল পেমেন্টকে উৎসাহিত করছে গত প্রায় এক দশক ধরে, ধীরে ধীরে ক্যাশলেস সমাজ গড়ার চেষ্টা করছে।

এখন ভারতে ডিজিটাল পেমেন্টের জয়জয়কার। সবখানেই কিউআর কোড সম্বলিত স্টিকার। প্রায় তিন শতাধিক প্রতিষ্ঠানের সেবা ব্যবহার করে নাগরিকরা যে কোন প্রয়োজনে অর্থ পরিশোধ করতে পারে। এমনকি রাস্তার পাশে ভ্রাম্যমান অস্থায়ী দোকানগুলোতেও কেনাকাটা শেষে মোবাইল থেকে পেমেন্ট করতে পারে।

একদিন দিল্লীর কুতুব মিনার দেখতে গিয়েছি। টিকেট কাটতে গিয়েও খুচরা টাকার সংকট। একজনকে দেখলাম পাশের লোকের কাছ থেকে নগদে বিশ রুপী ধার করে টিকেট কাটলেন, আর ধার পরিশোধ করলেন মোবাইল থেকে। বুঝলাম, কেবল মূল্য পরিশোধ নয়, ব্যক্তিগত ফান্ড ট্রান্সফারেও মোবাইলের ব্যবহার প্রচুর।

মোবাইল ভিত্তিক এই সকল সেবাদাতার মাধ্যমে প্রতিবছর কয়েক বিলিয়ন রুপী লেনদেন হয়। যে ব্যবস্থায় এই কাজটি সম্ভবপর হয়েছে তার নাম হলো ইউপিআই বা ইউনিফায়েড পেমেন্ট ইন্টারফেস, যে প্রতিষ্ঠান এই কাজটি করছে তার নাম এনপিসিআই বা ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া।

ফোনপে, গুগলপে, পেটিএম, আমাজনপে, পোস্টপে, ক্রিড, গ্রো পে, এক্সিস পে ইত্যাদি বাহারী নামের প্রচুর সেবাদাতা থেকে গ্রাহক তার পছন্দের এ্যাপ বাছাই করে নিতে পারেন। এ সকল সেবাদাতার মধ্যে সবচেয়ে বেশি গ্রাহক রয়েছে পেটিএম এর, ৩৩৩ মিলিয়নের বেশি। কিন্তু সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয় ফোনপে এবং গুগল পে-র মাধ্যমে। এই দুই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মোট ইউপিআই লেনদেনের প্রায় ৮০ শতাংশ সম্পন্ন হয়। আর এই তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পাদিত মাসিক লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ২০ বিলিয়ন রুপী!

ব্যাংক ও নন ব্যাংক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি) তো বাংলাদেশেও আছে, কিন্তু ভারতের মতো এতটা জনপ্রিয় নয় কেন – সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বুঝলাম – ডিজিটালি পেমেন্ট ও ফান্ড ট্রান্সফারে ভারতের সরকারের গৃহীত কিছু পদক্ষেপই এর কারণ।

এর অন্যতম হলো পেমেন্ট ও ফান্ড ট্রান্সফারে কোন ফি/চার্জ না রাখা। যে কোন গ্রাহক যে কোন এ্যাপ ব্যবহার করে যে কোন এ্যাপের গ্রাহককে পেমেন্ট করতে পারেন, একে বলা হয় ইন্টারঅপারেবিলিটি, এজন্য কাউকে একটি বাড়তি পয়সাও গুণতে হয় না। ব্যবহারকারী সেবাদাতাদের এ্যাপগুলোর নিরাপত্তা, সেবার মান ইত্যাদি নানা বিষয় বিবেচনায় সেগুলোকে বেছে নিচ্ছেন।

এছাড়াও, সরকার ক্যাশলেস লেনদেনকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন রকম সুবিধা দিচ্ছে। যেমন দর্শনীয় স্থানগুলোর টিকেট কিনতে একদিকে যেমন প্রায় ১০ শতাংশ ছাড় পাওয়া যায় তেমনি প্রবেশপথের দীর্ঘ লাইন এড়িয়ে জন্য পৃথক ছোট লাইনেও প্রবেশ সম্ভব। এমনকি, দিল্লীর ব্যস্ততম সুপারমার্কেটেও দেখেছি – কিছু কাউন্টারে নগদে পেমেন্ট করার ব্যবস্থাই নেই, সেখানে কেবল কার্ড এবং ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করা হয়।

এমনকি, সারা দুনিয়ার পর্যটকদের অন্যতম গন্তব্য ভারতে এসে যেন ভাংতি সংকটে বিপর্যস্ত না হয়ে ডিজিটাল লেনদেনে অংশগ্রহণ করতে পারে সেজন্য পর্যটকদের জন্যও পেমেন্ট এ্যাপ চালু করা হয়েছে। এয়ারপোর্টে বসেই যেন পাসপোর্টের মাধ্যমে একাউন্ট চালু করে নেয়া যায় সেটা নিশ্চিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশে এমএফএস এর প্রচলন একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে সক্ষম হলেও এর ব্যবহার এখনও সার্বজনীন নয়৷ মানুষ অনেকটা বাধ্য হয়েই এই সেবা গ্রহণ করে। বিগত সরকারের সময় এই খাতে নানা অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। ইন্টারঅপারেবিলিটি নিশ্চিতের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নানা পদক্ষেপ নিলেও সফল হয়নি। বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পাশ কাটিয়ে সরকারের আইডি ডিভিশনের উদ্যোগে সরকারি দলের নেতাদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে ‘বিনিময়’ নামে একটি পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল যা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি।

মাত্র কয়েক মাস আগে বাংলাদেশ ব্যাংক এনপিএসবির আওতায় পূর্ণোদ্যমে ইন্টারঅপারেবিলিটি সেবা প্রদান শুরু করেছে। এখন থেকে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে লেনদেনের কোন জটিলতা নেই – সহজেই ব্যাংক, এমএফএস এবং পিএসপিগুলোর মধ্যে অর্থের আদান-প্রদান সম্ভব। কিন্তু এই উদ্যোগ সফল হবার ব্যাপারে এখনও কিছু বাধা রয়ে গেছে।

বিগত নভেম্বর মাস থেকে চালু হওয়া এই সিস্টেমে বাংলাদেশ ব্যাংক এ সংক্রান্ত লেনদেনের ফি/চার্জ এর সর্বোচ্চ সীমা ধার্য্য করে দিয়েছে যা প্রেরকের কাছ থেকে নেয়া হবে। তবে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভর করবে তা আদায় করা হবে কিনা, অর্থ্যাৎ, সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান চাইলে বিনামূল্যে বা স্বল্প ফি-র বিনিময়ে এই সেবা দিতে পারবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক এই ফি ধার্য্য করেছে ইন্টারঅপারেবিলিটি নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানগুলোর যে ব্যয় হয় তা পুষিয়ে নেয়ার জন্য। এই সিস্টেম চালু করার প্রয়োজনীয় বড় অংকের ব্যয়, যা অর্ধশত কোটি টাকারও বেশি, বাংলাদেশ ব্যাংক বহন করেছে। কিন্তু এই ইন্টারঅপারেবিলিটি সেবা প্রদানের জন্য সকল প্রতিষ্ঠানই বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেয়া সর্বোচ্চ সীমায় ফি ধার্য্য করেছে, ফলে এখনও গ্রাহককে লেনদেনের পূর্বে ভাবতে হচ্ছে।

ইন্টারঅপারেবল লেনদেনের জন্য ব্যাংক ও অন্যান্য সেবাদাতার কিছু খরচ থাকবেই, তা সত্ত্বেও ভারত কিভাবে এই সেবাটি বিনামূল্যে প্রদান নিশ্চিত করেছে? উত্তর হলো – ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে। গড়ে প্রতিটি লেনদেনের জন্য সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের ব্যয় হয় ১ থেকে ২ রুপী। এই ব্যয়ের কিছুটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভর্তুকী দিচ্ছে। ২০২৬ অর্থ বছরে এই খাতে বরাদ্দ প্রায় ২২০০ কোটি রুপী, ২০২৭ অর্থ বছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০০০ কোটি রুপী।

ব্যাংক সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের খরচ পুষিয়ে নেয়ার জন্য মার্চেন্ট লেনদেনের জন্য চার্জ করছে। এছাড়া বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আয় বাড়াচ্ছে। অনেকে সুদে ঋণ নেয়ার সুযোগ দিচ্ছে। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাগুজে নোট ছাপানো ও ব্যবস্থাপনার ব্যয় কমিয়ে এনেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকও এই পন্থা অবলম্বন করতে পারে। বাংলাদেশে প্রতি বছর নতুন টাকা ছাপানোর জন্য ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন টাকা ব্যয় করা হয়। এছাড়া অর্থ ব্যবস্থাপনার জন্য বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয় বলে জানিয়েছিলেন সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। ডিজিটাল পেমেন্ট খাতে ভর্তুকি দেয়া গেলে টাকা ছাপানো ও ব্যবস্থাপনার খরচ কমানোও সম্ভব হবে।

ডিজিটাল লেনদেনের বহুবিধ উপকারও রয়েছে। যেমন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো হতে ডেটা সংগ্রহ করে একটি কেন্দ্রীয় রিপোজিটরি গঠন করা সম্ভব হলে ঋণগ্রহীতার আচরণ-অভ্যাস ইত্যাদি পর্যালোচনা ও নির্ণয় সহজতর হবে। এছাড়া মার্চেন্ট একাউন্টে সংঘটিত লেনদেনের উপর ভিত্তি করে আয়করের পরিমাণ নিশ্চিতেও এনবিআর-কে সহায়তা করা সম্ভব হবে।

মোদ্দা কথা হলো – জনগণকে স্পষ্টভাবে বোঝাতে হবে যে ডিজিটাল লেনদেনই নিরাপদ ও লাভজনক, তবেই লেস-ক্যাশ সমাজ গঠন সম্ভব হবে এবং ভাংতি ও ছেঁড়া-ফাটা নোটের সমস্যার সমাধান হবে। সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নিবে সেই প্রত্যাশাই করি।

দৈনিক সমকালের সম্পাদকীয় পাতায় সংক্ষিপ্তাকারে প্রকাশিত। ছবিসূত্র: বিডিনিউজ২৪

About দারাশিকো

আমি নাজমুল হাসান দারাশিকো। লেখালিখির প্রতি ভালোবাসা থেকে লিখি। পেশাগত এবং সাংসারিক ব্যস্ততার কারণে অবশ্য এই ভালোবাসা এখন অস্তিত্বের সংকটে, তাই এই ওয়েবসাইটকে বানিয়েছি আমার সিন্দুক। যোগাযোগ - darashiko(at)gmail.com

View all posts by দারাশিকো →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *