রাজশাহী-নাটোরে (রাজশাহী পর্ব)

ই-বুক ডাউনলোড: রাজশাহী-নাটোরে

আমার দীর্ঘদিনের সাথী ছোটভাই দুর্ধর্ষ শোয়াইব সৈনিক অবশেষে সৈনিক জীবন ত্যাগ করে পারিবারিক জীবনে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। এজন্য অবশ্য তার প্রস্তুতিও ব্যাপক। প্রথমে সে নামের শেষ থেকে ‘সৈনিক’ ছাটাই করেছে। তারপর চেহারায় নিরীহ জেন্টলম্যান ছাপ বসানোর জন্য কালো ফ্রেমের চশমা পড়া শুরু করেছে এবং সর্বশেষ, রিজিকের উৎস পালটে নিয়েছে। খোদা তায়ালা তার এই স্বেচ্ছা পরিবর্তনে সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং পারিবারিক জীবন শুরু করার জন্য একটি চমৎকার এবং উপযুক্ত তরুণীকে শোয়াইবের রিজিকে যুক্ত করার জন্য সন্ধান দিয়েছেন। তাকে নিয়ে আসার জন্যই সদলবলে যেতে হবে রাজশাহীতে।

বিয়ে শুক্রবার দুপুরে। ভোরবেলায় ঢাকা থেকে আত্মীয় স্বজন আর অল্প কিছু বন্ধুকে সাথে নিয়ে দুই বা তিনটে মাইক্রোবাসে চড়ে রাজশাহীতে পৌঁছানো এবং বিবাহ-সংক্রান্ত সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে রাতের মধ্যে ঢাকায় ফিরে আসা – এই হলো ওদের পরিকল্পনা। আমাকে থাকতে হবে বরযাত্রী হিসেবে। বরযাত্রায় আমার আপত্তি নেই, তবে আমার পরিকল্পনা একটু ভিন্নরকম। দুই চারদিন আগে একদিন ভোরবেলায় রাজশাহীতে নামবো, সাথে থাকবে পরিবার। শুক্রবারের আগের কয়েকদিন বেড়াবো কোন তাড়াহুড়া না করে, শোয়াইবের বিয়েতে যোগ দিবো এবং সেদিন রাতেই ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করবো।

পরিকল্পনা অনুযায়ী সোমবার রাতে ঢাকার কল্যাণপুর থেকে যাত্রা করলাম আমরা।দীর্ঘদিন পরে পরিবার নিয়ে বেড়াতে যাচ্ছি। বিষয়টা চ্যালেঞ্জিং – কারণ দলে ছোট বাচ্চা আছে। তার যত্ন-আত্তির জন্য সবসময় খেয়াল রাখতে হয়। মূলত এ কারণেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশী সময় বরাদ্দ রেখেছি। যে সকল দর্শনীয় স্থানের তালিকা করেছি সেগুলো সব দেখতেই হবে এমন সংকল্পও নেই।

রাজশাহী-নাটোরে ভ্রমণ কাহিনীটি তিনটি ভাগে প্রকাশ করা হয়েছে – রাজশাহী পর্ব, নাটোর পর্ব এবং রাজশাহীর খাবার। পাঠকের পড়ার সুবিধার্থে সম্পূর্ণ ভ্রমণ কাহিনীকে ছবিসহ একটি ই-বুকে রূপান্তরিত করা হয়েছে। ফাইল সাইজ: ১১ মেগাবাইট।

ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন – ছবিতে অথবা এখানে

রাজশাহীতে নামলাম ফজরের ওয়াক্তে। সরকারী একটি অফিসের গেস্ট হাউজে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। হাজির হয়ে পরিচয় দিলেই চলবে বলে জানতাম। কিন্তু তেমনটা হলো না। অফিসের গেস্ট রুমে বসে থাকতে হলো ঘন্টাখানেক। সিকিউরিটির কাছে তথ্য ছিল আরও পরে পৌঁছানোর। ফলে তার কাছে চাবী ছিল না। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাসা থেকে চাবী নিয়ে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হলো।

গেস্ট হাউজটা বেশ বড়। ভেতরে বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের জন্য বিভিন্ন আকৃতির পাঁচটি কক্ষ ছাড়াও রয়েছে বিশাল হলরুম, কিচেন। এটাচড টয়লেট ছাড়াও কমন বাথরুম, টয়লেট রয়েছে। আছে বারান্দা। সবচেয়ে আনন্দদায়ক ব্যাপার হল – এই বিশাল গেস্ট হাউজে কেবল আমরাই অতিথি। শুধু রুমে বসে থাকতে হবে এমন নয়, বাহিরের সোফায় বসা যাবে, বাচ্চাকে কোলে নিয়ে হেঁটে-হেঁটে ঘুম পাড়ানো যাবে, চাই-কি একটু দৌড়াদৌড়িও করে নেয়া যাবে। কিচেন ব্যবহার করে কারও বিরক্তি উৎপাদন করার সুযোগও থাকলো না।

জায়গা পাওয়া গিয়েছে, এবার প্রথম কাজ হলো রাতের ঘুমের ঘাটতি পূরণ করা। লেপ-কম্বল মুড়ি দিয়ে দিলাম ঘুম। ঘুম এত ভালো হলো যে উঠে প্রস্তুত হয়ে হোটেলে গিয়ে দেখি সকালের নাস্তা ফুড়িয়ে গেছে। হয় সিঙ্গারা গোছের কিছু দিয়ে নাস্তা করতে হবে, নাহয় দুপুরের ভাতের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। উপায় ছিল না, আমরা পরেরটিই বেছে নিলাম। মাস্টার শেফ নামের এক রেস্টুরেন্টে বসে ভাতের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।

শহীদ এ এইচ এম কামরুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা

যেদিন রাজশাহীতে পৌঁছলাম সেদিন থেকে শুক্রবার পর্যন্ত রাজশাহীতে বৃষ্টির দেখা পাইনি। অথচ এর আগের কয়েকদিন ‘হালকা থেকে মাঝারী অথবা ভারী বৃষ্টিপাত’ হয়েছে। তার উপর আমাদের প্রতিবেশী বন্ধু দেশ ফারাক্কা বাঁধের অনেকগুলো স্লুইসগেট খুলে তাদের অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিয়েছে। ফলে পদ্মায় পানি বেড়েছে, বিপদসীমাও অতিক্রম করেছে কিছু জায়গায়। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনার কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে এবং বন্যার আশংকা করা হচ্ছে। রাজশাহী ভ্রমণের সময় আমরা এই পানি বৃদ্ধির কিছু চিত্র দেখেছি বটে,সেটা রাজশাহী শহরে নয়। বিগত কয়েকদিনের বৃষ্টির ফলাফল দেখা গেল শহীদ এ এইচ এম কামরুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানায়।

চিড়িয়াখানার প্রবেশপথ বেশ চমৎকার। বাঁধানো রাস্তা, বাহারী গেট, ছোট্ট ঘরে টিকেট কাউন্টার। ভেতরে বেশ প্রশস্ত বাঁধানো জায়গা। কিন্তু তার পুরোটাই পানিতে ডুবে আছে। অনেক আগ্রহ নিয়ে চিড়িয়াখানায় এসেছি, ভেতরে না ঢুকেই ফেরত যেতে হলে ব্যাপারটা বেশ খারাপ হবে। টিকেট কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা মানুষটির সাথে কথা বলে জানা গেল – শুধুমাত্র এই চত্ত্বরটুকুই পানিতে ডুবে আছে। বাকী জায়গায় কাদা থাকলেও পানি নেই।

টিকেট কেটে, জুতা-মোজা হাতে নিয়ে, প্যান্ট গুটিয়ে প্রায় হাঁটুপানিতে নেমে বুঝলাম – বেশ ঝুঁকি নিয়েছি। টাইলস করা মেঝে অত্যন্ত পিচ্ছিল হয়ে আছে। যে কোন সময় পা হড়কালে কেবল ব্যাথাই পেতে হবে না, নোংরা কাদা-পানিতে মাখামাখি হতে হবে। বাচ্চাকে কোলে নিয়ে সবাই হাত ধরাধরি করে অত্যন্ত সতর্কভাবে পা টিপে টিপে প্রায় ষাট ফিট দুরত্ব পার হয়ে তারপর মূল অংশে পৌঁছলাম। নিজেকে কলম্বাস মনে হচ্ছিল।

আমার রাজশাহী ভ্রমণ এবার প্রথম নয়। প্রথম এসেছিলাম ২০০৯ সালে। তখন একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের প্রযোজকের সহকারী ছিলাম। রাজশাহীর টেনিস ক্লাবে একটি ইন্টারন্যাশনাল টেনিস টুর্নামেন্ট কাভার করতে এসেছিলাম। থেকেছি পর্যটন কর্পোরেশনের মোটেলে। মোটেল, টেনিস ক্লাব আর চিড়িয়াখানা পায়ে হাঁটা দূরত্বে। চিড়িয়াখানাও তখন বেড়িয়ে গিয়েছিলাম।

লেকর মাঝখানে রেয়েছ একটি চমৎকার ভাস্কর্য (ছবি: ভ্রমণগাইড.কম)

যে বিশাল জায়গা জুড়ে আজকের কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা তা এককালে ছিল রেসকোর্স ময়দান। ব্রিটিশ আমলে এবং সম্ভবত পাকিস্তান আমলেও এখানে ঘোড়দৌড় হতো। পরে রেস বন্ধ হলে এই বাগান অব্যবহৃত অবস্থায় ছিল। স্বাধীনতার পরে একে কেন্দ্রীয় উদ্যান হিসেবে কিছু উন্নতি সাধন করা হয়। আশির দশকে প্রথমে কয়েকটা ঘড়িয়ালের বাচ্চা ছাড়ার মাধ্যমে চিড়িয়াখানার কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। বর্তমানে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন এর তত্ত্বাবধায়ক।

দশ বছরের ব্যবধানে চিড়িয়াখানার বৈচিত্র্য বাড়েনি, অবকাঠামোগত কিছু উন্নয়ন হয়েছে। তখন সবচেয়ে অবাক হয়েছিলাম খাঁচায় আটক একটি গাধাকে দেখে, কারণ ঢাকা জাতীয় চিড়িয়াখানায়ও গাধা দেখিনি। এবার অবশ্য গাধা একটা নেই, অনেকগুলো হয়েছে। এখন অবশ্য ঢাকার চিড়িয়াখানাতেও গাধা আছে, কিছুদিন আগে দেখে এসেছি। বিভিন্ন ধরণের হাঁস, পাখি আর হরিণ-বানর-বেবুন-অজগর ছাড়া উল্লেখযোগ্য আর কিছুই নেই। বাঘ-সিংহ-ভালুক ছাড়া চিড়িয়াখানা ঠিক জমে না। জ্যান্ত না হলেও একটি জিরাফ, আর একটি গরিলা দেখা গেলো। তারপর হঠাৎ করেই চিড়িয়াখানাটা শেষ হয়ে গেলো।

দেখার কিছু না থাকলেও চিড়িয়াখানায় লোকজন আসছে। বেশিরভাগই তরুণ-তরুণী। অল্প কিছু বাচ্চা-কাচ্চাও আছে। তারা কেন এখানে আসে তা বোঝা গেল চিড়িয়াখানার শেষাংশে পৌঁছানোর পর।

একটি মিনি শিশুপার্ক আছে এখানে। দোলনা, ট্রেন, ঝুলন্ত নৌকা সহ বেশ কিছু রাইড রয়েছে। আছে পানিতে ঘূর্ণায়মান হাঁস আকৃতির নৌকা। পানিতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে কিছু প্লাস্টিকের বল। হাঁসের পিঠে বসে ঘুরতে ঘুরতে সেই বলগুলো ধরতে পারার মধ্যে এক ধরণের সাফল্য আছে। প্রত্যেক রাইডের জন্য আলাদা আলাদা টিকেট। তা হোক, বিনোদনের জন্য এসেছি, সেটা তো হলো।

চিড়িয়াখানা আর মিনি শিশুপার্ক ছাড়া আর আছে ফাঁকা মাঠ। বড় একটি লেক রয়েছে। লেকের মাঝখানে আছে জলপরী ফোয়ারা। আছে একটি ছোট্ট সেতু। চারদিকে বসার বেঞ্চি। প্রেমিক-প্রেমিকারা এখানে বসে সম্পর্ক গড়ে। কেউ কেউ ভাঙ্গে।

সৌভাগ্যবশত বের হবার সময় সেই পানি-কাদা মাড়াতে হলো না। কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় ভিন্ন একটি রাস্তা দিয়ে প্রবেশ ও বাহিরের উপায় করেছে। প্রথম থেকেই এই পথ চালু থাকলে কাদা-পানি এড়ানো যেতো। সেক্ষেত্রে প্রথম শিশুপার্ক, তারপর চিড়িয়াখানা বেড়াতে হতো। শিশুপার্ক পেরিয়ে চিড়িয়াখানা উপভোগ্য হতো কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে।

আমাদের এবারের গন্তব্য বরেন্দ্র গবেষনা জাদুঘর।

বরেন্দ্র গবেষনা জাদুঘর

বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরাতন জাদুঘরটি যে রাজশাহীতে অবস্থিত এই খবর আমার রাজশাহী ভ্রমণের সময়ও অজানা ছিল। ঠিক হলো না, বরং বলা উচিত রাজশাহীতে যে একটি জাদুঘর রয়েছে সেটিই এবার রাজশাহী ভ্রমণের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে জেনেছি। জাদুঘর এমনিতেই আমার বেশ পছন্দের স্থান, সুতরাং সবচেয়ে পুরাতন জাদুঘরে যেতেই হবে। কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা থেকে যখন অটোতে চড়ে বরেন্দ্র গবেষনা জাদুঘরে উপস্থিত হলাম, তখন দুপুর আড়াইটা বেজে গেছে।

বরেন্দ্র জাদুঘর একদম শহরের মধ্যে অবস্থিত। পরের কয়েকদিনে বার কয়েক এর পাশ দিয়ে যেতে হয়েছে। বোঝা যায়, রাজশাহী শহরের পুরাতন এলাকাগুলোর মধ্যে এটি একটি।

বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের প্রধান ভবন (ছবি: উইকিপিডিয়া)

ব্যক্তিগত উদ্যোগ থেকে এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ১৯১৩ সালে। মূল ভবনটি একতলা। পরবর্তীতে পাশে আরও ভবন তৈরী করা হয়েছে। সেখানে রয়েছে অফিস ও লাইব্রেরি। তবে সাধারণ দর্শকদের জন্য কেবল মূল দালানের অভ্যন্তরে জাদুঘর অংশটিই কেবল উন্মুক্ত। সেখানে রয়েছে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন সময়ের নিদর্শন। এদের মধ্যে সনাতন ধর্মীয় নানা রকম দেব-দেবীর মূর্তি, বুদ্ধমূর্তি, ব্যবহার্য জিনিসপত্র ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এসব নিদর্শনের মধ্যে কিছু রয়েছে যা হাজার বছরেরও পুরানো।

বরেন্দ্র গবেষনা জাদুঘর বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন। এর প্রতিষ্ঠার ইতিহাস এবং দর্শনীয় উপকরণের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা বাংলাপিডিয়ার ওয়েবসাইটে রয়েছে। তথ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিধায় কিছুটা সম্পাদনা করে এখানে তুলে ধরলাম।

নাটোরেরর দিঘাপাতিয়া রাজপরিবারের জমিদার শরৎকুমার রায় এবং তাঁর সহযোগী আইনজীবী অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক রমাপ্রসাদ চন্দ প্রমুখ প্রত্ন-অনুরাগী এই প্রতিষ্ঠান দুটি গড়ে তোলার জন্য তাঁরা তাঁদের সময় ও শ্রম ব্যয় করেন। তাঁদের সারা জীবনের প্রয়াস ছিল ওই সময়ের টিকে থাকা অমূল্য প্রত্নসম্পদ (বাংলার, বিশেষ করে বরেন্দ্রীর) জনসম্মুখে প্রকাশ করা।

অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে প্রত্নস্থল আবিষ্কারের লক্ষ্যে শরৎকুমার ১৯১০ সালের এপ্রিলে মান্দইল থেকে চন্ডীর কয়েকটি প্রমাণসাইজ মূর্তিসহ প্রায় ৩২টি ভাস্কর্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। রাজশাহীতে ফিরে আসার পর শহরের গণ্যমান্য নাগরিকগণ শরৎকুমার ও তাঁর সহকর্মীদের সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন এবং রাজশাহীতে প্রত্নসামগ্রী সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সুতরাং প্রয়োজনের তাগিদে রাজশাহী জাদুঘর (পরবর্তীকালে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর) গড়ে ওঠে এবং প্রত্নসামগ্রী সংরক্ষণের জন্য শরৎকুমার মাসে ২০০ টাকা প্রদানের ব্যবস্থা করেন। ১৯১১ সালে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে সংগৃহীত সকল দুষ্প্রাপ্য ও অনন্য নমুনা কলকাতার ভারতীয় জাতীয় জাদুঘর দাবি করলে বরেন্দ্র জাদুঘরের অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার উপক্রম হয়। বাংলার তৎকালীন গভর্নর লর্ড কারমাইকেল ১৯১২ সালে রাজশাহীতে এসে সোসাইটির সংগ্রহগুলি দেখে মুগ্ধ হন। এর অল্পকাল পরেই বাংলার গভর্নর ১৯১৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারির ১১ নং প্রজ্ঞাপন দ্বারা স্থানীয় জাদুঘরগুলির সংগঠকদের প্রত্নসম্পদ সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং সাধারণ্যে প্রদর্শনের অনুমতি প্রদান করেন।

শরৎ কুমার নিজ ব্যয়ে তাঁর বড় ভাই দিঘাপতিয়ার রাজা প্রমদানাথ রায়ের দানকৃত জমির উপর জাদুঘরের জন্য ভবন নির্মাণ করেন। ১৯১৬ সালের ১৩ নভেম্বর লর্ড কারমাইকেল ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

১৯৩০ সালে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় এবং ১৯৪৫ সালে শরৎ কুমার রায়ের মৃত্যুর ফলে জাদুঘরের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগ জাদুঘরের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তোলে। ১৯৪৯ সালে জাদুঘরটিকে মেডিকেল স্কুলে রূপান্তর করা হয়। ১৯৬১ সাল পর্যন্ত জাদুঘরের উত্তরাংশ স্কুলের দখলে ছিল।

দেশ বিভাগের পর থেকে প্রায় ১৯ বছর জাদুঘরটি প্রায় অচল অবস্থায় পড়ে ছিল। ১৯৬১ সালে মেডিকেল স্কুলটি জাদুঘরের উত্তরাংশ জাদুঘরকে প্রত্যর্পণ করলে কেন্দ্রীয় সরকারের নিকট থেকে প্রাপ্ত ত্রিশ হাজার টাকা অনুদানের অর্থ দিয়ে ১৯৬১ সালে বর্তমান লাইব্রেরি ভবনটি নির্মিত হয়। কিউরেটরের বাসভবন এবং অন্যান্য সম্পত্তির ক্ষতিপূরণের জন্য জাদুঘরের দেয়াল ঘেরা চত্বরে নির্মিত স্কুলের এনাটমি জাদুঘর ভবনটি বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরকে দেওয়া হয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী জেলা প্রশাসন জাদুঘরটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকট অর্পণ করার ব্যাপারে প্রাদেশিক সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। ১৯৬৪ সালের ১০ অক্টোবর এটি আইন সম্মত উপায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চলে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর পরিচালনার সকল আর্থিক দায়িত্ব গ্রহণ করে।

বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের সংগ্রহের মধ্যে রয়েছে পাথর ও ধাতুনির্মিত ভাস্কর্য, খোদিত লিপি, মুদ্রা, মৃৎপাত্র ও পোড়ামাটির ফলক, অস্ত্রশস্ত্র, আরবি ও ফারসি দলিলপত্র, চিত্র, বইপত্র ও সাময়িকী এবং সংস্কৃত ও বাংলা পান্ডুলিপিসমূহ।

১নং গ্যালারিতে সাজানো রয়েছে সিন্ধু সভ্যতার (খ্রি.পূ ২৫০০) প্রত্নসম্পদ, বাংলাদেশের পাহাড়পুরে (৮ম-১২শ শতক) উৎখননকৃত প্রত্নসম্পদ, ফারসি ফরমান ও বাংলা দলিলপত্র, পুরানো বাংলা হরফে সংস্কৃত লিপিসমূহ, চকচকে টালিসমূহ, ইসলামি রীতির ধাতব তৈজসপত্র, হাতে লেখা কুরআন শরীফ, বাংলা ও সংস্কৃত পান্ডুলিপি, মুগল চিত্রকলা, পাথর ও ব্রোঞ্জ নির্মিত বিভিন্ন ভাস্কর্য, বিহারের নালন্দা এবং ভারতের অন্যান্য স্থানে প্রাপ্ত প্রাচীন নিদর্শনাবলি। ২নং গ্যালারিতে রয়েছে বৌদ্ধ ও হিন্দু দেবদেবীর প্রস্তর মূর্তি এবং কাঠের আধুনিক ভাস্কর্যসমূহ। ৩নং গ্যালারিতে প্রদর্শিত হয় হিন্দু ভাস্কর্য: বেশ কয়েকটি সূর্য মূর্তি, শিব মূর্তি, গণেশ মূর্তি এবং বিষ্ণু মূর্তি। ৪নং গ্যালারিতে সাজানো আছে দুর্গা-গৌরী-উমা-পার্বতী, মাতৃকা ও চামুন্ডা মূর্তি। ৫নং গ্যালারিতে প্রদর্শিত হয় বুদ্ধ মূর্তি, বোধিসত্ত্ব, তারা, জৈন তীর্থঙ্কর এবং হিন্দুধর্মের গৌণ দেব-দেবীর মূর্তিসমূহ। ৬নং গ্যালারিতে সাজানো রয়েছে আরবি, ফারসি, সংস্কৃত এবং প্রাচীন বাংলা প্রস্তর লিপিসমূহ, মুসলিম যুগের খোদিত পাথর, মিহরাব, অলঙ্কৃত চৌকাঠ ও লিন্টেল এবং শেরশাহের আমলে নির্মিত দুটি কামান। বারান্দার উপরের সারিতে পাহাড়পুর থেকে প্রাপ্ত পোড়ামাটির ফলক সাজানো রয়েছে। নিচের সারিতে রয়েছে হিন্দু-বৌদ্ধ ভাস্কর্যরাজি। প্রাঙ্গণে সজ্জিত রয়েছে হিন্দু ও মুসলমান স্থাপত্যনিদর্শন খোদাইকৃত পাথর, পাথরের স্তম্ভ, শিবলিঙ্গ ইত্যাদি।

সবচেয়ে পুরাতন এই জাদুঘরের বর্তমান অবস্থা মোটেও সুবিধাজনক নয়। অল্প যে কটা কক্ষ ঘুরে দেখা যায় সেগুলো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত নয়, একতলা ভবন হওয়ায় ছাদের গরম টের পাওয়া যায়। জাদুঘরে এত বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে যার স্থান সংকুলান হচ্ছে না। ফলে করিডোরে, খোলা আকাশের নীচে রেখে দেয়া হয়েছে প্রচুর নিদর্শন। নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে খুব শক্তিশালী মনে হয়নি। এই লেখাটি লিখতে গিয়ে বাংলানিউজের ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের একটি প্রতিবেদন চোখে পড়ল। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে,

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশিত জাদুঘরের পূর্ণাঙ্গ ইনভেন্টরি প্রতিবেদন মতে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৮৫টি প্রত্নসামগ্রীসহ প্রায় তিন হাজার দুর্লভ বস্তু হারিয়েছে জাদুঘর থেকে। জাদুঘরে নিবন্ধিত নানা ধরনের প্রত্নসামগ্রীর ১৮৫টির কোনো হদিস নেই। হারিয়ে যাওয়ায় প্রত্নসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে দু’টি ব্রোঞ্জ, দু’টি কপার, দু’টি লিনেন, একটি ব্রাশ, দু’টি সিলভার, একটি ক্রিস্টাল, ৪৭টি বিভিন্ন ধরনের পাথর, ১০১টি টেরাকোটা, ১৩টি কাগজ এবং দুটি প্রাণির চামড়া। এছাড়া পাঁচ হাজার ৯৭১টি নিবন্ধিত মুদ্রার মধ্যে ৩৩টি এবং ১৩ হাজার ৯৩৩টি গ্রন্থের মধ্যে ৮৫টি পাওয়া যাচ্ছে না। পাওয়া যাচ্ছে না ১৩ হাজার ৫৭৬টি প্রকাশনার (পুস্তক, পুস্তিকা, গ্রন্থ, জার্নাল ইত্যাদি) মধ্যে তিন হাজার ৫২টি।

ছোট্ট জাদুঘর। তাই বেশি সময় লাগলো না দেখে শেষ করতে। জাদুঘরের চত্ত্বরটা বেশ চমৎকার এবং গোছানো। ফুলের বাগান রয়েছে, তাই দর্শনার্থীরা ফুলের সাথে ছবি তোলায় ব্যস্ত। আমরা অবশ্য তাদের মত ছবি তোলায় ব্যস্ত হতে পারলাম না। টয়লেটে প্রাকৃতিক কাজ সারা, হালকা নাস্তা করে নেয়া ইত্যাদি কাজে ব্যস্ত হতে হলো। আর আমি প্রস্তুতি নিলাম পরবর্তী গন্তব্য রেশম চাষ/কারখানা ভ্রমণের জন্য।

রেশম কারখানা

রাজশাহী রেশমের জন্য বিখ্যাত। এতটাই বিখ্যাত যে রাজশাহীকে রেশম নগরী বা সিল্ক সিটি নামে ডাকা হয়। এই বিখ্যাত হবার যন্ত্রণাও আছে। বাংলাদেশের সকল ইলিশ যেমন পদ্মায় পাওয়া যায়, সকল আমড়া যেভাবে বরিশালে জন্মায়, দই যেমন কেবল বগুড়ায়ই তৈরি হয়, তেমনি বাংলাদেশের সকল সিল্ক কেবল রাজশাহীতেই তৈরী হয়।

অবশ্য এই রাজশাহী সিল্কের অবস্থা আমাদের জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মতো। একসময় আমাদের টাকায় বাঘ ছিল, এখন দেশের সকল ক্রিকেটার বাঘ (কেবলমাত্র দেশের মাটিতে)। বঙ্গবন্ধু ছাড়া সবচেয়ে বেশী ভাস্কর্য রয়েছে এই বাঘেরই। রয়েল বেঙ্গল টাইগার আমাদের গর্ব, আমাদের ঐতিহ্য। যেহেতু সারা বাংলাদেশেই রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ছড়াছড়ি, তাই এই বাঘের আবাসস্থল সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশ থেকে বাঘকে তাড়িয়ে ভারতের অংশে পাঠিয়ে দেয়ার চেষ্টার অন্ত নেই।

রাজশাহীর সিল্কের অবস্থাও সেরকম। ট্রেনের নাম রেখেছি সিল্ক সিটি, কিন্তু বাস্তবে সিল্কের দেখা পাওয়া মুশকিল। অল্প কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে এখনও কিছু রেশম কারখানা টিকে আছে। এর মধ্যে সপুরা সিল্ক বেশ বিখ্যাত। ২০০৯ সালে আমি যখন প্রথমবারের মতো রাজশাহী এসেছিলাম, তখন সপুরা সিল্কের কারখানায় ঘুরে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। সে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। আমার সেই অভিজ্ঞতা পরিবারের সাথে ভাগ করে নেয়ার আগ্রহে আবারও রেশম কারখানা ভ্রমণের পরিকল্পনা করলাম।

আগেরবার এসেছিলাম একটি বেসরকারি টেলিভিশন টিমের সদস্য হয়ে। ফলে সহজেই সপুরা সিল্কের কারখানায় প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিলাম। কিন্তু এখন আম-পাবলিকের একজন হিসেবে প্রবেশাধিকার থাকবে কিনা নিশ্চিত ছিলাম না। বরেন্দ্র জাদুঘরের একজন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, এখনও সেই সুযোগ বর্তমান। যে কোন অটোচালককে বললেই নিয়ে যাবে।

কিন্তু বাস্তবতা যে সেরকম নয় তা বুঝলাম অটোচালক যখন নানা পথ ঘুরিয়ে আমাদেরকে রেশম কারখানার সামনে এসে থামলেন। সাইনবোর্ডে লেখা রাজশাহী রেশম কারখানা। আশেপাশে সপুরা সিল্কের কোন চিহ্ন-নিশানা দেখা গেলো না। অটোচালককে প্রশ্ন করলাম, সে জানালো এই কারখানা ছাড়া আর কোন কারখানা সে চিনে না।

ঢাকায় থাকতে একটা কথা শুনতাম – উত্তরবঙ্গের মানুষের আয়োডিন কম। এই কথা উত্তরবঙ্গে জন্মানো-বড় হওয়া মানুষের মুখেও শুনেছি। কিন্তু এই কথায় পাত্তা দেইনি কখনও। এবারের রাজশাহী ভ্রমণ থেকে বুঝলাম সত্যিই কোন ঝামেলা আছে। বিশেষত দরিদ্র শেণির লোকেদের বুঝজ্ঞান ভিন্নতর। তারা নিজেরা যা বুঝেছে সেটাই। প্রথম দিন সকালে এক স্কুলের নাম বলে তার গেটে নামিয়ে দিতে বললাম রিকশাচালককে। সে উল্টোদিকে বেশ কিছুদূর যাওয়ার পরে স্বীকার করলো – সে আসলে গন্তব্য চিনতে পারেনি। ভাড়াও বেশি দিতে হলো আমাকে।

যেহেতু নিতে এসেছে এখানে, সুতরাং ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করাই উত্তম। সিকিউরিটি গার্ড প্রথমে ঢুকতে দিতে চায়নি। ফোনে কথা বলল যেন কার সাথে। তারপর পরের দিন যেতে বলল। বিস্তারিত পরিচয় দিয়ে ঢাকা থেকে এসেছি জানিয়ে আবারও কথা বলতে বললাম। এবার অনুমতি পাওয়া গেল।

রাজশাহী রেশম কারখানা সরকারী প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে সরকারী রেশম কারখানা রয়েছে দুটি – অন্যটি ঠাকুরগাঁও-তে। দুটোর মধ্যে এটিই বড় ও পুরাতন। দেশের বাকী বেশিরভাগ সরকারি প্রতিষ্ঠানের মত এটাও লোকসানি প্রতিষ্ঠান এবং সম্ভবত জীবনে কখনোই লাভের মুখ দেখেনি। ২০০২ সালে এই প্রতিষ্ঠানটিকে বন্ধ করে দেয়া হয়। তারপর আবার ১৬ বছর পরে ২০১৮ সালে পুরাতন যন্ত্রপাতিগুলোকেই মেরামত করে এই কারখানাকে পুনরায় চালু করা হয়। এই বিনিয়োগ কেন করা হয়েছে এবং এই কারখানা কবে লাভের মুখ দেখবে তা বাংলাদেশের সচেতন নাগরিক মাত্রই জানেন।

রেশম কারখানার ভেতরে চোখ জুড়িয়ে যাওয়ার মত সবুজের সৌন্দর্য। বিশাল জায়গা জুড়ে বাগান। সেখানে সারি সারি তুঁত গাছ। গাছগুলোর উচ্চতা বেশি নয়, আট থেকে বারো ফুট হতে পারে। কিছু বড় গাছও আছে, সেগুলো বিভিন্ন ফল আর কাঠের গাছ। বাগানের মাঝখানে রাস্তা, সেই রাস্তা ধরে আমরা মূল ভবনের দিকে গেলাম। সেখানেও রিসিপশন থেকে ফিরিয়ে দিতে চাইল। অফিস শেষ হবার পথে। এই সময়ে কেউ পর্যটকের দায়িত্ব নিতে রাজি না। নানা কথা বলে-কয়ে রাজী করালাম।

নেকাবে মুখ ঢাকা একজন স্মার্ট নারী কর্মকর্তা (নাম স্মরণ নেই) আমাদেরকে কারখানার অভ্যন্তরে নিয়ে গেলেন। যেহেতু দিনের শেষ, তাই মেশিন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও পানি গরম করে কিভাবে রেশম পোকার গুটি থেকে সুতা বের করা হয় এবং কিভাবে মেশিনে সেই সুতা পড়িয়ে বিভিন্ন গ্রেডের সুতা তৈরী করা হয় এবং সেই সুতা কি কি পণ্য তৈরীতে ব্যবহার করা হয় সেটা হাতে কলমে দেখালেন। উনার কথা থেকেই জানা গেলো – বাজারে যে সিল্কের শাড়ি-কাপড় আছে সেই শাড়ি-কাপড়ের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য। রেশম সুতা সম্পর্কে যিনি জানেন না, তিনি এই পার্থক্য করতে পারবেন না। একটা ছোট্ট তথ্য দেই। উন্নতমানের একটি সিল্কের কাপড় তৈরীতে যে সুতা ব্যবহার করা হয় সেটা সর্ম্পূর্ণটাই এক খন্ড, কোন গিঁঠ নেই। ফলে, এই সুতার কাপড় হবে মসৃন, মিহি। নিম্নমানের কাপড়ের সুতাও নিম্নমানের।

কারখানার অংশ শেষ করে ভদ্রমহিলা আমাদের নিয়ে গেলেন আরেকটি ভবনে। সেখানে রেশম পোকা চাষ করা হচ্ছে। বিভিন্ন পর্যায়ের রেশম পোকা এনে আমাদের দেখালেন। গুটি, বিভিন্ন আকৃতির পোকা বাঁশের তৈরী মাচায় বা চাটাইতে রাখা হয়েছে। পোকাগুলো পাতা খায়, তারপর একটি নির্দিষ্ট সময় পরে গিয়ে সুতার মোড়কে নিজেকে জড়িয়ে নিতে শুরু করে এবং গুটিতে রূপান্তরিত হয়। এই গুটিকে গরম পানিতে সিদ্ধ করলে ভেতরের পোকা মারা যায় এবং গুটি থেকে সুতা সংগ্রহ করা হয়।

জানা গেলো, এই রেশম কারখানায় তারা গবেষণার কাজটি করে থাকেন। কিভাবে আরও বেশি উৎপাদন করা সম্ভব – এ হলো গবেষণার লক্ষ্য। তারা রেশম চাষে উৎসাহিত করেন। এই চাষে আলাদা জমির দরকারও হয় না। চাষীদের উন্নতমানের তুঁত গাছ এবং পোকা তারাই সরবরাহ করেন। দরকার কেবল চাষীদের আগ্রহ।

দীর্ঘ ষোল বছর এই কারখানা বন্ধ ছিল। এখন আবার চালু হয়েছে। নতুন করে লোকবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ৫/৬টি লুম চালু করে সেখানে কাপড় উৎপাদন করা হচ্ছে। অবশ্য, সেগুলো দেখার সুযোগ আমাদের হলো না। শ্রমিকেরা ছুটি নিয়ে চলে গিয়েছে।

স্বাধীনতার পূর্বে চালু হওয়া এই রাজশাহী রেশম কারখানা স্বাধীনতার পরে কয়েক বছর পর্যন্ত লাভে পরিচালিত হয়েছিল বলে জেনেছি। তারপর থেকে লোকসান আর লোকসান। রেশম উন্নয়ন বোর্ড চালু হবার পর থেকেই নাকি লোকসানের শুরু। এক কোটি টাকার বেশি ঋণ মাথায় নিয়ে রাজশাহী রেশম কারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল যা ষোল বছর পরে আবার চালু হয়েছে। ঠাকুরগাঁও রেশম কারখানাও লোকসানের কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। রাজশাহীর রেশম কারখানা উন্নয়নের জন্য ১০০০ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প নেয়া হয়েছে – দেখা যাক – লোকসানের খাতা আদৌ বন্ধ হয় কিনা।

পদ্মা গার্ডেন ‌‌

‘আমরা ছোটবেলায় যে পদ্মা দেখেছি সেটা এক বিশাল সমুদ্র। এই পাড়ে দাঁড়িয়ে ওই পাড় দেখা যেতো না। আর রাতেরবেলা সে কি গর্জন। মনে হতো সব ভেঙ্গেচুরে এগিয়ে আসছে যেন!’

প্রমত্ত পদ্মার এই গল্প শুনেছিলাম ২০০৯ সালে প্রথম রাজশাহী ভ্রমণে, স্থানীয় একজন বয়স্কা নারীর মুখে। পদ্মার সেই যৌবন অবশ্য হারিয়েছে কয়েক যুগ আগে। ছোটবেলায় ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে মুরুব্বীদের কথাবার্তা শুনতাম, আর মাঝেমধ্যে পত্রিকার শিরোনাম। তখন কিছু না বুঝলেও এখন ফারাক্কা সম্পর্কে জানি। জানি যে পদ্মার অকাল বার্ধক্যের অন্যতম কারণ এই ফারাক্কা বাঁধ।

আমরা যে সময় রাজশাহীতে গিয়েছি তখন অবশ্য চিত্র পালটে গিয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে ভারত এবং বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাংশে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে। ফারাক্কা বাঁধ সারা বছর কৃপণতা করলেও এখন উদার। অনেকগুলো স্লুইসগেট খুলে দিয়ে বর্ষার অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিয়েছে। ফলে রাজশাহীর পদ্মায় পানি তো বেড়েছেই, রাজশাহী সহ বেশ কয়েকটি জেলার নিম্নঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ফলে আমরা যখন পদ্মা গার্ডেনে উপস্থিত হলাম, সন্ধ্যার একটু আগে, তখন প্রচুর মানুষ না থাকলেও, পদ্মা নদী টইটম্বুর।

পদ্মা নদীতে ভ্রমণ

পদ্মার ভাঙ্গন এবং বন্যা রোধ করার জন্য রাজশাহী নগরীতে বিশাল এলাকা জুড়ে বিশাল বাঁধ, তার উপরে রাস্তা। ফলে দীর্ঘ অনেকটা পথ জুড়েই নদীর তীর ঘেঁষে চলাচল সম্ভব। কিন্তু নদীর তীরে গড়ে উঠা বিভিন্ন বৈধ-অবৈধ স্থাপনার কারণে নদীর দেখা পাওয়া একটু কঠিন। এ কারণে ভ্রমণ ও প্রকৃতি পিপাসুদের জন্য পদ্মা গার্ডেন আদর্শ স্থান। এখানে বসার জন্য ব্যবস্থা আছে, উন্মুক্ত মঞ্চ রয়েছে, পাবলিক টয়লেট আর কিছু রেস্টুরেন্ট রয়েছে। আছে কয়েকটা হরিণ এবং বাচ্চাদের জন্য দুটো রাইড। অসংখ্য ফেরিওয়ালা। ভীড় না থাকলে মন ভালো করে দেয়ার মতো অসাধারণ পরিবেশ।

এক জায়গায় দেখলাম ট্রলারে লোক উঠাচ্ছে। জন প্রতি বিশ টাকা। পদ্মা নদীতে কিছুক্ষণ ঘুরিয়ে নিয়ে আসবে। ট্রলারে বসার জন্য বেঞ্চ রয়েছে। নদীর ধারে এসে নদীতে না বেড়ালে ভ্রমণ অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। সুতরাং উঠে পড়লাম। নদীর তীর ঘেঁষেই বেশ অনেকটা দূর পর্যন্ত নিয়ে গেলো, তারপর আবার ঘুরিয়ে একই পথ ধরে ফিরে এলো ট্রলার। সব মিলিয়ে ১৫/২০ মিনিটের নৌ-ভ্রমণ।

সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। পদ্মা গার্ডেনে নানা রং এর বাহারি বাতি জ্বলে উঠল। লোকজন ধীরে ধীরে বাড়ির পথ ধরছে। কিছু মানুষ বসে থাকলো। পদ্মার বাতাসে আর ঢেউয়ের ছলাক ছলাক শব্দ একটি মোহনীয় পরিবেশ তৈরী করেছে। মনে হচ্ছিল, আরও ঘন্টা কয়েক বসে থাকলেও ক্লান্তি আসবে না।

কিন্ত বাস্তবতা এতটা রোমান্টিক না। সারাদিন ভ্রমণের কারণে সকলেই ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, ক্ষুধার্ত। সুতরাং পদ্মার আহবান উপেক্ষা করে আমরা বাড়ির পথ ধরলাম।

বিদিরপুরে

পরিবার নিয়ে রাজশাহী ভ্রমণের উদ্দেশ্য কেবল শোয়াইবের বিয়ে, এমনটি নয়। রাজশাহীতে আমার স্ত্রীর দুজন ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর স্থায়ী আবাস, রাজশাহীতে গেলে তাদের সাথেও সাক্ষাতের সুযোগ পাওয়া যাবে – এই চিন্তাও আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলেছে।

বান্ধবীদের একজন গ্লোরিয়া। আমার স্ত্রীর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অন্তরঙ্গ বন্ধু। নানা গুণে গুণান্বিত এবং সংগ্রামী নারী। ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়ার পরে তার মা-ই নানা প্রতিকূলতাকে পাশ কাটিয়ে সন্তানদের বড় করেছেন, প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মায়ের সেই সংগ্রামী চরিত্র গ্লোরিয়ার মধ্যেও আছে। ঢাকায় থাকতে আমাদের বাসায় এসেছে বেশ কয়েকবার। একবার তার মা-কে নিয়েও এসেছিল। এখন একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরীর সুবাদে রাজশাহীতেই কর্মরত। সব কিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন যে, রাজশাহী গিয়ে গ্লোরিয়াদের বাসায় এক বেলা না বেড়ালে গুরুতর অন্যায় হয়ে যাবে।

কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা যে সপ্তাহে রাজশাহী পৌঁছলাম সেই সপ্তাহে এক বান্ধবী অফিসের ট্রেনিং এ ঢাকা আসলো, ফিরলো আমরা চলে আসার পর। তার অনুপস্থিতিতে বাসায় উপস্থিত হয়ে তার মাকে বিড়ম্বনায় ফেলার কোন ইচ্ছেই আমাদের ছিল না, কিন্তু গ্লোরিয়ার একের পর এক ফোনের পরে যখন আন্টি ফোন দেয়া শুরু করলেন, তখন আর না গিয়ে উপায় রইল না। নাটোর থেকে ফেরার সময় কিছু মিষ্টান্ন আর ফলমূল কিনে রাতে হাজির হলাম গ্লোরিয়াদের বাসায়।

গিয়ে দেখি এলাহী কান্ড! আন্টি একাই বিস্তর রান্না বান্না করেছেন। বললেন, রাজশাহীর হোটেলের খাবার কত ভালো তা জানা আছে। উনার বাসায় না উঠার জন্য খুব অনুযোগ করলেন। ভরপেট খাবার আর কথাবার্তায় চমৎকার দুটো ঘন্টা কাটিয়ে তারপর আমাদের আস্তানায় ফিরলাম।

আরেকদিন গেলাম লীনাদের বাসায়। লীনা আমার স্ত্রীর স্কুল জীবনের বান্ধবী। স্বামীর সাথে পাবনায় সংসার করেন। এখন রাজশাহীতে বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন। থাকেন বিদিরপুরে।

লীনার বাসায় যেতে বেশ এক অভিজ্ঞতা হলো। বাসা কোথায় জিজ্ঞেস করলেই লীনা বলে – আপনার আস্তানা থেকে বের হয়ে অটোতে উঠে অমুক জায়গায় আসবেন। সেখান থেকে আবার অটোতে অথবা বাসে করে আসবেন অমুক জায়গায়। সেখান থেকে অমুক জায়গায় যাওয়ার পথেই আমার বাসা। যতই জিজ্ঞেস করি জায়গার নাম কি – ততই বলে এভাবে এভাবে আসতে হবে। একই ঘটনা গ্লোরিয়ার বাসায় যাওয়ার সময়ও ঘটেছিল। হয়তো রাজশাহীর নিয়ম এটাই।

যাহোক, লীনা যখন তাদের বাড়ির জায়গার নাম বলল, তখন গুগল ম্যাপে সার্চ করে দেখি, সেটা নাটোরের দিকে, প্রায় বিশ কিলো দূরে। এবার লীনা আরও নির্দিষ্ট করে ঠিকানা দিলো – গোদাগাড়ী উপাজেলার বিদিরপুর বারোমাইল। আমারও আর ঠিকানা খুঁজে পেতে অসুবিধা হলো না। মজার ব্যাপার হলো – অটোচালক জিজ্ঞেস করলো, কার বাড়িতে যাবো। অথচ আমরা লীনার বাবার নামও জানি না। লীনাকে ফোন দিয়ে বাবার নাম জানতে চাইলাম, লীনা উত্তর দিয়ে পালটা জানতে চাইল – বাবার নামের কি দরকার। বুঝিয়ে বলার পরে লীনা বলল, অটোচালককে বলতে ‘অমুকের বাড়ি’। অটোচালক একবারেই চিনল এবং এক্কেবারে ঠিক বাড়ির দরজায় নামিয়ে দিল। বুঝলাম – এখানে সব বাড়িই অটোচালকদের চেনা।

বেশ আপ্যায়ন হলো। বাহারি পদের নাস্তা। মাছ-গরু-মুরগী-সবজি ইত্যাদি মিলিয়ে বিশাল আয়োজন। ফলমূল। গলা পর্যন্ত খেতে হলো। আবার উপহার! ভালোবাসায় ডুবে মরার অবস্থা আরকি!

লীনাদের বাড়ির রাস্তাটা বাঁধের মতো। ডানদিকে লীনাদের বাড়ি, বামদিকে এক মিনিট হাঁটা দূরত্বে পদ্মা নদী। সবাই যখন গল্পে ব্যস্ত আমি তখন দুইবার নদীর তীরে বেড়িয়ে এলাম।

নদীতে প্রচুর পানি। বড় বড় অনেক গাছের গোড়া পানিতে ডুবে আছে। গত কয়েকদিনের বৃষ্টি আর খুলে দেয়া ফারাক্কা বাঁধের পানিতে ডুবে দিয়েছে এসব এলাকা। কিছু নিম্নাঞ্চল বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। নদীতে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। বাতাস আছে। ছায়ায় বসে থাকলে শান্তি লাগে বেশ।

শেষ বিকেলে লীনা আমাদেরকে ঘুরিয়ে দেখালো। নদী। ক্ষেত। ফল-ফলাদি। গেরস্থ বাড়ি। জানা গেল, এত কাছে নদী আসে না সাধারণত। বহুদূরেই থাকে। নদী পর্যন্ত এই বিশাল চরে চাষবাস হয় ধান, কলাইসহ বিভিন্ন ফসলের। এই জমির কোন সীমানা নেই। প্রত্যেকে তার বাড়ির সামনের জমি চাষ করে। নদী দূরে থাকলে জমির পরিমাণ বাড়ে। নদী কাছে এলে জমি কমে।

রাতে থেকে যাওয়ার জন্য বেশ জোরাজুরি করলো লীনারা। থেকে যেতে ইচ্ছেও করছিল। কিন্তু আমরা এসেছি রাজশাহী ঘুরে দেখার জন্য, এক বাড়িতে এত সময় কাটালে চলবে?

ফেরার পথে মেয়ে আমার বারবার প্রশ্ন করছিল – কেন আমরা চলে যাচ্ছি? কেন আমরা রাতে এখানে থাকবো না? উত্তর দিচ্ছিল ওর আম্মু, সেদিকে আমার মনযোগ ছিল না, আমার মন পড়ে থাকলো বিদিরপুরের নদীর তীরে।

সেই মন এখনও নদীর তীরে পড়ে আছে। হয়তো একারণেই আবারও যেতে হবে লীনাদের বাড়িতে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

এবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে দেখার কোন পরিকল্পনা ছিল না, যেহেতু শোয়াইবের বিয়ে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্টোদিকে আবাসিক এলাকায়, তাই একবার ঘুরে দেখার পরিকল্পনা হলো।

পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে ব্যাটারীচালিত একটি রিকশা নেয়া হলো। রিকশা আমাদের এ পথ সে পথ ঘুরিয়ে যখন শহীদ জিয়াউর রহমান হলের কাছাকাছি, তখন ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। উপায়ান্তর না দেখে হলের গাড়ি বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে হলো। বৃষ্টি থামলো মিনিট পনেরো পরে। তারপর আবার রিকশায় উঠে বেড়ানো।

একে তো শুক্রবার, তার উপর সাথে পরিচিত কেউ নেই, তাই ফাঁকা ক্যাম্পাস ঘুরে দেখতে বেশী সময় লাগলো না, আবার ভ্রমণটা ঠিক উপভোগ করাও গেল না।

শোয়াইবের বিয়েতে

অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এল। নানা পথ ঘুরে, ভুল রাস্তা থেকে সঠিক রাস্তায় ফিরে যখন বিয়েবাড়িতে উপস্থিত হয়েছি, তখন জুমার নামাজ শুরু হলো বলে। বিয়েতে বরের সঠিক সময়ে উপস্থিত হবার নিয়ম নেই, ফলে শোয়াইবসহ অন্যান্য বরযাত্রীরা তখনও উপস্থিত হতে পারেনি। অগত্যা জুমা পড়ে আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম।

কনের বাড়ির সামনের উঠোনে বিয়ের আয়োজন। বৃষ্টি হতে পারে এই আশঙ্কায় ত্রিপল দিয়ে ছাউনি দেয়া হয়েছে। সবদিক আবদ্ধ বলে প্রচন্ড গরম। এর মাঝে চলে গেলো বিদ্যুৎ। চালু হলো জেনারেটর। তারপর কি এক জটিলতায় সেই জেনারেটরও বন্ধ হয়ে গেলে গভীর অন্ধকারে বসে থাকলাম। একসময় জেনারেটর চালু হলো আর শোয়াইবসহ বরযাত্রীও উপস্থিত হলো। তারপর শুরু হলো মুষলধারায় বৃষ্টি। ত্রিপলের ফাঁক দিয়ে সেই বৃষ্টির পানি পড়তে লাগলো অঝোরধারায়।

দেখা গেল বিয়ের ঘটক আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই। তার সাথে এসেছে শোয়াইবের একজন বন্ধু সে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাই। আরও দুই-একজন পরিচিত-আধা পরিচিত লোক পাওয়া গেল। সবার সাথেই বহুদিন বাদে দেখা, ফলে বেশ আলাপ জমে উঠল।

ভোজনপর্ব শেষ করে এসে দেখি শোয়াইবকে ঘিরে রেখেছে তার শ্যালক-শ্যালিকাদের দল আর মাঝখানে শোয়াইব তার ঝোলমাখা শুকনো হাত নিয়ে বসে আছে, কারণ বকশিস ছাড়া তারা বরের হাত ধুয়ে দিবে না। বেচারা শোয়াইব! তার পকেটে নাই টাকা আর এই ধরণের বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য যে সকল বন্ধুকে নিয়ে এসেছিল তারা কেউই আশেপাশে নেই। অগত্যা নাক গলিয়ে দেন-দরবার করে শোয়াইবকে উদ্ধার করতে হলো।

বিকেলে আসরের পরে নববধূকে নিয়ে শোয়াইবরা যাত্রা করলো ঢাকার পথে, আমরা ফিরে এলাম আস্তানায়।

রাজশাহীর কোন দিকটি সবচেয়ে ভালো লাগলো – এই প্রশ্নের উত্তরে বিনা ভাবনাতেই আমি বলবো বিদিরপুরের কথা। নদীর তীরে একাকী বসে আছি – চারিদিকে শুনশান, কেবল ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আর ছায়াঘেরা তীরে মৃদু বাতাস – আমার শিহরন জাগে। আর ভালো লেগেছে রাজশাহীর ভীড়-কোলাহল মুক্ত শহর। দক্ষিণ এশিয়ার গ্রীন সিটি হিসেবে রাজশাহীর পরিচিতি রয়েছে। এখানে রাস্তায় কালো ধোঁয়া নেই – কারণ রিকশা-অটো সবই ব্যাটারি চালিত। তবে বিরক্তির কারণও এই অটোগুলো। তারা অনর্থক হর্ন বাজায়। গোটা শহরে দূষিত বাতাস না থাকলেও রাস্তার মোড়গুলোতে শব্দ দূষণের আধিক্য রয়েছে। রাতের নাইটকোচে বসে চেকলিস্টের সাথে মিলিয়ে নিচ্ছিলাম। পুঠিয়ার রাজবাড়িতে যাওয়া হলো না শহর থেকে বেশ দূরে অবস্থিত হওয়ায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও নাটোর ভ্রমণের জন্য বাদ দিতে হলো। নাটোরের চেকলিস্ট সফলভাবে সম্পূর্ণ হয়েছে। সাহেববাজারে বিদ্যুতের কলিজা সিঙ্গারা খাওয়া হলো না। তিলের জিলাপীর খোঁজই পেলাম না। তারমানে আবারও আসতে হবে রাজশাহীতে। কখন, কোন ছুতোয় তা উপরওয়ালাই ভালো জানেন।

About দারাশিকো

আমি নাজমুল হাসান দারাশিকো। লেখালিখির প্রতি ভালোবাসা থেকে লিখি। পেশাগত এবং সাংসারিক ব্যস্ততার কারণে অবশ্য এই ভালোবাসা এখন অস্তিত্বের সংকটে, তাই এই ওয়েবসাইটকে বানিয়েছি আমার সিন্দুক। যোগাযোগ - darashiko(at)gmail.com

View all posts by দারাশিকো →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *