নববর্ষের খাবারঃ ঘরে বানানো খই, দেশী মুর্গির ডিম পোচ এবং গুঠিয়ার বিখ্যাত সন্দেশ

ঠেকায় না পড়লে বাংলা নববর্ষের দিনে আমি ঢাকায় থাকি না। নববর্ষের মত বিশেষ দিনগুলোতে শাহবাগে জাহান্নামের পরিবেশ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারনা লাভ করা যায়। ব্যক্তিগতভাবে আমি জান্নাত প্রত্যাশী, জাহান্নামের স্বাদ নিতে গিয়ে জাহান্নামের বাসিন্দা হওয়ার বিন্দুমাত্র আগ্রহ বোধ করি না, তাই প্রত্যেক নববর্ষের আগেই আমি ঢাকা থেকে পালাই – গৃহবন্দী হয়ে থাকার চে’ পালানো ঢের ভালো।

এই নববর্ষে আমি বরিশালে। সাড়ে আটটায় কাকার ওয়ালটন বাইকে চড়ে গ্রামের ভেতর দিয়ে একেবেঁকে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের শেষ মাথায় কাকাদের বাড়িতে চলে গেলাম। বিনা নোটিশে আগমন, বৃদ্ধ দাদী আপ্যায়নের জন্য ট্রেতে করে যা নিয়ে এলেন – আমি উল্লসিত হয়ে গেলাম। এক বাটি সাদা খই, দাদীর পোষা মুর্গির ডিম পোচ, লবন দিয়ে মাখানো ছোট করে কাটা শশা, গুড় দিয়ে কষানো শুকনো চালতার আচার আর সেমাই।

ছবি কৃতজ্ঞতা: ইন্টারনেট

খেতে খেতে খই এবং মুড়ি ভাজার নিয়ম জানা গেল। মাটির হাড়িতে বালু বা ছাই উত্তপ্ত করে তার মধ্যে ধান ছেড়ে দিয়ে নাড়তে নাড়তে খই। খাওয়ার উপযোগি করতে ভাজার চেয়ে একটু বেশী কষ্ট করতে হয়। খইয়ের সাথে লেগে থাকা ধান ছড়াতে হয় , তারপর চালুনী দিয়ে চেলে ধানের খোসা ফেলে দিয়ে পাওয়া যায় খই। মুড়ি ভাজার পদ্ধতিও মোটামুটি এরকম – লবন দিয়ে চাল মেখে নিতে হয়। তারপর মাটির হাড়ি চুলায় তাপ দিয়ে দিয়ে টকটকে লাল করে ফেলতে হয়, হাড়িতে রাখা বালিও ফুটে লাল রং হয়। সেই তপ্ত বালিতে চাল নেড়ে চেড়ে তৈরী হয় মুড়ি। মেশিনে ভাজা মুড়িতে ইউরিয়া মেশানো হয়, বড়সড় হওয়ার জন্য। মেশিনের একদিক থেকে চাল দিলে অন্যদিক থেকে মুড়ি বের হয়। ঝামেলা অনেক কম।

 সান্টু মিয়ার গুঠিয়া মসজিদ দেখানোর জন্য কাকা বাইকে নিয়ে আবার টান দিলেন। ফেরার পথে গুঠিয়ার বিখ্যাত সন্দেশ খাওয়ানোর জন্য বাজারের এক হোটেলে নিয়ে গেলেন। গুঠিয়ার সন্দেশ বিখ্যাত, তবে ঠিক কোন কারীগর এই চমৎকার সন্দেশ বানিয়েছিলেন – জানা গেল না। প্রায় সবগুলো হোটেলেই সন্দেশ বিক্রি হয়, স্বাদে প্রায় একইরকম। বাজারের সবচে জনপ্রিয় দোকানে সন্দেশ খাওয়ার সুযোগ হল।
বরিশালমন্দির ওয়েবে গুঠিয়ার সন্দেশের ইতিহাস পাওয়া গেল, তবে এই ইতিহাস নির্ভরযোগ্য হবে কিনা আমার জানা নেই।

গুঠিয়া সন্দেশের রেসিপি এসেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া অঞ্চল থেকে। গুঠিয়া সন্দেশের প্রধান বিক্রেতা পরিমল চন্দ্র ভদ্র জানান, আমার কাকা সতীশ চন্দ্র দাস পূর্বে আমাদের দোকানেই ছিলেন, পরে বিএম কলেজের সামনে দোকান দেন। পাকিস্তান আমলে তিনি পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া চলে যান। সেখানকার এক কারিগরের কাছে তিনি এর রেসিপি শিখে নেন। অবশেষে ১৯৬২ সালে তিনি দেশে এসে নতুন ধরনের এই সন্দেশ চালু করেন।

গুঠিয়ার সন্দেশের কেজি সাড়ে চারশ টাকা। প্রতি পিস বিক্রি হয় পনেরো টাকা হিসেবে। সাদা এবং গুড় রং- এই দুই ধরনের সন্দেশ পাওয়া যায়। আমার কাছে গুড় রং এর সন্দেশটাই বেশী মজাদার লাগল। বাসার জন্য কিছু কিনে এনেছি।
নববর্ষ উদযাপন নয়, তবে সবাই যখন গরম ভাতের পান্তা আর কোল্ড স্টোরেজের ইলিশ বা অফ সিজনের জাটকা দিয়ে বৈশাখ উদযাপন করছে, কাকতালীয়ভাবে সত্যিকার বাংলাদেশী খাবার আর ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়িত হলাম। নববর্ষের শুভ সূচনা! সবাইকে ঘরে বানানো খই আর গুঠিয়ার সন্দেশ মিশ্রিত নববর্ষের শুভেচ্ছা!

About দারাশিকো

আমি নাজমুল হাসান দারাশিকো। লেখালিখির প্রতি ভালোবাসা থেকে লিখি। পেশাগত এবং সাংসারিক ব্যস্ততার কারণে অবশ্য এই ভালোবাসা এখন অস্তিত্বের সংকটে, তাই এই ওয়েবসাইটকে বানিয়েছি আমার সিন্দুক। যোগাযোগ - darashiko(at)gmail.com

View all posts by দারাশিকো →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *