কালো বেড়াল, সাদা বেড়াল

পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতিমান সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় কিছু রহস্য ও থ্রিলার গল্পও লিখেছেন। বিশেষ করে তার লালবাজারের সরকারী গোয়েন্দা শবর দাশগুপ্ত ইদানিং বেশ পরিচিতি পেয়েছেন। শবরের গোয়েন্দাগিরির উপর নির্ভর করে তিনটি সিনেমার মুক্তি এই পরিচিতির প্রধান কারণ। গোয়েন্দা শবর দাশগুপ্তের সাথে যারা বহু আগে থেকেই পরিচিত তারা আরও কিছু রহস্য-থ্রিলার গল্পের নামও জানেন। বিকেলের মৃত্যু, কালো বেড়াল সাদা বেড়াল ইত্যাদি। শীর্ষেন্দুর যাবতীয় রহস্য-থ্রিলার গল্পের মধ্যে কালো বেড়াল, সাদা বেড়াল আমার সবচেয়ে পছন্দের।

গল্পের নায়ক সুধাকর দত্ত। কিন্তু গল্প এগিয়েছে গোপীনাথকে ঘিরে, সুতরাং তাকেই প্রধান চরিত্র ধরে নেয়া যায়। জার্মান মেয়ে রোজমেরী এবং তার বাঙ্গালী স্বামী মনোজও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। সুধাকর ইন্টারপোলের বড় কর্মকর্তা, তার হেডকোয়ার্টার প্যারিসে, কিন্তু ইন্টারপোলের এজেন্ট হিসেবে তাকে প্যারিস-রোম-কলকাতা-আমস্টারডামসহ পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে ঘুরে বেড়াতে হয়। গোপীনাথ বাঙ্গালী বিজ্ঞানী, দারিদ্র‍্য-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বড় বিজ্ঞানী হয়ে প্যারিসের একটি বড় কর্পোরেশনে গুরুত্বপূর্ণ একটি গবেষনা দলের দায়িত্বে আছেন। তারা যে বিষয়টি নিয়ে গবেষনা করছেন তার কাঁচামাল তৈরী হয় কলকাতায়, মনোজ ও রোজমেরীর কারখানায়। তাদের কারখানা পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে কলকাতায় এসে খুন হয়ে যায় গোপীনাথের অন্যতম প্রধান সহযোগী আঁদ্রে। আঁদ্রের গবেষনা সংক্রান্ত গোপনীয় কাগজপত্র সংরক্ষণ করতে গিয়ে গোপীনাথ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন ভিকিজ মব, বড় বড় কিছু কর্পোরেশনের লেলিয়ে দেয়া মাফিয়া এবং অন্যান্য কুখ্যাত খুনীদের লক্ষ্যে পরিণত হয়। বহুবিধ অদৃশ্য কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী এই সব শত্রুদের হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখে টিকে থাকার সংগ্রামের গল্প কালো বেড়াল, সাদা বেড়াল।

সুধাকর দত্ত চরিত্রটি আমাদের দেশের কুয়াশা সিরিজের নায়ক কুয়াশার মতো। তার যোগ্যতার অভাব নেই, সে একাধিক ভাষায় কথা বলতে পারে, তার পরিচিতি বিশ্বব্যাপী কিন্তু তার ভূমিকা অন্তরালে। তার প্রকাশ্য উপস্থিতি কদাচিৎ। ফলে সুধাকরের চরিত্রের প্রতি সম্ভ্রম-শ্রদ্ধা জাগে। অন্যদিকে গোপীনাথ একজন সাধারণ মানুষের চরিত্র যে কিনা ঘটনার প্রবাহে একজন অসাধারণ যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষে পরিণত হয়। আমাদের সকলের মধ্যেই যে একজন নায়ক ঘুমিয়ে আছে, সামান্য প্রচেষ্টায় তাকে জাগিয়ে তোলা সম্ভব – গোপীনাথের চরিত্র এই ধারণা জন্মাতে প্রবল ভূমিকা রাখে।

সাদা বেড়াল, কালো বেড়াল রহস্যগল্প নয়, আগাগোড়াই থ্রিলার। এই কারণে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনার কোন ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না এবং এই অব্যাখ্যায়িত অংশ কাহিনীকে দুর্বলও করে না। তা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ উপন্যাসটি পাঠের পরে সমগ্র ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে চিন্তা করলে কিছুটা অতৃপ্তিবোধ তৈরী হয়।

দুই শতাধিক পৃষ্ঠার এই বইটি ২০১৫ সালে আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত রহস্যসমগ্রে স্থান পেয়েছে। সম্ভবত এর প্রথম প্রকাশ ১৯৯৯ সাল বা তার পূর্বে। ফলে ঘটনা ঘটেছে এমন সময়ে যখন গোপীনাথ কুখ্যাত ভিকিজ মব সম্পর্কে জানতে গুগলের পরিবর্তে পত্রিকা অফিসে ফোন করেন, সবাই ল্যান্ডফোনের উপর প্রচন্ড নির্ভরশীল এবং সিসি ক্যামেরার অভাবে সকলে নিশ্চিন্তে চলাচল করে।

প্রায় কুড়ি বছর আগে বইটি প্রথম পড়েছিলাম। মেজো ভাইয়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল বলে আরও দুয়েকবার পড়া হয়েছে। প্রায় এক যুগ পরে আবারও কালো বেড়াল, সাদা বেড়াল পাঠে সেই একই তৃপ্তি পাওয়া গেল। রহস্যসমগ্রের ভূমিকায় লেখক জানিয়েছিলেন যে গোয়েন্দা শবরকে নিয়ে তার আরও কয়েকটি গল্প লেখার ইচ্ছে আছে, কালো বেড়াল, সাদা বেড়ালের মতো কিছু লিখলে বেশ হতো!

About দারাশিকো

আমি নাজমুল হাসান দারাশিকো। লেখালিখির প্রতি ভালোবাসা থেকে লিখি। পেশাগত এবং সাংসারিক ব্যস্ততার কারণে অবশ্য এই ভালোবাসা এখন অস্তিত্বের সংকটে, তাই এই ওয়েবসাইটকে বানিয়েছি আমার সিন্দুক। যোগাযোগ - darashiko(at)gmail.com

View all posts by দারাশিকো →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *