ওয়াইলুল লিল মুতাফফিফীন! ধ্বংস তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়!
পবিত্র কুরআন শরীফের ৮৩ নম্বর সূরার প্রথম আয়াতে এই শক্তিশালী সতর্কবার্তা উপস্থাপন করা হয়েছে। সূরার নাম আল মুতাফফিফীন। পরের আয়াতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে এই ধরণের লোকেরা নিজেরা গ্রহণ করার সময় পরিপূর্ণভাবে মেপে নেয় কিন্তু দেয়ার সময় ওজনে কম দেয়।
আমাদের জীবনে বোধহয় এই ওজনে কম দেয়ার ঘটনা প্রতিদিনই ঘটে। আমরা যারা ক্রেতা, তারা মাছ মুরগি গরুর গোশত, ফল, সবজি ইত্যাদি কেনার সময় এমনভাবে ঠকে যাই যে বুঝতে বুঝতে অভিযোগের সময় পার হয়ে যায়। এমনকি প্রতি কেজিতে ৫০-১০০ গ্রাম কম দেখাবে এমন ডিজিটাল মেশিনও নাকি কিনতে পারা যায়। কিছুদিন আগে পত্রিকায় এক জালিয়াত চক্রের কথা জেনেছিলাম। তারা কাপ্তান বাজারে আড়তদারের মেশিনে এমন প্রযুক্তি স্থাপন করে যে দূর থেকে রিমোটে চেপে কয়েক কেজি ওজন কমিয়ে দিতে সক্ষম হতো।
[হোয়াটসঅ্যাপ-গ্রুপে নিয়মিত লিখতে চেষ্টা করছি। নিমন্ত্রণ রইল]
দুনিয়ার জীবনে মাপে বা ওজনে কম দেয়া নিয়ে কুরআনের আরও কয়েকটি আয়াতে বলা হয়েছে বলে জানা গেলো তাফসিরে জাকারিয়ায় এই আয়াতের ব্যাখ্যা থেকে। বরং সরাসরি তুলে দেই:
তাতফীফ এর (تَطْفِيْفٌ) অর্থ মাপে কম করা। যে এরূপ করে তাকে বলা হয় مُطَفَّف [কুরতুবী] কুরআনের এই আয়াত ও বিভিন্ন হাদীসে মাপ ও ওজনে কম করাকে হারাম করা হয়েছে এবং সঠিকভাবে ওজন ও পরিমাপ করার জন্য কড়া তাগিদ করা হয়েছে। যেমন বলা হয়েছেঃ “ইনসাফ সহকারে পুরো ওজন ও পরিমাপ করো। আমি কাউকে তার সামর্থের চাইতে বেশীর জন্য দায়িত্বশীল করি না।” [সূরা আল-আনআমঃ ১৫২] আরও বলা হয়েছেঃ “মাপার সময় পুরো মাপবে এবং সঠিক পাল্লা দিয়ে ওজন করবে।” [সূরা আল-ইসরা: ৩৫] অন্যত্র তাকীদ করা হয়েছেঃ “ওজনে বাড়াবাড়ি করো না, ঠিক ঠিকভাবে ইনসাফের সাথে ওজন করো এবং পাল্লায় কম করে দিয়ো না। [সূরা আর-রহমান: ৮–৯]। শু’আইব আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের ওপর এ অপরাধের কারণে আযাব নাযিল হয় যে, তাদের মধ্যে ওজনে ও মাপে কম দেওয়ার রোগ সাধারণভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং শু’আইব আলাইহিস সালাম এর বারবার নসীহত করা সত্বেও এ সম্প্রদায়টি এ অপরাধমূলক কাজটি থেকে বিরত থাকেনি। তবে আয়াতে উল্লেখিত تَطْفِيْفٌ শুধু মাপ ও ওজনের মধ্যেই সীমিত থাকবে না; বরং মাপ ও ওজনের মাধ্যমে হোক, গণনার মাধ্যমে হোক অথবা অন্য কোন পন্থায় প্রাপককে তার প্রাপ্য কম দিলে তা تَطْفِيْفٌ এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে হারাম হবে। সুতরাং প্রত্যেক প্রাপকের প্রাপ্য পূর্ণমাত্রায় দেয়াই যে আয়াতের উদ্দেশ্য এ কথা বলাই বাহুল্য। উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু জনৈক ব্যক্তিকে আসরের সালাতে না দেখে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। সে একটি ওজর পেশ করল। তখন তিনি তাকে বললেন, طفَّفت অর্থাৎ “তুমি আল্লাহর প্রাপ্য আদায়ে কমতি করেছ।” এই উক্তি উদ্ধৃত করে ইমাম মালেক রাহেমাহুল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক বস্তুর মধ্যে পূর্ণমাত্রায় দেয়া ও কম করা আছে। [মুয়াত্তা মালেক: ১/১২, নং ২২]। তাছাড়া ঝগড়া-বিবাদের সময় নিজের দলীল-প্রমাণাদি পেশ করার পর প্রতিপক্ষের দলীল-প্রমাণাদি পেশ করার সুযোগ দেয়াও এর অন্তর্ভুক্ত। [সা’দী]
ওজন বা পরিমাপে বেশিটা বুঝে নিয়ে কমটা দেয়ার ব্যাপারে আসলে আমরা সবাই-ই আগ্রহী এবং এই বিষয়ে আমরা নানারকম অজুহাত দাঁড়া করি। আমরা যারা সার্ভিস সেক্টরে কাজ করি, সোজা বাংলায় চাকুরি করি, তারাও এই ওজন বা পরিমাপের ক্ষেত্রে কম দিয়ে বেশি না নায্য পরিমাণ পাওয়ার আশা করি ও প্রচেষ্টা চালাই। বাংলাদেশের সরকারি চাকুরীজীবীদের দিকে তাকালে সম্ভবত এই বিষয়টা সবচেয়ে ভালো বোঝা যাবে।
৫ই আগস্টের পর থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবী-দাওয়ার সংবাদ প্রতিদিনই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আসছে। এইসব দাবীর কিছু যৌক্তিক, বড় অংশই অযৌক্তিক, চাপ দিয়ে আদায় করে নেয়া। সেবা দেয়ার বেলায় তারা কতটুকু আন্তরিক সেটা দেশের সাধারণ জনগণমাত্রই জানেন। সঠিক পরিমাপের সেবা না দেয়ার ক্ষতি পোষায় সারা দেশের জনগণ।
কৃষি পণ্যের উৎপাদন সংক্রান্ত তথ্যের গড়মিলের কারণে কৃষকরা ন্যায্য দাম পাচ্ছে না, অথচ প্রত্যেক উপজেলা পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ছিল সঠিক তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে সম্ভাব্য উৎপাদন জানানো যেন কৃষকেরা চাষাবাদ শুরুর আগেই পণ্যের দাম কেমন হতে পারে সেই ধারণা লাভ করতে পারে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর একটা বিশাল সংখ্যক কর্মী শেয়ার ব্যবসায়ের সাথে জড়িত, দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত তারা মোবাইলের স্ক্রিন থেকে চোখ সরাতে পারে না।
বাংলাদেশের দশ লক্ষ সরকারি কর্মকর্তা যদি তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সাথে পালন করে তাহলে সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি, লুটপাট সহ অন্যান্য সকল অন্যায় ও অবৈধ কাজকর্ম বন্ধ হবে না কেন? রাজউকের কর্মকর্তারা নৈতিকতা বজায় রেখে ভবনের অনুমোদন এবং সুপারভিশন নিশ্চিত করলে ঢাকা কিভাবে কনক্রিটের জঙ্গল হয়? বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের দায়িত্ব পালন করলে কিভাবে গুটিকয়েক লোক ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকা লুট করে? কাস্টমসের কর্মকর্তারা সৎ হলে কাস্টমস টাকা পাচারের অন্যতম ভূমিকা কিভাবে পালন করতে পারে? সততা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করতে হলে তো নৈতিকতাসম্পন্ন ভালো মানুষ হলেই হয়, ধার্মিক হওয়াও জরুরী নয়। এরকম মানুষের অভাব দূর করার মত যোগ্যতাসম্পন্ন নেতা কই?
উত্তর জানা নাই। বরং সূরা মুতাফফিফীনের প্রথম দিকের আয়াতগুলোর অর্থ তুলে দেই, হয়তো কারও বোধোদয় হবে।
ধ্বংস তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়, যারা লোকদের কাছ থেকে মেপে নেয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে, এবং যখন তাদের জন্য মেপে অথবা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়। তারা কি বিশ্বাস করে না যে, তারা পুনরুত্থিত হবে। এক মহা দিবসে; যেদিন দাঁড়াবে সমস্ত মানুষ সৃষ্টিকুলের রবের সামনে! কখনো না, পাপাচারীদের আমলনামা তো সিজ্জীনে আছে। কিসে তোমাকে জানাবে ‘সিজ্জীন’ কী? ওটা হচ্ছে লিখিত পুস্তক। সেদিন দুর্ভোগ হবে মিথ্যারোপকারীদের, যারা প্রতিদান দিবসে মিথ্যারোপ করে, আর সীমালংঘনকারী পাপিষ্ঠ ব্যতীত কেউই ওকে মিথ্যা মনে করে না।
রাব্বুল আলামীন আমাকে, এবং আপনাকে, ওজনে-পরিমাপে কম না দেয়ার তৌফিক দান করুক। আমীন।
