গুগল সার্চে বাংলাদেশের সংবাদ প্রকৃত চিত্রকে কতটুকু উপস্থাপন করে

গুগল সার্চে বাংলাদেশের সংবাদ

বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর গণহত্যা/নির্যাতন চলছে – এই বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন টুইট করলেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জেগেছিল – বাংলাদেশের মিডিয়াগুলোতে এই ধরণের সংবাদ প্রচারিত না হলেও এবং টুইটারসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় ফ্যাক্টচেকাররা সকল ভুয়া সংবাদকে চিহ্নিত করা সত্ত্বেও কেন ট্রাম্পের মত একজন ব্যক্তি এই ধরণের টুইট করল। গুগল সার্চে বাংলাদেশের সংবাদগুলো দেখে নিলেই তো প্রকৃত তথ্যটা জানা যেতো।

একটা সহজ উত্তর হলো ভারতীয় (এবং কিছুটা আওয়ামীলীগীয়) লবিং। কিন্তু সাধারণ নিরপেক্ষ কোন ভারতীয় ও অন্যান্য দেশীয় নাগরিক যদি নিজ উদ্যোগে যাচাই করতে চান সেক্ষেত্রে তিনি কী জানতে পারলেন – সেটা নিয়েও ভাবা উচিত। এই ভাবনার কাজটা করেছে টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট। তাদের একটি গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি নেত্র নিউজে প্রকাশিত হয়েছে।

সাবস্ট্যাকটেলিগ্রাম চ্যানেলেও প্রকাশিত। যেখানে ইচ্ছা যুক্ত হতে পারেন। ধন্যবাদ।

গবেষণার ফলাফল জানানোর আগে গবেষকদের পরিচয় দেয়া উচিত। একজনকে মোটামুটি সবাই চিনেন। তিনি সাবহানাজ রশীদ দিয়া যিনি মেটা’র (ফেসবুক) বাংলাদেশ বিষয়ক পাবলিক পলিসি প্রধান ছিলেন। অন্যজন শাহজেব মাহমুদ একজন আইন বিষয়ক গবেষক।

দিয়া এবং মাহমুদ তাদের গবেষণায় জানাচ্ছেন, গুগল সার্চে বাংলাদেশের বিষয়গুলো নিয়ে সার্চ করলে ভারতীয় মিডিয়ার ফলাফলই প্রথমদিকের পাতাগুলোতে পাওয়া যায়। বাংলাদেশী প্রথম সারির পত্রিকাগুলো থেকে ফলাফল পাওয়া যায় দশ বা তারও বেশি পৃষ্ঠায়। এমনকি বাংলায় ‘চিন্ময় কৃষ্ণ দাস’ লিখে সার্চ করলেও বাংলাদেশী প্রথম সারির পত্রিকাগুলো থেকে ফলাফল দেখায় না।

গুগলের এই ফলাফলের পেছনে ভারত বড় দেশ বা তাদের মিডিয়া বেশী ইত্যাদি ধরণের একটা ব্যাখ্যা কেউ কেউ দিতে পারেন, তাই তারা স্থানীয় একটি বিষয় নিয়ে সার্চ করে দেখিয়েছেন যে, সেক্ষেত্রে স্থানীয় মিডিয়া থেকেও ফলাফল উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে সন্দেহটা গুগলের এলগরিদমের দিকেই যায়। গুগলের এলগরিদমে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত এই ত্রুটির কারণে ভারতীয় মিডিয়ার ইচ্ছাকৃত মিথ্যা ও ভুয়া এবং দুর্দান্ত এসইও করা সংবাদের নীচে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কার মত ছোট দেশগুলোর সত্য সংবাদ চাপা পড়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

দিয়া ও মাহমুদের এই রিপোর্টের প্রেক্ষিতে কী করা উচিত সেটা নিয়ে আমার ভাবনাটুকু শেয়ার করতে চাই।

প্রথমত, বাংলাদেশের বর্তমান ড. ইউনুসের সরকারের উচিত অফিসিয়ালি গুগলের সাথে যোগাযোগ করা এবং সার্চ ফলাফল সংক্রান্ত এলগরিদমের এই ত্রুটি উপস্থাপন করা। উন্নত বিশ্বের কোন দেশ হলে হয়তো আদালতে বিলিয়ন ডলারের মামলা ঠুকে দিতো। বাংলাদেশে বর্তমানে কোন রাজনৈতিক সরকার না থাকায় সেই পদক্ষেপ না নেয়াই ভালো কিন্তু ড. ইউনুসের পরিচিতি ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে বিষয়টি সমাধা করা উচিত।

দ্বিতীয়ত, মানসম্মত এবং ইংরেজিভাষী মিডিয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি। সারা দুনিয়াতেই প্রচুর ছোটখাটো ইন্ডিপেন্ডেন্ট মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশে এই সংখ্যাটা খুবই কম। এমনকি নেত্র নিউজও একটি ছোট আউটলেট কিন্তু মানসম্মত বাংলা ও ইংরেজি কন্টেন্ট প্রচারে ভূমিকা রাখতে চেষ্টা করছে। সেন্ট্রিস্ট নেশন নামের একটি পূর্ণাঙ্গ ইংরেজি ভাষার অনলাইনভিত্তিক চ্যানেল খুব শীঘ্রই প্রচার কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। কিন্তু এ ধরণের মিডিয়াগুলো প্রফিটেবল হয় না বলে জনগণের সহায়তার দরকার হয়। এ ধরণের আরও উদ্যোগ নেয়া উচিত এবং সচেতন বাংলাদেশীদেরও এই বিষয়ে যথাসম্ভব সহযোগিতার মনোভাব পোষণ করা দরকার বলে মনে করি।

তৃতীয়ত, মিডিয়াতে এসইও ব্যবহারে আরও মনযোগী হওয়া উচিত। ভালো এসইও কেবল বিজ্ঞাপনীয় আয় বাড়াতে সাহায্য করবে না, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতেও ভূমিকা রাখে। মিডিয়ার কর্তাব্যক্তিদের এই বিষয়টি ভালোভাবে অনুধাবন করা উচিত।

চতুর্থত, সাধারণ দেশপ্রেমিক জনগণের উচিত টুইটার, কোরা, ইত্যাদি মিডিয়াগুলোতে ইংরেজিতে একটিভিটি বাড়ানো। বিশেষ করে ফ্যাক্টচেকড ইস্যুগুলো যেন সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেয়া যায় সেজন্য প্রয়োজনে ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে কো-অর্ডিনেটেড এপ্রোচে কাজ করা উচিত। চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে রিসোর্সফুল কন্টেন্ট তৈরি করা এবং সেগুলোর প্রচারে ভূমিকা রাখা সম্ভব।

সফলতা খুব সহজে এবং শীঘ্রই পাওয়া যাবে না কিন্তু ষড়যন্ত্রও সহসা শেষ হবার নয় ফলে শুরু করার সময় পার হয়ে যায়নি। আমাদের উপলব্ধি যত দ্রুত হবে ততই কল্যাণকর।

About দারাশিকো

আমি নাজমুল হাসান দারাশিকো। লেখালিখির প্রতি ভালোবাসা থেকে লিখি। পেশাগত এবং সাংসারিক ব্যস্ততার কারণে অবশ্য এই ভালোবাসা এখন অস্তিত্বের সংকটে, তাই এই ওয়েবসাইটকে বানিয়েছি আমার সিন্দুক। যোগাযোগ - darashiko(at)gmail.com

View all posts by দারাশিকো →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *