জনপ্রশাসন সংস্কার, আন্দোলন এবং অন্যান্য

জনপ্রশাসন সংস্কার কার্যক্রম, এ সংক্রান্ত বিভিন্ন আন্দোলন, আল্টিমেন্টাম এবং সচিবালয়ে আগুন ইত্যাদি বিষয়ে একটি পূর্নাঙ্গ ধারণার জন্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি দেখা যেতে পারে। পরিস্থিতি যেভাবে ঘোলা হয়ে উঠছে তাতে শেষ পর্যন্ত প্রশাসন খাতে সংস্কার আদৌ সম্ভব হবে কিনা সেই সন্দেহ দেখা যাচ্ছে।

[মূলত টেলিগ্রাম চ্যানেলের জন্য লিখেছিলাম, নিয়মিত পোস্ট করছি সেখানেই। আসবেন প্লিজ] ]

এডমিন এবং অন্যান্য ক্যাডারদের মধ্যকার চিরন্তন দ্বন্দ্বই সমস্যার প্রধান কারণ। ড. ইউনুসের সরকার আবদুল মুয়ীদ চৌধুরীকে প্রধান করে যখন কমিশন গঠন করল তখনই আন্দোলন শুরু করেছে এডমিন ক্যাডার ছাড়া অন্যান্য ক্যাডারগণ, কারণ কমিশন প্রধান ছাড়া বেশিরভাগ সদস্যই সাবেক এডমিন ক্যাডার। এখন কমিশন তাদের সুপারিশমালার খসড়া উপস্থাপন করার পর এডমিন ক্যাডারগণও আন্দোলনে যোগ দিয়েছে, যদিও তাদের দাবী আলাদা। সর্বশেষ তারা মুয়ীদ চৌধুরীকে অপসারণের জন্য ৪৮ ঘন্টা সময় বেঁধে দিয়েছে।

আবদুল মুয়ীদ চৌধুরীর মর্যাদা অন্যান্য এডমিন ক্যাডারদের থেকে উচ্চতর। তিনি সিএসপি অফিসার অর্থ্যাৎ পাকিস্তান আমলের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চাকুরীতে যোগ দিয়েছিলেন। যারা এডমিন ক্যাডারে চাকুরি করেন বা ভালো ধারণা রাখেন তারা সবাই জানবেন যে সিএসপি অফিসারদের যোগ্যতা বিসিএস ক্যাডারদের থেকে বেশি হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০০০ সালে অবসর গ্রহণের পর মুয়ীদ চৌধুরী ২০০১ সালে বিচারপতি লতিফুর রহমানের কেয়ারটেকার সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। ২০২৪ সালে আবারও উনাকে বেছে নিয়েছে ড. ইউনুসের সরকার, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান বানিয়েছেন।

এই কমিশন প্রস্তাব করেছে ডেপুটি কমিশনার পদে পঞ্চাশ শতাংশ প্রসাশন বাদে অন্যান্য ক্যাডার থেকে নেয়া হবে। এই সিদ্ধান্ত অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের খুশি করেছে, এডমিন ক্যাডাররা রাগ করেছেন। বিদ্যমান বিধি অনুযায়ী পঁচিশ শতাংশ অন্যান্য ক্যাডারদের থেকে নেয়া হয়। এডমিন ক্যাডারদের দাবী হলো শতভাগই এডমিন ক্যাডার থেকে নেয়া উচিত। এছাড়া পরীক্ষার মাধ্যমে ডেপুটি কমিশনার পদে নিয়োগের সুপারিশ করেছে কমিশন। অন্যান্য ক্যাডারগণ এডমিন ক্যাডারদেরকে দেয়া সুযোগ সুবিধাও দাবী করেছে।

বলে রাখি, কত শতাংশ অন্যান্য ক্যাডার থেকে হবে তার একটা সিদ্ধান্ত ২০১০ সালে আদালত থেকে হয়েছিল। সেটাই চালু আছে। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার এডমিন ক্যাডারদের সুদমুক্ত ৩০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঋণ ও মাসে ৫০ হাজার টাকা মেইনটিন্যান্স ভাতা সুবিধা দেয়ায় বাকী সকল ক্যাডারদের সাথে বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠে। বাকী ক্যাডাররাও এইসব সুবিধা চায়।

শেখ হাসিনা কেন তাদেরকে আলাদা এইরকম সুবিধা দিয়েছে সেটা বুঝে নেয়া দরকার। প্রসাশন ক্যাডাররা সম্মিলিতভাবে একটা ছদ্ম সরকার হিসেবে গড়ে উঠেছে। সাবেক সচিব এবং রাজনৈতিক মন্ত্রীদের সাথে আলাপ করলে জানবেন সচিবরা কিভাবে বহু মন্ত্রীদের সিদ্ধান্ত পালটে দিয়েছে, বাস্তবায়ন করতে বাধা দিয়েছে ইত্যাদি। অযোগ্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণে তারা সেটা করতে পারে এবং বেশিরভাগ রাজনৈতিক নেতৃত্বই তাদের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকে। তাছাড়া, রাজনৈতিক সরকারের পরিবর্তন হয় কিন্তু তারা ঘুরে ফিরে সরকারেই থাকে।

এটা অস্বীকার করার কোনই উপায় নাই যে, এডমিন ক্যাডারদের কাজের অভিজ্ঞতা অন্য সব ক্যাডারের তুলনায় অনেক বেশি। প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদেরকে ২৪ ঘন্টার কর্মচারি বলা হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ২৪ ঘন্টা কাজের মধ্যে থাকে কেবল পুলিশ আর এডমিন ক্যাডাররা। বাকীদের বেশিরভাগ নয়টা পাঁচটা চাকুরি করেন, তাদের কাজের ক্ষেত্র এবং অভিজ্ঞতয়া অর্জনের সুযোগও সীমিত। এখন ডেপুটি কমিশনার হিসেবে অন্যান্য ক্যাডার থেকে লোক নেয়া হলে তারা সেই দায়িত্ব কতটুকু ভালোভাবে পালন করতে সক্ষম হবেন সেই প্রশ্ন থাকে। এই বিবেচনায় এডমিন ক্যাডারদের দাবী যৌক্তিক মনে হয়। কিন্তু বাকী ক্যাডারগুলোর শীর্ষপদে যেভাবে এডমিন ক্যাডাররা উড়ে গিয়ে বসে পড়েন সেটার সমাধানও থাকা উচিত।

এডমিন ক্যাডারদেরকে শেখ হাসিনার সরকার সুদবিহীন গাড়ি ঋণের যে সুবিধা দিয়েছে সেটাও পুনর্বিবেচনা করা দরকার। এডমিন ক্যাডারদের জন্য সরকারের গাড়ি সুবিধা থাকে, অন্যান্য ক্যাডারদের জন্য সেই সুবিধা নাই, কেউ কেউ অফিসের জন্য বরাদ্দ গাড়ির সুবিধা নিয়ে থাকেন। ফলে এডমিন ক্যাডারদেরকে আলাদাভাবে গাড়ি ঋণ ও মেইনটিন্যান্স সুবিধা দেয়ার প্রয়োজনীয়তা বোধগম্য নয়। ব্যক্তিগতভাবে দেশের জ্বালানী ও পরিবেশের বিবেচনায় আমি যে কোন কর্মকর্তাকেই সুদমুক্ত গাড়ি ক্রয়ের ঋণ দেয়ার বিরোধিতা করি। একইসাথে নিজের ক্ষমতাকে অন্যায়ভাবে কুক্ষিগত করার স্বার্থে কেবলমাত্র প্রশাসন ক্যাডারদের অবাধ সুযোগ সুবিধা প্রদানও বন্ধ করা উচিত বলে মনে করি।

ফলে এই কমিশনের উচিত একদিকে যেমন এডমিন ক্যাডারদের ক্ষমতা ও সুযোগ সুবিধা ছাঁটাই করা তেমনি অন্যান্য ক্যাডারদের সুযোগ সুবিধাও সেভাবে বৃদ্ধি করা এবং তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য আরও কার্যকরী উপায় খুঁজে বের করা। সবচেয়ে বেশি জরুরী ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। এডমিন ক্যাডারের লোকজন যেভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, অন্যায়-দুর্নীতি করেন সেগুলার কোন জবাবদিহিতা আর বিচার নাই বলেই রাজনৈতিক সরকারগুলোর সাথে তাদের সুসম্পর্ক তৈরি হয় আর একে অপরের স্বার্থে সহযোগী হয়।

সংস্কার কমিশন কতটা করতে পারবে জানি না তবে এটাও চাই যে, শুধুমাত্র ক্যাডারকেন্দ্রীক চিন্তাভাবনা থেকে সরে আসতে হবে। সকল সুযোগ সুবিধা উচ্চতর শ্রেণির কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দ করার পরিবর্তে সুষম বন্টন নিশ্চিত করা বেশি প্রয়োজন। ডাক্তারদের-শিক্ষকদের জন্য সুযোগ-সুবিধা যেমনি বাড়াতে হবে তেমনি তাদের কাছ থেকে কাজটুকু আদায় করে নেয়াটাও নিশ্চিত করতে হবে। কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কর্মচারিদেরকেও সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে যেন দুই শ্রেণির পার্থক্য প্রকট হয়ে ফুটে না উঠে। আর জনগণের প্রতি সরকারি কর্মমর্তা-কর্মচারিদের যে দায়িত্ব সেটার পরিপালন নিশ্চিতের জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে সুযোগ-সুবিধারও আগে।

About দারাশিকো

আমি নাজমুল হাসান দারাশিকো। লেখালিখির প্রতি ভালোবাসা থেকে লিখি। পেশাগত এবং সাংসারিক ব্যস্ততার কারণে অবশ্য এই ভালোবাসা এখন অস্তিত্বের সংকটে, তাই এই ওয়েবসাইটকে বানিয়েছি আমার সিন্দুক। যোগাযোগ - darashiko(at)gmail.com

View all posts by দারাশিকো →

2 Comments on “জনপ্রশাসন সংস্কার, আন্দোলন এবং অন্যান্য”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *