শীতের পাখির সাথে কুমিল্লায়

গোড়ালি সমান পানিতে দাঁড়িয়ে তিনি অত্যন্ত যত্নের সাথে অযু করছিলেন। মাথা মাসেহ শেষ করে তিনি পা ধুলেন। তারপর কালেমায়ে শাহাদাত পড়ার জন্য ডানহাতের তর্জনী তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সুবহানাল্লাহ!’

আমি উনার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে জামার হাতা গুটিয়ে নিচ্ছিলাম। কালেমায়ে শাহাদাতের পরিবর্তে ‘সুবহানাল্লাহ’ শুনে আকাশের দিকে তাকালাম। শত শত বালিহাঁস আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে আর ডাকছে। তারা চক্রাকারে উড়ছে। কিছু হাঁস পুকুরের উত্তর-পূর্ব দিকের বাঁশঝাড়ে গিয়ে বসছে। আবার সেখান থেকে কিছু হাঁস উড়ে গিয়ে ঝাঁকের সাথে যোগ দিচ্ছে৷ সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য!

বাদ ফজর ঢাকা থেকে রওয়ানা করে কুমিল্লায় পৌঁছেছি বেলা এগারোটায়৷ সাইফুল্লাহ ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে৷ শীতের ছুটিতে ভাবীর পরিবারের সবাই একত্রিত হয়েছে গ্রামের বাড়িতে, এই সুযোগে সাইফুল্লাহ ভাইয়ের পরিবারও যোগ দিয়েছে, সাথে জুটেছি আমি।

কুমিল্লায় অবশ্য আমার এটা প্রথম ভ্রমণ নয়। বছর আষ্টেক আগে আমি আর সাকিব শাহরিয়ার একদিনের ট্যুরে কুমিল্লা ঘুরে গিয়েছি। তখনকার আর এবারের ভ্রমণের মধ্যে বড় কিছু পার্থক্য আছে। প্রথমতঃ তখন ঢাকা-চট্টগ্রাম দুই লেনের হাইওয়ে ছিল, এখন চার লেনের হাইওয়ে। ঢাকা-কুমিল্লা এখন আড়াই ঘন্টার যাত্রাপথের সমান। আমাদের অপেক্ষাকৃত বেশী সময় লাগার কারণ আর কিছু নয়, দুটি সড়ক দুর্ঘটনা। প্রায় এক ঘন্টা বেশী সময় লেগেছে রাস্তা বন্ধ হয়ে থাকার কারণে।

দ্বিতীয় পার্থক্য হলো, তখন এর নাম ছিল কুমিল্লা, আর এখন নাম পাল্টে রাখা হয়েছে সি-ইউ-এম-আই-এল-এল-এ ছুমিল্লা। বাংলাদেশে ইংরেজি শিক্ষার অবস্থা বেশ খারাপ বলে সম্প্রতি বণিকবার্তায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশীদের ইংরেজি দক্ষতা নেপালীদের থেকেও কম। এই প্রতিবেদন নিয়ে সন্দেহ করার সুযোগ নেই। যে দেশে কুড়িগ্রাম, কুষ্টিয়া লিখা হয় কে-ইউ দিয়ে, সেখানে কুমিল্লা কোন বিচারে সি-ইউ দিয়ে বিবেচনা করা হয়েছে, তা আমার বোধগম্য হয়না।

কুমিল্লা হোক আর ছুমিল্লা, প্রচন্ড শৈত্যপ্রবাহের কারণে ভ্রমণের প্রথম দিনে ভ্রমণ বলতে তেমন কিছু হলো না। ভালো খাই-দাই আর বিশ্রামেই দিন শেষ এবং সন্ধ্যায় মসজিদের পুকুরপাড়ে বালিহাঁসের ঝাঁক দেখে তৃপ্ত হওয়া। জানা গেল, পুকুরপাড়ের এই বিশাল বাঁশঝাড়েই হাজারখানেক বালিহাঁস আশ্রয় নিয়েছে। তারা আমাদের অতিথি পাখি। প্রত্যেক বছরেই সুদূর সাইবেরিয়া এবং অন্যান্য শীতপ্রধান দেশ থেকে উড়ে আমাদের এদেশে আসে তারা, নদী-খাল-বিলে কিছু সময় কাটিয়ে, বংশ-বিস্তার ঘটিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে আবার ফেরত যায়। সকালেই সুজন ভাই ফোন করে শীতের পাখি দেখা যায় এমন কোথাও ভ্রমণের পরিকল্পনা করছিলেন, সন্ধ্যায়ই অতিথি পাখি দেখা হয়ে যাবে ভাবিনি।

কুমিল্লায় ভ্রমণের জন্য শালবন বৌদ্ধ বিহার, প্রত্নতাত্ত্বিক যাদুঘর, ওয়ার সিমেট্রি, ধর্মসাগর এবং বার্ড-এর নাম আগে থেকেই জানা ছিল। বহু আগে থেকেই এই জায়গাগুলো সাধারণ মানুষের প্রিয় গন্তব্য ছিল। আগেরবার কুমিল্লা ভ্রমণে এসে ওয়ার সিমেট্রি বাদে বাকী জায়গাগুলো ঘুরে গিয়েছিলাম। এবার কুমিল্লায় এসে আরও কিছু নতুন স্পটের খোঁজ পাওয়া গেল।

রূপসাগর

কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে একটি বড় দীঘি এবং তার আশেপাশের জায়গা জুড়ে রূপসাগর। দীঘির মাঝখানে কৃত্রিম ঝর্ণা, তার চারদিকে বিভিন্ন ভঙ্গির পচিঁশটি ছুটন্ত অশ্বমূর্তি। আছে প্যাডেল বোটের ব্যবস্থা। দীঘির চারদিকে পায়ে হেঁটে বেড়ানোর জন্য রয়েছে ওয়াকওয়ে। একটি বোট হাউজে ওয়াশরুম, রেস্টুরেন্ট, বাচ্চাদের জন্য গেমস রুম ইত্যাদির ব্যবস্থা করা হয়েছে। ছোট্ট একটি টিলাও রয়েছে। নানা রকম ফুলের গাছে রঙ-বেরঙের ফুল ফুটে রয়েছে। ল্যাম্পপোস্টগুলোর স্পিকার থেকে ধীরলয়ের বাংলা ও হিন্দী গান বাজানো হয়। ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে বলে নিরাপত্তার অভাব নেই। অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করতে হলেও টিকিটের প্রয়োজন হয়। জনপ্রতি ৫০ টাকা। নিরিবিলিতে বেড়ানোর জন্য রূপসাগর আদর্শ জায়গা।

রূপসাগর, কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট। ছবি: দারাশিকো

দীঘির পাড়ে একটি পাথরের ফলক থেকে জানা গেল এর আদি নাম ব্রহ্মসাগর, একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। ২০১৪ সালে এটি সংরক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়। ফলকে ব্রহ্মসাগর সম্পর্কে আর কোন তথ্য নেই, রয়েছে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ যারা এর উন্নয়ন কাজে জড়িত ছিলেন তাদের নাম, পদবী ইত্যাদি। ফলক থেকে আরও জানা গেল – এখানে মিনি চিড়িয়াখানা, মনোরেল, ওয়াটার পার্ক, কটেজ, শিশু পার্ক, বিভিন্ন ধরনের রাইড ইত্যাদির পরিকল্পনা বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। ব্রহ্মসাগর সম্পর্কে আর কোন তথ্য পাওয়া গেল না। এমনকি ইন্টারনেটেও এর কোন তথ্য নেই, হয়তো কুমিল্লার ইতিহাস সম্পর্কিত বইয়ে কিছু পাওয়া যাবে।

ইংরেজ কবরস্থান

কুমিল্লার বাসিন্দাদের কাছে এ নামেই পরিচিত। পোষাকী নাম ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি। আরেকটি নাম হলো কমনওয়েলথ সিমেট্রি। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সৈনিকদের কবরস্থান। মোট ৭৩৭টি কবর, এর মধ্যে একজন বেসামরিক ব্যক্তি এবং ২৪জন জাপানি যুদ্ধবন্দী। ইংরেজ কবরস্থান নামে পরিচিত হলেও এখানে মুসলমান, খ্রীস্টান, ইহুদী, বৌদ্ধদের কবরও রয়েছে। এছাড়া আছে একটি গণকবর যেখানে ২৩জন বিমানসৈনিক চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন। প্রত্যেকটি কবরে তাদের ধর্মীয় প্রতীক রয়েছে। মুসলমানদের কবরে আরবীতে লেখা রয়েছে হুয়াল গাফুর।

বাংলাদেশে এরকম কবরস্থান রয়েছে দুইটি। অন্যটি চট্টগ্রাম শহরে অবস্থিত। আকৃতিতে এবং কবরের সংখ্যায় চট্টগ্রামের সিমেট্রি-টি বড়। কুমিল্লা জেলা তথ্য বাতায়ন অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এ অঞ্চলে ৪৫,০০০ সৈনিক মৃত্যুবরণ করেছিল। তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে মায়ানমার (তৎকালীন বার্মা), আসাম এবং বাংলাদেশে মোট নয়টি ওয়ার সিমেট্রি তৈরী করা হয়েছিল।

ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন-পরিপাটি স্থান। প্রাকৃতিক পরিবেশ আর নীরবতা পর্যটককে তৃপ্ত করার জন্য যথেষ্ট। তবে, এই ওয়ার সিমেট্রি ভ্রমণ আরও উপভোগ্য হতো যদি এখানে কোন গাইড থাকতো যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কিভাবে ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং কুমিল্লায় কিভাবে এত সংখ্যক সৈন্যের কবর হলো সে সম্পর্কে বলতে পারতেন। আমি নিশ্চিত, যে সৈনিকদের ফলক এখানে রয়েছে তাদের কিংবা এই অঞ্চলে প্রাণ দিয়েছে এমন কোন সৈনিকের গল্প ইতিহাসের পাতায় খুঁজে পাওয়া যাবে।

শালবন বৌদ্ধ বিহার ও যাদুঘর

স্থানীয়রা একে বলে কোটবাড়ি। শালবন বৌদ্ধ বিহার কোটবাড়িতে অবস্থিত। এটি একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। শত বছর আগে এই জায়গায় শালবন ছিল বলে শালবন বৌদ্ধ বিহার বলা হয়। এই স্থাপনাটি আবিষ্কৃত হয়েছে ১৮৭৫ সালে। তখন একে একটি রাজবাড়ী ধারণা করা হয়েছিল। পরবর্তীতে অবশ্য একে প্রাচীন কোন নগরীর ধ্বংসাবশেষ হিসেবেই নিশ্চিত করা হয়। প্রত্নতাত্ত্বিকদের হিসাব অনুযায়ী ৭ম থেকে ১২শ শতকের কোন এক সময়ে এই স্থাপনা তৈরী হয়েছিল। চারকোনা আকৃতির কাঠামোর ভেতরে অনেক কক্ষ, খুঁটি ইত্যাদি এখনও বোঝা যায়। যতটুকু জানি, এ সকল বিহার সেই সময়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান ছিল। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা এখানে থেকে বিদ্যা চর্চা করতেন। ভূমিকম্প বা এ ধরণের কোন কারণে এই বিহারগুলো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এই বিহার খনন করে যা উদ্ধার করা হয়েছে তারই কিছু অংশ দিয়ে বিহারের সাথের যাদুঘরটি সাজানো হয়েছে।

শালবন বৌদ্ধ বিহার, কুমিল্লা। ছবি: দারাশিকো

পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার কিংবা বগুড়ার বিহারের তুলনায় শালবন বৌদ্ধ বিহার বেশ ছোট। তবে, এখানে কাঠামোগুলো অনেক বেশি স্পষ্ট। এছাড়া বাহারী ফুলের গাছ রয়েছে। ফলে প্রচুর দর্শনার্থী এই বিহারে বেড়াতে আসেন। আমি প্রথমবার যখন এসেছিলাম তখন বৃষ্টি হয়েছিল, ফলে ভেতরে দর্শক ছিল না। অল্প কিছু মানুষ অনেক সময় নিয়ে ঘুরে ফিরে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। এবার মানুষের প্রচন্ড ভীড়। সবাই ছবি তুলতে ব্যস্ত। রয়েছে প্রফেশনাল ফটোগ্রাফারও।

বিহারের পাশেই শালবন। সেখানে হাঁটার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু যত্নের অভাবে সেই পার্ক শ্রী হারিয়েছে। শীতের সময়ে ধূলাবালি প্রচুর। উটকো লোকের ভীড়। ফলে বেড়ানোর আগ্রহ হয়নি। বৌদ্ধ বিহারের সাথেই একটি বৌদ্ধ মন্দির রয়েছে। সেখানে বৌদ্ধ মূর্তি রয়েছে। বিহারের পাশাপাশি সেখানেও বেড়াতে যায় লোকে, আমাদের অবশ্য সে সুযোগ হয়নি।

বার্ড

বাংলাদেশ একাডেমি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট এর সংক্ষিপ্ত রূপ হলো বার্ড যা কুমিল্লার অন্যতম দর্শনীয় স্থান। তবে এখন এখানে প্রবেশাধিকার অনেক সংরক্ষিত। বার্ডের একজন কর্মকর্তার রেফারেন্সে এবারে ঢোকার অনুমতি পাওয়া গেল, আগেরবার দরকার হয়নি।

ডঃ আখতার হামিদ খান এর নাম বার্ড-এর সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে। তিনি ১৯৫৯ সালে বার্ড প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তখন অবশ্য এর নাম ছিল পাকিস্তান গ্রাম উন্নয়ন একাডেমি। স্বাধীনতার পরে এর নাম পাল্টে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি রাখা হয়। মোট ১৫৬ একর জায়গার উপর অবস্থিত এই একাডেমিতে হোস্টেল, মসজিদ, ক্যাফেটেরিয়া, লাইব্রেরি, হেলথ ক্লিনিক, স্পোর্টস কমপ্লেক্স, প্রাইমারি স্কুল, স্টাফ কোয়ার্টার ইত্যাদি রয়েছে।

জালের মধ্যে মাকড়সা, বার্ড, কুমিল্লা। ছবি: দারাশিকো

তবে এসব দেখার জন্য কেউ যায় না। সাধারণ মানুষের জন্য প্রধান আকর্ষণ হলো এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য। বার্ডের ভেতরে একটি ছোট পাহাড় আছে, নাম নীলাচল। ছোট টিলা আছে বেশ অনেকগুলো। নীলাচল হলো পাহাড়ের চূড়া যার তিনদিকেই গভীর খাদ। প্রচুর গাছপালায় ভর্তি জায়গাটা। বার্ডে সব মিলিয়ে ২৫ হাজারের বেশী গাছ রয়েছে যার প্রায় অর্ধেক ফলজ গাছ। পিচঢালা রাস্তা রয়েছে। সেই রাস্তায় হাঁটতেই অবশ্য বেশী আনন্দের। একটি পানির ট্যাংকি রয়েছে। দীপু নাম্বার টু সিনেমার বিখ্যাত একটি দৃশ্যের চিত্রায়ন হয়েছিল এই ট্যাংকিতে।

আগেরবার যখন এসেছিলাম তখন বর্ষাকাল। ফলে জঙ্গল যৌবনে টইটম্বুর। তাছাড়া ভীড় একদমই ছিল না, ফলে বার্ড ঘুরে বেশ আরাম পাওয়া গিয়েছিল। এবার সেই জংলীভাবটুকু পাওয়া গেল না। বার্ড ঘুরতে ঘুরতে আমার ভারতের পুনেতে অবস্থিত এনআইবিএম এর অভিজ্ঞতা মনে পড়ে গেল। এনআইবিএম বার্ডের চেয়ে ছোট জায়গা, কিন্তু অনেক গোছালো। বার্ড তার চেয়ে প্রায় তিনগুণ বড়। এনআইবিএম দেখার পর থেকে এ ধরণের প্রাকৃতিক পরিবেশসহ প্রতিষ্ঠানের অভাব বোধ করছিলাম। এই ভ্রমণে বার্ড ঘুরে দেখার পর সেই অতৃপ্তি দূর হয়েছে।

ধর্মসাগর

এবারের ভ্রমণে ধর্মসাগর দেখার পরিকল্পনা ছিল না। আগেরবার ধর্মসাগর ঘুরে দেখেছিলাম। কুমিল্লা শহরের মধ্যেই বিশাল এক দীঘির নাম ধর্মসাগর। রূপসাগরের মতই ধর্মসাগর একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। ত্রিপুরার রাজা ধর্মমাণিক্য সাধারণ জনগণের পানীয় জলের অভাব দূর করতে এই দীঘি খনন করেছিলেন বলে তার নাম অনুসারে এই দীঘির নামকরণ করা হয়েছে বলে জানা যায়। সে হিসেবে এই দীঘীর বয়স প্রায় ছয়শ বছর, কারণ ধর্মমাণিক্যের শাসনামল ছিল ১৪৩১-১৪৬২ সাল পর্যন্ত। উইকিপিডিয়ায় এই দীঘি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে।

ধর্মসাগর, কুমিল্লা। ছবি: দারাশিকো

যদিও অনেক আগে এই দীঘিতে গিয়েছি, বিশাল আকৃতি ছাড়া এর অন্য কোন বৈশিষ্ট্য চোখে পড়েনি। সাধারণ মানুষের ব্যাপক যাতায়াত সেখানে, আশেপাশে বসার-হাঁটার ব্যবস্থা রয়েছে। ছেলেরা ঝাঁপিয়ে পড়ে গোসল করছিল। বর্তমানে কি অবস্থা জানা নেই।

ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্ক, ডাইনো পার্ক, ব্লু ওয়াটার পার্ক

এগুলো কুমিল্লার নতুন পর্যটক গন্তব্য। বড় জায়গায় কৃত্রিমভাবে এমিউজমেন্ট পার্ক হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে এই স্থানগুলো। ব্লু ওয়াটার পার্কে বাঘ, হাতিসহ নানা ধরণের জন্তু জানোয়ারের মূর্তি রয়েছে৷ আর আছে ওয়াটার রাইডের ব্যবস্থা। সাথে প্রাকৃতিক পরিবেশও চমৎকার।

ডাইনো পার্ক এবং ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কও একই রকম। পার্থক্য হলো এখানে বর্তমানকালের জন্তু জানোয়ারের পরিবর্তে প্রাগৈতিহাসিক জানোয়ার ডাইনোসরের মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। কলের তৈরি এই মূর্তিগুলো আবার নড়াচড়া করে – কেউ মাথা দোলায়, কেউ লেজ। ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কের প্রবেশপথে তো তিনটি ডাইনোসরের একটি ব্যান্ডদলও রয়েছে। বিশাল আকৃতির ডাইনোসর যেগুলো নড়াচড়া করে, সাথে রয়েছে সাউন্ড ইফেক্ট – সব মিলিয়ে মন্দ অভিজ্ঞতা হবার কথা নয়। প্যারাডাইস পার্কে বিভিন্ন ধরণের রাইড, ওয়াটার রাইডের ব্যবস্থা রয়েছে। টিকিটের বিনিময়ে প্রবেশ এবং বিভিন্ন ধরণের রাইডে চড়ার সুযোগ পাওয়া যায়। বাচ্চা থেকে শুরু করে তরুণদের জন্য এ ধরণের এমিউজমেন্ট পার্কগুলো বেশ উপভোগ্য। উল্লেখ্য, এই পার্কগুলোতে আমার যাওয়া হয়নি। ম্যাজিক প্যারাডাইসে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও সময়ের অভাবে তা সম্ভবপর হয়ে উঠেনি৷ ইন্টারনেট ঘেঁটে এই পার্কগুলো সম্পর্কে জানার পর এখন আর যাওয়ার আগ্রহও হচ্ছে না।

মাতৃভান্ডারের রসমালাই

কুমিল্লার নাম পাল্টে মাতৃভান্ডার রাখলেও মন্দ হতো না, কারণ কুমিল্লার সব মিষ্টির দোকানের নামই মাতৃভান্ডার। বাংলাদেশ আজব দেশ। এখানে সব ইলিশ মাছ পদ্মায় পাওয়া যায়, সব আমড়া জন্মে বরিশালে আর সব রসমালাই মাতৃভান্ডারে। যাহোক, ২০১১ সালে যখন প্রথমবার ঘুরতে এসেছিলাম তখন আদি এবং আসল মাতৃভান্ডারের রসমালাই খেয়েছিলাম। বলাবাহুল্য, ‘আদি মাতৃভান্ডার’ এবং ‘আসল মাতৃভান্ডার’ নামেও মিষ্টির দোকান রয়েছে কুমিল্লায় এবং সেগুলোও আদি ও আসল নয়। কুমিল্লার আসল মাতৃভান্ডার হলো মনোহরপুরে, টাউনহলের পাশে। বাকী সবই নকল মাতৃভান্ডার, কারণ এদের কোথাও শাখা নেই এবং তারা কোথাও সরবরাহও করে না। দোকানে ভীড় লেগেই থাকে। আসল এই মাতৃভান্ডারের রসমালাই আসলেই অসাধারণ, বাংলাদেশের সেরা রসমালাই। চারজনে এক কেজি রসমালাই চেটেপুটে খেয়েছিলাম তখন৷ এর স্বাদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে একমাত্র নাটোরের মৌচাক মিষ্টান্ন ভান্ডারের রসমালাই। নাটোরের রসমালাই দুইবার খাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমার, সর্বশেষ দুই মাস আগে। দুবারই আমার কাছে কুমিল্লার আসল মাতৃভান্ডারের প্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনে হয়েছে।

আসল মাতৃভান্ডার নিয়ে দৈনিক প্রথম আলো ২০১৬ সালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ১৯৩০ সালে বর্তমান স্বত্বাধিকারী শংকর সেনগুপ্তের বাবা ফণীন্দ্র সেন এই মিষ্টির দোকান শুরু করেন। প্রচলিত আছে, এক মণ দুধ জ্বাল দিয়ে যে ক্ষীর তৈরী হয় তা দিয়ে মাত্র চৌদ্দ কেজি রসমালাই তৈরী হয়। ক্ষীর বানানোর জন্য দুধ সংগ্রহ করা হয় আখাউড়া-দেবীদ্বার থেকে। এই তথ্য কতটুকু সত্য জানি না, তবে আসল মাতৃভান্ডারের রসমালাই খেয়ে ঠকবেন না – এই নিশ্চয়তা দিতে পারি।

রাতে ঘুমানোর ব্যবস্থা হলো আরেক বাড়িতে। তিনি সাইফুল্লাহ ভাইয়ের জ্যাঠা শ্বশুর। বয়স প্রায় পঁচাশি। এখনও বেশ শক্ত সমর্থ। মাঠে গরু নিয়ে যান, ফিরিয়ে এনে খেতে দেন। আরও নানা ধরণের কাজ করেন। চলাফেরা কাজকর্ম দেখলে মনে হয় না যে তিনি এত বয়ষ্ক। জ্যাঠার ছেলে মেয়েরা প্রতিষ্ঠিত। দুই ছেলে বাড়িতে থাকে। দোতলা বাড়ি। আমাদের স্থান হলো দোতলার একটি কক্ষে। বড়সড় রুম। অনেক উঁচুতে ছাদ। কথা বললে গমগম আওয়াজ হয়, দূর থেকেও শোনা যায়। ঠান্ডা শীতের রাত্রে অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতার মধ্যে আমাদের কথাবার্তা দূর থেকেও কেউ শুনতে পাচ্ছে – এমন উপলব্ধি অস্বস্তিকর। বিশেষ করে যখন এমন কোন বাড়িতে রাত কাটাচ্ছি যার পাশের প্রায় পরিত্যক্ত বাড়িতে জ্বীন থাকে বলে এ বাড়ির সবাই বিশ্বাস করে।

এই দোতলা বাড়িটা নির্মিত হয়েছে বছর তিনেক হলো। পুরাতন বাড়িটা নতুন বাড়ির দক্ষিণে। নতুন বাড়ি হবার পরে পুরাতন বাড়িতে নিয়মিত থাকার মতো কেউ ছিল না। কোন এক প্রয়োজনে জ্যাঠার দুই ছেলে রাত্রিতে পুরাতন বাড়িতে পাশাপাশি ঘুমিয়েছিল। মাঝরাত্রিতে শোরগোল। কে যেন একজনের গলা চেপে ধরে বারবার। জানা গেল, ফাঁকা বাড়িতে নাকি দুই একটি জ্বিন আশ্রয় নিয়েছে, এ তাদেরই কাজ। সুতরাং সে বাড়িতে কেউ থাকে না, দিনের বেলায় ধান-চাল ও অন্যান্য জিনিসপত্র রাখা-নেয়ার জন্য ব্যবহার করা হয় কেবল। জ্বীনের আছরের গল্প আরও আছে, সে গল্প আরেকদিন বলা যাবে।

সকাল বেলায় উঠে দেখি বাড়িভর্তি লোকজন। বাড়ি বলতে বাড়ির প্রবেশপথের সাথে কাচারি ঘরের কথা বলছি। ঘরে জায়গা হচ্ছে না বলে কিছু লোকজন ঘরের উঠানেও দাঁড়িয়ে-হাঁটাচলা করে অপেক্ষা করছে। গেটের বাহিরে সিএনজি-অটোরিকশা অপেক্ষা করছে। সেখানেও আছে কিছু মানুষ।

ঘরে বসে আছেন জ্যাঠা। তিনি দোয়া কালাম পরে ফুঁ দিয়ে দিচ্ছেন, নানারকম পরামর্শ দিচ্ছেন। স্থানীয় ভাষায় একে ‘ঝাড়া’ বলে, শুদ্ধ ভাষায় ঝাড়-ফুঁক৷ জানা গেল, জ্যাঠা গত বিশ বছরের বেশি সময় ধরে এই কাজ করছেন। এর আগে উনার বাবা একই কাজ করতেন। সপ্তাহে দুইদিন – শনিবার এবং মঙ্গলবার, বাদ ফজর থেকে শুরু করে জ্যাঠার নাস্তা খাওয়ার আগ পর্যন্ত। ফজরের আগে থেকে লোকজন আসতে শুরু করে। সবাইকে ঝাড়া শেষ করে তবেই জ্যাঠা নাস্তা খান, নয়টাও বাজে কোন কোনদিন। নাস্তা খাওয়ার পরে কেউ এলে তাকে ফিরে যেতে হয়। আজকেও দুটো পরিবার দেরীতে এসে কিছুক্ষণ বসে থেকে ফিরে গেলো।

শেষ বিকেলে ছোট চাচার বাসায় যেতে হলো। রসে ডুবানো পিঠা আর ঘিয়ে ভাজা সেমাই খেয়ে সবার থেকে বিদায় নিয়ে যখন বেড়িয়ে আসছি তখন বালিহাঁসের ডাকে আকাশে তাকিয়ে দেখি বিশাল এক ঝাঁক উড়ে উড়ে যাচ্ছে। ওরাও ভ্রমণে বেরিয়েছিল। ভরা পেট নিয়ে এখন ঘরে ফিরছে। আমার ভ্রমণও শেষ। এবার আমার ঘরে ফেরার পালা।

About দারাশিকো

আমি নাজমুল হাসান দারাশিকো। লেখালিখির প্রতি ভালোবাসা থেকে লিখি। পেশাগত এবং সাংসারিক ব্যস্ততার কারণে অবশ্য এই ভালোবাসা এখন অস্তিত্বের সংকটে, তাই এই ওয়েবসাইটকে বানিয়েছি আমার সিন্দুক। যোগাযোগ - darashiko(at)gmail.com

View all posts by দারাশিকো →

2 Comments on “শীতের পাখির সাথে কুমিল্লায়”

Leave a Reply to দারাশিকো Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *