রাসূলুল্লাহ (স) এর জীবন থেকে নেয়া নেতৃত্বের শিক্ষা

রাসূলুল্লাহ-স-এর-জীবন-থেকে-নেয়া-নেতৃত্বের-শিক্ষা-Leadrship-lessons-from-the-life-of-Rasoolullah

রাসূলুল্লাহ (স) এর জীবন থেকে নেয়া নেতৃত্বের শিক্ষা কোন মৌলিক রচনা নয়। এটি মীর্জা ইওয়ার বেগ রচিত বই Leadership Lessons from the life of Rasoolullah বইয়ের অনুবাদ-প্রচেষ্টা। চেষ্টা করবো সম্পূর্ণ বইটি অনুবাদ করতে। তখন হয়তো এই অংশটুকু পুনরায় লেখা হবে। আপাতত অনুবাদের কাজ শুরু করি।

নোটঃ বইটিতে প্রচুর কোরআনের আয়াত এবং হাদীসের রেফারেন্স দেয়া হয়েছে। আমি কোন আয়াত বা হাদীসের অনুবাদ করার চেষ্টা করি নাই, কেবল বিভিন্ন ওয়েবসাইট, বিশেষ করে ই-বাংলা লাইব্রেরিতে বাংলা কোরআন থেকে, আয়াতের অর্থ গ্রহণ করেছি। হাদীসের ক্ষেত্রে যেসব হাদীস বিভিন্ন ওয়েবসাইটে পেয়েছি, সেগুলো তুলে দিয়েছি, চেষ্টা করেছি সূত্র লিংক করে দিতে। বাকীগুলো ভবিষ্যতে অনুবাদ খুজেঁ বের করবো বলে আপাতত ইংরেজিটুকুই রেখেছি। অনুবাদ সম্পূর্ণ করতে পারলে সম্পূর্ণ রেফারেন্স দেয়ার চেষ্টা করবো।

সূচিপত্র

শুরুর কথা

If greatness of purpose, smallness of means and astounding results are the three criteria of human genius then who could dare to compare any great man in history with Muhammad?

Lamartine, French historian and educator

২০০৮ সালে হজ্জের তিন দিন পরের ঘটনা। সৌদী আরবের হজ্জ মন্ত্রনালয় আয়োজিত বার্ষিক হজ্জ কনফারেন্সে আমাকে দাওয়াত দেয়া হয়েছে। কনফারেন্স এবং হজ্জের শেষে আমি এবং আমার স্ত্রী মক্কা থেকে মদীনা ঘুরেছি। মদীনাতুর-রাসূল, রাসূলুল্লাহর শহর। যখন তিনি এখানে থাকার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন, তিঁনি এর নাম দিয়েছিলেন মুনাওয়ারাহ (ব্রিলিয়ান্ট, জাজ্জ্বল্যমান)। খুবই বিশিষ্ট একটি জায়গা যা আপনি কখনোই ছেড়ে যেতে চাইবেন না। আমি খুব অবাক হয়ে ভাবি, তিঁনি যখন জীবিত ছিলেন এবং এখানে ছিলেন তখন কেমন ছিল। এমনকি এখনো, যখন তিনি কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত, তাঁর মহিমা ও উপস্থিতি পুরোটা জুড়ে রয়েছে এবং এই শহর ও তার লোকদের এমন বৈশিষ্ট্য দান করেছে যা একে আমি যত শহরে ঘুরে বেড়িয়েছি তা থেকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে। একজন মুসলমানের জন্য মদীনায় আসা মানে হল নিজের ঘরে আসা। এমন ঘর যা তার জন্মস্থানের চেয়েও প্রিয়। এই ঘরেই সে মৃত্যুবরণ এবং কবরস্থ হতে চায়। কোন মুসলমানের কাছে মদীনা সৌদী আরব না। এটা ইসলাম, এটা তার হৃদয়, এমন একটি জায়গা যেখানে যেতে সে ব্যাকুল, এমন জায়গা যেখানে মোহাম্মদ (স) এর বাড়ি। মদীনার জন্য এই আকুলতা নিয়ে কত কবি যে কত কবিতা লিখেছে তার ইয়ত্তা নেই!

ভোর থেকেই তাঁকে ভালোবেসে দেখতে লক্ষ লক্ষ লোকের উপস্থিত হওয়ার অনেক আগেই তাহাজ্জুদ নামাজে তাড়িয়ে আমি তাঁর প্রতি সালাম পৌছালাম। কেমন ছিল সেই সময় যখন অন্যান্যরা তাঁর কাছে আসতো এবং তিনি এখানে সশরীরে উপস্থিত থেকে তাদের সালামের জবাব দিতেন এবং তাদের মিষ্ট হাসি উপহার দিতেন যে হাসি তাদের কাছে জীবনের চেয়েও বেশি দামী। যারা তাঁর পেছনে দাড়িয়ে নামাজ পড়েছে, যার উপর কোরআন নাযিল হয়েছে তার মুখ থেকেই কুরআন শুনেছে তারা কতইনা ভাগ্যবান!

১৪৩৫ বছর পরে বর্তমান সময়ে আমরা যারা তাকে দেখিনি এবং তার সুমধুর কণ্ঠস্বরও শুনতে পাইনি তারা তাঁকে অন্য যে কেউ বা যে কোন কিছুর তুলনায় অনেক বেশি ভালোবাসি। আমি যখন আল্লাহর কাছে তাঁর প্রতি রহমত বর্ষণের জন্য এবং আমাদেরকে ইসলামের দিকে পথ দেখানোর জন্য তাঁকে সর্বোচ্চ পুরস্কার দেয়ার দোয়া করছিলাম, আমার দু’চোখ ভেসে যাচ্ছিল। মদীনা হল রাসূলুল্লাহ (স)। আরবরা একে বলে মদীনাতুর-রাসূল বা রাসূলের শহর। এখানে যারা বসবাস করে তারা অনেক গর্বিত। অন্য অনেক জায়গার চেয়ে অনেক কম আয় করার পরও বহু লোক এই শহরকে বসবাসের জন্য বেছে নিয়েছে শুধুমাত্র এ কারণে যে তারা মদীনা ছেড়ে যেতে চান না। তিঁনি যে আলো জ্বালিয়েছিলেন, বহু বছর, প্রজন্ম, শতাব্দী ধরে তা আজও জ্বলছে, পৃথিবীতে আলো ছড়িয়েছে এবং যারা তাঁর আহবানকে গ্রহণ করতে রাজী হয়েছে তাদের কাছ পর্যন্ত পৌছে গেছে।

আমি রাসূলুল্লাহর (স) পাঁচটি অসাধারণ গুণের উল্লেখ করবো যা রাসূল (স) তার জীবনে পালন করেছেন এবং তার অনুসারীদের মধ্যে এত সফলভাবে বদ্ধমূল করে দিয়েছেন যে তা তাদেরকে এমন একটি দলে পরিনত করেছিল যা পৃথিবী আগে কখনো দেখেনি। সম্পূর্ণ বিসদৃশ কিছু উপজাতি যারা খুব তুচ্ছ কারণে নিজেদের মধ্যে মারাত্মক যুদ্ধ-বিগ্রহে জড়িয়ে পড়ার জন্য পরিচিত ছিল তাদেরকে একত্রিত করেছিলেন, এবং তারা পৃথিবীর যেখানেই গিয়েছেন সর্বোৎকৃষ্ট আচরণ এবং পথপ্রদর্শকের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

এ গুণগুলো হল:

leadership-qualities-from-the-life-of-rasoolullah

অসাধারণ হবার উপায়

কেন অসাধারণ হতে হবে? কারণ ‘যথেষ্ট ভালো’ হওয়া কখনোই যথেষ্ট নয়।

শুরুতেই ব্যাখ্যা করি আমি ‘এক্সট্রাঅর্ডিনারি’ বা অসাধারণ বলতে কি বুঝাচ্ছি, কারণ এর উপর ভিত্তি করেই বাকীটুকু বলবো। বিখ্যাত ফরাসী শিক্ষাবিদ আলফনসো ডি ল্যামারটিন (Alphonse de Lamartine) এর একটি উক্তি আছে,

‘যদি উদ্দেশ্যের শ্রেষ্ঠত্ব, উপকরণের ক্ষুদ্রতা এবং স্তম্ভিত করার মত ফলাফল মানবিক অসাধারনত্বের তিনটি শর্ত হয়, তাহলে ইতিহাসে মুহাম্মদের সাথে তুলনা করার মত আর কে আছে? দার্শনিক, ধর্মপ্রচারক, আইনপ্রণেতা, যোদ্ধা, চিন্তার বিজয়ী, যৌক্তিক বিশ্বাসের পুনস্থাপনকারী, বিশটি স্থলজ এবং একটি আধ্যাত্মিক রাজ্যের স্থপতি – তিনিই মুহাম্মদ। মানবিক শ্রেষ্ঠত্ব পরিমাপক যে কোন সূচকের বিবেচনায় যদি আমরা জিজ্ঞেস করি, তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠতর আর কে আছে? [Historie de le Turquie, Paris 1854, Vol:11, Pages 276-77]

অন্যরা যা চিন্তা করে তার চেয়ে বেশি কিছু করা জ্ঞানের পরিচয়ক, যুক্তিসঙ্গত বা যৌক্তিক। অসাধারণ হতে হলে যে কোন উপায়ে অস্বাভাবিক রকম সেরা হতে হবে। মনের গহীনে এমন ডাক শুনতে পারা যা অন্যরা বড়জোর চিন্তা করতে পারে, সেই তালে পথ চলা যা অন্যরা শুনতেও পারে না, তাসত্ত্বেও তাদের পা বাড়াতে উৎসাহ জোগায়। এ ধরনের লোক তারাই যারা এক্সট্রাঅর্ডিনারি, যারা খুবই ইন্সপায়ারিং। শুধু শ্বাস নেয়ার জন্য বেঁচে থাকা নয়। তাই কেউ যদি নেতৃত্ব দিতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই টিকে থাকার চেয়ে বেশি কিছু করতে হবে। এমন কিছু করতে হবে যা অন্য কেউ করেনি, লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে নয়, বরং সবাই যেন বুঝতে পারে তাদের পক্ষেও এমনটি করা সম্ভব। There is nothing sublime in pretending to be less than you are. নেতা হতে হলে ক্রমাগত নিজের ধ্যান-ধারনা এবং নিজের তৈরী সীমারেখা পেরিয়ে যেতে হয় কারণ শীর্ষে পৌছানোর ক্ষেত্রে বাধা একটিই, তা হলো তার নিজের মন।

নেতা হতে হলে মানুষের মন এবং আধ্যাত্মিক দুনিয়ার এমন গহীনে যাওয়ার সাহস অবশ্যই থাকতে হবে যেখানে কেউ অভিযান চালানোর সাহসই করে নি। সবসময় সঠিক বলে বিবেচনা করা হয়েছে এমন বিষয়কেও প্রশ্ন করতে হবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে ধরনাকে সত্য বলে গ্রহণ করা হয়েছে তাকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে। যত মূল্যই দিতে হোক না কেন তাকে অবশ্যই সত্যের পক্ষে দাড়াতে হবে। তাকে অবশ্যই নির্যাতিত, দুর্বল এবং বঞ্চিতদের পক্ষে এবং অত্যাচারীর বিপক্ষে দাড়াতে হবে তা সে যে কেউ হোক না কেন। এ সকল বিষয় একজন নেতাকে বিশ্বাস অর্জন করতে সাহায্য করে যা, বিশ্বাস হল নেতৃত্বের ভিত্তি। একজন নেতাকে কেবল ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বস্ত হতে হবে তা নয়, বরং জনগণের মধ্যে এই বিশ্বাস থাকতে হবে যে তাকে অনুসরণ করার মধ্যে কল্যাণ আছে। সংজ্ঞানুযায়ী, নেতৃত্ব সম্মুখে থেকেই দিতে হয়। তাই নেতৃত্ব প্রদান বিশাল সাহসের ব্যাপার। প্রত্যাশা সামান্য হলে মানুষ জেগে উঠে না,  তারা জাগে যখন প্রত্যাশা বেশি হয়। তাদের এমন নেতা প্রয়োজন যে এগিয়ে নিতে পারে, পিছিয়ে নিতে নয়।

নেতাকে একইসাথে অবশ্যই লক্ষ্য এবং কৌশল সম্পর্কে পরিষ্কার ধারনা রাখতে হবে। কেবল বড় বড় স্বপ্ন দেখা যথেষ্ট নয় যদি সেগুলো কিভাবে অর্জন করা হবে সে ব্যাপারে কোন ধারনা না থাকে। একজন নেতাকে স্বপ্ন দেখার মত যোগ্য হতে হবে এবং তার অনুসারীদেরকে এমন এক পথ ধরে নিয়ে যেতে হবে যেই পথ শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে পারবে। এক্সট্রাঅর্ডিনারী বা অসাধারণ হতে হলে একই সাথে স্বপ্ন দেখার মত ক্ষণস্থায়ী কাজ এবং সেই স্বপ্নকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মত দীর্ঘস্থায়ী কাজও করার মত যোগ্য হতে হবে। এজন্য বিভিন্ন ধরনের কাজের জন্য বিভিন্ন রকমের লোক প্রয়োজন হয় এবং এ ধরনের লোক খুঁজে বের করাও একটি কাজ, কারণ একজন নেতা একই সবকিছু করতে পারে না। কৌশল বাস্তবায়নের জন্য খুবই যোগ্য এবং অনুগত একদল লোক তৈরী করা না হলে সবচে উত্তম স্বপ্নটিও আকাঙ্খার রাজ্যে নির্বাসিত হতে বাধ্য। একদল অনুসারীকে জোগাড় করা, তাদেরকে নিজেদের সর্বোচ্চ ত্যাগে অনুপ্রাণিত করা, তাদেরকে প্রশিক্ষিত ও পরিচালনা করা এবং সবশেষে তাদের পাশে থেকে প্রশিক্ষণ অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের কাজগুলো ঠিকমত করছে কিনা তা নজরদারি করার মত কাজগুলো একজন অসাধারণ নেতার অবশ্য পালনীয় কাজ।

সবার শেষে একজন অসাধারণ নেতাকে অবশ্যই এমন একটি ব্যবস্থা তৈরী করে যেতে হবে যা তার দীর্ঘ অনুপস্থিতি সত্ত্বেও তার কাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। কোন অসাধারণ প্রতিভাকে যদি কোন প্রক্রিয়ার মধ্যে রূপান্তর করা না যায় তাহলে নেতার মৃত্যুর সাথে সাথে তারও মৃত্যু অবধারিত – নষ্টালজিয়া হিসেবে হয়তো পরে একসময় স্মরণ করা হবে কিন্তু নেতার পরবর্তী প্রজন্ম তার প্রতিভা থেকে কোনভাবে উপকৃত হবে না। কোন মহৎ সংগঠনকে সফল হতে হলে নেতাকে ব্যক্তি-পরিচালনাধীন থেকে কার্য-পরিচালনাধীনে রূপান্তর করতেই হবে। তা না হলে নেতার কাজ জেনারেশনকে পরিবতর্ন করার মত কিছু হবে না।

রাসূলুল্লাহ (স) এক্সট্রাঅর্ডিনারি লিডারশিপের মানদণ্ড এত প্রাণবন্ত ও স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেছেন যে তার সবচে খারাপ শত্রুও তার পক্ষে কথা বলে বাধ্য হবে। এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণক ঘটনা হল রাসূলুল্লাহ (স) এর চিঠি পাওয়ার পর বাইজেন্টাইন সম্রাজ্যের রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াসের সাতে আবু সুফিয়ানের কথোপকথনের ঘটনা। আমি পরবর্তীতে এই ঘটনা সবিস্তারে উল্লেখ করেছি।

অসাধারণ হওয়া নেতার ইচ্ছাধীন বিষয় নয়। এটা নেতা হতে চাওয়া যে কোন লোকের জন্য অত্যাবশ্যকীয় কাজ। এমন সব দিকে অসাধারণ হতে হবে যা লোকদের অনুপ্রেরনা দিবে, শক্তিমান করবে, তাদের মধ্যে শক্তি সঞ্চার করবে এবং তাদের ক্ষমতায়ন করবে। সাহসীরাই অন্যদেরকে সাহস দিতে পারে এবঙ মানবজাতির ইতিহাসে এমন কেউ নেই যে মুহাম্মদ (স) এর মত জীবনের সকল ক্ষেত্রে অসাধারণ নেতৃত্বের উদাহরণ দেখিয়েছে। এ কারণেই তার সাথীরা তার প্রতি আনুগত্যের এক উদাহরণীয় ভিন্ন মাত্রা প্রদর্শন করেছিল। তারা তাঁকে ভালোবেসেছিল এবং তিনিও তাদেরকে।

অসাধারণ বিশ্বাস কি?

রাসূলুল্লাহ (স) এর মধ্যে যে অসাধারণ গুণাবলীর সন্নিবেশ ঘটেছিল তার মধ্যে প্রথমটি হল ‘বিশ্বাস বা ফেইথ। বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বারবারা উইন্টার্সের ভাষায় বলি – ঝুঁকি নেয়ার জন্য যথেষ্ট ভরসা করার যোগ্যতা।

‌‍”When you come to the end of the light of all that you know and are about to step off into the darkness of the unknown, faith is knowing that one of two things will happen. There will be something firm to stand on or you will be taught how to fly.” ~ Barbara Winters

যখন তুমি আলোর শেষ প্রান্তে পৌছে যাবে এবং অজানা অন্ধকারের দিকে পা বাড়াবে তখন এমন শক্ত কিছু পাবে যেখানে পা রাখা যাবে অন্যথায় উড়তে শিখে যাবে – এই দুটি জিনিসের যে কোন একটি ঘটবে এমন ধারনা করাটাই বিশ্বাস। – বারবারা উইন্টার্স

শব্দগুলোর ব্যবহার খেয়াল করুন। তিনি কিন্তু বলেন নি, Faith is believing. তিনি বলেছেন, ‘Faith is knowing’ এবং এই দুইয়ের মধ্যে বিশাল ফারাক রয়েছে। to know বা জানা কোন প্রকার সন্দেহের অবকাশ ছাড়াই সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত বিশ্বাস জ্ঞান করা। এটাই যে কেউকে ঝুঁকি নিতে সাহায্য করে। শেষ প্রান্তে পৌছে পা বাড়ানোর সময় বিশ্বাস করা –  আপনি ধ্বংস হবেন না বরং তার পরিবর্তে জ্ঞান ও আল্লাহর সাথে যোগাযোগের এমন স্তরে পা রাখবেন যা কখনো ভাবতেও পারেন নি।

বিশ্বাস খুবই জরুরী কারণ এটা ছাড়া মানুষের হৃদয়কে পরিবর্তন করার মত কঠিনতম কাজ করা অসম্ভব। এটি একটি ক্ষুদ্র শব্দ কিন্তু এর অর্থ বিশাল। একেক মানুষের কাছে এর অর্থ একেক রকম। তাই আমি ‘ফেইথ’ বলতে কি বুঝাচ্ছি তা বরং ব্যাখ্যা করি।

Extraordinary Faith Chart by Mirza Yawar Baig

আমার মতে ফেইথ হল একটি ডায়নামিক প্রসেস যেখানে তিনটি বিষয়ের মিথষ্ক্রিয়া ঘটে। এগুলো হল: কঠিন সময়ে ধৈর্য্য ধারণ করা এবং আল্লাহর নেয়ামতের জন্য শুকর-গুজার হওয়া, আমাদের পাপ ও ভুলগুলোর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং প্রার্থনার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য কামনা করা কারণ আমরা তাকে ভালোবাসি।

বারবারা উইন্টার্স যেভাবে বলেছে ফেইথ হল এমনভাবে জানা যখন কে সঠিক তার কোন চিহ্ন থাকে না। ফেইথ বস্তুবাদী দুনিয়ার মত অন্ধভাবে বিশ্বাস করা নয়। বিশ্বাস হল বস্তুকে অতিক্রম করে এমন কিছু দেখতে পারা যা খালি চোখ দিয়ে দেখা যায় না বা বর্ণনা করা যায় না কিন্তু হৃদয়ের চোখ দিয়ে পুরোপুরি অনুভব করা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি ঘটনা দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি।

জার্মানদের সাথে তীব্র এক যুদ্ধের পর একজন সৈনিক তার অফিসারের কাছ থেকে নো ম্যান’স ল্যান্ড এলাকায় গিয়ে সহযোদ্ধার দেহ নিয়ে আসার অনুমতি চাইল। অফিসার তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। বললেন, দেখো সে মরে গেছে। এখন তোমার নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তার দেহ নিয়ে আসার কি দরকার? কিন্তু সৈনিক তার অবস্থানে অনড়, ফলে অফিসার এক পর্যায়ে তাকে অনুমতি দিলেন এবং কোম্পানীকে নির্দেশ দিলেন সৈন্যটি সহযোদ্ধার দেহ নিয়ে ফেরত আসা পর্যন্ত তাকে কাভার দিতে। কয়েক মিনিট পরে সৈন্যটি অক্ষত অবস্থায় ফিরে এল, তার কাঁধে সেই বন্ধুটি। অফিসারটি জিজ্ঞেস করলেন, নিজের জীবনের ঝুঁকি নেয়ায় কি লাভ হল? বাঁচাতে তো আর পারলে না?

সৈন্যটি বলল, স্যার, আমি যখন তার কাছে পৌছে দেখলাম সে তখনো বেঁচে আছে। আমাকে দেখে সে বলল, আমি জানতাম তুমি আসবে। সে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল এবং সে আমার কাঁধেই মারা গিয়েছে। লাভ এটুকুই।

বিশ্বাস অন্ধ নয়। এটি এমন কিছু দেখতে পায় যা বিশ্বাসহীনতা দেখতে পারে না। এটি ভালোবাসা, নিষ্ঠা, বিনাস্বার্থে করা সহযোগিতার লেন্স দিয়ে দেখতে পায়। ভালোবাসার মানুষের সাথে থাকার তীব্র আকাঙ্খাই বিশ্বাস। বিশ্বাস তীব্র প্রচেষ্টায় হতাশার অন্ধকার রাস্তাকে আলোকিত করে কারণ এটি জানে এই পথে সফলতা ও ব্যর্থতা মাইলের হিসাবে মাপা হয় না বরং যিনি অন্তরের খোঁজ রাখেন তাকে সন্তুষ্ট করার অভিপ্রায়ে উঠে দাড়ানো ও প্রচেষ্টা চালানোর ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। যখন সবাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তখনও যে সামনের দিকে এগিয়ে যায় তার মুখের হাসিই বিশ্বাস কারণ সে এমন কিছু শুনতে পেয়েছে যা অন্যরা পায় নি।

সে যখন হাঁটে, অন্যরা থেমে গিয়ে তাকে দেখে এবং বিস্মিত হয়, তারপর ধীরে ধীরে তারাও ঘুরে দাড়ায় এবং তার সাথে যোগ দিতে থাকে এবং এটি একটি কাফেলায় রূপ নেয়। তারা তাকে অনুসরণ করে কারণ এর মধ্যেই তারা জীবনের অর্থ এবং নিজেদের পরিপূর্ণতা খুঁজে পায়।

ইসলামের ভাষায় বিশ্বাস হল ‘তাওয়াক্কুল’। এ ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেছেন,

আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্যে নিস্কৃতির পথ করে দেবেন। এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিযিক দেবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে তার জন্যে তিনিই যথেষ্ট। (সূরা তালাক ৬৫: ২-৩)

তাওয়াক্কুল বা বিশ্বাস উপরে বর্ণিত তিনটি কাজের ফলাফল।

তওবা (ক্ষমা প্রার্থনা)

আল্লাহ তায়ালা আমাদের অপরাধের জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার আদেশ করেছেন। তওবা হল পথনির্দেশনা পাবার প্রথম শর্ত কারণ তওবা হল কোন কিছু পরিবর্তনের আগ্রহ নির্দেশ করে। কোন ব্যক্তি যদি কোন পরিবর্তনের ব্যাপারে সচেতন না হয় বা প্রয়োজন অনুভব না করে তাহলে কোন পরিবর্তন বা সংশোধন সম্ভব নয়। তাই আমরা যখন তওবা করি তার মানে হল আমরা আমাদের মনোভাব এবং পথের পরিবর্তনের ব্যাপারে সচেতন হয়েছি।

আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম (আ) এবং হাওয়া (আ) কে প্রথম যে শিক্ষা দিয়েছিলেন তা হল তওবা। আদম – হাওয়া (আ) এবং ইবলিশ উভয়েই আল্লাহকে অমান্য করেছিল। কিন্তু পার্থক্য তৈরী হল তাদের মনোভাবে যখন তারা তাদের ভুল সম্পর্কে সচেতন হল। আদম ও হাওয়া (আ) অতিসত্বর অনুতপ্ত হলেন এবং বললেন,

তারা উভয়ে বললঃ হে আমাদের পালনকর্তা আমরা নিজেদের প্রতি জুলম করেছি। যদি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করেন, তবে আমরা অবশ্যই অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যাব। (সূরা আ’রাফ ৭: ২৩)

আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাদেরকে ক্ষমা করে দেন এবং সঠিক পথের নির্দেশনা দেন এবং তাদেরকে অন্যদের পথ নির্দেশনার উৎস বানিয়ে দেন।

অন্যদিকে ইবলিশ অনুতপ্ত ছিল না বরং সে আল্লাহর কাছে সময় চেয়ে নিল, বললঃ

সে (ইবলিশ) বললঃ আমাকে কেয়ামত দিবস পর্যন্ত অবকাশ দিন। (সূরা আ’রাফ ৭: ১৪)

আজ আমাদেরকে যদি আমাদের খারাপ কাজ ছেড়ে দিতে বলা হয়, তবে আমরা সময় চেয়ে নেই। আমাদের ভেবে দেখা উচিত আমরা কার মনোভাবের পুনরাবৃত্তি করছি – হযরত আদম ও হাওয়া (আ) নাকি ইবলিশ (শয়তান) এর? অন্যায়ের উপর অটল থাকা (Israar ala al ma’asee) খারাপ পরিণতির কারণ (Soo al Khaatima)।

আরবীতে বলা হয়, ‘La kabeera ma’al Istighfaar wa la Shagheera ma’al Israar’ অর্থ্যাৎ তওবার চেয়ে বড় এবং গোয়ার্তুমির চেয়ে ছোট কোন গুনাহ নেই। পাপের উপর অটল থাকার ফলে হেদায়াতের রাস্তা বন্ধ হয়ে যায় এবং আমাদের উপর আল্লাহর ক্রোধ পতিত হয়। যারা নিজেদেরকে সংশোধনকে প্রত্যাখ্যান করে পাপের উপর অটল থাকে তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেনঃ

অতঃপর তারা যখন ঐ উপদেশ ভুলে গেল, যা তাদেরকে দেয়া হয়েছিল, তখন আমি তাদের সামনে সব কিছুর দ্বার উম্মুক্ত করে দিলাম। এমনকি, যখন তাদেরকে প্রদত্ত বিষয়াদির জন্যে তারা খুব গর্বিত হয়ে পড়ল, তখন আমি অকস্মাৎ তাদেরকে পাকড়াও করলাম। তখন তারা নিরাশ হয়ে গেল। (সূরা আল আনআম ৬: ৪৪)

আল্লাহ তায়ালা হলেন ঘায়ুর (গর্বিত, সম্মানিত) এবং আমাদের নিজেদেরকে সংশোধনের একাধিক সুযোগ দেয়ার পরেও যখন আমরা তার বিরোধিতাকে আঁকড়ে ধরে থাকি,  তখন তিনি হেদায়াতের দরজা বন্ধ করে দেন। পরিবর্তে তিনি তার জন্য বিরুদ্ধাচরনের সকল দরজা খুলে দেন যাতে সে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয় এবং তারপর যখন হঠাৎ একসময় মৃত্যু তার সামনে উপস্থিত হয় তখন তার কাছে তওবা করার কোন সুযোগ অবশিষ্ট থাকে না। আল্লাহ আমাদের এমন করুণ পরিণতি থেকে হেফাজত করুক।

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সকল প্রকার অবাধ্যতা ও পাপ থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন। কোন পাপকেই ছোট বা ক্ষুদ্র জ্ঞান করা উচিত নয় কারণ যে কোন পাপই আল্লাহর অবাধ্যতার নিদর্শন এবং এ ধরনের মনোভাব খুবই গুরুতর। তাই নির্দিষ্ট কোন কাজ নয় বরং আমাদের মনোভাব বা দৃষ্টিভঙ্গীর ব্যাপারে সচেতন হওয়া উচিত কারণ এটিই জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।

সকল পাপের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হল শিরক করা এবং কেউ যদি এর উপর মৃত্যুবরণ করে তাহলে আল্লাহ তার সকল পাপ ক্ষমা করলেও এই পাপ ক্ষমা করবেন না।

দ্বীনের যে সকল বিষয় আমাদের ভালো লাগে সেগুলো পালন করা এবং যেগুলো ভালো লাগে না তা ত্যাগ করার দৃষ্টিভঙ্গী সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আমাদেরকে বিশেষভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন। এটি অহংকারের চুড়ান্ত রূপ এবং আল্লাহর ক্রোধের কারণ। বর্তমান সময়ে এমন অনেক মুসলমান রয়েছে যারা ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে এমন সব কিছুকে বৈধ করে নিয়েছে এবং তারা প্রার্থনাও করে। যারা আল্লাহ যা অপছন্দ করেন তা ত্যাগ করে না তারা কিভাবে তার সামনে দাড়িয়ে বলে, ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন (আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং তোমার কাছেই সাহায্য চাই)। এ ধরনের ঔদ্ধত্য – নিজেদের ইচ্ছামত বেছে নেয়া – এই দুনিয়া এবং আখিরাত দুদিকেই শাস্তির দিকে নিয়ে যায়।

তাই আল্লাহর অবাধ্যতা এবং রাসূল (স) এর সুন্নাহের বিপরীত এমন সব কিছু আমাদের অবিলম্বে পরিত্যাগ করা উচিত এবং দ্রুত তওবা করা ও ইস্তেগফার করা খুবই জরুরী। কতদিন ধরে এই কাজ করা উচিত? যতদিন আমরা বেঁচে থাকার আশা করি ততদিন।

তওবা মানে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার দিকে ফিরে আসা এবং ইস্তেগফার হল আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে ফিরে আসার উপায়। এ দুটি সম্পর্কযুক্ত এবং একটি আরেকটিকে অনুসরণ করে। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম এ বিষয়ে খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, আমি সেটি এখানে উল্লেখ করছি।

তওবা ও ইস্তিগফারের অর্থ

স্কলাররা তওবা (ক্ষমাপ্রার্থনা) বলতে নিন্মলিখিত বিষয়গুলোকে বুঝিয়েছেন: ১) পাপকে পরিত্যাগ করা ২) পাপের দিকে পুনরায় ফিরে না আসার ব্যাপারে দৃঢ় ইচ্ছা ও প্রতিজ্ঞা ৩) কৃত পাপের জন্য অনুশোচনা করা, এবং, যদি পাপটি অন্য কোন মানুষের অধিকারের বিপরীত হয়, তাহলে ৪) তার ক্ষতিপূরণ করা। এগুলো তওবা বা ক্ষমাপ্রার্থনার শর্ত হিসেবে বিবেচিত। তবে, আল্লাহ ও তার রাসূল (স) বর্ণিত তওবার অর্থ আরও ব্যাপক, এবং উপরের উল্লিখিত বিষয়গুলো ছাড়াও ধৈর্য্যসহকারে আল্লাহর সকল নির্দেশ মেনে চলাও এর অন্তর্ভূক্ত। যারা তওবা করতে অনাগ্রহী তাদের অপছন্দ করা এবং তাদের সঙ্গ পরিত্যাগ করা, তাদেরকে তওবার জন্য উদ্বুদ্ধ করা এবং ক্ষমা চাওয়ার অভ্যাসকে উপেক্ষা না করার ব্যাপারে পরামর্শ দেয়াও তওবার অন্তর্ভূক্ত। তাও তওবা হল প্রতিদিন পাপ সংগঠনের বিপরীত এবং সাধারনভাবে শুধু পাপ ত্যাগ করা এবং এর জন্য অনুশোচনা করা নয়।

তওবার সারমর্ম হল আল্লাহর কাছে ফিরে আসা এবং তিনি যা পছন্দ করেন তা পালন করা এবং যা অপছন্দ করেন তা ত্যাগ করা। তওবা হল অপছন্দনীয় থেকে পছন্দনীয়ের দিকে, অবাধ্যতা থেকে বাধ্যতার দিকে, আল্লাহর ক্রোধ থেকে দয়ার দিকে প্রত্যাবর্তন (হিজরত) করা।

ইস্তিগফার এবং তওবা

ইস্তিগফার মানে ক্ষমা চাওয়া এবং তওবা মানে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন। যখন কেউ তার ভুল বুঝতে পারে তখন সে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় এবং তারপর আল্লাহর বাধ্যগত হয়ে যায় এবং তার কাজের মাধ্যমে সে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী যে কারোর জন্য দুটোই করণীয়। তাকে অবশ্যই আল্লাহর সামেন তার ভুল, পাপ এবং খারাপ কাজ স্বীকার করতে হবে এবং তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। একই সাথে তাকে অবশ্যই শর্তহীনভাবে খারাপ কাজগুলো ত্যাগ করতে হবে এবং ্আল্লাহর অনুগত হতে হবে। যেমন কেউ যদি নামাজ না পড়ে তাহলে সে সে সবচেয়ে খারাপ কাজগুলোর একটি করার দোষে দুষ্ট। যখন সে তার কৃতকর্মের গুরুত্ব সম্পর্কে উপলবদ্ধি করতে সক্ষম হবে, তখন সে তওবা করবে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে। তারপর সে নিয়মিতভাবে নামাজ পড়া শুরু করবে। অর্থ্যাৎ সে ক্ষমা চাইল (ইস্তিগফার) করল এবং নামাজ পড়া শুরু করলো (তওবা)। নিয়মিত নামাজ পড়াই হল তার তওবা যা ছাড়া তার ইস্তিগফারের কোন গুরুত্বই নেই।

কোরআনে ইস্তিগফার, যার অর্থ ক্ষমা প্রার্থনা, শব্দটি দুইভাবে বর্ণিত হয়েছে। হয় শুধু ইস্তিগফার অথবা তওবার সাথে মিলে। শুধুমাত্র ইস্তিগফারের ব্যবহার পাওয়া যাবে নিচের আয়াতে যেখানে হযরত সালেহ তার জাতির উদ্দেশ্যে বলেছে,

সালেহ বললেন, হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা কল্যাণের পূর্বে দ্রুত অকল্যাণ কামনা করছ কেন? তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছো না কেন? সম্ভবত: তোমরা দয়াপ্রাপ্ত হবে।(সূরা নামল ২৭:৪৬)

আল্লাহ আরও বলেন,

আর আল্লাহর কাছেই মাগফেরাত কামনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাকারী, করুনাময়। (সূরা বাকারা ২:১৯৯)

এবং তিনি বলেছেন ক্ষমাপ্রার্থনা কোন মানুষকে তার ক্রোধ থেকে রক্ষা করে:

অথচ আল্লাহ কখনই তাদের উপর আযাব নাযিল করবেন না যতক্ষণ আপনি তাদের মাঝে অবস্থান করবেন। তাছাড়া তারা যতক্ষণ ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে আল্লাহ কখনও তাদের উপর আযাব দেবেন না। (সূরা আনফাল ৮:৩৩)

তওবার সাথে মিলে ইস্তেগফারের ব্যবহার নিচের আয়াতগুলোতে পাওয়া যায়:

আর তোমরা নিজেদের পালনকর্তা সমীপে ক্ষমা প্রার্থনা কর। অনন্তর তাঁরই প্রতি মনোনিবেশ কর। তাহলে তিনি তোমাদেরকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উৎকৃষ্ট জীবনোপকরণ দান করবেন এবং অধিক আমলকারীকে বেশী করে দেবেন আর যদি তোমরা বিমুখ হতে থাক, তবে আমি তোমাদের উপর এক মহা দিবসের আযাবের আশঙ্কা করছি।(সূরা হুদ ১১:৩)

আর হে আমার কওম! তোমাদের পালন কর্তার কাছে তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর তাঁরই প্রতি মনোনিবেশ কর; তিনি আসমান থেকে তোমাদের উপর বৃষ্টি ধারা প্রেরণ করবেন এবং তোমাদের শক্তির উপর শক্তি বৃদ্ধি করবেন, তোমরা কিন্তু অপরাধীদের মত বিমুখ হয়ো না।(সূরা হুদ ১১:৫২)

আর সামুদ জাতি প্রতি তাদের ভাই সালেহ কে প্রেরণ করি; তিনি বললেন, হে আমার জাতি। আল্লাহর বন্দেগী কর, তিনি ছাড়া তোমাদের কোন উপাস্য নাই। তিনিই যমীন হতে তোমাদেরকে পয়দা করেছেন, তন্মধ্যে তোমাদেরকে বসতি দান করেছেন। অতএব; তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর অতঃপর তাঁরই দিকে ফিরে চল আমার পালনকর্তা নিকটেই আছেন, কবুল করে থাকেন; সন্দেহ নেই। (সূরা হুদ ১১:৬১)

কেউ যদি পাপ করতেই থাকে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় (এর শর্তসমূহ পূরণ না করেই), তবে এটি সত্যিকারের ইস্তিগফার নয় এবং এটা তাকে শাস্তি থেকে রক্ষা করবে না। ইস্তিগফারের মধ্যে তওবা অন্তর্ভূক্ত, এবং তওবার মধ্যে ইস্তিগফার: প্রত্যেকটি অন্যটির মধ্যে উহ্য আছে।

ইস্তিগফার শব্দের এই যে ব্যপকতা এর মধ্যে বর্ম বা আড়ালের জন্য ক্ষমা চাওয়ার এ অর্থও অন্তর্ভূক্ত – আমাদের মানবিক ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং ক্ষতিকর এবং ধ্বংসাত্মক ভুল থেকে আড়াল বা রক্ষা করা। মানুষের সবচে বড় এবং ক্ষতিকর ত্রুটি-বিচ্যুতি হল অজ্ঞতা এবং পাপ। এই অজ্ঞতা এবং পাপের কারণে মানুষ এমন পর্যায়ে নেমে যায় যা তাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। এই দুই ধরনের ত্রুটি থেকে রক্ষা করার বর্ম হল নিজের ভুল সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং নিজের মধ্যে স্রষ্টা প্রদত্ত জ্ঞান, সুবিচার এবং ধার্মিকতা স্পষ্ট করা। আল্লাহ মানুষের মধ্যে রূহ ফুঁকে দেয়ার মাধ্যমে যে মর্যাদা দান করেছেন মানুষ যত তা ভুলে যাবে ততই সে নিজেকে পশুর পর্যায়ে নামিয়ে আনবে এবং ততই তার অজ্ঞতা এবং পাপ বৃদ্ধি পাবে।

যখন তওবা এবং ইস্তিগফার শব্দ দুটো একত্রে ব্যবহৃত হয় (ইস্তিগফার এর পরে তওবা), তখন একটির (ইস্তিগফার) অর্থ হল যা ঘটে গেছে তার মন্দ ও ক্ষতি থেকে প্রতিরক্ষা চাওয়া এবং দ্বিতীয়টির (তওবা) অর্থ হল আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এবং ভবিষ্যতের মন্দ থেকে সুরক্ষা প্রার্থনা করা। এখানে দুটো বিষয় দেখা যাচ্ছে – একটি হল সেই পাপ যা  ইতোমধ্যেই সংগঠিত হয়েছে, ইস্তিগফার হল তার ক্ষতি থেকে সুরক্ষা প্রার্থনা এবং অন্যটি হল,  একই পাপের ভবিষ্যত পুনরাবৃত্তি যার ভয় আমরা করছি, তওবা হল তা আর না করার দৃঢ় সংকল্প। আল্লাহর দিকে সম্পূর্ণরূপে ফিরে যাওয়ার (রূজু) ক্ষেত্রে এ দুটোরই প্রয়োজন – ইস্তিগফার এবং তওবা। যখন একত্রে ব্যবহৃত হয়, তখন দুটোই আলাদাভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার গুরুত্ব প্রকাশ করে, অনথায়, যখন একাকী ব্যবহৃত হয়, তখন প্রত্যেকটি অন্যটিকেও বুঝিয়ে থাকে।

তওবার সবচে বড় উপকার হল এটি নিজেই আমাদেরকে আল্লাহর সাথে সংযুক্ত করে, নিজেই আমাদের জীবনের প্রতি আমাদের মনযোগ নির্দিষ্ট করে, কারণ তওবা করার সময় আমরা আমাদের জীবনে কৃতকর্মের হিসাব করে নেই। তওবা আমাদের মধ্যে নম্রতা প্রতিষ্ঠিত করে এবং সেই সত্যের প্রতি আমাদের মনযোগ আকর্ষন করে যে একদিন আমরা মৃত্যুবরণ করবো এবং আল্লাহর দিকে ফিরে যাবো।

তবে কোনভাবেই আল্লাহর দয়া থেকে হতাশ হওয়া যাবে না। তিনি বলেছেন,

বলো, (আল্লাহ বলেছেন) ‘হে আমার বান্দারা! তোমরা যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তারা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সকল গুনাহ মাফ করে দেবেন। তিনি অতীব ক্ষমাশীল, পরমদয়ালু।’ (সূরা জুমার ৩৯:৫৩)

আমাদের আক্বীদা হল যতক্ষন পর্যন্ত কেউ নিষ্ঠার সাথে ক্ষমা চায় আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সকল গুহান ক্ষমা করে দেবেন এবং তাই ্আমাদের কখনোই আল্লাহর দয়া থেকে নিরাশ হই না।যখন আমরা অনুশোচনা করতে অস্বীকার করি এবং বিরোধিতা ও মাত্রাতিরিক্ত এবং পাপ করতে শুরু করি তখন হিদায়াতের দরজা বন্ধ হয়ে যায় এবং এ ধরনের কাজ আমাদেরকে কুফরের দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ বলেছেন,

নিশ্চিতই যারা কাফের হয়েছে তাদেরকে আপনি ভয় প্রদর্শন করুন আর নাই করুন তাতে কিছুই আসে যায় না, তারা ঈমান আনবে না। আল্লাহ তাদের অন্তকরণ এবং তাদের কানসমূহ বন্ধ করে দিয়েছেন, আর তাদের চোখসমূহ পর্দায় ঢেকে দিয়েছেন। আর তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। (সূরা বাকারা ২:৬-৭)

তওবা কবুল হওয়ার তিনটি শর্ত রয়েছে।

১. যিনি তওবা করছেন তাকে প্রকৃতভাবেই অনুশোচনাকারী ও অনুতপ্ত হতে হবে এবং যে কাজের জন্য তওবা করছে তাকে ঘৃণা করতে হবে। আদম এবং হাওয়া (আ) এর ক্ষেত্রে তারা আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হন এবং তৎক্ষনাত আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। তারা তাদের কাজকে ন্যয়সঙ্গত প্রমাণ করার কোন চেষ্টা করেন নি। তারা দেরী করেন নি কিংবা সময় চান নি। তারা আল্লাহকে অমান্য করার গুরুত্ব অনুভব করেছিলেন কারণ তারা আল্লাহর মহিমা এবং শ্রেষ্ঠত্ব অনুভব করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই দৃষ্টিকোন থেকে কোন পাপই ‘ক্ষুদ্র’ নয় কারণ সকল পাপই আল্লাহর অবাধ্যতা আর তিনি ‘ক্ষুদ্র’ নন।

২. যিনি তওবা করছেন তাকে একই কাজের পুনরাবৃত্তি না হওয়া নিশ্চিত করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। আদম এবং হাওয়া (আ) কতবার আল্লাহকে অমান্য করেছিলেন? একবার। তারা তাদের দীর্ঘ জীবনে সেই একবারের পর আর কখনো পাপ করেন নি। পাপের পুনরাবৃত্তি না করা ক্ষমা চাওয়ার আন্তরিকতার চিহ্ন।

৩. যিনি তওবা করছেন তাকে পাপের কারণে কারও ক্ষতি হলে তা সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে, যেমন তাদের কাছে ক্ষমা চাওয়া, তাদের সম্পদ ফিরিয়ে দেয়া বা ক্ষতিপূরণ করা। কখনো কখনো পাপের প্রকৃতি এমন হয় যে তা অন্যের বস্তুগত বা অন্যভাবে ক্ষতি সাধণ করে। এ ক্ষেত্রে তাকে অবশ্যই সংশোধণ করতে হবে এবং উক্ত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণ করতে হবে ও তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। এ কাজটি ছাড়া আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না কারণ সে যার প্রতি অন্যায় করেছে সে আল্লাহ নয়, অন্য কেউ। যখন মানুষের অধিকার ভঙ্গ করা হয়, তখন যার অধিকার ভঙ্গ করা হয়েছে সে প্রথমে ক্ষমা না করলে আল্লাহ ভঙ্গকারীকে ক্ষমা করবেন না। এটা করা না হলে, শেষ বিচারের দিন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা অধিকার ভঙ্গকারীর ভালো কাজগুলোকে ক্ষতিগ্রস্থকে দিয়ে দিবেন এবং ক্ষতিগ্রস্থের খারাপ কাজগুলোকে অধিকার ভঙ্গকারীর উপর চাপিয়ে দিবেন এবং তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করবেন।

যারা তওবা করেন, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ সুহাবানাহু তায়ালার দয়ার দৃষ্টান্ত এরকম:

যারা আরশ বহন করে এবং যারা তার চারপাশে আছে, তারা তাদের পালনকর্তার সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করে, তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং মুমিনদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে, হে আমাদের পালনকর্তা, আপনার রহমত ও জ্ঞান সবকিছুতে পরিব্যাপ্ত। অতএব, যারা তওবা করে এবং আপনার পথে চলে, তাদেরকে ক্ষমা করুন এবং জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন। হে আমাদের পালনকর্তা, আর তাদেরকে দাখিল করুন চিরকাল বসবাসের জান্নাতে, যার ওয়াদা আপনি তাদেরকে দিয়েছেন এবং তাদের বাপ-দাদা, পতি-পত্নী ও সন্তানদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করে তাদেরকে। নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। এবং আপনি তাদেরকে অমঙ্গল থেকে রক্ষা করুন। আপনি যাকে সেদিন অমঙ্গল থেকে রক্ষা করবেন, তার প্রতি অনুগ্রহই করবেন। এটাই মহাসাফল্য। (সূরা আল মু’মিনুন ৪০:৭-৯)

যারা তওবাকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করবে মহান রাব্বুল আলামীন তাকে কেবল মাফ করে দেয়াই নয় বরং তার পাপকে পূণ্যে রূপান্তরিত করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

কিন্তু যারা তওবা করে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের গোনাহকে পুন্য দ্বারা পরিবর্তত করে এবং দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা আল ফুরক্বান ২৫:৭০)

রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে তওবা করা এবং প্রতিনিয়ত তার ক্ষমাপ্রার্থনার তৌফিক দিন। তিনি আমাদের ইস্তিগফার কবুল করুন এবং আমাদের এমন জীবন যাপনে সহায়তা করুন যেন তার সামনে অপমানিত অবস্থায় উপস্থিত হতে না হয় এবং তার দয়া যেন তার ক্রোধ থেকে সুরক্ষাকারী হয়। সকল আধ্যাত্মিক উন্নতি শুরু হয় আল্লাহর দিকে ফেরার মাধ্যমে এবং এ কারণে আমি প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করলাম।

সবর এবং শোকর (ধৈর্য্য এবং কৃতজ্ঞতা)

দ্বিতীয় পদক্ষেপ হল আল্লাহর দেয়া নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। মানুষ কেবল তখনই সন্তুষ্ট এবং অন্তরের শান্তি লাভ করে যখন যে আল্লাহর দেয়া নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ হয়। এ কৃতজ্ঞতা সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

যখন তোমাদের পালনকর্তা ঘোষণা করলেন যে, যদি কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর, তবে তোমাদেরকে আরও দেব এবং যদি অকৃতজ্ঞ হও তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি হবে কঠোর। (সূরা ইব্রাহিম ১৪:৭)

তওবা করার তাওফিক এবং সুযোগ দেয়ার জন্য আল্লাহ তায়ালার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। যদি আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তওবার পথ খোলা না রাখতেন তাহলে আমাদের কি হত? একজন মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতের জন্য যত বেশি শোকর গুজার হবে, তত বেশি সে এই নেয়ামত সম্পর্কে জানবে এবং আল্লাহকে ভালোবাসবে। কৃতজ্ঞতা আল্লাহর বিশালতা ও গরিমা সম্পর্কে এবং এই পৃথিবীর স্রষ্টা ও মালিক যে মানুষের প্রতি দয়াবান সেই সচেতনতা বৃদ্ধি করে। কৃতজ্ঞতার সবচে বড় পুরস্কার হল মানুষ যে কারণে কৃতজ্ঞ তা আরও উপভোগ্য হয় এবং অকৃতজ্ঞতার প্রথম শাস্তি হল তার আনন্দ কেড়ে নেয়া, ফলে মানুষ তার যা আছে তা নিয়ে সুখী হতে পারে না এবং স্ব-নির্যাতনের যন্ত্রনায় ভুগতে থাকে।

শোকর বা কৃতজ্ঞতা সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা স্পষ্টভাবে বলেছেন, আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো এটা তা অধিকার এবং তিনি এর পুরস্কার দিবেন তার নেয়ামতকে আরও বাড়িয়ে দিয়ে। পবিত্র কুরআনে বিসমিল্লাহ’র পর একদম প্রথম আয়াতটিই শোকরের আয়াত: আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন (সকল প্রশংসা এবং কৃতজ্ঞতা পৃথিবীর রব আল্লাহ’র প্রতি)। আল্লাহ কেবল কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ‌উপকারের কথাই বলেন নি, আল্লাহ এ কথাও বলেছেন যে এমনটি না করার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে বলেছেন এবং এজন্য তিনি ‘কুফর’ (অস্বীকার করা) শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এ ধরনের কাজের জন্য তিনি তাঁর শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছেন।

মজার ব্যাপার হল, আল্লাহ তায়ালা যারা সবর (ধৈর্য্য) করবে তাদেরকে সাহায্য করা এবং পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হবে শোকর। এ কারণে সবর এবং শোকর পারস্পরিক-সম্পর্কযুক্ত।

হে মুমিন গন! তোমরা ধৈর্য্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চিতই আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের সাথে রয়েছেন। (সূরা বাকারা ২:১৫৩)

আর আল্লাহ তা’আলার নির্দেশ মান্য কর এবং তাঁর রসূলের। তাছাড়া তোমরা পরস্পরে বিবাদে লিপ্ত হইও না। যদি তা কর, তবে তোমরা কাপুরুষ হয়ে পড়বে এবং তোমাদের প্রভাব চলে যাবে। আর তোমরা ধৈর্য্যধারণ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা রয়েছেন ধৈর্য্যশীলদের সাথে।(সূরা আনফাল ৮: ৪৬)

সবর (ধৈর্য্য) আর শোকর (কৃতজ্ঞতা) অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। ইসলামে সবর বা ধৈর্য্যের ধারনাটি অদ্বিতীয়। সাধারণভাবে ধৈর্য্য বলতে যা বোঝায়, অর্থ্যাৎ কঠিন সময়কে নিরবে সহ্য করা, সবর তা বোঝায় না। এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, ইসলামে ধৈর্য্য বা সবর মানে যা ঘটছে তাকে অদৃষ্ট ধরে নেয়া নয়। এর মানে হল নিজের সর্বশক্তি এবং সামর্থ্য দিয়ে আল্লাহর জন্য প্রচেষ্টা চালানো এবং ফলাফলের জন্য তার উপর নির্ভর করাকে বোঝায়। আল্লাহ তায়ালা অনেক জায়গায় ‘মুজাহিদুন’ বোঝানোর জন্য ‘সাবিরুন’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। একজন মুজাহিদ শুধু আল্লাহর সাহায্যের জন্য বসে থাকে না। সে তার কাছে যা আছে তাই নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় প্রচেষ্টা চালায় এবং আল্লাহর সাহায্যের জন্য দোয়া করতে থাকে। যে যুদ্ধ করছে সে কখনো বসে থেকে কষ্ট সহ্য করে না। সে সর্বদা সম্পূর্ণ জাগ্রত থাকে, বিভিন্ন কাজে জড়িত থাকে, চিন্তা ও পরিকল্পনা করে এবং যুদ্ধে জয়ের জন্য তার সর্বোচট্ট প্রচেষ্টা চালায়। সকল প্রচেষ্টার শেষে তে তার রবের দরবারে সাহায্যের জন্য প্রার্থনা করে কারণ সে জানে তার সাহায্য ছাড়া কোন কিছু অর্জন করা সম্ভব নয়।

সবর মানে কাজ করা; সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানো এবং তারপর আল্লাহর উপর নির্ভর করা। সবরের এই ধারনাটি রাসূলুল্লাহ (স) এর জীবনে বদরের যুদ্ধে দেখতে পাওয়া যায় যখন তিনি সামান্য উপকরন দিয়ে তাঁর পক্ষে যতটুকু সম্ভব সকল ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করার পর আল্লাহর দরবারে দাঁড়ান এবং তার বিখ্যাত দুয়াটি করেন। রাসুলুল্লাহ (স) আল্লাহর কাছে সাহায্যের জন্য নিরন্তর দোয়া করেন এবং বলেন, “হে আল্লাহ! আত্মাভিমানী এবং উদ্ধত কুরাইশরা  তোমার স্পর্ধা করে এবং তোমার রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এখানে উপস্থিত হয়েছে। হে আল্লাহ, আপনি যে বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আমি তার প্রতীক্ষায় রয়েছি। আমি আপনার কাছে মিনতি করছি, আল্লাহ আপনি তাদের পরাজিত করে দিন। হে আল্লাহ! আজ যদি মুসলমানদের এই দল পরাজিত হয়, তাহলে এই দুনিয়ায় তোমার ইবাদত করার জন্য আর কেউ অবশিষ্ট থাকবে না।”

তিনি কিবলার দিকে মুখ করে দুই হাত ছড়িয়ে তাঁর রবকে ডাকতে লাগলেন যতক্ষন না পর্যন্ত তার চাদর কাঁধ থেকে পড়ে গেল। তখন আবু বকর (রা) এসে চাদরটি তুলে রাসূলুল্লাহ (স) এর কাঁধে পড়িয়ে দিলেন এবং বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (স), আপনি আপনার রবের নিকট যথেষ্ট কান্নাকাটি করেছেন। তিনি অবশ্যই তার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবেন।”

অবিলম্বেই আল্লাহর সহায়তা পাওয়া গেল, তিনি বেহেশত থেকে ফেরেশতাদের পাঠালেন রাসূল (স) এবং তার সাথীদেরকে সহায়তা করার জন্য। আল্লাহ বলেন,

যখন নির্দেশ দান করেন ফেরেশতাদিগকে তোমাদের পরওয়ারদেগার যে, আমি সাথে রয়েছি তোমাদের, সুতরাং তোমরা মুসলমানদের চিত্তসমূহকে ধীরস্থির করে রাখ। আমি কাফেরদের মনে ভীতির সঞ্চার করে দেব। কাজেই গর্দানের উপর আঘাত হান এবং তাদেরকে কাট জোড়ায় জোড়ায়। (সূরা আনফাল ৮:১২)

তোমরা যখন ফরিয়াদ করতে আরম্ভ করেছিলে স্বীয় পরওয়ারদেগারের নিকট, তখন তিনি তোমাদের ফরিয়াদের মঞ্জুরী দান করলেন যে, আমি তোমাদিগকে সাহায্য করব ধারাবহিকভাবে আগত হাজার ফেরেশতার মাধ্যমে। (সূরা আনফাল ৮:০৯)

রাসূলুল্লাহ (স) হেলান দেয় অবস্থায় কিছুটা তন্দ্রাবস্থায় ছিলেন,  তারপর তিনি মাথা তুললেন, তার চোখে আনন্দের অশ্রু: হে আবুবকর, তোমাকে অভিনন্দন। আল্লাহর বিজয় সন্নিকটে। বালুঝড়ের গভীরে আমি ঘোড়ায় বসা জিবরাইলকে (আ) দেখতে পাচ্ছি। তারপর তিনি তেলাওয়াত করলেন,

এ দল তো সত্ত্বরই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে। (সূরা কামার ৫৪:৪৫)

জীবরাইল (আ) এর নির্দেশনা অনুযায়ী রাসূল (স) এক মুঠো নুড়ি-বালি তুলে নিলেন, শত্রুদের দিকে ছুড়ে মারলেন এবং বললেন, ‘বিভ্রান্তি তাদেরকে পাকড়াও করুক’। যেইমাত্র তিনি ধূলি নিক্ষেপ করলেন, এক ভয়ানক বালিঝড় বিস্ফোরিত অগ্নিকণার ন্যায় শত্রুদের চোখে পড়তে লাগল।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,

আর তুমি মাটির মুষ্ঠি নিক্ষেপ করনি, যখন তা নিক্ষেপ করেছিলে, বরং তা নিক্ষেপ করেছিলেন আল্লাহ স্বয়ং। (সূরা আনফাল: ৮: ১৭)

হাদীসের বর্ণনা থেকে সুস্পষ্টভাবে জানা যায় যে সেদিন প্রকৃতপক্ষেই ফেরেশতারা নাজিল হয়েছিলেন এবং মুসলমানদের পক্ষে লড়াই করেছিলেন। ইবনে আব্বাস বলেন: সেদিন যখন একজন মুসলমান একজন কাফেরকে তাড়া করছিল, তখন সে তার উপর চাবুকের আওয়াজ শুনতে পেল যার এবং একজন ঘোড়সওয়ার আরোহী বলছিল: মারো হাইজুম। তিনি দেখলেন শত্রুসৈন্য মস্তকচ্ছিন্ন হয়ে লুটিয়ে পড়ল। একজন আনসার রাসূলুল্লাহ (স) এর কাছে এলেন এবং ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। রাসূল (স) বললেন, ‘তুমি সত্য বলেছো। এটা ছিল তৃতীয় জান্নাতের পক্ষ থেকে সহায়তা।’ বদরে রাসূলুল্লাহ (স) বিপদআপদের মুখোমুখি হলে সালাত এবং সবরের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়ার কুরআনিক নির্দেশনার সংক্ষিপ্তসার প্রদর্শন করেছিলেন। তিনি সকল প্রকার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন এবং তারপর তার রবকে ডেকেছিলেন।

আল্লাহর ভালোবাসা

যখন কেউ তওবা ও ইস্তেগফার করে এবং প্রতিনিয়ত আল্লাহকে তাঁর অনুগ্রহের শোকর করে, এটা স্বাভাবিক যে সে আল্লাহকে ভালোবাসতে শুরু করবে। তবে, আল্লাহর ভালোবাসার সাথে অন্যান্য ভালোবাসাকে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা হল ইবাদত এবং এটা তার নিজস্ব উপায়ে হয়। এটা আমরা যেরকম চাই সেরকমভাবে প্রকাশ বা স্বীকার করার মত কিছু নয়। যে সকল মানুষ আল্লাহকে ভালোবাসে তারা সর্বদা তাঁর অনুগত এবং তার প্রদত্ত নেয়ামত তার অবাধ্যতায় কখনো ব্যবহার করে না। আল্লাহ আমাদের যা দিয়েছেন – আমাদের জীবন, সময়, সামর্থ্য, সম্পদ, শিক্ষা, ক্ষমতা এবং প্রভাব-প্রতিপত্তি – তার অবাধ্যতায় ব্যবহার করা অকৃতজ্ঞতার সর্বোচ্চ বহি:প্রকাশ। একারণেই আল্লাহর নৈকট্যের উপায় হল কাসরাতুস সুজুদ – বেশি বেশি সিজদা করা। সিজদা হল মুসলমানদের আইকনিক সিম্বল যার মাধ্যমে সে কোন প্রকার সংকোচ এবং শর্ত ছাড়াই সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে। ঠিক এ কারণেই আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করা হারাম, মুসলমানের জন্য তার স্রষ্টা ব্যতীত অন্য কারও নিকট নিজেকে উপস্থাপন করা এবং অসহায় সমর্পণ করার অনুমতি নেই। এর বিপরীত করার অর্থ মানবতার অপমান এবং কেবলমাত্র আল্লাহ-ই যে এরূপ আনুগত্যের যোগ্য সেই সত্যকে অস্বীকার করা। সকল ইবাদত কেবল আল্লাহরই জন্য, তিনি ছাড়া অন্য কেউ বা কিছুই ইবাদতের যোগ্য নয়।

প্রশ্ন হল, কিভাবে আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়া সম্ভব? এর জবাব আল্লাহ তায়ালা নিজেই দিয়েছেন, যখন তিনি তাঁর রাসূলকে বলেন:

বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহ ও তোমাদিগকে ভালবাসেন এবং তোমাদিগকে তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু। (সূরা আল ইমরান ৩: ৩১)

স্রষ্টার প্রতি আমাদের ভালোবাসা প্রকাশের উপায় হল তার প্রতি অনুগত হওয়া এবং তার রাসূলের সুন্নাহ অনুসরণ করা। আমরা যখন তা করবো, আল্লাহ আমাদের ভালোবাসবেন। আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের এটাই চাবিকাঠি।

আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়া এবং তার সাথে সংযোগ স্থাপনের উপায় হল তার প্রতি অনুগত হওয়া এবং তার রাসূলের সুন্নাহ অনুসরণ করা। এ ব্যাপারে আমাদের মনে কোন প্রকার সন্দেহ থাকা উচিত নয়। যদি কেউ মনে করে যে সে আল্লাহর অবাধ্য হয়ে কিংবা তার রাসূলের সুন্নাহ উপেক্ষা করে বা সুন্নাতের বিপক্ষে গিয়েও তা’ল্লুক মা’ল্লাহ (আল্লাহর সাথে সংযোগ) বজায় রাখতে সক্ষম হবেন তাহলে সে নিজেকে বোকা বানালো। আল্লাহ বলেন সবকিছুকে অতিক্রম করে তাকে ভালোবাসাই ঈমানের পরিচায়ক। একজন ঈমানদার ব্যক্তি যে কোন ব্যক্তি ও যে কোন কিছুর চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভালোবাসেন এবং তার প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্যের মাধ্যমেই তা প্রকাশিত হয়। তিনি বলেন:

আর কোন লোক এমনও রয়েছে যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালবাসা হয়ে থাকে। কিন্তু যারা আল্লাহর প্রতি ঈমানদার তাদের ভালবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশী। আর কতইনা উত্তম হ’ত যদি এ জালেমরা পার্থিব কোন কোন আযাব প্রত্যক্ষ করেই উপলব্ধি করে নিত যে, যাবতীয় ক্ষমতা শুধুমাত্র আল্লাহরই জন্য এবং আল্লাহর আযাবই সবচেয়ে কঠিনতর। (সূরা বাকারা ২: ১৬৫)

আল্লাহর কোন নির্দেশ শুনলে ঈমানদারদের অবস্থা কি হয় আল্লাহ সে সম্পর্কে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন :

তারা বলে, আমরা শুনেছি এবং কবুল করেছি। আমরা তোমার ক্ষমা চাই, হে আমাদের পালনকর্তা। তোমারই দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। (সূরা বাকারা ২: ২৮৫)

এবং আল্লাহ তাদের সম্পর্কেও জানিয়ে দিয়েছেন যারা তাদের ইচ্ছা-আকাঙখাকে তাঁর নির্দেশের তুলনায় অগ্রাধিকার দেয় এবং বলে :

আপনি কি তাকে দেখেন না, যে তারা প্রবৃত্তিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে? তবুও কি আপনি তার যিম্মাদার হবেন? আপনি কি মনে করেন যে, তাদের অধিকাংশ শোনে অথবা বোঝে ? তারা তো চতুস্পদ জন্তুর মত; বরং আরও পথভ্রান্ত। (সূরা ফুরকান ২৫: ৪৪)

দুইদলের মধ্যবর্তী রেখা স্পষ্ট। আমরা কোন দিকে যেতে চাই সেটা আমাদেরকেই বেছে নিতে হবে।

আল্লাহ তার বান্দাদের মধ্যে কাদের নিকটবর্তী বলে দিয়েছেন :

নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন, যারা পরহেযগার এবং যারা সৎকর্ম করে। (সূরা নাহল ১৬: ১২৮)

যারা আল্লাহকে ভালোবাসে এবং তার সাথে সংযোগ স্থাপন করতে চায় তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন :

সেদিন প্রত্যেকেই যা কিছু সে ভাল কাজ করেছে; চোখের সামনে দেখতে পাবে এবং যা কিছু মন্দ কাজ করেছে তাও, ওরা তখন কামনা করবে, যদি তার এবং এসব কর্মের মধ্যে ব্যবধান দুরের হতো! আল্লাহ তাঁর নিজের সম্পর্কে তোমাদের সাবধান করছেন। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু। (সূরা আল ইমরান ৩: ৩১)

আল্লাহ এমন একটি সম্পর্কযুক্ত দুনিয়া সৃষ্টি করেছেন যেখানে আমাদের সকল কর্মকাণ্ডের দুই ধরণের পরিণতি রয়েছে : দুনিয়াতে উপকার অথবা ক্ষতি এবং আখিরাতে পুরস্কার অথবা শাস্তি। প্রত্যেকটি কাজই দুই ধরণের ফলাফল তৈরি করে। একটি এই দুনিয়ায় এবং অন্যটি আখিরাতে পাওয়া যাবে।

মনে রাখা উচিত আল্লাহ যখন তার বান্দাকে ভালোবাসেন, তার ভালোবাসা এই পৃথিবী এবং তাঁর সকল সৃষ্টির মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। অন্যদিকে, যখন আল্লাহ তার কোন বান্দাকে অপছন্দ করেন, তার ঘৃণা এই দুনিয়া এবং এর সকল সৃষ্টির মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। মানুষ আমাদের ভালোবাসবে, সম্মান ও শ্রদ্ধা করবে নাকি ঘৃণা, অপমান ও অসম্মান করবে তা নির্ধারিত হয় আল্লাহ আমাদের পছন্দ করেন না অপছন্দ তার উপর।

যারা মানুষকে নেতৃত্ব দিতে এবং প্রভাবান্বিত করতে আগ্রহী, তাদের অবশ্যই উপলব্ধি করা উচিত যে আল্লাহর সাথে সংযোগ স্থাপন করা এবং তার প্রতি অনুগত হওয়া ব্যতীত তারা আশা করা ঠিক নয় যে মানুষ তাদের ভালোবাসবে।

হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন: “যদি আল্লাহ সুবহানাহুতা’য়ালা তার কোন বান্দাকে পছন্দ করেন, তিনি জীবরাইল (আ) কে ডেকে বলেন, আমি অমুককে ভালোবাসি, তাই তুমিও তাকে ভালোবাসো।

If Allah loves a slave [of His], He calls Jibreel (AS) and says: ‘I love So-and-so, therefore love him.'” He (Rasoolullah) said: “So Jibreel loves him. Then he (Jibreel) calls out in heavens, saying: ‘Allah loves So-and-so, therefore love him.’ And the inhabitants of heaven love him.” He (Rasoolullah ) said: “Then acceptance is established for him on earth. And if Allah hates a slave [of His], He calls Jibreel (AS) and says: ‘I abhor So-and-so, therefore abhor him.’ So Jibreel abhors him. Then Jibreel calls out to the inhabitants of heaven: ‘Allah abhors So-and-so, therefore abhor him.'” He (Rasoolullah ) said: “So they abhor him, and hatred is established for him on earth.” [Muslim, Bukhari, Malik, and at-Tirmidhi]

হাদীসে কুদসী: আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন,

Allah said: Whosoever shows enmity to someone devoted to Me, I shall be at war with him. My slave draws not near to Me with anything more loved by Me than the religious duties I have enjoined upon him, and My slave continues to draw near to Me with supererogatory (Nawaafil) works so that I shall love him. When I love him I am his hearing with which he hears, his seeing with which he sees, his hand with which he strikes and his foot with which he walks. Were he to ask [something] of Me, I would surely give it to him, and were he to ask Me for refuge, I would surely grant him it. I do not hesitate about anything as much as I hesitate about [seizing] the soul of My faithful slave: he hates death and I hate hurting him. [Bukhari]

এই তিনটি পদক্ষেপ হল আমাদের অন্তরে তাওয়াককুল প্রতিষ্ঠা এবং আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার উপায়।

রাসূলের সিরাতে তাওয়াককুলের সবচেয়ে বড় উদাহরণ তার নবীত্বের শুরুর দিকে যখন রাসূলুল্লাহ (স) সাফা পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ডাকলেন, ‘ওয়া সুবাহা!’

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন:

যখন ‘(হে নবী!) আপনি আপনার নিকটাত্মীয়দিগকে সাবধান করুন’ আয়াতটি নাযিল হয়, তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফা পাহাড়ে উঠলেন এবং হে বনী ফিহর! হে বনী আ’দী! বলিয়া কুরাইশদের বিভিন্ন গোত্রকে ডাক দিলেন, ইহাতে তাহারা সকলে সমবেত হল। অতঃপর তিনি বললেনঃ বল তো, আমি যদি এখন তোমাদিগকে বলি যে, এই পাহাড়ের উপত্যকায় একটি অশ্বারোহী সৈন্যবাহিনী তোমাদের উপর আতর্কিতে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত রহিয়াছে, তবে কি তোমরা আমাকে বিশ্বাস করবে? সমবেত সকলে বললঃ হাঁ, কারণ আমরা আপনাকে সর্বদা সত্যবাদীই পেয়েছি। তখন তিনি বললেনঃ আমি তোমাদিগকে সম্মুখে একটি কঠিন আযাব সম্পর্কে সাবধান করিতেছি।’ এই কথা শুনিয়া আবু লাহাব বললঃ সারাটা জীবন তোমার বিনাশ হউক। তুমি কি এইজন্যই আমাদিগকে একত্রিত করেছ? তখন تبت يدا ابى لهب وتب নাযিল হইল অর্থঃ আবু লাহাবের উভয় হাত ধ্বংস হউক এবং তাহার বিনাশ হউক। – (বুখারী, মুসলিম)

খেয়াল করুন, রাসূলুল্লাহ (স) বিভিন্ন উপায়ে তার বহুত্ববাদী সমাজের কাছে ইসলামকে উপস্থাপন করতে পারতেন। তিনি গোত্রের শ্রেষ্ঠত্ব এবং মহত্ব দাবী করতে পারতেন। তিনি অভিজাত গোত্রদের মধ্যে অভিজাত গোত্র – কুরাইশ গোত্রের অন্তর্গত বনু হাশিম গোত্র – এর সদস্য ছিলেন। তাই তিনি নিজেকে প্রথমে একজন গোত্রপ্রধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন এবং তারপর ইসলামের দাওয়াত দিতে পারতেন।

বিকল্পভাবে, তিনি সমাজ সংস্কারকের পথ অবলম্বন করতে পারতেন। তৎকালীন মক্কাকে সামাজিক অবক্ষয়ের আধিক্য, নিপীড়ন এবং পাপের স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। মুহাম্মদ (স) প্রথমে এসবের বিরুদ্ধে বলতে পারতেন, নিজের পক্ষে অনেক লোক জমায়েত করার পর তারপর তার সামাজিক সংস্কার আন্দোলনের মতবাদ হিসেবে ইসলামের পরিচয় দিতে পারতেন।

সবশেষে তিনি ইসলামকে একটি বিকল্প ধর্ম, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন থিওরি, সত্যে পৌছানোর নতুন উপায়, রোমে যাওয়ার আরেকটি পথ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারতেন। জান্নাতে পৌছানোর একমাত্র পথ, মুক্তির একমাত্র উপায়, একমাত্র সত্য ধর্ম যা ছাড়া আর কোন কিছুই শেষ বিচারের দিনে আল্লাহ’র কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না – এমনভাবে উপস্থাপন না করলেও পারতেন। তিনি ইসলামকে বর্তমান সময়ের আরও অনেক নবযুগের তত্ত্বের ন্যয় একটি তত্ত্ব, যা একটি বহুত্ববাদী সমাজ সহজেই গ্রহণ করে, হিসেবে উপস্থাপন করতে পারতেন।

তিনি এ ধরনের কিছুই করেন নি। তার কাছে যতরকম বিকল্প উপায় ছিল তার কোনটিই তিনি ব্যবহার করেন নি বরং সব কিছু থেকে সুস্পষ্ট অবস্থানে থেকে তিনি আহবান জানিয়েছেন, ‘মূর্তিপূজা ত্যাগ করো এবং কোন শরীক না করে কেবলমাত্র তাঁরই ইবাদত করো অথবা যখন আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে তখনকার শাস্তির জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও।’

এভাবে আহবানের ফলে তিনি একদিকে মক্কার সবাইকে তার শত্রুভাবাপন্ন করে তুললেন কারণ আদর্শের দিক থেকে তিনি তাদের ধর্মকে আঘাত করেছেন এবং এর অলীক রূপকে তুলে ধরেছেন। Its mythology stood out for what it was; a myth। এবং তিনি আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার ধারনা উপস্থাপন করেছেন যার কাছে কোন কিছুই গোপনীয় নয়। যারা নিজেদের ক্ষমতা এবং সম্পদের জোরে তাদের ইচ্ছানুযায়ী যা খুশি করতে অভ্যস্ত ছিল তাদের জন্য এটা খুব সুখকর ধারনা ছিল না। সকল যুগেই ধনী এবং ক্ষমতাশালীরা কোন একদিন তাদেরকে জবাবদিহিতার জন্য ডাকা হবে এবং কৃতকর্মের জন্য মূল্য দিতে হবে এমন ধারনাকে ভালোভাবে নেয়নি। এ বিষয়গুলো মক্কার সাধারণ লোকদের কাছে, বিশেষত কুরাইশদের কাছে এতটাই অবাস্তব এবং বেমানান ছিল যে তারা তাৎক্ষনিক বিদ্রোহ করে বসল। কুরাইশরা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিল কারণ তারা ছিল যাজক শ্রেণির, কা’বা ঘরের জিম্মাদার যেখানে তারা তাদের ৩৫০টি মূর্তি স্থাপন করেছিল; এদের উপাসনা, বিশেষ করে হজ্বের সময়, তাদের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল

মুহাম্মদ (স) এর বাণী কেবলমাত্র তাদের বিশ্বাসকেই বিপন্ন করেনি বরং তাদের চোখে তারচেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাদের অর্থনীতির জন্যও হুমকীস্বরূপ ছিল, তারা এটা সহ্য করতে পারেনি। ফলে তারা তাদের সর্বশক্তি দিয়ে বিরোধিতা করতে লাগল। রাসূলুল্লাহ (স) কেন ইসলাম প্রচারের জন্য ঠিক এ পদ্ধতি অনুসরণ করেছিল বোঝার একমাত্র উপায় হল কুরআন অধ্যয়ন এবং দেখা যে আল্লাহ’র অন্যান্য আম্বিয়াগণ কি করেছিলেন। তারা সকলেই একই কাজ করেছিলেন। তারা তাদের বার্তা কোনপ্রকার ঘুরপথে না গিয়ে বা প্রচ্ছন্নতার আশ্রয় না নিয়ে সুস্পষ্টভাবে এবং সরাসরি বর্ণনা করেছিলেন।

তাঁরা মানুষের কাছ থেকে কোন অর্থনৈতিক, সামাজিক বা রাজনৈতিক পুরস্কার চাননি । তারা তাদের কার্যক্রম পরিচালিত করেছিলেন কেবলমাত্র আল্লাহকে ভয় করে এবং কেবলমাত্র তার কাছ থেকেই পুরষ্কারের আশায়। কোনরকম পার্থিব পুরষ্কারের আশা ব্যতিরেকে ইসলামের প্রচার এবং শিক্ষাদানে তাদের স্পষ্টতা ছিল সকল যুগের আম্বিয়াগণের সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য। যুগ যুগ ধরে আম্বিয়াগণ মানবজাতির পথপ্রদর্শনে যা করে এসেছেন, মুহাম্মদ (স) কেবল তার পুনরাবৃত্তি করেছেন। বর্তমান সময় পর্যন্ত আম্বিয়াগণের উত্তরাধিকারীগণ – জ্ঞানী ব্যক্তিরা যারা আল্লাহর বাণীকে মানবজাতির কাছে পৌছে দিয়েছেন – একই পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন। তারা স্পষ্টভাবে এবং সরাসরি বলেছেন এবং তারা মানুষের কাছ থেকে কোন পুরষ্কারের আশা বা বিনিময়ে এ কাজ করে গেছেন। যে কেউ এই প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনবে সে নিজেকে আম্বিয়াগণের মহিমান্বিত নিরবচ্ছিন্ন ঐতিহ্য এবং এর সাথে যুক্ত আল্লাহর সাহায্য থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্নি করবে।

আমি যখনই রাসূলুল্লাহ (স) এর শক্তিশালী, গভীর, ধৈর্য্যশীল এবং অবিচল ঈমানের কথা চিন্তা করি, রাসূল (স) এর ইসলাম প্রচার শুরুর এই ঘটনাটি আমার ভাবনায় চলে আসে কারণ এটি সফলতার জন্য আল্লাহর উপর তাঁর পূর্ণ নির্ভরতার চিত্র অঙ্কিত করে যেখানে তিনি অন্য কোন কিছুকে, এমনকি তাঁর নিজস্ব ফয়সালাকেও, হস্তক্ষেপ করার সুযোগ না দিয়ে তাঁর প্রতি যে আদেশ করা হয়েছে তা অনুসরণ করেছেন।

আল্লাহ সুবহানাহুতা’য়ালা তাকে মানুষকে সতর্ক করার জন্য নির্দেশ করেছেন এবং তিনি তাই করেছেন। এমন না যে নিজস্ব বিবেচনাবোধ ব্যবহার করার খারাপ বা বেঠিক, কিন্তু যার উপর ওহী নাযিল হয় তার জন্য বিনাপ্রশ্নে অনুসরণ করা ব্যতীত আর কোন উপায় নেই। একই যুক্তি বর্তমানে যারা সেই বাণীকে বহন করে চলেছেন অর্থ্যাৎ মুসলমানগণ, যারা সেই ঐশীবাণী, এর সত্যতা, যার উদ্দেশ্য সমগ্র মানবজাতি, এর ঐশ্বরিক উৎপত্তি এবং শেষ দিন পর্যন্ত এর অপরির্তনীয় ব্যবহারযোগ্যতার উপর বিশ্বাস করে, তাদের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। আমরা বাণীর মধ্যে কোন পরিবর্তন সাধন না করে আমাদের যা করতে বলা হয়েছে তা বিনাপ্রশ্নে পালন করি। এটি আমাদের নিজেদের সততাকেই প্রমাণ করে।

এই বৈশিষ্ট্যই পূর্বে যারা ওহীপ্রাপ্ত হয়েছিলেন তাদের থেকে মুসলমানদেরকে পার্থক্য করে, কারণ তারা তাদের ঐশীবাণীতে, এর ব্যাখ্যায় এমন পরিবর্তন করেছিলেন যে তার ঐশ্বরিক গুণাবলী নষ্ট হয়ে গিয়েছিল এবং খোদার কথা মানুষের কথায় পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল। গত শত সহস্র বছরে মুসলমানদের কখনোই এই অপবাদের মুখোমুখি হতে হয়নি।

মক্কার তের বছরের নবীত্বের সময়কাল পুরোটাই ছিল ক্রমাগত নৈরাশ্য আর ব্যর্থতার সময়। কেউ যদি সম্ভাব্য সফলতার কোন দৃশ্যমান চিহ্ন খুঁজে, তাহলে কিছুই পাবে না। তা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (স) কিভাবে তার মিশন চালিয়ে গেলেন। তার প্রত্যয় এবং উদ্যম অফুরন্ত, রাতে দাঁড়াতেন রবের সাথে সম্পর্ক সৃষ্টির জন্য, আর দিনে কেউ যদি তার কথা শোনার জন্য থামতো, তবে তার কাছেই দাওয়াত পৌছাতেন – তা সে গ্রহণ করুক বা না করুক। তারা যেরকম প্রতিক্রিয়াই দেখাক বা যেরকম আচরনই করুক, তিনি কখনোই ধৈর্য্য হারাতেন না, রাগতেন না, তাদের বাজে আচরনের প্রতিক্রিয়া দেখাতেন না কিন্তু তিনি কখনোই তার মিশন থেকে সরে আসেন নি কিংবা প্রচারে সামান্য দুর্বলতার আশ্রয়ও নেন নি। তার এবং তার মিশনের জন্য কোন সাপ্তাহিক ছুটি বা বিরতি ছিল না – তিনি অবিরামভাবে দিনে ও রাতে কাজ করে গেলেন। সম্পূর্ণ এবং সর্বাত্মক ঈমান ছাড়া আর কি এমন প্রচেষ্টার কারণ হতে পারে? আল্লাহর রাসূল ছাড়া আর কার এই উচ্চতার শ্রেষ্ঠত্ব থাকতে পারে? আমাদের জীবনে শেখার মত অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অন্যতম হল এই হতাশা এবং আপাতঃব্যর্থতার মুখে টিকে থাকার যোগ্যতা অর্জন করা। যে সবচে দ্রুতগতির সে নয়, দৌড়ে সেই জিতে যে সবচে বেশি ধৈর্যশীল। আমরা সহসাই হাল ছেড়ে দেই, দ্রুতই নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ি এবং দৃশ্যমান ফলাফলের প্রতি অতিরিক্ত ফোকাস দেই। আমরা ভুলে যাই, ইসলাম হৃদয়ে প্রবেশ করে এবং এই প্রবেশের বেশিরভাগ অংশই অদৃশ্য। ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা) এর জীবনী থেকে আমরা জানতে পারি ইসলাম কিভাবে অন্তরে প্রবেশ করে কিন্তু প্রকাশ্যে আসতে কিছু সময় লেগে যায়।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কখন ওমর (রা) এর অন্তরে ইসলাম প্রবেশ করিয়ে দেন তার একটি ঘটনা রয়েছে। ঘটনাটি ওমর (রা) নিজেই বর্ণনা করেছেন। তিনি মদ্যপান করতেন এবং তার মদ্যপানের সঙ্গী-সাথী ছিল। এক গভীর রাতে, ওমর (রা) এর মদ্যপানের ইচ্ছা হল কিন্তু তিনি এজন্য কোন সঙ্গী পেলেন না। যেহেতু তার কিছু করার ছিল না, তিনি ঠিক করলেন কা’বা তাওয়াফ করবেন। গভীর রাত। তিনি যখন কা’বায় উপস্থিত হলেন, দেখলেন রাসূলুল্লাহ (স) কা’বার সামনে প্রার্থনায় দন্ডায়মান। ওমর (রা) কা’বার পেছন দিকে চলে গেলেন এবং এর কিসওয়া’র (পর্দা) আড়ালে লুকিয়ে পড়লেন। তারপর গোপনে একদম রাসূলুল্লাহ (স) এর সামনে এসে উপস্থিত হলেন। তিনি সালাতে দন্ডায়মান অবস্থায় আল হাক্বাহ তেলাওয়াতরত রাসূলুল্লাহ (স)-কে অ্যাম্বুশ করতে চেয়েছিলেন।

ওমর (রা) নিজেকে বললেন, এটা নিশ্চয়ই কোন কবির বয়ান। রাসূলুল্লাহ (স) তেলাওয়াত করলেন:

এটা কোন কবির কালাম নয়; তোমরা কমই বিশ্বাস কর! ً(আল হাক্কাহ ৬৯:৪১)

ওমর (রা) খুব অবাক হলেন, ভাবলনে, এটা অবশ্যই কোন ‘কাহিন’ (ভবিষ্যতবক্তা) এর বয়ান।

রাসূলুল্লাহ (স) আরও তিলাওয়াত করলেন:

এবং এটা কোন অতীন্দ্রিয়বাদীর কথা নয়; তোমরা কমই অনুধাবন কর। (আল হাক্কাহ ৬৯:৪২)

ওমর (রা) বিস্মিত হলেন এবং স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন। এই ঘটনারও কয়েক বছর পরে তিনি সত্যি ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ইসলাম গ্রহণের বিখ্যাত ঘটনাটি আমরা সবাই-ই জানি। যারা জানেন না, তাদের জন্য আমি আরেকবার ঘটনাটি বর্ণনা করতে চাই। কারণ হৃদয়কে ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য কুরআনের আয়াতের যে ক্ষমতা তা এখানেও প্রকাশ পায়। আমি বহুবার বলেছি, কুরআন কথ্য ভাষা হিসেবে নাযিল হয়েছে এবং এর সর্বোচ্চ শক্তি প্রকাশ পায় যখন এটি শোনা হয়। এর ছন্দ, বলার ঢং, নির্দেশনার মহিমা এবং যোগাযোগের স্পষ্টতার মধ্যে এমন কিছু আছে যা প্রকৃত সত্যসন্ধানীর হৃদয় ছুঁয়ে যায়। আমি এজন্যও ঘটনাটি উল্লেখ করতে চাই কারণ এটি রাসূল (স) এর সিরাতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা যার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (স) এর ঈমান কিভাবে এর চরম শত্রুকেও প্রভাবান্বিত করেছিল তার পরিচয় পাওয়া যায়।

একদিন, রাসূলুল্লাহ (স) কে নিয়ে কি করা যায় এমন আলোচনা চলছিল কুরাইশ এবং তার বন্ধুদের মাঝে। তারা জানতে চাইল, ‘কে মুহাম্মদ (স)-কে হত্যা করতে আগ্রহী?’ ওমর (রা) এগিয়ে এল, ‘আমি করবো’। তিনি তার তলোয়ার নিয়ে দারুল আকরামের দিকে রওয়ানা হলেন। পথিমধ্যে সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা) এর সাথে তার সাক্ষাত হল। সে জানতে চাইল, ‘কোথায় যাচ্ছো?’ ওমর (রা) বলল, যে লোকটা আমাদের বিভক্ত করেছে এবং আমাদের দেবতাদের অভিশাপ দিয়েছে তাকে খুন করতে যাচ্ছি।‘

সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা) তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কি মনে করো বনু আবদ মানাফ গোত্রের লোককে হত্যা করলে তারা তোমাকে এই পৃথিবীর বুকে হাঁটতে দিবে?’ এই নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়ে গেল এবং ওমর (রা) তাকে বললেন, ‘আমার ধারনা তুমি মুসলমান হয়ে গেছ। যদি তাই হয় তাহলে মুহাম্মদ (স) কে হত্যার আগে আমি তোমাকে খুন করবো।‘

সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা) তাকে বললেন, ‘মুহাম্মদ (স)-কে হত্যা করার আগে নিজের ঘর সামলাও না কেন?’ ‘কি বলতে চাও?’, ওমর (রা) জানতে চাইলেন। সাহাবী বললেন, ‘তোমার বোন এবং তার স্বামী মুসলমান হয়ে গিয়েছে।‘ তার বোন ফাতিমা বিনতে আল খাত্তাব (রা) এবং তার স্বামী সাঈদ বিন যায়েদ (রা) ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। সাঈদ বিন যায়েদ (রা) ছিলেন ওমরের চাচাতো ভাই এবং সেই সৌভাগ্যবান দশজনের একজন যাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। তাদেরকে খাব্বাব বিন আল আরাত (রা) কোরআন শিক্ষা দিচ্ছিলেন এবং ওমর (রা) যখন তাদের বাসায় উপস্থিত হলেন তখন তিনি শুনতে পেলেন তারা কোরআন তেলাওয়াত করছে।

তিনি দরজায় কড়াঘাত করলেন। যখন তারা দেখল, দরজায় ওমর (রা) দাঁড়িয়ে, খাব্বাব (রা) লুকিয়ে পড়লেন। ‘কিসের শব্দ পেলাম?’, জানতে চাইলেন ওমর (রা)। ফাতেমা (রা) বললেন, ‘কিছু না। আমরা কথা বলছিলাম।‘ ওমর (রা) ক্রুদ্ধ হলেন এবং বললেন, ‘মিথ্যা কথা বলো না। তোমরা কি মুসলমান হয়ে গিয়েছো?’ সাঈদ (রা) বললেন, ‘যদি ইসলাম তোমার ধর্ম থেকে ভালো হয় তাহলে?’ ওমর (রা) তাকে আক্রমন করলেন, মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে তার উপর বসে পড়লেন। ফাতেমা (রা) স্বামীকে রক্ষার জন্য এগিয়ে এলেন কিন্তু ওমর (রা) তার মুখে আঘাত করলেন এবং তার মুখ রক্তাক্ত হয়ে গেল। যদিও তিনি ওমরের বোন, তিনি ভয় পেলেন না। তিনি দাঁড়িয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহর শত্রু। আমি আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি বলে আমাকে মেরেছো? তাহলে শুনে নাও, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া আর কেউ উপাসনার যোগ্য নয় এবং মোহাম্মদ (স) তার রাসূল। এখন তুমি যা খুশি করতে পারো।‘

তাঁর দৃঢ়তায় ওমর (রা) হতভম্ব হয়ে গেলেন এবং তার রক্তাক্ত মুখ দেখে তিনি তার কর্মের জন্য খুব লজ্জিত হলেন। তিনি সাঈদ (রা)-কে ছেড়ে দিয়ে বসলেন, বললেন, ‘তোমাদের কাগজগুলো দাও।’ ফাতিমা (রা) দিতে অস্বীকার করলে ওমর (রা) বললেন, ‘তোমার কথা আমাকে প্রভাবিত করেছে, কথা দিচ্ছি তোমার কাগজগুলো নিরাপদে ফেরত দিবো।‘ ফাতেমা (রা) বললেন, ‘তুমি মুশরিক এবং অপবিত্র। আগে গোসল করে আসো।’ ওমর (রা) গোসল করে আসলে তিনি কাগজগুলো দিলেন। ওমর (রা) কাগজে লিখা আয়াত তেলাওয়াত শুরু করলেন।

১। তোয়া-হা। ২। আপনাকে ক্লেশ দেবার জন্য আমি আপনার প্রতি কোরআন অবতীর্ণ করিনি। ৩। কিন্তু তাদেরই উপদেশের জন্য যারা ভয় করে। ৪। এটা তাঁর কাছ থেকে অবতীর্ণ, যিনি ভূমন্ডল ও সমুচ্চ নভোমন্ডল সৃষ্টি করেছেন। ৫। তিনি পরম দয়াময়, আরশে সমাসীন হয়েছেন। ৬। নভোমন্ডলে, ভুমন্ডলে, এতদুভয়ের মধ্যবর্তী স্থানে এবং সিক্ত ভূগর্ভে যা আছে, তা তাঁরই। ৭। যদি তুমি উচ্চকন্ঠেও কথা বল, তিনি তো গুপ্ত ও তদপেক্ষাও গুপ্ত বিষয়বস্তু জানেন। ৮। আল্লাহ তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য ইলাহ নেই। সব সৌন্দর্যমন্ডিত নাম তাঁরই। (সূরা ত্বোয়া-হা ২০:১-৮)

ওমর (রা) আয়াতগুলো পড়লেন এবং বললেন, ‘কুরাইশরা কি এর বিরোধী? সত্যিই এসব যিনি বলেছেন তিনি উপাসনার যোগ্য। মুহাম্মদ (স) কোথায় আছে আমাকে বলো।’ যখন ওমর (রা) আয়াতগুলো তেলাওয়াত করলেন এবং রাসূলুল্লাহ (স) এর সাথে সাক্ষাৎ করতে চাইলেন, খাব্বাব বিন আল আরাত (রা) বেরিয়ে এলেন এবং বললেন, ‘হে ওমর, রাসূলুল্লাহ (স) এর দোয়া আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কবুল করেছেন।’ রাসূলুল্লাহ (স) দোয়া করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, আমর ববিন হিশাম অথবা ওমর বিন আল খাত্তাব, এই দুজনের যে কোন একজনকে, যাকে তুমি সবচেয়ে পছন্দ কর, দিয়ে ইসলামকে সম্মানিত (শক্তিশালী) করো।’

তারা ওমর (রা) কে রাসূলুল্লাহ (স) এর অবস্থান বললেন এবং তিনি সরাসরি সেখানে হাজির হয়ে দরজায় করাঘাত করলেন। সাহাবীরা তাকে দেখে ভয় পেয়ে গেলেন এবং সবাই বসে রইলেন। হামজা (রা) তাদের দেখে বললেন, ‘কি ব্যাপার?’ তারা বলল, ‘দরজায় ওমর।’ ‘তো কি হয়েছে? যদি সে ভালো উদ্দেশ্যে আসে তো ভালো, কিন্তু যদি খারাপ উদ্দেশ্যে আসে তাহলে আমি তার তলোয়ার দিয়েই তাকে হত্যা করবো। দরজা খুলে দাও।’ ওমর (রা) ঘরে ঢুকলে হামজা (রা) এবং অন্যরা তাকে ধরে ফেলল এবং রাসূলুল্লাহ (স) এর কাছে নিয়ে গেল।

‘ওকে ছেড়ে দাও’, রাসূল (স) বললেন। তারা ছেড়ে দিল। রাসূল (স) ওমর এর ঘাড়ে ধরে বললেন, ‘হে ইবন আল খাত্তাব, তুমি কেন এসেছো এখানে? তুমি কি আল্লাহ তোমাকে ধ্বংস না করা পর্যন্ত ইসলামের সাথে লড়াই করবে?’ ওমর (রা) বললেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি সাক্ষ্য দিতে এসেছি যে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ উপাসনার যোগ্য নয় এবং আপনি তার রাসূল।’ রাসূলুল্লাহ (স) তাকবীর দিলেন, তার সাথে উপস্থিত সকলের তাকবীরে জায়গাটি মুখরিত হয়ে গেল। তারা এত উচ্চে তাকবীর দিয়েছিলেন যে, তার পরপরই সবার নজর এড়াতে তারা দ্রুত আলাদা হয়ে পড়েলেন।

এক্সট্রাঅর্ডিনারী লক্ষ্য

সীরাতে রাসূলুল্লাহ (স) এর এক্সট্রাওর্ডিনারি লক্ষ্য, তাঁর বার্তায় অবিচল আস্থা সম্পর্কিত সবচেয়ে সুন্দর যে ঘটনাটি আমি মনে করতে পারি; মানবজাতির কল্যাণে এর সত্যতা, গুরুত্ব এবং ক্রিটিক্যালিটি বর্ণনা করছি। ঘটনাটা ইসলামের প্রথম যুগে মক্কায় ঘটেছিল যখন তার পক্ষে কোনরকম সহযোগিতা ছিল না এবং বলা যায় তিনি সেসময় একাই ইসলামের বাণী প্রচার করছিলেন।

বর্ণনাকারী বলেন: হজ্ব সম্পন্ন করার পর আমি মিনার একটি পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। সমতল অংশ হজ্ব করতে আসা তীর্থযাত্রীদের তাঁবুতে ঢেকে গিয়েছিল। সেটা ছিল গ্রীষ্মের মধ্য দুপুর, তীব্র গরম এবং শুষ্ক। আমি দেখলাম, এই গরমের মধ্যে একজন ব্যক্তি তাঁবু থেকে তাঁবুতে গিয়ে মানুষকে কেবল আল্লাহর উপাসনা করতে আহবান জানাচ্ছে এবং মূর্তিপূজার ব্যাপারে সতর্ক করছে। কেউ তার কথা শুনে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে। কেউ ধমক দিচ্ছে। বাকীরা তো তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে। তার বাণীকে কেউ গ্রহণ করতে করেছে দেখিনি। সেই তীব্র গরমের মধ্যে আমি লোকটাকে দেখলাম তার নিজের তাঁবুর সামনে একটি পাথরের উপর বিশ্রামের জন্য বসলেন। তাঁবু থেকে তার মেয়ে পানি হাতে বের হয়ে এসে তার বাবার মুখ ধুইয়ে দিল এবং পানি খেতে দিল। বাবার দুরাবস্থা দেখে সে খুব কষ্ট পেল, ‘ওরা আপনার এ কি অবস্থা করেছে, আব্বা?

মানুষটি উত্তর দিল, ‘দু:খ পেও না, প্রিয় কন্যা। এমন একদিন আসবে যখন এই বার্তা পৃথিবীর বুকে সকল স্থায়ী অস্থায়ী ঘরে পৌছে যাবে।’ রাসূলুল্লাহ (স) এর মিশন যে ডিভাইন তার কোন প্রমাণ না থাকলেও এই একটি ঘটনাই প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট। আল্লাহর রাসূল ছাড়া আর কার এইরকম মিশন চালিয়ে নেয়ার সাহস, সহিষ্ণুতা এবং ধৈর্য্য থাকবে যেখানে এর সফলতার বিন্দুমাত্র কোন চিহ্ন নেই? আর কে তার মিশনের সাফল্য সম্পর্কে এতটাই নিশ্চিত এবং বিশ্বাসী যে একের পর এক ব্যর্থতা আর হতাশার পরও এগিয়ে নেয়ার শক্তি পায়? একজন নবী ছাড়া আর কে একের পর এক প্রত্যাখ্যান গ্রহণ করতে পারে কিন্তু তাসত্ত্বেও যারা তার কথা শুনতে মোটেও আগ্রহী নয় তাদের কাছে তার বার্তা নিয়ে যেতে বিন্দুমাত্র পিছপা হয় না?

রাসূল (স) এর বক্তব্যে যে লক্ষ্য প্রকাশ পেয়েছে তার প্রকৃতি বিস্ময়কর মনে হতে পারে। রাসূলুল্লাহ (স) বলেছিলেন, ‘দু:খ পেও না, প্রিয় কন্যা। এমন একদিন আসবে যখন এই বার্তা পৃথিবীর বুকে সকল স্থায়ী অস্থায়ী ঘরে পৌছে যাবে।’ এখানে যে মানুষটি বলছেন যে তার বার্তা একদিন পৃথিবীর সকল স্থায়ী -অস্থায়ী ঘরে পৌঁছে যাবে তিনি তখন পর্যন্ত নিজে ব্যক্তিগতভাবে বার্তা পৌছাতে পারেন এমন ঘরেও পৌঁছায় নি। এমন একজন মানুষ পৃথিবীর মানুষের মুক্তির কথা বলছে যে কিনা নিজের মুক্তির নিশ্চয়তাও দিতে পারে না। যেই অপরিচিত মানুষগুলো এতটা তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে তাদের চিরন্তন কল্যাণের জন্যই কিনা ভাবছে মানুষটি।

অন্যদিকে, এক্সট্রাঅর্ডিন্যারি লক্ষ্যের বৈশিষ্ট্যই হল এক্সট্রাঅর্ডিনারি প্রচেষ্টা চালানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করা। ক্ষুদ্র আশায় মানুষ জেগে উঠে না, বৃহৎ আকাঙ্ক্ষা মানুষকে জাগিয়ে তোলে। মাউন্ট এভারেস্টের বেজ ক্যাম্পে দাঁড়িয়ে থাকা কোন অভিযাত্রীর মোটিভেশনাল লেকচারের দরকার হয় না। পাহাড় তাকে অনুপ্রাণিত করে। পাহাড়ের সর্বশেষ শৈলশিরাটি অতিক্রম করার পর চূড়ায় দাঁড়িয়ে তার যে আনন্দ হবে তার ভাবনাই তাকে বেস ক্যাম্পে দাঁড়ানো অবস্থায় অনুপ্রাণিত করে এবং তার প্রতি ঘন্টার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করতে থাকে। পাহাড়ে চূড়ার প্রতিকূলতাই তাদের প্রেরণা। নিজেকে জিজ্ঞেস করে দেখুন অ৯অ, আপনার বাসা থেকে এগারো কিলোমিটার হেঁটে যেতে আগ্রহ পান কিনা? পাহাড়ে চড়া নি:সন্দেহে পৃথিবীর বুকে হাঁটা কিন্তু এর দুর্গমতা এর গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। একটি লক্ষ্য অর্জনের সাথে যুক্ত তৃপ্তির পরিমাণ এর প্রতিকূলতার সমানুপাতিক।

বৈপ্লবিক পরিবর্তন কোন সাধারণ পরিবর্তন নয় বরং অনেক বেশি ধাতুগত এবং সহজাত; বিশ্বাসের পরিবর্তন সম্পর্কে কথা বলার মত কঠিন আর কি হতে পারে। এর চ্যালেঞ্জটা বোঝা খুবই জরুরী কারণ সকল কর্মই হল বিশ্বাসের ফলাফল। মানুষ তার নিজ নিজ বিশ্বাস অনুযায়ী কাজ করে, সচেতনভাবে হোক বা অবচেতনভাবে। যেমন, মানুষ তার ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী আচরণ করতে পারে, সচেতনভাবে এবং কিছু রীতিনীতি পালনের মাধ্যমে; আবার তারা তাদের নিজেদের বিশ্বাস অনুযায়ী নির্দিষ্ট কোন কাজকে লাভজনক মনে করে তাতে বিনিয়োগ করতে পারে। আবার মানুষ ঘুম থেকে উঠে কাজে যোগ দেয় কারণ অবচেতনভাবে সে বিশ্বাস করে সে ওইদিন এবং পরের দিনগুলোতে বেঁচে থাকবে এবং পৃথিবীও ধ্বংস হবে না। সুতরাং বিশ্বাস আমাদের সকল চিন্তা এবং কর্মের ভিত্তি গড়ে দেয়। এই বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করে বলা যে এটা সম্পূর্ণ ভুল এবং এর জন্য চিরন্তন শাস্তি পেতে হবে বলাটা সহজ কাজ নয়। তা সত্ত্বেও রাসূল (স) তার বার্তার সত্যে এত গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন যে কোন কিছুই তাকে অন্যের কাছে বার্তা নিয়ে যেতে বিরত করতে পারেনি। বর্ণিত আছে যে তিনি একদা তার চরম শত্রুদের অন্যতম আবু জেহলের বাড়িতে একশতাধিক বার গিয়েছেন এই আশায় যে সে ইসলামের দাওয়াত কবুল করবে। নবী ছাড়া আর কে এমন একজনকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করবে যে কিনা তার ক্ষতি করার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়েছে?

এক্সট্রাঅর্ডিনারি লক্ষ্য অর্জনের কর্মকাণ্ডের আরেকটি ব্যাপার হল এখানে কর্মই প্রশিক্ষণ। আরব প্রবাদ বলে, ‘যদি কোমড় না ভাঙে, তবে এটা তোমাকে শক্তিশালী করে তুলবে।’ এক্সট্রাঅর্ডিনারি লক্ষ্যের জন্য কাজ করাও তেমনি, এটা কেবল শক্তি বৃদ্ধি করে। রাসূলুল্লাহ (স) এবং প্রথম যুগের মুসলমানদের ক্ষেত্রেও এমনটিই ঘটেছে। সকল প্রকার বিরোধিতা, নির্যাতন এবং শাস্তি তাদেরকে এবং আল্লাহর সাথে তাদের সম্পর্কে কেবল শক্তিশালীই করেছে এবং তাদেরকে আরও স্থিতিশীল (রেজিলেন্ট) করেছে। এক্সট্রাঅর্ডিনারি লক্ষ্য জোর প্রচেষ্টা চালানোকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। If it is worth doing, then it is worth the effort. সমগ্র মানবজাতিকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করা এবং জান্নাতে নেয়ার চেষ্টার চেয়ে মূল্যবান প্রচেষ্টা আর আত্মত্যাগ আর কি হতে পারে? আমরা যাকে ত্যাগ বলছি, রাসূল (স) এবং তার সাহাবীরা তাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বিনিয়োগ হিসেবে দেখেছিল এবং এ কারণে তাদের পক্ষে কোন দ্বিধা ছাড়াই এটা করা সম্ভবপর হয়েছিল।

এক্সট্রাঅর্ডিনারি সংকল্প

মানুষ যখন কোন বিষয়ে দৃঢ় সংকল্প গ্রহন করে একমাত্র তখনই সে তা থেকে ফল লাভ করতে পারে। রাসূলুল্লাহ (স) এর জন্য এটা কখনোই সামান্য সন্দেহের বিষয়ও ছিল না। তাঁর বড় সফলতা হল এমন একটা প্রজন্ম তৈরি করা যারা তাঁর সংকল্পের অংশীদার হয়েছে এবং এর জন্য নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়ে এর সর্বোচ্চ প্রমাণ রেখেছে। ইসলামের বার্তার প্রতি তাঁর সংকল্প নিয়ে কারও মনে যেন বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ না থাকে সেজন্য তিনি ব্যক্তিগত দৃষ্টান্ত স্থাপনের মাধ্যমে সফল হয়েছিলেন; তিনি নিজে পালন করেছেন এবং সকলের কাছে প্রচার করেছেন। কেবলমাত্র রাসূল (স) নয়, সাহাবীরাও, যারা তাঁর কাছ থেকে ভালোভাবে শিখেছিলেন, তাদের জীবনে এর দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন। তাদের এই সংকল্পের প্রমাণ সীরাতের অনেক ঘটনায় পাওয়া যায়।

বদর যুদ্ধের সময় সাহাবীরা সামান্য সরঞ্জামাদি নিয়ে বদরের কূপের দিকে চলছিল। তাঁরা পূর্ণাঙ্গ কোন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল না বরং আস শামস থেকে ফেরা আবু সুফিয়ানের কাফেলা দখল নেয়ার উদ্দেশ্যে গিয়েছিল। এই কাফেলার পণ্যদ্রব্য কেনা হয়েছিল মক্কার মুজাহিরদের বাজেয়াপ্ত সম্পত্তির বিনিময়ে। তাদের দলে মাত্র দুইটি ঘোড়া এবং সত্তরটি উট ছিল। একটি উটে তিনজন সওয়ারী পালাক্রমে সওয়ার হত। রাসূল (স) এর সহযোগী ছিল আলী ইবনে তালিব (রা) এবং উলুবাবা (রা)। তারা তাঁকে উটটি দিতে চাইলে তিনি বললেন, ‘তোমরা আমার চেয়ে শক্তিশালী নও এবং আমিও তোমাদের মত বেশি পুরষ্কার আশা করি।’ তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং সবসময় সাথীদের কাছ থেকে যেরকম সংকল্প আশা করেন, তার চেয়ে বেশি না হলেও সমান সংকল্প প্রদর্শন করেছেন।

খন্দকের যুদ্ধের সময় যুদ্ধ পরিকল্পনার জন্য রাসূল (স) একটি শূরা গঠন করেন। পারস্য থেকে আগত সালমান আল ফারিসি (রা) বললেন, ‘আমাদের ওখানে কোন সৈন্যবাহিনীর আক্রমণের আশঙ্কা করলে আমরা পরিখা খনন করি। আমরা কেন এখানে একটি পরিখা খনন করছি না?’ আল্লাহর রাসূল (স) একমত হলেন এবং মদীনার উত্তর দিক অপেক্ষাকৃত দুর্বল হওয়ায় সেখানে খন্দক খননের সিদ্ধান্ত নিলেন। পূর্ব এবং পশ্চিমে আল হাররা (একটি আগ্নেয়গিরি উপত্যকা) দ্বারা সুরক্ষিত ছিল এবং দক্ষিণে ছিল দুর্ভেদ্য খেজুর বাগান। প্রতি দশজনকে চল্লিশ ফুট পরিখা খনন করতে দেয়া হল। মুসলমানগণ ছিলেন দরিদ্র‍্য, ক্ষুধার্ত এবং দুর্বল। আনাস ইবনে মালিক বলেন যে এক শীতের রাত্রে রাসূল (স) তাদের নিকট গেলেন এবং তাদের দুরাবস্থা দেখে দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ, নিশ্চয়ই এসব আখিরাতের জন্য। হে আল্লাহ, মুজাহির এবং আনসারদেরকে ক্ষমা করুন।’ এটা সাহাবীদের অজানা ছিল না যে ( It was not lost on the Sahaba that) যখন তারা তীব্র ঠান্ডায় খোলা আকাশের নিচে ঘুমাচ্ছিল, তাদের নেতা তখন তাঁবুর উষ্ণতায় ঘুমাচ্ছিলেন না বরং তিনি তাদের মাঝে হেঁটে হেঁটে তাদের খোঁজ নিচ্ছিলেন এবং তাদের জন্য দোয়া করছিলেন। মানুষ অন্য মানুষের প্রতি বিশ্বস্ত হয়, কোন পদবী বা র‍্যাংকের নিকট নয়।

আল বারা’আ বলেন, খন্দকের এক দিনে আমি রাসূল (স) কে মাটি বহন করতে দেখলাম। তার শরীরে এত মাটি লেগেছিল যে তাঁর চামড়া দেখা যাচ্ছিল না।’ রাসূল (স) এর সংকল্পের এটা একটা উদাহরণ। এমন কোন কাজ ছিল না যাকে তিনি তাঁর জন্য অমর্যাদাকর গণ্য করেছেন। এমন কিছু ছিল না যা তিনি নিজে করেন নি কিন্তু অন্যকে করার আদেশ করেছেন। নেতৃত্ব সবসময় সামনে থেকেই দিতে হয়। মানুষ নেতাকে অনুসরণ করে কারণ নেতা তাদের সামনে পথ চলে। মাঝে মাঝে আমরা এটা ভুলে যাই।

এই সময় রাসূল (স) নিজে এত বেশি ক্ষুধার্ত ছিলেন যে তিনি পেটের সাথে দুটো পাথর বেঁধে রাখতেন। জাবির ইবনে আব্দাল্লা যখন অন্যদের সাথে মিলে পরিখা খনন করছিলেন, তখন রাসূল (স) কে এই অবস্থায় দেখেন; সবার পেটে যখন একটি পাথর বাঁধা তখন রাসূলের (স) পেটে বাঁধা দুটি পাথর! তিনি স্ত্রীর নিকট গিয়ে বললেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (স) কে অবর্ণনীয় অবস্থায় দেখে এসেছি। তোমার কাছে কোন খাবার আছে?’ তার স্ত্রী জবাব দিলেন, ‘আমার কাছে আছে বলতে কিছু বার্লি এবং একটি ছোট খাসী।’ জাবির বিন আবদুল্লাহ খাসীটিকে জবেহ করলেন এবং তার স্ত্রীকে বললেন কিছু রুটির খামি তৈরি করতে। যখন গোশত রান্না হতে লাগল এবং তার স্ত্রী রুটি বানাতে লাগল, জাবির বিন আবদুল্লাহ রাসূল (স) এর কাছে গিয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আপনার জন্য কিছু খাবারের ব্যবস্থা করেছি, আপনি অনুগ্রহ করে আপনার একজন বা দুইজন সাথীসহ আমার সাথে আসুন।’ রাসূলুল্লাহ (স) জানতে চাইলেন তার কাছে কতটুকু খাবার আছে এবং জাবির তাকে বলল। রাসূল (স) বললেন, তা যথেষ্ট। তুমি তোমার স্ত্রীকে বল আমি না আসা পর্যন্ত স্যুপের পাত্র যেন সরিয়ে না নেয়।’

তারপর রাসূলুল্লাহ (স) দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ডাকলেন, ‘হে মুহাজির, হে আনসার; জাবির তোমাদেরকে তার বাড়িতে খাবারের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে।’ জাবির খুব বিস্মিত হল কারণ সে আশা করেছিল রাসূল (স) এক বা দুইজন সাথী নিয়ে আসবেন কিন্তু তিনি তো এখন পুরো ক্যাম্পকেই আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। সে বিব্রত হয়ে দৌড়ে বাসায় গেল এবং যা ঘটেছে স্ত্রীকে খুলে বলল। তিনি (স্ত্রী) জানতে চাইলেন, ‘তিনি কি জানতে চেয়েছেন আমাদের কাছে কি পরিমাণ খাবার রয়েছে?’ জাবির বললেন, ‘হ্যা।’ ‘আপনি কি তাকে বলেছেন?’, জিজ্ঞেস করলেন তার স্ত্রী। ‘হ্যা’, তিনি উত্তর দিলেন। তিনি (স্ত্রী) বললেন, ‘তাহলে দুশ্চিন্তা করবেন না, আল্লাহ এবং তার রাসূল (স) ভালো জানেন।’ জাবির বলেন, ‘এই কথাগুলো আমাকে আশ্বস্ত করল।’

রাসূলুল্লাহ (স) জাবিরের বাড়িতে প্রবেশ করলেন এবং খাদ্য বিতরণের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। তিনি রুটি ছিঁড়ে এবং গোশত ও ঝোল পরিবেশন করে সাহাবীদেরকে দশজনের দলে আসতে বললেন। রাসূল (স) খাবার তৈরি করে পরিবেশন করতেন এবং তারা পেটপুরে খেতেন এবং চলে যেতেন এবং আরেকটি দশজনের দল আসতো এবং খেতো। সর্বমোট ৮০০ জন সাহাবী খেল। রাসূল (স) যখন পাত্রের নিকট ফিরে যেতেন, পাত্রটি পূর্ণ ছিল এবং রুটি তৈরি হচ্ছিল। তাই তিনি জাবিরের স্ত্রীকে প্রতিবেশীদের খাওয়াতে বললেন। তার লোকদের মনোবল এত বেশি ছিল যে এটা তাদের কাছে কোন বিস্ময়কর ঘটনা ছিল না। (It is hardly a surprise that the morale of his people was so high) একজন নেতা যিনি আপনার সকল কষ্টের অংশীদার তার থেকে আপনি আর কি আশা করেন?

অলৌকিক ঘটনা: ভবিষ্যৎবাণী

একটা পাথরের চাঁই পরিখা খননকারীদের কাছে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ভাঙ্গা যাচ্ছিল না। সুতরাং তারা রাসূল (স) এর নিকটে আসলেন। তিনি তাদের সাথে গেলেন এবং কুড়াল তুলে পাথরে চাঁইতে আঘাত করলেন। আগুনের ফুলকি ছুটল এবং তিনি বললেন, ‘আল্লাহু আকবার।’ তারপর তিনি দ্বিতীয়বার আঘাত করলেন, আগুনের ফুলকি ছুটল এবং তিনি বললেন, ‘আল্লাহু আকবার।’ তারপর তিনি তৃতীয়বার আঘাত করলেন এবং পাথরের চাঁইটি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ধূলায় পরিণত হল। সালমান আল ফারিসি জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আগুনের ফুলকি কি ছিল এবং আপনি আল্লাহু আকবার বললেন কেন?’ তিনি জবাব দিলেন, ‘প্রথমবারে আমি যখন আঘাত করলাম, আমাকে রোমান সাম্রাজ্য বিজয়ের সুসংবাদ দেয়া হল এবং আমি এখান থেকেই আস-শামের লাল প্রাসাদ দেখতে পেলাম। দ্বিতীয়বারে আমাকে পারস্য জয়ের সুসংবাদ দেয়া হল এবং আমি সাদা প্রাসাদ আল কিসরা দেখতে পেলাম। তৃতীয়বারে আমাকে ইয়েমেন জয়ের সুসংবাদ দেয়া হল এবং আমি সানা’আর দরজা দেখতে পেলাম। তাই আমি বললাম ‘আল্লাহু আকবার।’

সাহাবীদের সংকল্পের কথা বলতে গেলে একটি ঘটনা উল্লেখ করতে হয় যখন রাসূলুল্লাহ (স) কোন এক অভিযানে আম্মার বিন ইয়াসির এবং আব্বাদ বিন বাশিরকে পাহারার জন্য নিয়োজিত করেছিলেন। তারা দুজনে ঠিক করে নিল, প্রথমে একজন ঘুমাবে এবং অন্যজন জেগে থাকবে, তারপর অর্ধেক রাত পার হলে, সে অন্যজনকে জাগিয়ে দিবে। প্রথমে আব্বাদ বিন বাশিরের ভাগে জেগে থাকার দায়িত্ব পরল এবং তিনি ভাবলেন, পাহাড়ার সময়ে তিনি নামাজ আদায় করবেন। শত্রুদলের একজন গোপনে আব্বাদের পেছনে উপস্থিত হয়ে তীর ছুড়ল, তীরটি তার শরীরে পাশ দিয়ে বিদ্ধ হল। আব্বাদ দাঁড়িয়ে থেকে নামাজ অব্যাহত রাখলেন। শত্রুসৈন্যটি আরও একটি তীর ছুঁড়ল, এই তীরটিও তার শরীরে লাগল। তাসত্ত্বেও তিনি দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে থাকলেন। শত্রুর ছোঁড়া তৃতীয় তীরটি আব্বাদকে আঘাত করলে সে আম্মারকে জাগিয়ে তুলল। আব্বাদের সঙ্গীকে দেখে শত্রুসৈন্যটি পালিয়ে গেল। আম্মার বিন ইয়াসির দেখল যে রক্তক্ষরণে আব্বাদ মারা যাচ্ছে, সে তাকে বলল, ‘সুবহানআল্লাহ, তুমি আমাকে জাগিয়ে দিলে না কেন?’ আব্বাদ বলল, ‘If it wasn’t for the fact that this man kept shooting arrow after arrow and I was afraid that I may die and thereby fail my responsibility to Rasoolullah, I would not have woken you up until I finished my entire recitation.’

সাহাবীরা ছিলেন ইসলামের জীবন্ত উদাহরণ। এই ঘটনাটি সাহাবীদের ঈমানের স্তর সম্পর্কে ধারনা দেয়। আব্বাদ বিন বাশির (রা) শরীরে তিনটি তীর বিদ্ধ হবার পরেও নামাজে খুশু বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। এটা ইসলামের প্রতি তাদের দায়িত্বশীলতারও উদাহরণ। আব্বাদ একটি শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছে যার মানে হল ‘দরজার সুরক্ষা’ অর্থাৎ আমি যে দরজা সুরক্ষা প্রদান করছি সেখান দিয়ে শত্রুর প্রবেশ বাঁধাগ্রস্ত করা। এটা সকল মুসলমানের দায়িত্ব। শত্রু হল শয়তান অথবা এমন কেউ যে ইসলাম বা মুসলমানদের ক্ষতি করতে চায়। সকল মুসলমানের উচিত আল্লাহ প্রদত্ত যে কোন উপায়ে ইসলাম অথবা মুসলমানদের ক্ষতি প্রতিরোধ করা এবং ইসলাম ও মুসলমানদেরকে যে কোন উপায়ে সহযোগিতা করা। আমাদেরকে ‘কি হয়েছিল’ জিজ্ঞাসা করা হবে না, বরং জানতে চাওয়া হবে, ‘তুমি কি করেছিলে?’

এক্সট্রাঅর্ডিনারি দল

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার নবীর চারদিকে এমন এক প্রজন্ম তৈরি করেছেন যারা নিজেরাই এক একটি আদর্শ (benchmarks)। আগেই বলেছি, মুহাম্মদ (স) তার প্রেরিত নবীদের মধ্যে সর্বশেষ হবেন, এটা আল্লাহর ইচ্ছা এবং একারণে উত্তরসূরি তৈরি করা আবশ্যক ছিল যারা এই বাণীকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এরা হলে রাসূল (স) এর সাহাবীরা, যাদেরকে বলা হয় সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজিন্ম।

আব্দুল্লাহ হতে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন: “সর্বোত্তম মানুষ হচ্ছে আমার যুগের মানুষ। এরপর উত্তম হল, এর পরবর্তীতে আগমনকারী লোকেরা। তারপর উত্তম হল যারা তাদের পরবর্তীতে আসবে তারা। অতঃপর এমন এক কওমের আগমন ঘটবে যাদের কারও সাক্ষ্য কসমের আগেই হয়ে যাবে, আবার কসম সাক্ষ্যের আগেই হয়ে যাবে।” (বুখারী) (সূত্র)

এ বিষয়ে সেরা বইগুলোর অন্যতম একটি বই, খালিদ মুহাম্মদ খালিদ রচিত Men Around the Messenger থেকে উদ্ধৃত করছি।

‚It was neither invented discourse nor false rumor that was recorded in history about the great company of men who came into the world of belief and faith. That is because the entirety of human history has never witnessed such accurate documentation, honesty, and investigation of facts as did that epoch of Islamic history and its men. An extraordinary human effort has been exerted to study and pursue its tidings. Successive generations of able and brilliant scholars have not left unexamined even the smallest details or minutest explanations concerning that early epoch without putting them under microscopic investigation, scrutiny, and criticism.

The spectacular magnitude we encounter on the pages of this book of those colossal men of the Companions of the Messenger (PBUH) is not something legendary, even though they may seem like legends due to their miraculous nature! These are facts characteristic of the personality and life of the Prophet’s Companions. They soar high and are exalted and ennobled, not because of the author or, depicter, but because of what the Companions themselves desired and the extraordinary and righteous effort they exerted for the sake of excelling and attaining perfection.‛

আল্লাহর রাসূলের একটি কাজ অন্য সকল নবীর কাজের তুলনায় ভিন্নতর এবং অধিকতর জটিল ছিল। তাঁর পূর্বের সকল আম্বিয়ার কাজ ছিল মানুষের কাছে তাদের বার্তা পৌঁছানো। একারণে তাদের অনুসারী ছিল। মুহাম্মদ (স) সকল নবীর শেষ নবী হওয়ায় এবং তার মধ্য দিয়ে নবুয়্যতের ধারার সমাপ্তি ঘটায় তাঁর কাজ কেবল বার্তাই পৌঁছাননোই ছিল না বরং এমন প্রজন্ম তৈরি করাও ছিল যারা তাঁর বার্তা পৃথিবীর সকল প্রান্তে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কেয়ামত পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যাবে। এটা নবীত্বের সিলমোহরের বরকত যে দাওয়াহ’র কাজ তার উম্মতকে দেয়া হয়েছে।

সংক্ষেপে বলে গেলে, অন্যান্য আম্বিয়ারা অনুসারী তৈরি করেছিলেন, আর মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ (স) তৈরি করেছিলেন নেতা।

এদের প্রথম ছিলেন তার খলিফা – খলিফাতুর রাসূলুল্লাহ – আবু বকর সিদ্দিক। তিনি কত উত্তম পন্থায় নেতৃত্বের শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় রাসূল (স) এর ওফাতের পর তার প্রথম কাজে। আমি কিছুটা বিস্তৃত আকারে ঘটনাটা বলবো দুটো কারণে, প্রথমত, এই ঘটনাটা আমাদের বারবার স্মরণ করা উচিত এবং দ্বিতীয়ত, এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে আল্লাহর রাসূল (স) সুস্পষ্টভাবে সাহাবীদেরকে ইঙ্গিত দিয়েছেন কে হবে তার উত্তরসূরি। তিনি এমনভাবে কাজটি করেছিলেন যে তারা কোন সন্দেহ ছাড়াই স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছিলেন এবং তাঁকে বেছে নিয়েছিলেন।

এই বিষয়ে যারা সন্দেহ পোষন করে এবং কুৎসা রটনা করতে চায় তারা হয় রাসূল (স) এর জীবন এবং সময় সম্পর্কে অজ্ঞতার পরিচয় দেয় অথবা তাদের নিগূঢ় উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে।

শেষের দিনগুলো

আল্লাহর রাসূল (স) বলেছেন, ‘When any calamity befalls you think of my death and that calamity will seem like nothing.’ মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বড় দু:সংবাদ ছিল রাসূল (স) এর মৃত্যু শুধু একারণে নয় যে, তারা তাঁর সঙ্গ পাবার বরকত থেকে বঞ্চিত হল, একারণেও তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথে ওহি আসা বন্ধ হয়ে গেল এবং আল্লাহর সাথে সংযোগের সমাপ্তি ঘটল।

সফর মাসে শেষের শুরু হল। রাসূল (স) অনেক আয়াত এবং ইঙ্গিতের মাধ্যমে জানতে পারলেন, তাকেও পূর্বের নবীদের মত মৃত্যুবরণ করতে হবে। তিনি এর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন এবং অপেক্ষা করতে লাগলেন। আল্লাহ সুবহানাহুতা’য়ালা বলেন,

নিশ্চয় তোমারও মৃত্যু হবে এবং তাদেরও মৃত্যু হবে। (সূরা জুমার ৩৯:৩০)

৩৪)আপনার পূর্বেও কোন মানুষকে আমি অনন্ত জীবন দান করিনি। সুতরাং আপনার মৃত্যু হলে তারা কি চিরঞ্জীব হবে? প্রত্যেককে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। ৩৫)আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভাল দ্বারা পরীক্ষা করে থাকি এবং আমারই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। (সূরা আম্বিয়া ২১:৩৪-৩৫)

১৪৪) আর মুহাম্মদ একজন রসূল বৈ তো নয়! তাঁর পূর্বেও বহু রসূল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। তাহলে কি তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে? বস্তুতঃ কেউ যদি পশ্চাদপসরণ করে, তবে তাতে আল্লাহর কিছুই ক্ষতি-বৃদ্ধি হবে না। আর যারা কৃতজ্ঞ, আল্লাহ তাদের সওয়াব দান করবেন।  ১৪৫) আর আল্লাহর হুকুম ছাড়া কেউ মরতে পারে না-সেজন্য একটা সময় নির্ধারিত রয়েছে। বস্তুতঃ যে লোক দুনিয়ায় বিনিময় কামনা করবে, আমি তাকে তা দুনিয়াতেই দান করব। পক্ষান্তরে-যে লোক আখেরাতে বিনিময় কামনা করবে, তা থেকে আমি তাকে তাই দেবো। আর যারা কৃতজ্ঞ তাদেরকে আমি প্রতিদান দেবো। (সূরা আল ইমরান ৩: ১৪৪-১৪৫)

১) যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় ২) এবং আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে দেখবেন, ৩) তখন আপনি আপনার পালনকর্তার পবিত্রতা বর্ণনা করুন এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাকারী।  (সূরা নাসর ১১০: ১-৩)

আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।  (সূরা মায়েদা ০৫:০৩)

আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালার সুন্নাত হল মিশন সম্পূর্ণ হলে তিনি তার নবীকে ডেকে নেন। তিনি অনেকবার ইঙ্গিতে জানিয়েছেন, রাসূলুল্লাহ (স) এর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হবে না। আল্লাহ তা’য়ালা আরও জানিয়েছেন, নবীত্বের কাজ মুহাম্মদ (স) এর সাথেই শেষ হয়ে যাবে না বরং তার উম্মাতকে এই দায়িত্ব প্রদান করা হবে এবং তারা যতদিন এই কাজ চালিয়ে যাবে, রাসূল (স) এর মত তাদের জন্যও আল্লাহর সহায়তা আসবে।

রাসূল (স) এর মৃত্যুনির্দেশক হাদীস

হজ্বের খুতবার শুরুতে তিনি বলেন:

আমার কাছ থেকে হজ্বের নিয়মাবলী শিখে নাও কারণ আমি হয়তো এই বছরে পরে আর হজ্ব করতে পারবো না।

মুয়াজ বিন জাবালকে ইয়েমেনে প্রেরণের প্রাক্বালে তিনি বললেন :

ফেরার সময় হয়তো তোমাকে আমার কবর এবং মসজিদের পাশ দিয়ে ফিরতে হবে। এবং মুয়াজ চোখ মুছলেন।

রাসূল (স) বলেন,

জীবরাইল (আ) (বছরে) একবার আমার সাথে কোরআন তেলাওয়াত করতো। এবছর তিনি দুইবার করেছেন এবং এর শুদ্ধতা নিশ্চিত করেছেন।

Rasoolullah woke up and called Abu Muwayhiba, his servant late one night and said, ‘O Abu Muwayhiba, I have been commanded to ask forgiveness for the people of Al Baqee’a. So come with me.’ They went there and Rasoolullah said, ‘As salaamu alaikum Ya Ahlal Maqaabir. Congratulations that you do not experience what people here are experiencing. Trials and tribulations come like dark portions of the night following each other in succession, the last being worse than the first. (then he looked at Abu Muwayhiba and said) I was given the choice of the keys of the treasures of the earth and to live in this world as long as the world exists and then Jannah; or to meet Allah now and Jannah.’ Abu Muwayhiba said, ‘Choose us Ya Rasoolullah ’ Rasoolullah said, ‘No I have chosen to meet Allah and Jannah.’ Then he made dua for the forgiveness of the people of Al Baqee’a and then they left. When he reached home, his terminal illness began.

Ayesha (RA) said, ‘O My head, O my head!’ Rasoolullah said, ‘No I should say O My Head.’ When she complained of her headache more, he joked with her and said, ‘Actually if you were to die it wouldn’t be such a bad thing because I would wash you and pray for you and attend your funeral.’ She said, ‘Ya Rasoolullah let someone else have this good fortune because if I die you will still have your other wives to care for you.’

রাসূল (স) এর অসুস্থতা বৃদ্ধি পেল। তাঁর মাথাব্যাথা বেড়ে গেল এবং তীব্র জ্বর হল। একজন সাহাবী রাসূল (স) এর কপালে হাত রাখলেন এবং সরিয়ে নিয়ে বললেন, ‘আমি আপনার শরীরে হাত রেখে সহ্য করতে পারছি না। আপনার জ্বর খুবই তীব্র।’ আল্লাহর রাসূল (স) বললেন, ‘হ্যা, আমরা নবীরা সাধারণ মানুষের দ্বিগুন যাতনা ভোগ করি।’ তিনি তাঁর স্ত্রীদের কাছে গেলেন। তিনি যখন হযরত মায়মুনা (র) ঘরে ছিলেন তখন তার আরেকবার তীব্র ব্যাথার উদ্রেক হল, তাই তিনি হযরত আয়েশা (রা) এর ঘরে গেলেন এবং সকলকে সেখানে তার সাথে সাক্ষাৎ করতে বললেন। তাঁর স্ত্রীগণ সেখানে তাঁর শুশ্রূষা করতে সম্মত হলেন। তাঁর মাথা একটি কাপড়ে শক্ত করে বেঁধে দেয়া হল এবং তিনি একপাশে হযরত আলী (রা) এবং অন্যপাশে হযরত আল আব্বাস (রা) এর উপর ঝুঁকে (leaning) ছিলেন। তিনি সেখানে শয্যা গ্রহণ করলেন।

আল্লাহর রাসূল (স) মসজিদে গিয়ে লোকদের সাথে কথা বলতে এবং তাদেরকে নির্দেশনা (covenant) দিতে চেয়েছিলেন, তাই তিনি মদীনার সাতটি ভিন্ন ভিন্ন কূপ থেকে পানি এনে জ্বর কমানোর জন্য ঢালতে বললেন। তারপর তিনি একপাশে আলী বিন আবি তালিব এবং অন্যপাশে আল আব্বাসের একজন পুত্রের সহায়তায় মসজিদে গেলেন। তিনি এতটাই দূর্বল হয়ে পড়েছিলেন যে নিজে হাঁটতে পারছিলেন না। তিনি একটি খুতবা দিলেন, আল্লাহর প্রশংসা করলেন ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন এবং তারপর আল্লাহর কাছে উহুদ যুদ্ধের শহীদদের জন্য ক্ষমমা প্রার্থনা করলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁর সাথীদের প্রতি এবং যারা তাঁর মিশন বাস্তবায়নে সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি খুব বিশ্বস্ত ছিলেন। আল্লাহর রাসূল (স) তাঁর উম্মাতের জন্য বেঁচে ছিলেন।

তিনি বললেন, ‘হে মুহাজির সকল, তোমরা সংখ্যায় বৃদ্ধি পাচ্ছো কিন্তু আনসাররা বৃদ্ধি পাচ্ছে না। তারা সেই লোক যারা আমাকে শুরুর দিকে সহায়তা করেছে, তাই তাদের মধ্যে সম্মানীতদেরকে সম্মান করো এবং যারা ভুল করে তাদেরকে ক্ষমা করে দাও। হে লোকসকল, উসামার নেতৃত্বে অভিযান অব্যাহত রাখো। তার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তোমাদের অভিযোগ তার বাবার বিরুদ্ধে তোমাদের অভিযোগের মত একই। (Your complaint against his leadership is the same as your complaint against the generalship of his father before him) আল্লাহ সুবহানাহুতায়া’লা সাক্ষী, উসামা তার বাবার মতই নেতৃত্বের যোগ্য।’ রাসূল (স) থামলেন, স্তব্ধ নীরবতা বিরাজ করছিল। তারপর তিনি বললেন, ‘হে লোকসকল, আল্লাহর এক বান্দাকে এই দুনিয়া এবং আল্লাহর হাতে যা রয়েছে তার মধ্যে বাছাই করতে দেয়া হয়েছিল এবং সে আল্লাহর সাথে যা তা পছন্দ করল।’ (আবু বকর (রা) কাঁদতে শুরু করলেন, লোকেরা অবাক হল কেন তিনি কাঁদছেন। তিনদিন পরে তারা জানতে পারল।) আবু বকর (রা) বললেন, ‘আমরা নিজেদের এবং আমাদের সন্তানদের আপনার জন্য কোরবানি করবো ইয়া রাসূলুল্লাহ।’ রাসূল (স) তাকে থামিয়ে দিলেন এবং বললেন, ‘বন্ধুত্ব এবং সম্পদে আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্যক্তি আবু বকর। আমি যদি আল্লাহ ব্যতীত আর কাউকে খলিল হিসেবে বেছে নিতাম, সে হত আবু বকর। কিন্তু আমি আল্লাহর খলিল এবং আবু বকর আমার বন্ধু এবং ইসলামের সাথী। মসজিদের সকল দরজা বন্ধ হয়ে যাবে কেবল আবু বকরের দরজা হবে না।’ তারপর তিনি বললেন, ‘আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইহুদী ও খ্রীস্টানদেরকে তাদের নবীর কবরের উপর উপাসনার ঘর নির্মানের জন্য অভিশাপ দিক। আরব উপত্যাকায় আর কোন ধর্ম টিকে থাকা উচিত নয়। তোমরা সালাতের হেফাজত করো। তোমাদের অধীনে যারা রয়েছে তাদের যত্ন নিও। তোমাদের নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। উসামার বাহিনীকে পাঠিয়ে দাও।

রাসূল (স) নামাজের ইমামতি করতে যেতে পারলেন না, তাই তিনি নির্দেশ দিলেন, আবু বকর (রা) কে নামাজের ইমামতি করার জন্য বলতে। তিনি বললেন, ‘Mooroo Aba Bakr fa yusalli bin naas.’ (আবু বকরকে নামাজের নেতৃত্ব দেয়ার আদেশ করো) আয়েশা (রা) বিতর্কের ভয়ে তার পিতাকে নামাজ পড়াতে দিতে চাননি। তাই তিনি বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (স), তিনি অত্যন্ত নরম হৃদয়ের মানুষ এবং তিনি হয়তো আপনার স্থলে দাঁড়ালে নিজেকে সামলাতে (overcome) পারবেন না।’

আল্লাহর রাসূল (স) এই আপত্তির পুনরাবৃত্তিতে বিরক্ত হলেন এবং বললেন, আবু বকরকে সালাতে লোকদেরকে নেতৃত্ব করতে বলো। তোমরা মমেয়েরা ইউসুফের (সময়কার) মেয়েদের মতো।’ পরে আয়েশা (রা) বলেন, ‘আমি চাইনি আমার পিতা সালাতে নেতৃত্ব দিক কারন মানুষ হয়তো রাসূলুল্লাহ’র (স) জায়গায় তাকে পছন্দ করবে না।’

কোন ঐতিহাসিক ঘটনা বুঝতে হলে অবশ্যই সেই সময়ের প্রেক্ষাপট, সাংস্কৃতিক দ্যোতনা এবং সেই সময়ে মানুষের আচরনের মধ্য দিয়ে দেখতে হবে। আমরা বর্তমান সময়ের মানদণ্ড চৌদ্দ শতক আগে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনার ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারি না এবং বলতে পারি না যতক্ষণ পর্যন্ত ঘটনাটি আমাদের বর্তমান সময়ের বিচারে ‘গ্রহণযোগ্য’ না হচ্ছে, ততক্ষণ একে গ্রহণ করবো না। আরবদের মধ্যে, এমনকি তাদের মধ্যেও যারা তথাকথিত আমেরিকার ওয়াইল্ড ওয়েস্টকে দখল করতে গিয়েছিল, মুখের কথাই চুক্তি হিসেবে গণ্য হতো। অনেক বড় লেনদেন কেবলমাত্র একে অপরকে দেয়া মুখে প্রতিশ্রুতি প্রদানের মাধ্যমেই সম্পন্ন হতো। কিছু চুক্তি লিখিত হতো বটে, তবে তা এ কারণে নয় যে মুখের কথা যথেষ্ট নয় বরং কিছু নির্দিষ্ট বিষয় এতটা জটিল যে সাধারণভাবে মনে রাখা সম্ভব নয়। তবে এ ধরনের চুক্তি মুখের কথার উপর ভিত্তি করেই স্বাক্ষরিত হত। চুক্তির লিখন ছিল গৌণ বিষয় এবং চুক্তির বিশুদ্ধতায় কিছুই বৃদ্ধি করতো না। একবার কোন বিষয়ে দুটি পক্ষ একমত হলে, উভয় পক্ষই তা মমেনে চলতো, তা লিখিত হোক বা না হোক। এ কারণেই কাউকে মিথ্যেবাদী বলা ছিল খুনের মত ঘটনা, কারণ কোন ব্যক্তি যদি এ ধরনের ঘটনা ঘটতে দেয় এবং এ ব্যাপারে কিছু না করে, তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায় সে এই অভিযোগকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং এর মাধ্যমে সে সমাজে বসবাসের যোগ্যতা হারালো। এমনকি বর্তমান সময়েও, একজন আরবকে সবচেয়ে খারাপ বলার উপায় হল তাকে মিথ্যেবাদী বলা।

যারা রাসূল (স) কে মক্কায় বিরোধিতা করেছিল তাদের চেয়েও মদীনার মুনাফিকদেরকে আল্লাহ তা’য়ালা আরও কঠোরভাবে অভিশাপ দিয়েছেন কারণ তারা মুসলমান হবার ভান করলেও গোপনে তারা রাসূল (স) এর বিরোধিতা করতো। তারা অভিশপ্ত কারণ তারা ছিল মিথ্যেবাদী। ইসলাম সত্যবাদিতার প্রতি অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করে এমনকি এর জন্য যদি নিজের, নিজ পিতা, ভাই এবং পরিবারের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে হয় তারপরেও। ইসলাম হল সত্য এবং সকল প্রকার মিথ্যার বিরুদ্ধে এর অবস্থান।

এখানে, আবু বকর (রা) এর উত্তোরাধিকারের ঘটনায়, আমরা কোন সাধারণ মানুষের কথা নিয়ে আলোচনা করছি না। আমরা আল্লাহর রাসূল (স) এর মুখের কথা নিয়ে কথা বলছি যার উপর তাদের ঈমান প্রতিষ্ঠিত। সাহাবীরা শুধুমাত্র রাসূল (স) কে প্রশ্নাতীতভাবে মান্যই করতো না, তার এমনকি তাঁর অব্যক্ত আকাঙ্ক্ষাতে সাড়া দেয়ারও চেষ্টা করতো, কারণ তারা তাঁকে ভালোবাসতো, তাঁর নিকটবর্তী ছিল এবং তাঁর যোগাযোগের সূক্ষ্ম পার্থক্যও বুঝতে পারতো। সুতরাং যদি তিনি যদি ইঙ্গিত করতেন যে আবু বকর তাঁর উত্তরসূরি হবেন, তাহলে সেই সময় কেউ এই আপত্তি তুলত না যে এটা লিখিত নয়।

এটা অবশ্যই অনুধাবন করতে হবে যে সাহাবীদের কাছে সালাত ছিল সকল বিষয়ের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাদের কাছে ধর্মের অবস্থান ছিল অন্য সবকিছুর আগে, আর নামাজ হল ধর্মের মধ্যে প্রধান। নামাজের ইমাম ছিল তাদের জীবনের ইমাম। রাসূলুল্লাহ (স) নিজে সর্বদা নামাজের ইমাম ছিলেন। এটা খুবই স্পষ্ট ছিল যে যখন রাসূলুল্লাহ (স) তার আখেরি অসুস্থ্যতার সময়ে স্পষ্টভাবে আবু বকর (রা) কে মনোনীত করলেন এবং নামাজ পড়ানোর নির্দেশ দিলেন, তার মানে হল তিনি তার উত্তরসূরি হিসেবে আবু বকর (রা) কে বাছাই করে নিলেন। আমার বিশ্বাস, রাসূল (স) একে লিখিত রূপ দেননি কারণ তিনি তার প্রশিক্ষণ সম্পর্কে খুবই নিশ্চিত ছিলেন এবং তিনি জানতেন লোকেরা আবু বকর (রা) কে কতটা শ্রদ্ধা করে। যদি তিনি সত্যিই এটা লিখে রাখা, এমনকি অন্য কাউকে, আলী ইবনে আবি তালিবসহ, উত্তরসূরি নিযুক্ত করার প্রয়োজন মনে করতেন তাহলে এমনটি করার জন্য বৃহস্পতিবার আখেরি অসুস্থতা শুরু হওয়া থেকে সোমবারে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত যথেষ্ট সময় এবং সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন। এ থেকে স্পষ্ট, তাঁর উত্তরসূরি কে হচ্ছেন এবং তার অনুসারী সাহাবীগণ যে তার ইচ্ছাকে সম্মান করবে এবং মেনে নিবে তা নিয়ে তাঁর মনে কোনরূপ সন্দেহ ছিল না। প্রকৃতপক্ষে ঠিক তাই ঘটেছিল এবং আলী বিন আবি তালিব (রা) সহ সকলেই বিনা দ্বিধায় আবু বকর (রা) কে খলিফাতুর রাসূলুল্লাহ হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন।

আবু বকর সিদ্দিক ছিলেন তাদের শাইখ। তারা তাঁকে অন্যদের চেয়ে অধিক শ্রদ্ধা করতো, পরামর্শ এবং বিধিনিষেধ জানার জন্য তার কাছে আসতো এবং রাসূল (স) এর সাথে বিভিন্ন বিষয়ে ইন্টারসিড করার জন্য অনুরোধ করতো। ওমর ইবনুল খাত্তাব হুদাইবিয়ার সন্ধির ব্যাপারে তার আপত্তি সম্পর্কে কথা বলতে কার কাছে গিয়েছিল? রাসূল (স) সেই মহিলাকে কি বলেছিল যখন সে কোন এক বিষয়ে তাঁর কাছে প্রশ্ন করেছিল এবং তিনি তাকে পরের দিন আসতে বলেছিলেন? মহিলা প্রশ্ন করলেন, আমি এসে যদি আপনাকে না পাই, তখন? উত্তরে তিনি বললেন, ‘আবু বকরকে জিজ্ঞেস করো।’ মহিলা পুনরায় জানতে চাইলেন, ‘যদি আবু বকরও না থাকে?’ তিনি বললেন, ‘ওমরকে জিজ্ঞেস করো।’ রাসুল (স) এর সীরাত খুবই সতর্কতার সাথে এবং বিশ্বস্ত উৎস থেকে অধ্যয়ন করা এবং যারা ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করে যাদেরকে রাসূল (স) অন্যদের তুলনায় বেশী বিশ্বাস করতেন তাদের থেকে সাবধান থাকা জরুরী। তারা খুব কমই উপলব্ধি করতে পারে যে কোন সাহাবীর সততায় কালিমা লেপন করা মানে হল কোরআন এর বিশুদ্ধতা এবং ইসলামের সম্পূর্ণ কাঠামোতেই কালিমা লিপ্ত করা। কারণ এই সাহাবীরাই আল্লাহর কথা এবং রাসূলুল্লাহ (স) এর নির্দেশাবলী আমাদের কাছে পৌঁছিয়েছেন। আমরা যদি তাদেরকে একটি বিষয়ে বিশ্বাস করতে না পারি তাহলে কিভাবে বাকী বিষয়গুলোতে করবো? ধর্ম হিসেবে ইসলামের কি অবস্থা হবে? হয়তো আল্লাহ ও তার রাসূলের এইসব শত্রুরা তাদের কর্মের ফলাফল সম্পর্কে ঠিক বুঝতে পারে কিন্তু করে কারণ তারা ইসলামের ক্ষতি করতে চায়।

আবু বকর (রা) কে নামাজের নেতৃত্ব দেয়ার নির্দেশ দানের মধ্যে রাসূল (স) এর কি অভিপ্রায় তা সাহাবীদের কাছে পরিষ্কার ছিল। এ কারণে কেউ তাকে উত্তরসূরি নির্ধারণের জন্য কারও নাম উল্লেখ করা অথবা লিখে রাখার জন্য বলেনি, যদিও এসব করার জন্য বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রদত্ত খুতবার পর থেকে সোমবার মধ্য-সকাল পর্যন্ত যথেষ্ট সময় এবং সুযোগ তাঁর পক্ষে ছিল। তিনি সুবোধ্য ছিলেন এবং পুরো সময়টাতেই তার কর্মক্ষমতা তার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল। বহু লোক তার সাথে সাক্ষাৎ করেছেন এবং তিনি তাদের সাথে কথা বলেছেন। তিনি যদি চাইতেন তাহলে খুব সহজেই আলী ইবনে আবি তালিব বা অন্য কারও নাম বলতে পারতেন। তিনি আলি বিন আবি তালিবকেও সালাতে নেতৃত্ব দেয়ার নির্দেশ দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি আল্লাহ সুবহানাহুতা’য়ালার দ্বারা নির্দেশিত ছিলেন এবং তিনি তাই করেছিলেন যা আল্লাহ তায়ালা চেয়েছেন। এ বিষয়টি আমাদের সবসময় মনে রাখা উচিত। আবু বকর (রা) বৃহস্পতিবার রাসূল (স) এর নির্দেশের পর থেকে সোমবারে রাসূল (স) এর ওফাত পর্যন্ত নামাজ পড়িয়েছেন। একবার আজান হওয়ার পরও আবু বকর (র) উপস্থিত না হওয়ায় মুয়াজ্জিন হযরত ওমার বিন আল খাত্তাবকে নামাজ পড়ানোর জন্য বললেন। রাসূলুল্লাহ (স) ওমরের গলার আওয়াজ শুনে বললেন, ‘আল্লাহ সুবহানাহুতা’য়ালা এবং মুমিনরা চায় না আবু বকর ছাড়া আর কেউ আমীর হোক।’ এটা রাসূল (স) এর স্পষ্ট ইঙ্গিত যে তিনি আবু ববকর (রা) কে তার উত্তরসূরি হিসেবে নির্বাচন করেছেন।

ফাতিমা (রা) প্রতিদিন তাঁর বাবাকে দেখতে যেতেন। তিনি (নবীজী) তাকে চুম্বন করতেন এবং নিজের আসনে বসতে দিতেন। একবার তিনি তাঁকে দেখতে এলেন এবং চুম্বন করলেন। রাসূল (স) তার কানে ফিসফিস করে কিছু বললেন এবং সে কাঁদতে শুরু করল। এবার তিনি অন্যকিছু ফিসফিস করে বলে বললেন এবং সে হাসল। আয়েশা (রা) তার কাছ থেকে রাসূল (স) কি বলেছেন তা জানার চেষ্টা করলেন কিন্তু সে বলতে অস্বীকার করল। রাসূল (স) এর মৃত্যুর পর সে জানালো, ‘তিনি বলেছিলেন যে এই অসুস্থতা থেকেই তিনি মৃত্যুবরণ করবেন এবং আমি কাঁদলাম। তারপর তিনি বললেন যে এই ঘরের মানুষদের মধ্যে আমিই সর্বপ্রথম তার সাথে মিলিত হবো এবং আমি হাসলাম।’ অসুস্থতার শেষদিনে ফাতেমা (রা) বললেন, ‘হে আমার পিতা, আপনার কি যন্ত্রনাই না হচ্ছে।’ রাসূল (স) উত্তরে বললেন, ‘আজকের পর আমি আর যন্ত্রণা ভোগ করবো না।’ আমাদের উচিত নিজেদেরকে রাসূল (স) এর পরিবার এবং সাহাবীদের স্থানে নিজেকে কল্পনা করা যেন তারা সেই শেষ কয়টা দিন কেমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তাদের কর্তব্য সম্পাদন করেছে তা বুঝতে পারি। রাসূল (স) এর ঘরে সাতটি দিনার ছিল। তিনি ওগুলো দান করে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। রাসূলের অসুস্থতার কারণে আয়েশা (রা) তা করতে ভুলে গেলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বারবার অচেতন হয়ে চেতন ফিরে পাচ্ছিলেন। এমনই একবার চেতন হয়ে তিনি দিনারগুলো তখনো আছে কিনা জজানতে চচাইলেন। আয়েশা (র) জানালেন সেগুলো তখনো আছে। রাসূল (স) ওগুলো চাইলেন এবং তিনি তাঁর হাতে ওগুলো তুলে দিলেন। ‘এটা কি ভালো দেখাবে যদি মুহাম্মদ এই অবস্থায় তার রবের সাথে সাক্ষাৎ করেন?’ দিনারগুলো তৎক্ষণাৎ বিলিয়ে দেয়া হল।

রবিবার রাত অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণভাবে কেটে গেল।

সোমবারে সাহাবীরা হযরত আবু বকর (রা) এর নেতৃত্বে নামাজ আদায় করছিলেন, রাসূল (স) তার ঘর এবং মসজিদের মধ্যবর্তী পর্দা সরিয়ে দিলেন। আনাস বিন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, রাসূল (স) দাঁড়ালেন এবং আমাদের দেখলেন। তার মুখমন্ডল ছিল চাঁদের ন্যায়। তারপর তিনি আলি বিন আবি তালিব এবং ফাহাদ ইবনুল আব্বাস এর উপর ভর করে মসজিদে আসলেন। তাকে দেখে লোকেরা এতই খুশি হল যে তারা প্রায় নামাজ ছেড়ে দিচ্ছিল। আবু বকর (রা) তেলাওয়াতে তার কন্ঠস্বর উঁচু করে বুঝাতে চাইলেন নামাজ জারী রাখা উচিত। আবু বকর (রা) বুঝতে পারলেন এই উত্তেজনার একটিই মানে, রাসূলুল্লাহ (স) আসছেন। তাই তিনি পিছিয়ে আসতে শুরু করলেন কিন্তু রাসূল (স) তাকে সামনের দিকে ঠেলে দিলেন এবং বললেন, ‘তুমি পড়াও’ এবং তিনি তার পাশে বসে পড়লেন ও বসেই নামাজ শেষ করলেন। এটাই সর্বশেষ দৃশ্য যা রাসূল (স) অবলোকন করলেন; তাঁর উম্মাত একসাথে নামাজে দাঁড়িয়ে আছে।

এই দৃশ্যটি ছিল তাঁর মিশন সম্পন্ন হবার ইঙ্গিতবাহী এবং তাকে সবচেয়ে খুশি করেছিল।

নামাজের পর তিনি সমবেতদের উদ্দেশ্যে পরিষ্কার কন্ঠে ভাষন দিলেন যা এমনকি মসজিদের বাহির থেকেও শোনা গেল। তিনি বললেন, ‘হে মানবসকল, আগুন তৈরি হয়ে আছে। বিধ্বংসী আক্রমণ অন্ধকারের ন্যায় ধেয়ে আসছে। আল্লাহ সাক্ষী, এর পরে আমি আর কোনকিছুর জন্য দায়ী হবো না। কোরআন যা বৈধ করেছে তা ব্যতীত আর কোন কিছুকে আমি বৈধ করিনি এবং কোরআন যা নিষেধ করেছে তা ব্যতীত আর কোন কিছুকে আমি নিষেধ করিনি। আল্লাহর অভিশাপ তাদের উপর যারা কবরকে নিজেদের মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে (কবরকে উপাসনার স্থান বানিয়েছে)।

রাসূল (স) এর রোগমুক্তিতে মুসলমানরা এতটাই আনন্দিত হয়েছিল যে উসামা বিন যায়েদ চলে যাওয়ার অনুমতি চেয়েছিলেন। আবু বকর (রা) রাসূল (স) কে প্রশ্ন করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আমরা সবাই আপনার জন্য দোয়া করেছিলাম, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আপনাকে আপনার উপর রহমত বর্ষন করেছেন এবং সুস্বাস্থ্য দান করেছেন। আমি খারিজার কন্যার সাথে (তার স্ত্রী) দিন কাটাবো বলে কথা দিয়েছিলাম। আমাকে কি অনুমতি পেতে পারি?’ রাসূল (স) তাকে অনুমতি দিলেন এবং তিনি মদীনার সীমান্তে সুনাহ (Sunh) এ গেলেন। হযরত ওমর (রা) এবং হযরত আলী (রা) তাদের নিজেদের ব্যবসায়ে ফেরত গেলেন। রাসূল (স) আয়েশা (রা) এর ঘরে ফিরে আসলেন। আয়েশা (রা) এর ভাই, আব্দুর রহমান বিন আবু বকর, রাসূল (স) কে দেখতে এলেন। তার পকেটে একটি মিসওয়াক ছিল। আয়েশা (রা) লক্ষ্য করলেন রাসূল (স) মিসওয়াকটির দিকে তাকিয়ে আছেন, তাই তিনি জানতে চাইলেন ওটা তার চাই কিনা। রাসূল (স) মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন এবং তিনি মিসওয়াকটি নিয়ে চিবিয়ে নরম করে দিলেন এবং রাসূল (স) এর দাঁত পরিষ্কারের জন্য তার মুখে দিলেন। আয়েশা (রা) সূরা ফালাক্ব এবং সূরা নাস পড়ে রাসূল (স) এর হাতে ফুঁ দিলেন এবং তার শরীরে বুলিয়ে দিলেন।

আল্লাহর রাসূল (স) এর অবস্থার দ্রুত অবনতি হল এবং তিনি একটি পানিভর্তি পাত্রে হাত ডুবিয়ে নিয়ে মুখ মুছতে লাগলেন এবং বললেন, ‘As sakaraathil mawti bil haq’ (মৃত্যুর অসারতা (যন্ত্রনা) সত্য)।’

তারপর সেই অন্তিম সময় উপস্থিত হল। আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, ‘I saw him looking towards the heavens and saying, ‘Bal il Rafeeqil A’ala Bal il Rafeeqil A’ala Bal il Rafeeqil A’ala.’ So I knew that the angel of death had come and asked his permission and he chose Allah and did not choose us.’ Then his head turned towards me and I screamed.

সংবাদটি মদীনাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। ওমর এবং মুগিরা (রা) রাসূল (স) এর ঘরে ছুটে আসলেন। ওমর (রা) বলকেন, ‘তিনি অচেতন হয়ে গেছেন।’ মুগিরা (রা) বললেন, ‘তিনি মারা গেছেন।’ ওমর (রা) বললেন, তুমি ফিতনা তৈরি করতে চাইছো। মুনাফিকদের ধ্বংস করা ব্যতীত তিনি মৃত্যুবরণ করবেন না।’ ওমর (রা) মসজিদে গেলেন এবং তার ততরবারি বের করে বললেন, লোকেরা বলছে যে রাসূল (স) মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি মারা যাননি বরং মুসা (আ) এর মত অজ্ঞান হয়ে গেছেন। যদি কেউ বলে তিনি মারা গেছেন, আমি এই তরবারি দিয়ে তার মাথা কেটে ফেলবো।’

আবু বকর (রা) তখন মদীনার সীমান্তে ছিলেন, তার কাছে এই সংবাদ পৌঁছালে তিনি দ্রুত ফিরে এলেন। তিনি কারও সাথে কথা না বলে সোজা আয়েশা (রা) এর ঘরে গেলেন যেখানে রাসূল (স) শায়িত ছিলেন। তিনি রাসূল (স) এর ঢেকে রাখা মুখ উন্মুক্ত করে তাকে চুম্বন করলেন এবং কাঁদলেন, বললেন, ‘আপনি জীবিত অবস্থায় পবিত্র ছিলেন, মৃত অবস্থায়ও পবিত্র। যে মৃত্যু আপনার জন্য অবধারিত ছিল, আপনি তার মধ্য দিয়েই চলে গেলেন।’

তিনি তারপর মসজিদে এলেন এবং দেখলেন ওমর (রা) লোকদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করছেন। তিনি বললেন, ‘ Ijlis Ya Omar,’ (বসে যাও, হে ওমর)। কিন্তু ওমর (রা) তাকে উপেক্ষা করলেন। তাই আবু বকর মিম্বারে আরোহন করলেন এবং লোকদের উদ্দেশ্যে কথা আরম্ভ করলেন। লোকেরা ওমর (রা) কে ছেড়ে তার কথা শুনতে এল। তিনি বললেন, ‘man kaana yaabudu Muhammadan in kaana Muhammadan qad-maat. Wa in kaana ya-budullah fa innallaha hayyun la yamooth. (যারা মুহাম্মদের উপাসনা করে, তারা জেনে রাখুক যে মুহাম্মদ এখন মৃত। যারা আল্লাহর উপাসনা করে তারা জেনে নিক আল্লাহ কখনো মৃত্যুবরণ করে না)। তারপর তিনি নিন্মোক্ত আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন:

আর মুহাম্মদ একজন রসূল বৈ তো নয়! তাঁর পূর্বেও বহু রসূল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। তাহলে কি তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে? বস্তুতঃ কেউ যদি পশ্চাদপসরণ করে, তবে তাতে আল্লাহর কিছুই ক্ষতি-বৃদ্ধি হবে না। আর যারা কৃতজ্ঞ, আল্লাহ তাদের সওয়াব দান করবেন। (সূরা আল ইমরান ৩: ১৪৪)

ওমর (রা) বললেন, ‘এই আয়াতটি কোরআনের?’ আয়াতটি তিনি জানতেন কিন্তু এমনভাবে বললেন যেন তিনি এই প্রথমবার শুনলেন।’ এবার তিনি ভেঙ্গে পড়লেন এবং বললেন, ‘আমার পা আমাকে আর বহন করতে পারছে না।’ বর্ণনাকারী বলেন, সকলেই আয়াতটি এমনভাবে তেলাওয়াত করছিল যেন তারা এটি প্রথমবার শুনছে।’

রাসূল (স) এর আশেপাশের মানুষ যাদেরকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন তাদের প্রকৃতি কিরূপ তা বোঝানোর জন্য আমি এই ঘটনাটি এত বিশদভাবে বর্ণনা করলাম। সাহাবীদের মধ্যে এমন কেউ ছিল না যে রাসূলুল্লাহকে আবু বকর (রা) এর চেয়ে বেশি ভালোবাসতো এবং যাকে রাসূলুল্লাহ (স) আবু বকরের চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। যদি এমন কেউ থাকতো যার প্রিয়তম বন্ধুর মৃত্যুতে দু:খে ভেঙ্গে পড়া এবং ক্রিয়াহীন হয়ে যুক্তিযুক্ত মনে হয় তিনি হলেন আবু বকর (রা)। অথচ তিনিই একমাত্র লোক যিনি তার যন্ত্রণাকে পাশ কাটিয়ে শক্ত খুঁটি হলেন যেন অন্যরা তার থেকে সহায়তা নিতে পারে। শক্তিশালী ছিল ওমর (রা), অথচ সেই রাসূলুল্লাহ (স) এর মৃত্যুকে গ্রহণ করতে পারেনি এবং বাস্তবতার আঘাতে ভেঙ্গে পড়েছিল। যে আবু বকর (রা) রাসূল (স) কে অন্য যে কারও চেয়ে বেশি ভালোবাসতো সেই দৃঢ় থেকে উম্মাহকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হয়েছিল। প্রশিক্ষণের প্রমাণ পাওয়া যায় যখন নেতা তার অনুসারীদের মাঝে অনুপস্থিত থাকেন। এবং এরকম একটি সময়ে রাসূলুল্লাহ (স) এর প্রথম দিকের শিক্ষার্থী আবু বকর (রা) কে পাওয়া গেল সর্বোত্তম অবস্থায়। তার কর্মের মাধ্যমেই তিনি প্রমাণ করেছেন রাসূল (স) সর্বোত্তম ব্যক্তিকেই বাছাই করেছিলেন।

রাসূলুল্লাহ (স) এর মিয়াহন কেবলমাত্র তার বার্তা পৌঁছানো ছিল না বরং ছিল এমন একটি জাতি প্রস্তুত করা যারা প্রজন্মের পর প্রজন্মে এই বার্তা পৌঁছে দিবে। আবু বকর (রা) এমন একটি প্রজন্মকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই কাহিনীটি দিয়েই এই অধ্যায়টি সমাপ্ত করা যায় কারণ ইতিহাস সাক্ষী এর পরে কি ঘটেছিল এবং পরবর্তী চৌদ্দশত বছর ধরে বর্তমান সময় পর্যন্ত ঘটে চলছে, এমন সময় ও স্থানে যা রাসূল (স) জানতেনও না, দেখেনও নি।

একজন নেতার কাছে কঠিনতম কাজ তার নির্দেশ মান্য করানো নয়, বরং সে যে স্বপ্ন দেখেছে তাদেরকে দিয়েও সেই একই স্বপ্ন দেখানো। এমন এক ভিশন অর্জনের জন্য উদ্বুদ্ধ করা যা একমাত্র সেই দেখতে পেরেছে। যখন মানুষ কোন ভিশন অর্জনের জন্য দৃঢ় সংকল্প করে, একমাত্র তখনই তারা এর বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে। যে কোন ক্ষেত্রেই একজন নেতার জন্য এটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ।

মুহাম্মদ (স) এটা শুধু তার নিজের প্রজন্মেই সফলভাবে করতে সক্ষম হয়নি, পরের প্রজন্ম যারা জন্মই নেয়নি তাদের মাঝেও পৌঁছে দিয়েছেন। যারা মুহাম্মদ (স) এর সময়ে বেঁচে ছিল না, কখনো তাকে দেখে নি কিংবা তার কন্ঠ শুনেনি তারাও এমনভাবে তাঁর বার্তা দূর দুরান্তে পৌঁছে দিচ্ছেন যেন তারা সরাসরি তাঁর কাছ থেকেই আসছেন। তারা তাঁকে নিজেদের পিতামাতা ও সন্তানদের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন এবং তার সম্মান রক্ষার্থে প্রয়োজনে নিজেদের জীবন ত্যাগ করতে রাজী এবং এমন কিছু করাকে গৌরবের কাজ বলে মনে করেন। রাসূল (স) এর নেতৃত্বে এমন কি ছিল যা এসব কিছু সম্ভবপর করে তুলেছে? কি এমন বিষয় যা তাকে যে কোন বিচারেইই স্মরণীয় করেছে? তাঁর মধ্যে কি এমন ছিল যার কারণে তার চরম শত্রুও তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁর সম্পর্কে ভালো বলতে বাধ্য হত? বাইজেন্টাইন সম্রাট হেরাক্লিয়াসের ঘটনাটি যা আমি আগেই উল্লেখ করেছি সেরকম একটি ঘটনা।

এক্সট্রাঅর্ডিনারি গুণাবলী

বলা হয়, শেষ পর্যন্ত ফলটাই ঘরে নেয়া যায়। ফলাফল নির্ভর করে গুণের উপর। গুণ হলো সবচেয়ে বড় পার্থক্যকারী, অনুসারীদের জন্য সবচাইতে প্রেরনাদায়ক এবং চলমান সফলতার সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তা।

আগেই বলেছি, রাসূল (স) এবং সাহাবীদের কাছে নামাজ ছিল সবকিছু পরিমাপ করার মিটার। তাদের জীবনকে সংজ্ঞায়িত করেছে নামাজ। তাদের সকল প্রয়োজন পূরণের জন্য তারা সালাতের দিকেই তারা মুখ ফিরাতো। সালাত ছিল তাদের নিরবতার, রবের সাথে কাটানোর সময়, তাদের কর্মশক্তির প্রেরণা।  নামাজ ছিল তাদের চিত্তবিনোদন, ভারমুক্ত করার উপকরণ এবং তাদের শক্তি। রাসূল (স) বিলাল বিন রাবাহ (রা) কে ডেকে নামাজের জন্য আজান দিতে বলতেন, ‘Farehna biha Ya Bilal,’ (এর মাধ্যমে আমাদের শান্তি দাও হে বিলাল)।

নামাজের মাধ্যমেই রাসূল (স) তার উত্তরসূরি কে হবেন সেই বার্তা দিয়ে যান এবং তাঁর রবের সাথে সাক্ষাতের পূর্বে পৃথিবীর যে দৃশ্যটি তাকে সুখী করেছিল তা ছিল সাহাবীদের নামাজ। তাই এটা খুব স্বাভাবিক যে রাসূলুল্লাহ (স) নামাজের ভাষাতেই গুণাবলী বর্ণনা করবেন। বিখ্যাত হাদীসে জীবরাইলে রাসূল (স) জীবরাইল (আ) এর প্রশ্নের উত্তরে ইহসান (যার একটি অর্থ উৎকর্ষতা) বলতে কি বোঝায় বলেছেন। আমি এখানে সম্পূর্ণ হাদীসটি উপস্থাপন করছি, তবে আলোচনার ক্ষেত্রে কেবলমাত্র আল ইহসান সম্পর্কে গুরুত্বারোপ করবো।

ইয়াহিন বিন ইয়ামুর এর সূত্রে বর্ণিত যে একদা তিনি মসজিদে প্রবেশের সময় আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা) এর সাথে দেখা হল। তিনি (আবদুল্লাহ ইবনে ওমর) বলেন, ‘আমার বাবা, ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা), বলেন, একদা আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর খিদমতে ছিলাম। এমন সময় একজন লোক আমাদের কাছে এসে হাযির হলেন। তাঁর পরিধানের কাপড় ছিল সা’দা ধবধবে, মাথার কেশ ছিল কাল কুচকুচে। তাঁর মধ্যে সফরের কোন চিহ্ন ছিল না। আমরা কেউ তাঁকে চিনি না। তিনি নিজের দুই হাঁটু নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর দুই হাঁটুর সাথে লাগিয়ে বসে পড়লেন আর তার দুই হাত নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর দুই উরুর উপর রাখলেন।

 

তারপর তিনি বললেন, হে মুহাম্মদ! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে অবহিত করুন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ইসলাম হল, তুমি এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করবে যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল, সালাত (নামায/নামাজ) কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে, রামাযানের রোযা পালন করবে এবং বায়তুল্লাহ পৌছার সামর্থ্য থাকলে হাজ্জ (হজ্জ) পালন করবে। আগন্তুক বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন। তার কথা শুনে আমরা বিষ্মিত হলাম যে, তিনই প্রশ্ন করেছেন আর তিনই-তা সত্যায়িত করছেন।

 

আগন্তুক বললেন, আমাকে ঈমান সম্পর্কে অবহিত করুন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ঈমান হল আল্লাহর প্রতি, তার ফেরেশতাদের প্রতি, তার কিতাবসমূহের প্রতি, তার রাসুলগণের প্রতি এবং আখিরাতের প্রতি ঈমান আনবে, আর তাকদিরের ভালমন্দের প্রতি ঈমান রাখবে। আগন্তুক বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন।

 

তারপর বললেন, আমাকে ইহসান সম্পর্কে অবহিত করুন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ইহসান হলো, এমনভাবে ইবাদত-বন্দেগী করবে যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ, যদি তুমি তাকে নাও দেখ, তাহলে ভাববে তিনি তোমাকে দেখছেন।

 

আগন্তুক বললেন, আমাকে কিয়ামত সম্পর্কে অবহিত করুন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ বিষয়ে প্রশ্নকারীর চাইতে যাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে তিনি অধিক অবহিত নন। আগন্তুক বললেন, আমাকে এর আলামত সম্পর্কে অবহিত করুন। রাসুল বললেনঃ তা হলো এই যে, দাসী তার প্রভুর জননী হবে; আর নগ্নপদ, বিবস্ত্রদেহ দরিদ্র মেষপালকদের বিরাট বিরাট অট্টালিকার প্রতিযোগিতায় গর্বিত দেখতে পাবে।

 

উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) বললেন যে, পরে আগন্তুক প্রস্হান করলেন। আমি বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, হে উমর! তুমি জানো, এই প্রশ্নকারী কে? আমি আরয করলাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই সম্যক জ্ঞাত আছেন। রাসুল বললেনঃ তিনি জিবরীল। তোমাদের তিনি দ্বীন শিক্ষা দিতে এসেছিলেন।  (সহীহ মুসলিম ৮) (সূত্র)

আমার দৃষ্টিতে আল ইহসান সম্পর্কিত চিহ্নিত অংশটুকু রাসূলুল্লাহ (স) এর জীবনে উৎকৃষ্টতার ধারণার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত যা রাসূল (স) নিজে পালন করেছেন এবং আমাদের জন্য আদর্শ হিসেবে রেখে গেছেন যেন আমরা নিজেরাই পরিমাপ করতে পারি। আমি আগেও বলেছি, ইসলাম এবং রাসূল (স) এর শিক্ষার ক্ষেত্রে সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই ধর্মের আঙ্গিকে বলা হয়েছে কিন্তু এর প্রয়োগ কেবলমাত্র ধর্মীয় প্রার্থনাই নয়, বরং জীবনের সকল ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এ কারণেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার রাসূলের শুধুমাত্র উপাসনার অংশটুকু নয়, সমগ্র জীবনকেই মানবজাতির জন্য অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবে ঘোষনা করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহুতা’য়ালা বলেন:

যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে। (সূরা আহযাব ৩৩ঃ২১)

ইসলাম হল জীবনের পূর্নাঙ্গ পথ যা ধর্মবিশ্বাস (আকীদা) থেকে শুরু করে উপাসনা (ইবাদত), আচরণবিধি (আখলাক), ব্যবহার (মু’য়ামিলাত) এবং সমাজ (মু’য়াশিরাহ) পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে, যদিও নীতিমালা এবং আদর্শসমূহ ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে উল্লেখ করা হয়, তারা জীবনের বাকী সকল ক্ষেত্রেও পরিব্যপ্ত।

এই হাদীসে উৎকর্ষতা/শ্রেষ্ঠত্ব বলতে রাসূল (স) যা বলেছেন তার সহজ অর্থ হলো আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার উপস্থিতি সম্পর্কে জ্ঞাত থাকা। এর মানে হল তিনি আমাদের দেখছেন, তিনি আমাদের সহায়তা করবেন, আমাদের বিচ্যুতিসমূহ ক্ষমা করবেন, আমাদের প্রচেষ্টায় সহযোগিতা করবেন এবং আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হবেন। আমাদের জীবনের সকল ক্ষেত্রে, সকল কাজে, কথায় এই সচেতনতার সার্বক্ষণিক উপস্থিতি থাকতে হবে। আমাদের প্রত্যেকটি লেনদেন, প্রত্যেকটি কথোপকথন, প্রত্যেকটি সম্পর্ক স্থাপনের সময় এটি মনে রাখতে হবে। ভাবুনতো এমন একটা সমাজ তৈরি হলে কেমন হবে যেখানে সকল সদস্য এই সত্যটি সম্পর্কে জ্ঞাত এবং সতর্ক যে সে এক আল্লাহর কাছে দায়বদ্ধ যার কাছে কোন কিছুই লুক্কায়িত নয় এবং একদিন তাকে জবাবদিহির জন্য ডাকা হবে ও সে কেমন জীবন যাপন করেছে তার উপর ভিত্তি করে তাকে পুরস্কার অথবা শাস্তি দেয়া হবে? এটা হবে এমন একটি সমাজ যেখানে মানুষ বস্তুগত সম্পদ নয় বরং পরস্পরের কাছে ভালো হওয়ার, অধিকার পূর্ণ করার জন্য প্রতিযোগিতা করবে।

রাসূলুল্লাহ (স) তার নিজের জীবনে এমন একটি সমাজ তৈরি করেছিলেন। রাসূল (স) কে অন্যান্য শিক্ষকদের থেকে আলাদা করেছে তার জীবন যা ছিল তাঁর প্রচারিত শিক্ষার জীবন্ত উদাহরণ। তার জীবনে কথা ও কাজের মধ্যে কোন অমিল ছিল না। তিনি অন্যকে যা করতে বলেছেন তা নিজে করেছেন এবং তিনি ছিলেন জীবন-যাপন, হাঁটা-চলা, কথা-বার্তায় ইসলামের পতাকাবাহক। তার জীবনে, ইসলাম কেবলমাত্র কোন তত্ত্ব, আদর্শ বা দর্শন ছিল না বরং সত্যিকারের বাস্তব পদ্ধতি যা পরবর্তীতে আবু বকর (রা) এর পরবর্তী খলিফা সাইয়্যিদিনা ওমর ইবনুল খাত্তাবের কাছে হস্তান্তরিত হয়েছিল। খলিফা নির্বাচিত হবার পর ওমর (রা) কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, আবূ বকর (রা) আমার জন্য অনেক উঁচু আদর্শ স্থাপন করে তার পরবর্তী খলিফাদের জন্য কঠিন করে গেছেন।’

আরেকটি উদাহরণ: প্রত্যেকদিন ভোরে ফজর নামাজের আগে আবু বকর সিদ্দিক (রা) মদীনার সীমান্তে অবস্থিত একটি ক্যাম্পে যেতেন। তিনি তাঁবুর ভিতরে প্রবেশ করতেন এবং কিছু সময় কাটিয়ে ফিরে আসতেন। তার মৃত্যুর পরে ওমর (রা) ঠিক করলেন ওই তাঁবুতে কে বাস করে তা জানতে আগ্রহী হলেন। তিনি ক্যাম্পে গিয়ে বয়সের কারণে প্রায় অন্ধ একজন বৃদ্ধা মহিলাকে পেলেন।

তিনি তাকে তার নিজের সম্পর্কে জানতে চাইলেন। বৃদ্ধা মহিলা উত্তর দিলেন, ‘আমি এক বৃদ্ধা মহিলা যার এই দুনিয়াতে কেউ নেই এবং আমি এখানে আমার ভেড়া নিয়ে একাকী বাস করি। প্রত্যেক সকালে মদীনা থেকে একজন লোক আমার এখানে এসে আমার তাঁবু পরিষ্কার করে, আমার খাবার রান্না করে, ভেড়ার দুধ দোহন করে, তাদের যত্ন নেয় এবং তারপর ফিরে যায়। তার যত্ন-পরিচর্যা ব্যতীত আমার পক্ষে টিকে থাকতে পারতাম না। ওমর (রা) জানতে চাইলেন, ‘আপনি জানেন তিনি কে?’ উত্তরে তিনি জানালেন লোকটি কে সে সম্পর্কে তার ককোন দধারনা নেই কারণ সে কখনো তাকে বলেনি।

ওমর (রা) তাকে বললেন, ‘তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স) এর খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা)।’

এমন একটা সমাজে বসবাসের কথা ভেবে দেখুন যেখানে একজন শাসক নিজে দুর্বল ও বঞ্চিতদের সেবা করছে। এমন একটি সমাজ যার শাসক তার জনগণের ভয়ে ভীত নয় বরং শাসিতদের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে জবাব দেয়ার ভয়ে ভীত।

আমীরুল মু’মিনীন ওমর ইবনুল খাত্তাব সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে খলিফা থাকাকালীন সময়ে একদিন তিনি সাহাবীদের সাথে এক স্থানে এলেন এবং বললেন, সকল প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার যিনি মহিমান্বিত এবং তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে দেন সে যাই চাক না কেন। এমন এক সময় ছিল যখন আমি আমার পিতার উটের রাখাল ছিলাম। আমি উটগুলোকে নিয়ে এখানে আসতাম। আমার পিতা আমাকে অনেক কাজ দিতেন এবং আমি যদি কাজ না করতাম, তবে তিনি আমাকে প্রহার করতেউ এবং আমি খুব জীর্ণ শীর্ণ পোষাক পরিধান করতাম। কিন্তু আজ আমার দিকে তাকাও, আল্লাহ আমাকে এত উচ্চতায় নিয়ে এসেছেন যে আমার আর আল্লাহর মাঝে আর কেউ নেই।’

আবদুর রহমান ইবনে আওফ বর্ণনা করেন যে ওমর (রা) লোকদের মসজিদে ডাকলেন এবং তারা জমায়েত হবার পর তিনি মিম্বারে উঠলেন এবং বললেন, ‘আমি আমার কিছু ফুপুদের রাখাল ছিলাম এবং আমি যখন ঘরে ফিরতাম, তারা আমাকে মুঠোভর্তি খেজুর অথবা কিসমিস দিতেন এবং আমাকে একটি দুর্বিষহ দিন যেত।’ তারপর তিনি মিম্বার থেকে নেমে পড়লেন। আবদুর রহমান ইবনে আওফ তাকে বললেন, ‘এই খুতবার কারণ কি?’ আপনি তো নিজেকে সবার সামনে ছোট করলেন। এতে কি লাভ হল?’ ওমর (রা) বললেন, ‘তোমার অমঙ্গল হোক হে ইবনে আওফ। আমার নফস আমাকে বলছিল, ‘তুমি হলে আমীরুল মু’মিনীন। তোমার থেকে ভালো আর কে আছে?’ আমি আমার নফসকে শিক্ষা দিলাম সত্যিটা কি।’

Omar ibn Al Khattab could not be fooled by anyone including himself. আবদুল্লাহ বিন মাসুদ সাহাবীদের সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, আল্লাহ সাক্ষী, তারা এই উম্মাহর শ্রেষ্ঠ লোক ছিলেন। তারা ছিলেন সবচেয়ে পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী (সর্বাধিক তাক্বওয়াবান)। তাদের ছিল সুগভীর জ্ঞান। And they were the least superficial (least formality).’ তিনি ‘সকল জ্ঞান’ বলেন নি, বলেছেন ‘সুগভীর জ্ঞান’। (He did not say ‘most knowledge’ but ‘deepest knowledge’.) এর কারণ হল তারা সরাসরি রাসূলুল্লাহ (স) এর কাছ থেকে শিখেছিলেন। যদিও একজন সাহাবী ইমাম বুখারী বা মুসলিমের মত এত বেশি হাদীস জানতেন না, তারা সেগুলো জীবন্ত রেখেছিলেন এবং কোন হাদীস কী প্রেক্ষাপটে উপস্থিত হয়েছে তার সাক্ষী ছিলেন। তারাই একমাত্র প্রজন্ম যারা প্রকৃতপক্ষে রাসূল (স) যা বলেছেন তা শুনেছিলেন এবং জানতেন কেন তিনি তা বলেছেন। কোরআন নাজিলের সময় তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁকে ওহী গ্রহণ করতে দেখেছেন। জিবরাঈল (আ) যখন মানুষের রূপে হাজির হয়েছেন তখন তারা তাকে দেখেছেন এবনভ তার কথা শুনেছেন। সাহাবীরা ছিলেন পরিচ্ছন্ন এবং তাদের জীবন ছিল সাধারণ এবং খাঁটি। তারা এমন একটি জাতি যা গ্রীক দর্শন বা রোমান ও পারস্য সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত ছিল না। তাই যখন ইসলাম এলো, তারা একে গ্রহণ করে নিল এবং কোন কিছু যোগ না কিরে এর বিশুদ্ধতম রূপে পালন করল।

এমনকি ইসলাম আগমনের পূর্বে, জাহিলিয়্যাতের যুগেও তারা ছিল মরুভূমির সাধারণ লোক। তাদের ভাষা কৃত্রিমতা এবং বাহুল্য বিবর্জিত ছিল। তাদের কবিতা ছিল সরল এবং বর্ণনাত্মক, রূপক এবং প্রতিকী নয়। হিন্দু বা গ্রীকদের মতো জটিল দর্শন, প্রতীকীবাদ এবং যুক্তিতে পরিপূর্ণ কোন পৌরাণিক কাহিনী তাদের ছিল না। এমনকি যখন তারা মূর্তিপূজা করতো, তারা কেবল তার সামনে মাথানত করতো এবং তাদের উদ্দেশ্যে কোরবানী দিতো। এটুকুই। এর পেছনে কোন জটিল কাহিনী এবং দার্শনিক যৌক্তিকতা ছিল না। এর সাথে কোন পৌরাণিক কাহিনী সংযুক্ত ছিল না।

ইসলাম গ্রহণের সময় তারা তাদের এই স্পষ্টতা এবং সরলতা দ্বীনের কাছে নিয়ে এসেছে। তারা দর্শন এবং যুক্তিকে এর সাথে যুক্ত করে নি। তারা কুরআন এবং সুন্নাহকে যেভাবে পেয়েছে সেভাবেই গ্রহণ করেছে এবং আন্তরিকতার সাথে পালন করেছে ও জীবনে প্রতিষ্ঠা করেছে। তারা আয়াতের গভীর কোন অর্থ খোঁজ করেনি। তারা শুনেছে এবং মেনে নিয়েছে। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ

রাসূল বিশ্বাস রাখেন ঐ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে যা তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুসলমানরাও সবাই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর গ্রন্থসমুহের প্রতি এবং তাঁর পয়গম্বরগণের প্রতি। তারা বলে আমরা তাঁর পয়গম্বরদের মধ্যে কোন তারতম্য করিনা। তারা বলে, আমরা শুনেছি এবং কবুল করেছি। আমরা তোমার ক্ষমা চাই, হে আমাদের পালনকর্তা। তোমারই দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। (সূরা বাকারা ২ঃ২৮৫)

যারা আয়াতের গুপ্ত অর্থ সন্ধান এবং জটিল দার্শনিকতা তৈরি করে তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ

তিনিই আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন। তাতে কিছু আয়াত রয়েছে সুস্পষ্ট, সেগুলোই কিতাবের আসল অংশ। আর অন্যগুলো রূপক। সুতরাং যাদের অন্তরে কুটিলতা রয়েছে, তারা অনুসরণ করে ফিৎনা বিস্তার এবং অপব্যাখ্যার উদ্দেশে তন্মধ্যেকার রূপকগুলোর। আর সেগুলোর ব্যাখ্যা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। আর যারা জ্ঞানে সুগভীর, তারা বলেনঃ আমরা এর প্রতি ঈমান এনেছি। এই সবই আমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। আর বোধশক্তি সম্পন্নেরা ছাড়া অপর কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না। (তাফসির আত-তাবারী) (সূরা আল ইমরান ৩ঃ৭)

সাহাবীরা যার উপর কোরআন নাজিল হয়েছে সেই মুহাম্মদ (স) এর কাছ থেকে সরাসরি কোরআন শিখেছেন। তারাই একমাত্র প্রজন্ম যারা প্রত্যেকটি ওহী, প্রত্যেকটি আয়াত নাজিলের পরিস্থিতির সাক্ষী। তারা কেবল শব্দের পারিভাষিক অর্থই নয়, এই শব্দগুলো নাজিলের কারণও অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। এই কারণেই মুসলিম স্কলারগণ আল্লাহর কিতাব এবং রাসূল (স) এর সুন্নাহ সংক্রান্ত যে কোন বিষয়ে সাহাবীদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং কে কষ্টিপাথর বিবেচনা করেছেন। এমনকি ভাষাবিদ্যার ক্ষেত্রেও কোন বিশেষ শব্দের অর্থ কী হবে তা চূড়ান্ত হয় কোরআন হাদীসের আলোকে সাহাবীরা সেই শব্দটির অর্থ কি বুঝেছিলেন তার উপর।

এই কারণে রাসূল (স) তার বিখ্যাত হাদীসে তাদেরকে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্ম হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছিলেন, ‘The best generation is my generation and then those that come after them and those that come after them.’ হাদীস বিশারদগণ বলেন এই শ্রেষ্ঠত্ব ক্রম এবং আদর্শ উভয়ক্ষেত্রেই, যার মানে হল সর্বোত্তম মুসলমান হল তারাই যারা বিশ্বাস এবং কর্মের দিক থেকে রাসূল (স) এবং তার সাহাবীদের নিকটতম।

ইসলামে বিদয়াত মক্কা এবং মদীনায় শুরু হয়নি। বর্তমান সময়ের সকল দর্শন এবং জটিল তত্ত্বসমূহ যা নিয়ে অনেক বই-পুস্তক রচিত হয়েছে তার বেশিরভাগই সাহাবীদের সময়ের অনেক পরে যখন ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছে এবং কপ্টিক ক্রিস্টিয়ানিটি ও হিন্দুত্ববাদের সংস্পর্শে এসেছে তখন আবির্ভূত হয়েছে।

এই সময়ে ইসলামের মধ্যে দর্শন প্রবেশ করে৷ সাহাবীরা ছিলেন কর্মমুখী, আল্লাহর সাথে সংযুক্ত এবং তাঁর সাথে সাক্ষাতের ব্যাপারে সচেষ্ট। এমন আন্দাজ-অনুমান করা যা মূল্যহীন এবং কেবল সন্দেহ সৃষ্টি ও ঈমানকে দুর্বল করে, তার সময় বা আগ্রহ – কোনটিই তাদের ছিল না।

সাহাবীদের কাছে শিক্ষার চিহ্ন ছিল সরলতা এবং সুস্পষ্টতা, জটিলতা, প্যাঁচানো যুক্তি এবং দর্শন নয়। তারা কূটনৈতিক ছিলেন না। তারা ছিলেন স্পষ্টবাদী। তারা মানুষের মতামতের চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভয় করতেন। তারা মানুষের কাছে অপছন্দনীয় হওয়ার চেয়ে আল্লাহ এবং তার রাসূল (স) এর কাছে অপছন্দনীয় হওয়াকে ভয় করতেন। তাই তারা যা বলা দরকার তাই বলেছেন, সে সম্পর্কে লোকে যাই ভাবুক না কেন। শুধুমাত্র সাহাবীদের গল্প না শুনে তাদের মতো চরিত্র গঠন ইসলামে বেশ গুরুত্বপূর্ণ কারণ তাদেরকে মানদন্ড বিবেচনায়ই আমাদের বিচার করা হবে।

আল ইহসান বক্তে সাহাবীরা এটাই বুঝেছিলেন এবং নিজেদের জীবনে তারা এরই পরিপালন করেছিলেন। সাহাবীদের জীবনে বহু ঘটনা রয়েছে যেগুলো আমি এখানে পুনরাবৃত্তি করতে চাই না। বর্তমান সময়ের যে কারও জন্য খুবই ভালো পরামর্শ হল তাদের জীবনী পাঠ করা এবং রাসূলুল্লাহ (স) এর সময়ে বেঁচে থাকা কেমন হত তা অনুধাবনের চেষ্টা করা।

আমি বিশ্বাস করি কেউ যদি তার সহযোগীদের কল্যাণে আগ্রহী হয় তবে রাসূল (স) এর জীবনীপাঠ খুবই জরুরী এবং বর্তমানের পৃথিবীতে সেই সময়ের পুনঃসৃষ্টির জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা উচিত। তবেই আমরা সুবিচার, সমবেদনা, সত্যবাদীতা এবং সহমর্মিতাপূর্ণ একটি পৃথিবী পেতে পারি। বর্তমান সময়ে এগুলোর অভাব প্রকট, ফলে আমরা এমন একটা পৃথিবীতে বাস করছি যার বৈশিষ্ট্য হলো নিষ্ঠুরতা, উদাসীনতা এবং বৈষম্য। কেমন পৃথিবী আমরা চাই সেটা আমাদেরই সিদ্ধান্ত।

হিজরত

মুহাম্মদ (স) এর মক্কা থেকে মদীনায় গমন বা হিজরতের ঘটনা স্মরণ করার জন্য কিছু সময় ব্যয় করা যেতে পারে।

ইসলামের ইতিহাসে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের ঘটনা এতই গুরুত্বপূর্ণ যে ওমর ইবনুল খাত্তাবের সময়ে যখন হিজরী সাল কোন তারিখ থেকে গণনা করা হবে তা নির্ধারণের প্রয়োজন হল, সাহাবীরা রাসুলুল্লাহ (স) এর জন্ম বা মৃত্যুদিবসকে বাছাই না করে পৌত্তলিকতার ভূমি থেকে সেই ভূমিতে, যেখানে ইসলামিক একত্ববাদ প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, অভিবাসনের দিনকে বেছে নিলেন। এর প্রতিকী অর্থ হল যখন কোন ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তির উপরে আল্লাহর ইচ্ছাকে গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিল এবং আল্লাহর নির্দেশনা অনুসারে চলার মধ্যেই কেবল মুক্তি এবং সফলতা নিহিত মেনে নিয়ে নিজেকে সমর্পন করল, সে যেন নতুন জীবন শুরু করল। হিজরত আরও একটি কারণে গুরুত্বপুর্ণ কারণ এই সময়েই রাসূলুল্লাহ (স) এর উম্মত প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সময়েই মুসলমানরা একক রাষ্ট্র হিসেবে – জাতীয়তা, গোত্র বা বর্ণের ভিত্তিতে নয়, বরং বিশ্বাসের ভিত্তিতে – প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সময়েই শতবর্ষের গোত্রীয় এবং জাতীয়তার বন্ধন মুছে গিয়ে বিশ্বাসের ভিত্তিতে নতুন বন্ধন স্থাপিত হয়। এমন এক মুহুর্ত যখন ভাতৃত্বের কারণ প্রতিষ্ঠিত হল। এক আল্লাহর ইবাদত এবং তার রাসূল (স) এর অনুসরণ করাই হল এখানে অন্তর্ভূক্তির একমাত্র শর্ত। খুবই দুঃখের বিষয়, মুসলমানরা বর্তমানে কেবল হিজরী ক্যালেন্ডার ব্যবহার করাই বন্ধ করেনি, রাসূল (স) বন্ধনের যে সকল ভিত্তি মুছে ফেলেছিল সেগুলো পুনরায় আঁকড়ে ধরেছে। এর ফলাফল পরিষ্কার।

হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, একদিন দুপুরে আমরা একজন লোককে আমাদের বাড়ির দিকে আসতে দেখলাম, তার মুখ আবৃত ছিল। যখন তিনি সামনে এলেন, আমার পিতা তাকে চিনলেন। তিনি বললেন, জরুরী না হলে মুহাম্মদ (স) এসময় আসতেন না। তিনি বাড়িতে প্রবেশ করলেন এবং আমার পিতাকে বললেন, দয়া করে সবাইকে এই স্থান ত্যাগ করতে বলুন। আবু বকর (রা) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (স), ‘এখানে আপনার পরিবার ভিন্ন কেহ উপস্থিত নেই।’

সীরাতের প্রত্যেকটি বিষয়ের উপর আলোকপাত করা অপরিহার্য। বন্ধুত্বের কোন পর্যায়ে আপনার বন্ধু আপনার ঘরে প্রবেশ করতে পারে এবং বলতে পারে, দয়া কিরে সবাইকে এই স্থান ত্যাগ করতে বলুন’, এবং প্রতিউত্তরে ‘হে আল্লাহর রাসূল, এখানে আপনার পরিবার ভিন্ন কেহ নেই’ গ্রহণ করে। আবু বকর সিদ্দীক ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স) এর নিকটতম বন্ধু যারা একে অপরকে যে কারও চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। তাদের এই ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের শিকড় ছিল গভীর এবং আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।

আল্লাহর রাসূল (স) তারপর বললেন, আমাকে মক্কা ত্যাগ এবং হিজরতের অনুমতি দেয়া হয়েছে। আবু বকর (রা) প্রশ্ন করলেন, ‘আমি কি আপনার সঙ্গী হতে পারি?’ রাসুলুল্লাহ (স) বললেন, ‘হ্যাঁ।’আবু বকর (রা) আনন্দে কাঁদতে শুরু করলেন। আয়েশা (রা) বলেন ‘এই প্রথম আমি কাউকে আনন্দে কাঁদতে দেখলাম।’ এই অভিযাত্রা ছিল বিপদের কিন্তু আবু বকর (রা) রাসূল (স) এর সাথী হতে পেরে খুবই খুশী হলেন। রাসূল (স) আবু বকর (রা) কে দুটি উট প্রস্তুত করতে বললেন। আবু বকর (রা) তাকে বললেন, ‘আমি ইতোমধ্যেই তাদেরকে প্রস্তুত করে রেখেছি হে আল্লাহর রাসূল। আমার মনে হচ্ছিল যে আপনার রব আপনাকে মক্কা ত্যাগের অনুমতি দিবেন এবং তাই আমি উটগুলোকে প্রস্তুত করে রেখেছি।’ রাসূল (স) বললেন, ‘আমি ওগুলোর মূল্য পরিশোধ কিরবো।’

আবু বকর (রা) বললেন, ‘যা আপনাকে সন্তুষ্ট করে তাই আমার নিকট গ্রহণযোগ্য।’ এটা আতিথিয়তার মৌলিক নীতি – অতিথিকে যা সন্তুষ্ট করে তা করা এবং নিজের ইচ্ছাকে অতিথির উপর চাপিয়ে না দেয়া।’

রাসূল (স) হযরত আলী ইবনে তালিব (রা)কে তাঁর বিছানায় ঘুমানো এবং তাঁর কাছে রক্ষিত আমানত (নিরাপত্তার জন্য কিছু লোক যা তার কাছে রাখতে দিয়েছিল) প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। আলী (রা) নির্দ্বিধায় তা পালন করলেন। রাসূল (স) এর সাথী বা সাহাবীদের অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল তারা কখনোই নিজের এবং তাদের পরিবারের উর্ধ্বে রাসূল (স) এর স্বস্তি এবং নিরাপত্তার জন্য কিছু করতে দ্বুধা করতো না। তাদের নিকট আল্লাহর মনোনীত বার্তাবাহক ছিলেন যেকোন কিছুর চেয়ে প্রিয় এবং মূল্যবান, এমনকি নিজের জীবনের চেয়েও।

গ্রেফতার এড়াতে দুই সঙ্গী, মুহাম্মদ (স) এবং আবু বকর (রা), ঘুরপথে মক্কা ত্যাগ করলেন। কখনো আবু বকর (রা) মুহাম্মদ (স) এর আগে থাকলেন, কখনো পিছনে। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কেন তিনি এরূপ করলেন। তিনি বললেন, যখন আমি সামিনে থেকে বিপদের উপস্থিতি টের পেতাম তখন সামনে থাকতাম এবং যখন পেছন থেকে বিপদের আশংকা করতাম তখন পেছনে হাঁটতাম। আল্লাহর রাসূল (স) বললেন, তুমি কি নিজের ক্ষতি হতে দিতে নাকি আমার? তিনি বললেন, আমার, হে আল্লাহর রাসূল। তারা আল ঘার আত-থর এ পৌঁছলেন। আবু বকর (রা) গুহার ভেতরে গিয়ে দেখে এলেন গুহাটি আল্লাহর রাসূল (স) এর জন্য নিরাপদ কিনা। তারা সেখানে রাত্রিযাপন করলেন বটে, কিন্তু তারা তখনো নিরাপদ দূরত্ব থেকে অনেক দূরে।

মক্কার কুরাইশরা তাঁদের পলায়ন বুঝতে পারল এবং তাদের জীবিত ধরা বা হত্যার জন্য ছুটে এলো। আবু বকির (রা) এর ভৃত্য তাঁদের পদচিহ্নের উপর দিয়ে একপাল ভেড়া চড়িয়ে দিল যেন তাঁরা কোনদিকে গিয়েছে মরুভূমির বালুতে তার পরিষ্কার ছাপ না থাকে। কিন্তু আরবরা গজলা হরিন এবং খরগোস শিকার করে, সুতরাং তাদের খুব বেশি একটা চিহ্নের দরকার হলো না। ফলে তারা শেষপর্যন্ত গুহায় পৌছুলো এবং গুহার প্রবেশমুখে এমন জায়গায় দাঁড়ালো যে আবু বকর (রা) তাদের পা দেখতে পাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (স), তারা নিচের দিকে তাকালেই আমাদেরকে দেখে ফেলবে।’ রাসুলুল্লাহ (স) বললেন, ‘হে আবু বকর, তু দুইজনে ব্যাপারে কি বলছো যাদের তৃতীয়জন হলেন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা?’ রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন সম্পূর্ণ শান্ত এবং মোটেও ভীত নয়। বরং তিনি আবু বকর (রা) কে যা বললেন তা পরবর্তীতে আল্লাহ তায়ালা নাজিল করেনঃ

যদি তোমরা তাকে (রসূলকে) সাহায্য না কর, তবে মনে রেখো, আল্লাহ তার সাহায্য করেছিলেন, যখন তাকে কাফেররা বহিষ্কার করেছিল, তিনি ছিলেন দু’জনের একজন, যখন তারা গুহার মধ্যে ছিলেন। তখন তিনি আপন সঙ্গীকে বললেন বিষন্ন হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। অতঃপর আল্লাহ তার প্রতি স্বীয় সান্তনা নাযিল করলেন এবং তাঁর সাহায্যে এমন বাহিনী পাঠালেন, যা তোমরা দেখনি। বস্তুতঃ আল্লাহ কাফেরদের মাথা নীচু করে দিলেন আর আল্লাহর কথাই সদা সমুন্নত এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (সূরা তওবা ৯ঃ৪০)

আবু বকর (রা) এবং রাসূলুল্লাহ (স) এর মধ্যকার বিশেষ সম্পর্ক ছিল সবার কাছে ঈর্ষনীয়। আগুন যেমন লোহাকে গলিয়ে সম্পর্ককে দৃঢ় করে তোলে, তাদের বন্ধুত্বও তেমনি বিপদ আর কষ্টের মাধ্যমে মজবুত হয়েছে৷ ওমর ইবনুল খাত্তাব খলিফা থাকাজালীন একদিন শুনতে পেলেন লোকেরা আবু বকর (রা) এবং ওমর (রা) এর মধ্যে কে অধিকতর আলোচনা করছে। তিনি তাদের কাছে ছুটে গেলেন এবং বললেন, আবু বকরের জীবনের একদিন ওমরের গোটা পরিবারের চেয়ে ভালো। সাহাবীদের মধ্যে আবু বকর (রা) এর মর্যাদার অনেক নিদর্শনের এটি একটি।

তিনি ছিলেন স্বভাবগত নেতা, বিদ্বান, রাসূলুল্লাহ (স) এর পরামর্শক এবং এমন ব্যক্তি যাকে তারা রাসূল (স) এর মৃত্যুর পর আমীর হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। তাকে বলা হতো খলিফাতুর রাসূলুল্লাহ। এই উপাধী কেবল তার জন্যই প্রযোজ্য ছিলা এবং আর কাউকে এই খেতাব দেয়া হয়নি। আবু বকর (রা) তাদের শাইখ ছিলেন কারণ রাসূল (স) তাকে সর্বাধিক ভালোবাসতেন।

তাঁরা গুহায় ছিলেন তিনদিন। আবদুল্লাহ বিন আবু বকর (রা) সারাদিন মক্কায় তথ্য সংগ্রহ করতেন এবং রাতে গুহায় আবু বকর (রা) এবং রাসূলুল্লাহ (স) এর সাথে কাটাতেন। তিনি সন্ধ্যায় যাবার সময় আবু বকর (রা) এর ভৃত্য আমের বিন ফুহাইরাকে দিয়ে দুধ সংগ্রহ এবং তার পদচিহ্ন মোছার জন্য একপাল ভেড়া চড়িয়ে নিয়ে যেতেন। আবদুল্লাহ ইবনে উরাইকাত তাঁদেরকে ঘুরপথে মদীনা নিয়ে যাবার পথপ্রদর্শক ছিল। সে মুসলিম ছিল না, তবে রাসূলুল্লাহ (স) কে সহযোগিতা করতে রাজী ছিল।

কুরাইশরা হযরত মুহাম্মদ (স) এবং আবু বকর (রা) এর প্রতিজনের জীবিত অথবা মৃত মাথার মূল্য ১০০ উট পুরস্কার ঘোষনা করলো। আদিবাসী সমাজে উট হল আয় রোজগার এবং সামাজিক মর্যাদার উৎস, তাদের জন্য এটা ছিল বিশাল পুরস্কার। আল্লাহর রাসূলের শত্রুপক্ষের একজন, সুরাকা বিন মালিক, তার গোত্রের লোকদের সাথে বসে ছিল। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে জানালো সে ফুইজনকে দেখেছে এবং ধারণা করছে তারা মুহাম্মদ (স) এবং আবু বকর (রা)। সুরাকা ইচ্ছা করেই লোকটিকে উপহাস করলো দবকং বোঝালো তার ভুল হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে সে নিজেই পুরস্কারটি নিতে চাচ্ছিল। লোকটি চলে গেলে সুরাকা সন্তর্পনে সঙ্গীদের পরিত্যাগ করল এবং নিজের অস্ত্র ও বাহন প্রস্তুত করলো। কেউ যেন খেয়াল না করতে পারে এজন্য সে বির্শা নিচু করে নীরবে লোকটি নির্দেশিত পথের দিকে যাত্রা করলো।

আল্লাহর রাসূল (স) কোরআন তিলাওয়াত করতে করতে সামনে হাঁটছিলেন, আবু বকর (রা) পিছনে তাকিয়ে সুরাকাকে দেখতে পেলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স) কে জানালেন এবং তিনি দোয়া করলেন। সুরাকার ঘোড়া বালিতে আটকে গেল এবং সে ঘোড়া থেকে পড়ে গেল। সে খুবই অবাক হল। এমন কেউ যে ঘোড়ার পিঠেই বড় হয়েছে তার জব্য ঘোড়া থেকে পরে যাবার বিষয়টি স্বাভাবিক নয়। সে আবার ঘোড়ায় চড়ে বসে ছুটে চলল এবং রাসূল (স) আবারও দোয়া করলেন আর সুরাকার ঘোড়া বালিতে আটকা পড়ল এবং সে ঘোড়া থেকে পরে গেল। সুরাকা আরও একবার বাহনে উঠে বসে রওয়ানা হল কিন্তু এবার তার মুখে বালি পড়ল এবং সে পুনরায় ঘোড়া হতে পড়ে গেল। সুরাকা বুঝতে, বিষয়টি স্বাভাবিকের উর্ধ্বে এবং সে শান্তি প্রার্থনা করলো। রাসূলুল্লাহ (স) সম্মত হলেন। সুরাকা লিখিত দিতে অনুরোধ করলো। আল্লাহর রাসূল (স) আব্দুল্লাহ বিন উরাইকাতকে লিখে দিতে বললেন এবং সুরাকা একে নিরাপদে রাখলেন। বহু বছর পরে যখন রাসূল (স) তায়েফ অবরোধ করলেন তখন সুরাকা গ্রেফতার হলে সে এই দলিল প্রদর্শন করে নিজের জীবন বাঁচিয়েছিল। রাসূল (স) সুরাকাকে যারা তাঁকে ধরার জন্য স্থিরসংকল্প ছিল তাদের নিবৃত্ত করতে বলেছিলেন এবং সুরাকা কথা রেখেছিল। (Rasoolullah  told Suraaqa to weaken the resolve of anyone who wanted to pursue him and Suraaqa was true to his word.) সুরাকা কুরাইশদের নিকট ফিরে গিয়ে বলল তারা রাসূলুল্লাহকে খুঁজে পাবে বটে কিন্তু এর পরবর্তী তাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে।

মুহাম্মদ (স), আবু বকর (রা) এবং তাদের পথপ্রদর্শক চলতে লাগলেন। দৃশ্যটি কল্পনা করুন। মরুভূমিতে তিনজন মানুষ, গ্রীষ্মের উষ্ণতম সময়ে পায়ে হেঁটে বা উটের পিঠে চলছে, তাদেরকে তাড়া করে আসছে শত্রুরা যারা তাদেরকে হত্যা করতে চায়। আজ আমরা হিজরতকে এক বাক্যে উপস্থাপন করি – তিনি মক্কা থেকে মদীনায় মাইগ্রেট করলেন – যার মধ্যে সেই যাত্রার প্রকৃত কোন মর্যাদা বা উপলব্ধি অনুভূত হয় না। তাদের কষ্ট, ক্ষুধা-তৃষ্ণা ও নিরাপত্তাহীনতা এবং আল্লাহর রাসূল (স) এর ধৈর্য্য ও সাহস – সবই এর অন্তর্ভূক্ত ছিল। ব্যক্তিগত সাহস নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ এবং রাসূলুল্লাহ (স) এর চেয়ে সাহসী আর কেউ ছিল না। জীবনের পুরোটা সময়ে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং বিপদের মুখোমুখি হয়েছেন।

চলতে চলতে তারা একটি মেষপালকের শিবিরে এসে পৌঁছালেন। এ ধরণের ছাউনি বা শিবির আজও আরবদেশে দেখতে পাওয়া যায় যেখানে মেষপালক তার পরিবার এবং মেষগুলো নিয়ে বসবাস করে৷ মেষপালক মেষগুলোকে চড়াতে নিয়ে যেত এবং তার অবর্তমানে তার স্ত্রী ছাউনিতে থাকতো।

রাসূলুল্লাহ (স) এবং তার সাথীরা যখন ক্যাম্পে পৌঁছালেন তখন সেখনে ছিলেন উম্মু মা’বদ। রাসূল (স) তাকে বললেন, তুমি কি আমাদেরকে কিছু খেতে দিতে পারো?’ সে জবাব দিল, যদি খাবার মত কিছু থাকতো, তবে আপনাকে চাইতে হতো না।’ অতিথির আপ্যায়ন করা মরুভূমির আদিবাসী সমাজের গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতি। রাসূল (স) উম্মু মা’বদের তাঁবুর কোনায় রোগামত একটি ভেড়া দেখতে পেলেন। তিনি বললেন, তুমি কি আমাকে ওই ভেড়াটার দুধ দোহনের অনুমতি দিবে? সে বলল, যদি ওটা কোন কাজের হত তাহলে সেটা অন্যগুলোর সাথে ঘাস খেতে যেতো। এর দুধ নেই। এটা বন্ধ্যা এবং শুষ্ক। কিন্তু রাসূল (স) জোর করলেন, তাই সে তাঁকে ভেড়া থেকে দুধ দোহনের অনুমতি দিলেন। আল্লাহর রাসূল (স) তাকে ক্যাম্পের সবচেয়ে বড় পাত্রটি নিয়ে আসতে বললেন। উম্মু মা’বদ বিস্মিত হলেও সবচেয়ে বড় পাত্রটি নিয়ে এলেন। রাসুলুল্লাহ (স) ডান হাতে ছাগলটির পেছনে চাপড় দিয়ে দুধ দোয়াতে শুরু করলেন এবং পাত্রটির কানায় কানায় ভর্তি হওয়া পর্যন্ত দুধ প্রবাহিত হলো।

আলাহর রাসূল (স) উম্মু মা’বদের হাতে পাত্রটি দিয়ে পেট ভর্তি করে খেতে বললেন। তার শেষ হলে তিনি পাত্রটি আবু বকর (রা) কে দিলেন এবং তারপর পথপ্রদর্শক খেতে দিয়ে সবশেষে নিজে খেলেন। সবার খাওয়া শেষ হলেও দেখা গেল পাত্রে দুধ রয়ে গেছে। রাসূলুল্লাহ (স) এর স্পর্শে এমনই বরকত ছিল।

সেই রাত্রে স্বামী ফিরে এলে উম্মু মা’বদ সেই বিকেলে ঘটে যাওয়া ঘটনা সম্পর্কে যে ভাষায় রাসূল (স) এর বর্ণনা করেছিলেন তা শত শত বছর ধরে প্রতিধ্বনিত হয়ে আসছে।

She said, ‚I saw him to be a man of evident splendor. Fine in figure, his face handsome, slim in form, his head not too small, elegant and good looking, his eyes black, eyelashes long, his voice deep, very intelligent, his brows high and arched, his hair in plaits, his neck long and beard thick. He gave an impression of dignity when silent and of high intelligence when he spoke. His words were impressive and he was decisive, not trivial not trite, his ideas like pearls moving on their string. He seemed the most splendid and fine looking man from a distance and the very best of all from close by. Medium in height, the eye not finding him too tall nor too short. A tree branch as it were between two others but he was the finest looking of the three. The best proportioned. He was the center of his companions’ attention. When he spoke they listened well and if he ordered they hurried to obey. A man well helped well served, never sullen, never refuted.‛

Her husband said, ‚This man must be Muhammad  who Quraysh are pursuing. If I meet him I will pledge allegiance to him and become Muslim.‛ Ummu Ma’abad had already accepted Islam at the hands of the Messenger  of Allah  .

মুসলমানদের হৃদয়ে মদীনার প্রতি ভালোবাসা তৈরীর জন্য রাসূল (স) দোয়া করলেন, আল্লাহুম্মা হাব-বাব ইলাইনাল মাদীনা কা হুব্বনিা মক্কা আও আশদাদ। মদীনায় বরকত দানের জন্যও রাসূল (স) দোয়া করলেন, {হে আল্লাহ! মক্কায় যতটুকু বরকত রয়েছে, মদীনায় তার দ্বিগুণ বরকত দাও} (সূত্র)। মদীনা দাজ্জাল থেকে সুরক্ষিত। মদীনার দুঃখ-কষ্টে ধৈর্য্যধারনের জন্য রয়েছে বিশেষ পুরস্কার।

মদীনা ছিল নিচু ভূমি। শীতের সময় এখানে প্রচন্ড ঠান্ডা পড়তো। মক্কা থেকে আগত সাহাবীরা অসুস্থ হয়ে পড়তো,সেখানে বসবাস করা তাদের জন্য খুব কঠিন হত। এ কারণে রাসূল (স) বললেন, যে ব্যক্তি মদীনার কষ্ট ও বালা-মুসিবতে ধৈর্যধারণ করবে, ক্বিয়ামতের দিন আমি তার পক্ষে সাক্ষ্য দেব কিংবা তার জন্য শাফায়াত করব। (সূত্র) রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মদীনার কষ্ট ও বালা-মুসিবতে ধৈর্যধারণ করবে, ক্বিয়ামতের দিন আমি তার পক্ষে সাক্ষ্য দেব কিংবা তার জন্য শাফায়াত করব।’ (সূত্র)

যারা আন্তরিক তাদের দোয়া আল্লাহ কবুল করেন। ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা) মদীনায় শাহাদাত বরণের জন্য দোয়া করতেন। তিনি যখন মসজিদে নববীতে ফজরের নামাজ পড়াচ্ছিলেন, তখন একজন খ্রীস্টান তাকে ছুরিকাঘাত করে এবং তিনি শহীদ হিসেবে মৃত্যুবরণ করেন। আল্লাহর রাসূল (স) বলেন, যারা মদীনাবাসীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে, আল্লাহ তাদেরকে অদৃশ্য করে দেন যেভাবে লবন পানিতে অদৃশ্য হয়ে যায়। মদীনা পবিত্র, তাই এখানে গাছ কাটা, পশুহত্যা, লড়াই এবং অস্ত্রবহন নিষিদ্ধ।

আমার বিশ্বাস হিজরতের ঘটনা ইসলামে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ যে ইসলামিক ক্যালেন্ডার গণনা এখান থেকেই শুরু করা হয়ে এটা বোঝার জন্য এই ভ্রমণের কিছু বিষয় পাঠ করা অত্যাবশ্যক। আগেই বলেছি, এটা ছিল বহু-ঈশ্বরবাদ এবং দুর্নীতির ভূমি থেকে সেই ভূমিতে রাসূলুল্লাহ (স) এর পরিভ্রমণ যা তাঁকে মুক্তি এবং তার বাণী প্রচারের কাজে সহযোগিতা করার জন্য প্রস্তুত ছিল। তার নিজের জন্ম বা মৃত্যু তারিখকে ক্যালেন্ডারের সূচনা তারিখ বিবেচনা করা হয়নি। ইসলাম যে কর্মের ধর্ম এবং সকল কর্মের সেরা হল আল্লাহর নির্দেশনা অনুসরণ করা অসম্ভব বা কঠিন এমন স্থান থেকে আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলা সম্ভব এমন স্থানে গমন করা – তার ইঙ্গিত পাওয়া যায় এই ঘটনায়।

হিজরতের ধারণার মধ্যে এ কারণে প্রতিকী এবং আক্ষরিক উভয় অর্থই রয়েছে। প্রতীকী অর্থে আল্লাহ যা অপছন্দ করেন তা পরিত্যাগ করে যা পছন্দ করেন তা গ্রহণ করা হল হিজরত৷ হিজরত হল নিজের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আনা যা আল্লাহু সুবহানাহু তায়ালা এবং তার রাসূল (স) এর আনুগত্যকে প্রতিফলিত করে। হিজরত হল পাপ থেকে আল্লাহর আনুগত্যের দিকে প্রত্যাবর্তন করা। এই ধরনের হিজরত – সচেতনভাবে সব ধরণের অবাধ্যতা থেকে আল্লাহর আনুগত্যের দিকে – সকল মুসলমানের জন্য বাধ্যতামূলক। আক্ষরিক অর্থে হিজরত হলো মন্দ স্থান থেকে অপেক্ষাকৃত ভালো স্থানে স্থানান্তরিত হওয়া। নিখুঁত বলে কোন জায়গ নেই এমন চিন্তার মাধ্যমে শয়তান আমাদের থামিয়ে দিতে চায় কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কিছু জায়গার এমন কতগুলো সহজাত সমস্যা রয়েছে যা ইসলামের যথাযথ পরিপালনকে অসম্ভব করে তোলে। আমাদের প্রত্যেকেরই কি করা উচিত সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।

দাওয়াহ’র ইতিহাসে হিজরত একটি বাস্তবতা। বহু আম্বিয়াকে তাদের নিজ জনপদ থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। কতককে হত্যা কর হয়েছে। আম্বিয়া ছিলেন না এমন বহু ব্যক্তি যারা সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে এবং সত্যের এই বিরোধিতা চলছে। ওয়ারাকা বিন নওফেল নবুয়্যতের ঘটনা শুনে এই বিরোধিতা সম্পর্কে ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন। এ কারণেই হিজরতের পুরস্কার এত বেশি।

কোরআনকে আল ফুরক্বান বলা হয় কারণ এটি সত্যকে মিথ্যা হতে পৃথক করে। বদরের যুদ্ধকে একই কারণে আল ফুরক্বানও বলা হয়। ইসলাম এসেছে সত্যকে প্রচার করতে এবং মিথ্যাকে নিষিদ্ধ করতে যেন সকল মানুষ একটি নৈতিক সমাজে শান্তিতে এবং মিলেমিশে বসবাস করতে পারে। শয়তান এবং তার অনুসারীরা এর বিরোধিতা করে এবং ভবিষ্যতেও করতে থাকবে। এই সংগ্রাম আদ্যিকালের। ইসলাম সবসময়ই তার অনুসারীদের সত্য এবং মিথ্যার মধ্যে বাছাই করতে বলে, তাই আমাদের প্রস্তুত থাকা উচিত।

মুহাম্মদ (স) ই সেই ব্যক্তি যে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একক এবং একমাত্র স্রষ্টার কাছ থেকে সমগ্র মানবজাতির জন্য ভালোবাসা, দয়া এবং ক্ষমার বাণী নিয়ে এসেছে।

শহরের নিকটবর্তী হতেই আমরা রাসূলুল্লাহ (স) এর কবর মসজিদে নববীর মিনার দেখতে পেলাম। রাসূল (স) যে পথ ধরে মদীনায় হিজরত করেছিলেন সেই একই পথ ধরে আমরা চলছি। সৌদি আরবের বাদশা ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ মক্কা থেকে মদীনায় যাবার মহাসড়ক নির্মানের সময় রাসূলুল্লাহ (স) এর হিজরতের রাস্তা হুবহু অনুসরণ করার উপর জোর দিয়েছিলেন। রাস্তাটি সহজতম ছিল না এবং অনেকগুলো গিরিখাদ অতিক্রম করতে হয়েছিল ফলে বিশাল পরিমান ব্যায়ে এটি নির্মিত হয়। বর্তমানকালে মুসলমানরা সেই পথ অনুসরণ করতে পারে যা রাসূল (স) চৌদ্দশত বছর আগে করেছিলেন।

অবশ্য একালে আমরা এয়ার কন্ডিশনের আরামে ভ্রনণ করি আর রাসূলুল্লাহ (স) এবং তার সাথীরা সেই পথে পায়ে হেঁটেছেন, গিরিখাদের খাড়া প্রান্ত ধরে উঠেছেন এবং নেমেছেন। এ সকল গিরিখাদের উপর স্থাপিত কোন একটি সেতুর উপর দাঁড়িয়ে খাদগুলো কতটা গভীর তা অনুধাবন করার পরামর্শ থাকল। তার জীবন সহজ ছিল না, তিনি ছিলেন খুব কঠিন একজন মানুষ – একজন যোদ্ধা এবং একজন ব্যক্তি যে তার লক্ষ্যের প্রতি সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

আগেই বলেছি, তার সীরাতে (জীবনী) খুব সহজভাবে লেখা হয়: তিনি মক্কা থেকে মদীনায় স্থানান্তরিত হলেন। এই ক্ষুদ্র বাক্যটি স্থানান্তর (মাইগ্রেট) শব্দের অর্থ – শারীরিক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক – সামান্যটুকুও প্রকাশ করে না। এর অর্থ মাতৃভূমিকে, নিজের শহরকে, পিতৃপুরুষের ভূমিকে ত্যাগ করা। গোষ্ঠীবদ্ধ কোন সমাজে নিজের জন্মভূমি থেকে উৎখাতের চেয়ে বড় কোন শাস্তি হতে পারে না। কোন উপজাতি তার সবচেয়ে খারাপ অপরাধীর ক্ষেত্রেও গোত্রের নিরাপত্তার বাহিরে রাখার এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না। অথচ তারা মুহাম্মদ (স) এর ক্ষেত্রে, যে কোন অপরাধ করেনি, এই কাজটিই করলো।

গোত্রের প্রতি আনুগত্য সর্বাগ্রে – এমনকি ন্যয়বিচার এবং নিরপেক্ষতার চেয়েও। সেযুগের গোত্রীয় সমাজে জ্ঞাতিজনকে সহযোগিতা করতে হতো – ভুল বা শুদ্ধ যাই হোক না কেন। বহু বছর পরে রাসূলুল্লাহ (স) এই ঐতিহ্যকে খুব গুরুত্বপূর্ণ এক শিক্ষাদানের জন্য প্রয়োগ করেছিলেন।

তিনি বলেন: তোমার ভাইকে সহায়তা করো – সে ভুল বা সঠিক যাই হোক। তার সাথীরা জিজ্ঞেস করলো, সে যদি সঠিক হয় তবে তাকে সহায়তা করার ব্যাপারটি আমরা বুঝতে পেরেছি কিন্তু সে যদি ভুল হয় তাহলে কিভাবে সহায়তা করবো? তিনি জবাব দিলেন, তার ভুল কাজকে বন্ধ করার মাধ্যমে তাকে সহায়তা করবে। অন্যথায় আল্লাহ তায়ালা তাকে শাস্তি দিবেন। যদি তুমি তার মন্দ কাজ বন্ধ করো, তবে তুমি তাকে সহায়তা করলে। অথচ তার নিজের গোত্র সকল সহায়তা তুলে নিল, তিনি কোন ভুল করেছেন এ কারণে নয় বরং তিনি তাদের সহায়তা করতে চেষ্টা করছিলেন এই কারণে। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, বর্তমানেও মানুষ সেই অজ্ঞতার যুগে ফেরত গিয়েছে যেখানে বর্ণ, জাতীয়তা এবং গোত্রবাদ সত্য এবং ন্যয়বিচারে আগে গুরুত্ব পায়। অবিচার এবং নির্যাতনের এমন অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে মুহাম্মদ (স) এর শিক্ষা মানুষের পথ দেখানোর জন্য বাতিঘরের ন্যয়।

পৃথিবীর নিয়ম বড়ই অদ্ভুত এবং এর পরিবর্তন হয় না। যে বার্তাবাহক তোমার মুক্তির বার্তা বয়ে এনেছে তাকে হত্যা করো – এই নিয়ম আজও চলছে।

সুতরাং মাইগ্রেশন বা হিজরত সত্যিকার অর্থে অভিবাসন ছিল না, ছিল তাঁর সবচেয়ে ভালোবাসার জায়গা থেকে উচ্ছেদ হওয়া। যেখানে তার একটি পরিচিতি ছিল, যার প্রত্যেকটি জায়গা তিনি চিনতেন, প্রত্যেকটি ঘর, টিলা, উপত্যাকার সাথে তাঁর স্মৃতি জড়িত। এমন স্থান যেখানে তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন এবং জীবনের তেপ্পান্নটি বছর পার করেছেন। এখানে তিনি তার প্রিয়তমা স্ত্রী হযরত খাদিজা (রা) কে বিবাহ করেছিলেন যিনি তার সন্তানের জন্ম দিয়েছেন এবং যখন তার সহায়তায় জনগণের মধ্য থেকে কেউ ছিল না তখন তার সাহায্যকারী ছিলেন। এখানেই তাঁর সহধর্মিণী সায়্যিদিনা খাদিজাতুল কুবরা (রা) এবং তাঁর গভীর সমর্থক চাচা আবু তালিবের মৃত্যুতে তিনি গভীর দুঃখ পেয়েছেন৷ মক্কা হল সেই স্থান যেখানে তার সন্তানাদি জন্মগ্রহণ করেছে ও বড় হয়েছে, সেই জায়গা যেখানে ধনী ও দরিদ্র, সুখী ও দুঃখী ছিলেন। A place where he was loved, revered and then reviled –all in the course of conveying the message which intends only good for all mankind. সুতরাং তিনি মক্কা ত্যাগ করলেন। সেখানে তার কাজ কঠিনতম হয়ে উঠেছিল এবং নিকৃষ্ট বিরোধীদেরকে আকৃষ্ট করছিল। একারণেই রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, সকল নবীকেই বিরোধিতা ও নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে এবং আমি সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত।

Allah himself mentioned this tendency of people to mindlessly fight that which is most beneficial to them – Hidaya (guidance) –when He said after narrating the incident of the man who was killed when he invited his people to follow the Messengers.

Ya-Seen 36:30. Alas for mankind! There never came a Messenger to them but they mocked him.

হিজরত বলতে নিজের পরিবারকে এমন স্থানে ফেলে আসাকেও বোঝায় যেখানে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। এর মানে নিজের সহায় সম্পত্তি বলতে যা কিছু আছে তা ফেরত পাবার আশা না করে ফেলে আসা। এর মানে হলো বছরের উষ্ণতম সময়ে মরুভূমির উপর ৪৫০ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে চলা, পেছনে তাড়া করে আসছে পুরস্কারলোভী শিকারীরা কারণ তার মাথার জন্য একশ উট পুরস্কার ঘোষনা করেছে তারই গোত্রের লোকেরা। এই পুরস্কারের পরিমান বিশাল, এ কারণে বহু মানুষ তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত ছিল তার বিগত তের বছরের নবীত্বের, তার সংগ্রামের, পর্যালোচনা।

আমরা কেবল সমান্য কিছু সফলতা ছাড়া কেবল ব্যার্থতার পর ব্যার্থতা দেখতে পাই। এটি একজন নবীর জন্য খুবই হৃদয়বিদারক ব্যাপার। নবীদের হৃদয় তাদের রবের সাথে সম্পর্কের ভিত্তিতে মজবুত হয়। তাদের জীবন আমাদেরকে কষ্টসহিষ্ণু হতে শিক্ষা দেয়।

The ability to face the brutal facts, yet have absolute faith in eventual success, when there is no evidence to show that you can or will succeed.

মদীনার নিকটবর্তী হলে রাসূল (স) কি দেখতে পেয়েছিলেন আমি তা কল্পনা করার চেষ্টা করলাম। আমরা এখন যে বিশালাকৃতির উঁচু দালানগুলি দেখতে পাই তা তো অবশ্যই নয়। তিনি হয়তো কেবল বালি আর খেজুর গাছ দেখতে পেয়েছেন, গাঢ় সবুজ রঙ এর ফর্ণ জাতীয় গাছ বাতাসে দুলে দুলে তাকে স্বাগত জানাচ্ছিল। দূরে, মাটির তৈরি ঘরের গ্রামটি দেখা যায় যা তার বাণী প্রচারের কেন্দ্রস্থল হতে যাচ্ছে। ছোট্ট সেই গ্রামটি এখন সম্পুর্ণই মসজিদে নববীর সুন্দর অবকাঠামোর অন্তর্ভূক্ত। মহান আল্লাহর বিজ্ঞতার কি অপূর্ব নিদর্শন, রাসূল (স) মদীনার যে মাটিকে বিশ্বাস করেছেন, হেঁটেছেন তার প্রতিটি ইঞ্চি এখন সিজদার স্থান। জায়গাটির এই গুরুত্বের কারণ হল এর অধিবাসীরা আল্লাহর রাসূল (স) এর প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

ছোট্ট এই গ্রাম থেকে এমন এক আলো ছড়িয়ে পড়েছিল যা সেই সময়কার পুরো বিশ্বকেই আলোকিত করেছিল এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরবর্তী প্রজন্মকে আলোকিত করে চলছে। এমন অভাবনীয় কাজ করতে বাতির বাহক কি এমন করেছিল? তার মহিমান্বিত জীবন থেকে নেতৃত্বের কি শিক্ষা আমরা গ্রহণ করতে পারি? রাসূল (স) এর সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা নিজে বলেছেন তার জীবন সমগ্র মানবজাতির জন্য আদর্শ। The life of Rasoolullah  is the one that Allah  quoted as the example for all mankind and so the lessons to be learnt from it are legion. Nobody can claim to do full justice to that and neither do I.

এই বইয়ে আমি তাঁর মহিমান্বিত জীবনের কিছু দিক তুলে ধরে নেতৃত্বের কি শিক্ষা গ্রহণ কর যায় তা দেখার এবং আপনাদের জানানোর চেষ্টা করেছি। আমাদের বর্তমান ক্রান্তিকালের সবচেয়ে বড় ও দৃশ্যমান ঘাটতি হল জবাবদিহিতা, ন্যায়পরায়ণতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের অনুভূতিসম্পন্ন আদর্শিক নেতৃত্ব। সারাবিশ্বে আদর্শিক নেতৃত্বের অভাব খুবই প্রকট।

আমরা বর্তমানে যে দুনিয়ায় বসবাস করছি এবং ভবিষ্যতের যে দুনিয়ার সম্মুখীন তা খুবই জটিল। এখন তথ্য পূর্বের যে কোন সময়ের তুলনায় সহজে পাওয়া যায়। ক্ষমতা অভিজাত শ্রেণির হাতে কুক্ষিগত হয়ে আছে। এই পৃথিবীর টিকে থাকা না থাকা যে বিষয়গুলোর উপর নির্ভরশীল তা এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্থ যে এদের পুনরুদ্ধার প্রায় অসম্ভব। আমরা যে সমাজে বাস করি সেটা অর্থনৈতিক, জাতিগত, জাতীয়তা, ধর্ম এবং ক্ষমতার রেখায় বিভক্ত। এবং এই বিভক্তি ক্রমাগত বাড়ছে।

বস্তুগত দিক বিবেচনায়, যেমন গ্যাজেট, যন্ত্রপাতি, সম্পদ এবং অর্থ, আমরা সম্ভবত আগের যে কোন সময়ের তুলনায় প্রাচুর্যের মধ্যে আছি। আমাদের যা নেই তা হল নৈতিক ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের, যাদের কম রয়েছে তাদেরকেও অন্তর্ভূক্ত করে এমন মানদণ্ড। বস্তুগত সম্পদ জমা করার চেয়ে সততার উপর অধিক গুরুত্বারোপ করে, স্বল্পমেয়াদী কৌশলের তুলনায় দীর্ঘমেয়াদী Criteria that place greater importance on integrity than on accumulating material wealth. Criteria that focus on the long term impact of short term strategies. Criteria where we hold ourselves accountable for our actions, even if nobody else does. Criteria where we stand by our word, live by our creed and act according to our values; concerned about leaving a legacy of honor for those who will come after us.

রাসূলুল্লাহ (স) এর সীরাত অধ্যয়নকালে আমরা অনুধাবন করতে পারি যে ট্রেণ্ড, ফোকাস এবং সমস্যার ক্ষেত্রে তাঁর সময়ের পৃথিবী এবং আমাদের বর্তমান পৃথবী হুবহু এক। এটা তাঁর জীবন থেকে নেতৃত্বের শিক্ষা গ্রহণের জন্য আশাব্যঞ্জক কারণ সেই সময়ের সমস্যাগুলো যদি আমাদেরগুলোর মত হয় এবং সেগুলো তার পদ্ধতি অনুযায়ী সমাধান করা হয়, তাহলে আমাদের বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে, সেই পদ্ধতিগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী অতিক্রম করে আমাদের কাছে এসেছে যখন আমরা বিভিন্ন শক্তির নেতিবাচক প্রভাবে ঘূর্ণিপাক খাচ্ছি। নতুন এবং পরীক্ষামূলক কোন তত্ত্বের তুলনায় প্রয়োগকৃত ও পরীক্ষীত কোন উপায় শ্রেয়তর। বিশেষ করে যখন সেই উপায়টি ঐশ্বরিক এবং যিনি প্রয়োগ করেছেন তিনি ঐশ্বরিক সহযোগিতাপ্রাপ্ত। এ ধরনের উপায় কখনো ব্যর্থ হবার নয়।

আল হিজাজ এবং তৎকালীন সমাজ

ইসলাম পূর্ব যুগে আল হিজাজ নামে পরিচিত অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ কিছু উপাদান সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করছি। হিজারে প্রধান শহর ছিল মক্কা, আল্লাহর ঘর বা কা’বা শরীফের কারণেই এর গুরুত্ব বেশি ছিল। মুহাম্মদ (স) এর জন্মের সময় আরবের শহরাঞ্চলের অধিবাসীরা, বিশেষ করে মক্কার কুরাইশ এবং তায়েফের বনু তাকিফ গোত্র, উত্তরদিকে শ্যাম (সিরিয়া, জর্দান, ফিলিস্তিন, লেবানন) এবং দক্ষিণদিকে ইয়েমেনের সাথে সমৃদ্ধ ব্যবসার কারণে বেশ ধনী এবং ক্ষমতাবান ছিল। তাদের এই সমৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিককালের। আরব উপত্যাকার (জাজিরাতুল আরব) গোত্রগুলো এক প্রজন্ম আগেও যে দারিদ্র‍্য ছিল সেটা মনে রেখেছিল এবং তার সমৃদ্ধি নিয়ে খুব গর্বিত ছিল।

ধর্ম ছিল তাদের ব্যবসায়ের প্রসার, ক্ষমতা আর সম্পদ আহরনের একটা উপায় মাত্র, সকলের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিতের লক্ষ্যে মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণের উপায় নয়। দেব-দেবীদের কারণে কা’বায় তীর্থযাত্রীরা উপস্থিত হত এবং এদের সংখ্যা যত বেশি তাদের জন্য তত ভালো। ক্লক্রমে এদের সংখ্যা এত বেড়ে গেল যে শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে হযরত ইব্রাহিম (আ) যে ঘর নির্মাণ করেছিলেন তার ভিতরে ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল। মক্কা ছিল ব্যবসা এবং তীর্থকেন্দ্র, তাই মক্কার স্থানীয় সম্পদশালী ও ক্ষমতাবান বাণিজ্যপ্রধানদের সমৃদ্ধির অন্যতম উৎস ছিল তীর্থযাত্রা ও এর আনুষঙ্গিক কার্যাবলী।

বস্তুগত সম্পদ ছিল প্রাথমিক এবং একমাত্র বিবেচ্য। এটি ছিল সামাজিক মান-মর্যাদার প্রতীক। কে কি পোষাক পড়ল, কি সুগন্ধী ব্যবহার করল, কার কতজন দাস ও ভৃত্য রয়েছে, কি ধরনের বাহন ব্যবহার করে ইত্যাদি বিষয় ছিল আলোচনার বস্তু এবং যারা তাদের মত হতে চায় তাদের কল্পনা এবং ভাবনার খোরাক। The phrase, ‘If you got it, flaunt it,’ may not have been known then but lifestyles certainly reflected this philosophy. ঔদ্ধত্য ছিল ক্ষমতাবানদের অধিকার এবং তাদের অবাধ শোষনের ক্ষমতা ছিল মর্যাদার প্রতীক। যারাই তাদের প্রতিবাদ করেছে তারাই তাদের ক্রোধানলে পতিত হয়েছে। Self-indulgence was the right of those who had wealth and no law regulated what they could or couldn’t do. মাত্র এক প্রজন্ম আগেই তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল খুবই ভিন্নরকম। তাই যারা সম্পদশালী হয়ে গেছে তাদের নিজেদের স্মৃতিতে অসুখী দিনগুলো রয়ে গিয়েছিল এবং তাই তাদের সম্পদের ব্যাপারে তারা খুবই স্পর্শকাতর ছিল। অর্থই ছিল একমাত্র বিবেচ্য এবং অর্থ অর্জিত হলে একমাত্র চিন্তা হতো কি উপায়ে এর ভোগ করা যায়। এই ভোগের কোন নির্দিষ্ট সীমানা ছিল না, সীমানা নির্ধারিত হতো কি পরিমান অর্থ রয়েছে তার উপর। দরিদ্ররা সম্পদশালোদের দ্বারা খুবই নির্মমভাবে নির্যাতিত হতো। দাস এবং নারীদেরকে পণ্যের ন্যায় ব্যবহার করা শেষে কোনরূপ চিন্তা বা মন্তব্য ছাড়াই ছুঁড়ে ফেলা হতো।

দাসপ্রথা ছিল বিস্তৃত। নারীদেরকে সম্পত্তির ন্যায় ক্রয়, বিক্রয় এবং উত্তরাধিকারসূত্রে অধিকার করা এবং ইচ্ছামত ত্যাগ করা যেতো। মুহাম্মদ (স) এর সময়কার সমাজ ছিল গোত্রভিত্তিক পুঁজিবাদী সমাজ যেখানে সফলতার একমাত্র মাপকাঠি ছিল ক্ষমতা এবং সম্পদের পুঞ্জিভূতকরন। নৈতিক মূল্যবোধের প্রকট অভাব ছিল। বেশ্যাবৃত্তি ছিল বিস্তৃত এবং সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য। নারীদের কোন অধিকার ছিল না, তাদেরকে অস্থাবর সম্পত্তি হিসেবে গন্য করা হতো যার সবচেয়ে জঘন্যরূপ হল কন্যাশিশু হত্যা। যারা জীবিত কবরস্থ হওয়ার মত ভয়ংকর পরিণতি থেকে বেঁচে যেতো, তারা বড় হয়ে উঠতো পুরুষের ভোগ্যসামগ্রী হিসেবে ব্যবহার, নাহয় সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহারের জন্য। গোত্র এবং জাতীয়তা, বর্ণ এবং বংশ পরিচয়কে সব কিছুর চেয়ে গুরুত্ব দেয়া হতো। কিছু নারীর সমাজিক মর্যাদা এবং প্রতিপত্তি থাকলেও এগুলো ছিল নিয়মের ব্যতিক্রম। জীবন ছিল কদর্য, নিষ্ঠুর এবং সংক্ষিপ্ত।

অর্থ ছিল ক্ষমতা এবং যাদের তা কম তারা গোত্রীয় সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে দুর্বল ছিল। দাসরা ছিল কঠিন নিপীড়নের শিকার এবং ক্ষমতাসীন অভিজাত সম্প্রদায়ের করুণার বস্তু। মুহাম্মদ (স) যে গোত্রের অন্তর্গত ছিলেন সেই মক্কার কুরাইশরা ব্যবসায়ী ছিলেন, পাশাপাশি অতিরিক্ত এবং অন্যান্য গোত্রের সাথে খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে পার্থক্য ছিল তা হল তারা ছিল কা’বার তত্ত্বাবধায়ক। In today’s terms they were merchant priests who regulated worship at the Ka’aba and were revered as a result of their association with the chief house of worship in Arabia. কুরাইশদের মধ্যে মুহাম্মদ (স) এর পরিবার, বনু হাশিম, ছিল সবচেয়ে সম্মানিত এবং পবিত্র জমজম কূপের রক্ষক হিসেবে তারা তীর্থযাত্রীদের খাবার ও পানীয় সরবরাহের মাধ্যমে সেবা করার বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল। This special position also gave Quraysh protection in a society which existed on the time honored principle of raiding each other.

কুরাইশদের বাণিজ্য কাফালা শীতকালে দক্ষিণে ইয়েমেন পর্যন্ত এবং গ্রীষ্মে উত্তরে শ্যাম পর্যন্ত নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতো। যে সকল গোত্রের পেশা ছিল এ ধরণের বাণিজ্য কাফেলা আক্রমণ করা, তাদের থেকেও কুরাইশদের কাফেলা নিরাপদ ছিল, কারণ তারা হলো কা’র তত্ত্বাবধায়ক এবং প্রধাণ ধর্মযাজক। Makkan aristocracy was an aristocracy of rich merchants and not the usual hereditary aristocracy of land owners and royalty that we see elsewhere. It was a society where upward mobility was comparatively easy. If you made enough money you could rise in society and enjoy its benefits. So acquisition of material wealth was the single primary focus of all people. Religion was a means of getting rich.

আগেই বলেছি, আমরা যদি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করি তাহলে দেখতে পারবো আমাদের বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার সাথে এর কত গভীর মিল। হিজাজের আরবদের ন্যায় এযুগে হয়তো সেই অর্থে দাসপ্রথা নেই কিন্তু আমাদের দাসপ্রথা আরও শক্তিশালী কারণ এটা প্রকৃতিতে মতাদর্শভিত্তিক (ideological) এবং সারা বিশ্বে বিস্তৃত। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এর মূল্যবোধ প্রচারের মাধ্যমে একে আরও শক্তিশালী করে তুলছে। এটি এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যা মানুষকে এর ভিতরে বন্দী করে এবং স্বাধীনতা ও সমতার আদর্শের কারণে এটি যেন হুমকীর মুখে না পড়ে তা দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন নিশ্চিত করে৷ (We may not have slaves in the same sense that the Arabs of Al-Hijaz had but our slavery is even more powerful because it is ideological in nature, has global reach, is enforced by an education system which promotes its values, an economic system which locks people into it and an executive which ensures that it is not threatened by misplaced ideals of freedom and equality.)

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে, সেই সময়ের দুই পরাক্রমশালী হলো বাইজেন্টাইন (রোমান) সম্রাজ্য ও পারস্য সম্রাজ্য যারা যুদ্ধে লিপ্ত ছিল এবং কখনো এ পক্ষ কখনো ওই পক্ষ অপরের উপর জয়ী হতো। এদের কেউই আরব অঞ্চল শাসনের ব্যাপারে আগ্রহী ছিল না। এর কারণ মূলত ছিল আরবের শুষ্ক, চাষাবাদ অযোগ্য মরুভূমি আর কিছু মরুদ্যান শহর যেখানে যাযাবর কিছু গোত্র বসবাস করতো, আর ছিল দুইটি বাণিজ্যকেন্দ্র – মক্কা এবং তায়েফ। কর আদায় বা সৈন্য ও রসদ সংগ্রহ কিংবা প্রয়োজনে বিভিন্ন গোত্রকে বশে আনার জন্য অভিযান চালানো কোন কিছুর জন্যই আরব খুব ভালো কোন পছন্দ ছিল না। রোমান এবং পারসীয়রা এই অঞ্চলের আরবদের উপেক্ষা করায় তারা বিচ্ছিন্ন ছিল এবং কখনো অন্য কারও অধীন হয়নি।

আরবরা তাদের নিজস্ব গোত্রীয় আইন মেনে বাস করতো, তাদের নিজস্ব গোত্রপ্রধান দ্বারা পরিচালিত হতো এবং ঈর্ষনীয়ভাবে নিজের স্বাধীনতাকে রক্ষা করতো। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখানে উল্লেখ করা উচিত, তারা হল এমন মানুষ যারা কখনই কারও অধীন ছিল না, ফলে কারও অধীন ছিল এমন লোকদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য তাদের মধ্যে ছিল না। তাদের এই অনমনীয়তা এবং আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সত্ত্বেও প্রচণ্ড স্বাধীনচেতা মনোভাব প্রকট হয়ে উঠত। তারা ছিল এমন লোক যারা নিজেদের আইন কঠোরভাবে মেনে চলতো কিন্তু অন্যদের নিয়মকানুন গ্রহণ করতে আগ্রহী ছিল না।

তারা কখনোই কারও সামনে মাথা নত করেনি এবং এ নিয়ে তারা গর্বিত ছিল। ফলে যখন তারা আল্লাহর কাছে মাথা নত করল তখন তাদের মনে ছিল যে তারা কখনো মাথা নত করেনি, ফলে তাওহীদের সকল অর্থই তারা গ্রহণ করেছিল। মুহাম্মদ (স) এই বিশ্বজগতের স্রষ্টার কাছ থেকে যে মতবাদ গ্রহণ করেছিল তা ছিল মরুর বাতাসের মত বিশুদ্ধ, পরিষ্কার এবং সরল। ইসলাম যখন রাজাদের কাছে এলো এবং মুসলমানরা রাজ্য জয় করতে শুরু করল তখনই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক এবং দার্শনিক বিষয়গুলো আত্মভূত করতে শুরু করে যার সাথে মুহাম্মদ (স) এর ইসলামের কোন সম্পর্ক ছিল না।

আরবদের গোত্রভিত্তিক সমাজের প্রকৃতি এবং ইসলামের বাণীর বিরোধিতার ধরণ – এই উভয়ের বৈশিষ্ট্য মনে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের বার্তাকে ধরা হয়েছিল এমন কিছু যা তাদের স্বাধীনতাকে কেড়ে নিতে এবং তাদের যাজকতন্ত্র ও ক্ষমতার ভিত্তিকে পুনর্বিন্যাস করতে চায়।

মুহাম্মদ (স) এর সমকালীন আরব সমাজের এই সংক্ষিপ্ত চিত্র থেকে এটা স্পষ্ট হওয়া উচিত যে এর সাথে বর্তমানের প্রভাবশালী বৈশ্বিক সংস্কৃতির কত গভীর মিল। অর্থ-ক্ষমতার উপর অধিকতর গুরুত্ব, বিনোদন ও মুনাফার জন্য নারীদের অবজেক্টিফিকেশন (যদিও একে স্বাধীনতার নামে বিক্রি করা হচ্ছে), widespread promiscuity and license, নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, বস্তুগত সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতা, সমাজকে বর্ণ/জাতীয়তা ইত্যাদি রেখায় বিভক্তিকরণ এবং ন্যায়বিচার, নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের লক্ষ্যে যে কোন পদক্ষেপ – যে কোন ধর্ম যা করতে চায় – ইত্যাদিকে অপ্রয়োজনীয়, অবাঞ্চিত জ্ঞান করা হয় এবং এর তীব্র বিরোধিতা করা হয়। দরিদ্র ও দুর্বলদের কোন স্বর, ক্ষমতা এমনকি পরিচিতিও নেই এবং ধনীদের আরও ধনী হবার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে, তাদের এই অবস্থার কারণে বাকী দুনিয়ার কি পরিণতি হচ্ছে তার কোন ভাবনা নেই। গোটা দুনিয়া নিপীড়নের যাতাকলে পিষ্ট অথচ এর কোন সমাধান দেখা যাচ্ছে না।

এমন একটি সমাজেই মুহাম্মদ (স) জম্মগ্রহণ করেছিলেন এবং নেড়ে উঠেছিলেন, এই সমাজেই তিনি তার বাণী প্রচার করেছেন – এমন বাণী যা বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ বা অর্থনৈতিক মর্যাদা নির্বিশেষে সকলের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিতের লক্ষ্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে চায়। এই বাণীতে রয়েছে ব্যক্তির জন্য মর্যাদা, মানুষের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা এবং দুর্বলের জন্য সহানুভূতি। রয়েছে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্তি এবং মানুষের স্রষ্টার আইন-কানুনের প্রতি নত হওয়ার বার্তা যা সকলের জন্য নিশ্চিত করে শান্তি, সুসম্পর্ক এবং নিরাপত্তা। বর্তমানে এই বাণীর চেয়ে অধিক আর কী প্রয়োজন?

এমন বার্তা আমাদের নিদারুণভাবে প্রয়োজন কারণ বর্তমানে পৃথিবী যে সমাধান খুঁজছে তা এখানে আছে। এই প্রেক্ষাপটে যে সকল নেতৃত্বের শিক্ষা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে আমি বিশ্বাস করি তা ঘেঁটে বের করেছি এবং একটি আধুনিক, প্রয়োগ উপযোগী ফরম্যাটে উপস্থাপন করেছি। আমি বিশ্বাস করি শিক্ষার উদ্দেশ্য হল সে অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা এবং এর অন্যথায় জ্ঞান আমাদের উপকার করতে পারে না। তাই আমি অনুরোধ করবো নেতৃত্বের শিক্ষাগুলো নিজের জীবনে বাস্তবায়নের অভিপ্রায় নিয়ে এই বইটি পড়ুন।

আল্লাহর রাসূলের (স) জীবন থেকে যে বিষয়গুলো শিক্ষা নেয়া যায়ঃ
1. (Complete certainty)
2. সমঝোতা না করা (No compromise)
3. (Putting himself on the line)
4. (Resilience: Face the facts + Absolute faith in success)
5. সবার প্রথমে লক্ষ্য – ব্যক্তিগত পছন্দেরও আগে (Goal comes first – before personal preferences)
6. (Living his message)
7. ঝুঁকি গ্রহণ (Risk taking)
8. দীর্ঘমেয়াদের স্বার্থে স্বল্পমেয়াদী স্বার্থ ত্যাগ (Sacrificing short term for long term)
9. (Magnanimity and forgiveness)
10. ব্যক্তি-চালিত থেকে প্রক্রিয়া-চালিতে রূপান্তর (Transiting from Person – led to Process-driven)
11. উত্তরাধিকার পরিকল্পনা এবং নেতৃত্ব তৈরি (Succession planning & leadership development)

এই বইয়ের বাকী অংশে আমরা এগুলোর প্রত্যেকটি আলাদাভাবে কুরআন, সুন্নাহ এবং সীরাত থেকে প্রমাণসহ বর্ণনা করবো। আমি যতটুকু সম্ভব পরিষ্কারভাবে উপস্থাপনের জন্য মহান রাব্বুল আলামীনের সাহায্য ও সহযোগিতা এবং আমার ভুল ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

আল্লাহ ও তার বাণীতে পূর্ণ আস্থা

আল্লাহর রাসূল (স) এর প্রথম যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠে তা হল তার বাণীতে পূর্ণ আস্থার বিষয়টি; আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস এবং তিনি নিজে আল্লাহর রাসূল ও তাকে সমগ্র মানবজাতির কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেয়ার জন্য প্রেরণ করা হয়েছে।

দৃশ্যটি নিজের ক্ষেত্রে কল্পনা করুন৷ রাসূলুল্লাহ (স) সাফা পাহাড়ের উপর আরোহন করলেন এবং চিৎকার করে ডাকলেন, ‘হে সাথীরা!’ লোকজন এর চতুর্দিকের হারাম শরীফ এবং বাজারথেকে তার কাছে ছুটে এল, শুধু একারণে নয় যে এই বিপদের ডাক সবাইকে সবকিছু ফেলে রেখে জরুরীভিত্তিতে উপস্থিত হতে বলছে, একারণেও যে এই ডাক এসেছে মুহাম্মদ, আস সাদিক আল আমীন (সত্যবাদী এবং বিশ্বাসী – কুরাইশরা তাকে এই নামে ডাকতো) থেকে। সে যদি ‘হে সাথীরা!’ বলে ডাকে তাহলে সেটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং তারা সাফা পাহাড়ের পাদদেশে তার চারিদিকে জমায়েত হল। বর্তমানকালে আমরা যখন উমরাহ পালন করতে যাই এবং তাওয়াফ সম্পন্ন করার পর যখন সাফা পাহাড়ে সায়ী করতে যাই, আমাদের উচিত থেমে এই পাহাড় কি দেখেছে তা প্রতিফলিত করা। এটাই সেই স্থান যেখানে দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ (স) ইবরাহীম (আ) এর পরে প্রথমবার তাওহীদের বাণী ঘোষণা করলেন।

রাসূলুল্লাহ (স) তাদেরকে বললেন, হে লোকেরা, যদি আমি বলি যে একটি সৈন্যদল এই পাহাড়ের পেছনে অপেক্ষা করছে তাহলে কি তোমিরা আমাকে বিশ্বাস করবে?

তারা বলল, তুমি কখনো আমাদের সাথে মিথ্যা বলোনি এবং আমরা তোমাকে বিশ্বাস করবো। তিনি বললেন, আমি তোমাদেরকে (পরকালে) কঠিন শাস্তির ব্যাপারে সতর্ক করতে এসেছি (যদি তোমরা বহুঈশ্বরবাদ ত্যাগ এবং আল্লাহর ইবাদত না করো)।

আবু লাহাব ছিলেন আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ (স) এর সবচেয়ে নিকটতম আত্মীয়, তার পিতার ভাই। তিনি তাদের অনেকের পক্ষে বললেন, তাব্বাল-লাকা সারাল ইয়াওমা-লি হাতা জামাত্না? (বাকী জীবনে তোমার অনিষ্ট হোক, তুমি কি এজন্যে আমাদেরকে জমায়েত করেছো?) আবু লাহাবের মতে আখিরাতের কথা বলা মানে সময়ের অপচয় এবং তাকে দোকান হতে ডেকে আনাকে ক্ষতি বলে বিবেচনা করলেন। এ ধরনের ব্যক্তি পৃথিবীর যে কোন বিষয়ে কথা বলতে আপত্তি করে না কিন্তু আখিরাতের মুক্তি নিয়ে যত আপত্তি। এই যুগেও আপনি যদি কিভাবে মিলিয়ন ডলার আয় করা যাবে তা নিয়ে কথা বলেন, তাহলে মানুষ যেভাবেই হোক সময়ে বের করে নিবে, এমনকি আপনার কথা শোনার জন্য অর্থও প্রদান করবে। কিন্তু আপনি যদি তাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি এবং জান্নাতে প্রবেশের উপায় সম্পর্কে বলতে চান, তাহলে তারা তাদের সময় নষ্ট করার ব্যাপারে আপনাকে অভিযুক্ত করবে।

আবু লাহাব আখিরাত নিয়ে কিথা বলাকে সময়ের অপচয় এবং তকে দোকান থেকে ডেকে আনাকে ক্ষতি বলে মনে করলেন, তাই তিনি তার ভাতিজাকে অভিশাপ দিলেন। কিন্তু তার ভাতিজা ছিলেন আল্লাহর রাসূল (স) এবং যারা আল্লাহর রাসূলকে অভিশাপ দেয় আল্লাহ তাদের পছন্দ করেন না। তাই আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা বলেন,

১) আবু লাহাবের হস্তদ্বয় ধ্বংস হোক এবং ধ্বংস হোক সে নিজে, ২) কোন কাজে আসেনি তার ধন-সম্পদ ও যা সে উপার্জন করেছে। ৩) সত্বরই সে প্রবেশ করবে লেলিহান অগ্নিতে (সূরা লাহাব ১১১ঃ১-৩)

কুরআনের উৎস যে ঐশ্বরিক এই সূরাটি তার অনেক প্রমাণের একটি, যারা প্রমাণ খুঁজতে চায় তাদের জন্য, কারণ আবু লাহাব যে অমুসলিম অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে এখানে সেই ভবিষ্যতবাণী করা হয়েছে।

কুরআনকে মিথ্যা ‘প্রমাণ’ করার জন্য আবু লাহাবের জন্য এটুকুই যথেষ্ট ছিল যে সে শুধুমাত্র ইসলাম গ্রহনের ভান করবে, তাহলেই এই ভবিষ্যতবাণী মিথ্যা প্রমাণিত হতো। কিন্তু সে তা করেনি এবং বহু বছর পরে সে ইসলাম গ্রহণ ব্যাতিরেকেই খুবই ভয়ংকর এক রোগে মৃত্যুবরণ করে এবং তার মৃতদেহে পচন ধরে কারণ মানুষ তাকে কবরস্ত করার জন্য ধরতেও চায়নি৷ তিনদিন পরে তার ছেলেরা লম্বা লাঠির সাহায্যে তার শবদেহটি একটি গর্তে ফেলে দেয় এবং পাথর ছুঁড়ে গর্তটি ভর্তি করে। অর্থ্যাৎ আবু লাহাবকে তার নিজের ছেলেরাই পাথর মারে এবং মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি মোতাবেক জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে।

প্রথম যে নেতৃত্বের শিক্ষা আমরা পাই তা হল নেতার তার নিজের উপর পূর্ণ আস্থা থাকা জরুরী। নিজের ভিশন, কৌশল, পদ্ধতি এবং এই বিশ্বাস থাকা যে তাকে কেউ অনুসরণ করলে নিশ্চিতভাবে সে উপকৃত হবে। নেতা যদি এ বিষয়ে সামান্যতম সন্দেহও প্রকাশ করে তার নেতৃত্বের ক্ষমতা খুবই ক্ষতিগ্রস্থ হবে। মানুষ তাদের নেতাকে বিভিন্ন কারণে অনুসরণ করে – কেউ করে কারণ তারা তার বাণী বিশ্বাস করেছে, কেউ করে কারণ নেতা ক্ষমতাবান বার কেউ নেতার বিভিন্নরকম সম্পর্কের কারণে অনুসরণ করে।

নেতা যদি তার পথে অটল থাকেন তবে ক্রমান্বয়ে তার অনুসারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং বিন্দু সিন্ধুতে পরিণত হয়। অটল অবিচল থাকা এর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

নবীত্বের ২৩ বছরের কঠিনতম সময়েও একটি ঘটনার অস্তিত্ব পাওয়া যাবে না যেখানে মুহাম্মদ (স) তার বাণী এবং দায়িত্ব থেকে বিন্দুমাত্র নড়াচড়া করেছেন। এটাও একটি অলৌকিক ব্যাপার এবং রাসূল (স) এর উপর প্রদত্ত ঐশ্বরিক মিশনের প্রমাণ। এই বিশ্বাস এবং এর সাথে মুহাম্মদ (স) এর মহৎ গুণাবলী, সত্যবাদী ও বিশ্বাসী হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি, সুন্দর ব্যবহার, নিষ্কলংক চরিত্র, সুগভীর প্রজ্ঞা, অসাধারণ বিচক্ষণতা এবং সুবিশস্ল মহানুভবতা তাকে খুবই বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিল। অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল, এ কারণে নয় যে তারা তার আহবানে ঈমান এনেছে, বরং তারা মুহাম্মদ (স) কে বিশ্বাস করে এবং বিশ্বাস করে যদি তিনি কথা বলে থাকেন তবে অবশ্যই একথা সত্য। এ থেকে বার্তাবাহকের ব্যক্তিগত চরিত্রের গুরুত্ব স্পষ্ট এবং এর চেয়ে অন্য কিছু বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয় বা তার বার্তা প্রচারে সহায়ক হতে পারেনা।

বর্তমানের দুনিয়ায় ইসলামিক দাওয়াহ সংগঠনগুলো ইসলামের দিকে আহবান জানানোর জন্য ভালো মন্দ সব ধরনের পদ্ধতি অনুসরন করে। আম্বিয়া কেরামের দাওয়াহ পদ্ধতি এবং তার বৈশিষ্ট্য মনে করিয়ে দেয়া যেতে পারেঃ তারা এ কাজ করেছিলেন কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এবং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ, কোন উপায়েই মানুষের কাছ থেকে কোন প্রতিদানের আশা করেননি।

মহান আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা তার নবীদের সম্পর্কে বলেনঃ

এরা এমন ছিল, যাদেরকে আল্লাহ পথ প্রদর্শন করেছিলেন। অতএব, আপনিও তাদের পথ অনুসরণ করুন। আপনি বলে দিনঃ আমি তোমাদের কাছে এর জন্যে কোন পারিশ্রমিক চাই না। এটি সারা বিশ্বের জন্যে একটি উপদেশমাত্র। (সূরা আনআম ৬ঃ৯০)

নবীগণ অনুসৃত হবার জন্যই এসেছেন এবং তাদের পথই একমাত্র পথ যা আল্লাহ সুবাহানাহুতায়ালা স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং তাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন৷

নবীদের দাওয়াহ’র নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো ছিলঃ

১। সরল ও সুস্পষ্ট, আপোষহীন
২। কোন কুণ্ডলীকৃত জটিল দর্শন নেই
৩। আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালার ক্ষমতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল
৪। একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করা
৫। মানুষের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা না করা
৬। শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করা

বার্তাটি তাহলে কি ছিল?

১৪৪৭ বছর আগে জান্নাতের একটি জানালা খুলে দেয়া হয়েছিল এবং আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা মানুষের সাথে কথা বলেছিলেন। জীবরাঈল (আ) নবীকরীম মুহাম্মদ (স) এর নিকট এসে তাকে আলিঙ্গন করলেন এবং বললেন, ‘ইকরা’ (পড়)। মুহাম্মদ (স) বললেন, ‘আমি পড়তে পারি না’। এমনটি তিনবার ঘটল৷ তারপর জীবরাঈল (আ) তাকে যে বার্তাসহ পাঠানো হয়েছে তা হস্তান্তর করলেন এবং সুরা আলাকের প্রথম আয়াত পাঠ করলেন; কুরআন শরীফের প্রথম আয়াতগুচ্ছ নাজিল হল।

১) পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন ২) সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। ৩) পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু, ৪) যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন, ৫) শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না। (সূরা আলাক ৯৬ঃ১-৫)

এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা এবং তার রাসূলের মাঝে এটাই প্রথম আলাপ; যা তাঁর আরেকজন বার্তাবাহক জীবরাঈল (আ) এর মাধ্যমে প্রেরণ করা হয়েছে। এটি ছিল দুইটি ভিন্ন মাত্রার দুই ধরণের সৃষ্টির সাক্ষাৎ৷ মুহাম্মদ (স) এর জন্য এই ধরণের সাক্ষাৎ প্রথম তাই স্বাভাবিকভাবেই তিনি বেশ ভীত হয়ে পড়লেন।

মুহাম্মদ (স) খুব ভীত অবস্থায় কাঁপতে কাঁপতে বাড়িতে তার স্ত্রী হযরত খাদিজা (রা) এর কাছে গেলেন এবং বললেন, ‘জাম্মিলুনি, জাম্মিলুনি’ ( আমাকে কিছু দিয়ে আবৃত করে দাও)। তিনি ধারণা করেছিলেন যার সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে সে জ্বীন, তাই তিনি ভীত ছিলেন। জ্বীন ও যাদুকরের সাথে মিলে কিছু করতে তিনি ঘৃণা করতেন। তিনি তার সাথে যা ঘটেছে তা বর্ণনা করলেন এবং বললেন, তিনি ভয় পাচ্ছেন এটি হয়তো তাকে ধ্বংস করবে। জবাবে তিনি (খাদিজা) বললেন, আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আপনাকে ত্যাগ করবেন না কারণ আপনি অভাবগ্রস্থকে সহায়তা করেন, দরিদ্রকে সহযোগিতা করেন এবং আপনি অতিথিদের প্রতি দয়ালু।

মজার ব্যাপার হল তিনি যে সকল গুণাবলীর কথা বলেছেন তার সবগুলোই মানুষের সাথে ভদ্র আচরন ও দয়ালু ব্যবহার সম্পৃক্ত। এটা এমন একটা বিষয় যা আমরা বর্তমানে আমাদের জীবন থেকে প্রায় নির্বাসিত করেছ এবং এ কারণে বিশ্বব্যাপী আমাদের এ করুণ অবস্থা। আমাদেরকে প্রেরণ করা হয়েছে পৃথিবীকে দেয়ার জন্য। পৃথিবী তাদেরকে ভালোবাসে যারা দেয়, যারা বিবেকবান এবং দয়ালু। অন্যদিকে তাদেরকে ঘৃণা করে যারাটাকা পয়সা সম্পদ ইত্যাদির জন্য লালায়িত, ধান্দাবাজ এবং অন্যদের থেকে নেয়ার জন্য আগ্রহী। আমাদের চরিত্রের বর্তমান রূপ কি তা তুলে ধরবার কি কোন প্রয়োজন আর আছে?

আল্লাহর রাসূল (স) এবং তার সাহাবীরা এমন উদাহরণ স্থাপন করে গেছেন যে কেউ ঘুনাক্ষরেও বলতে পারবে না Rasoolullahand his Sahaba set an example which is conspicuous by the fact that those who claim to follow them don’t practice their ways. তাহলে অনুসরণ করার অর্থ কি? আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করা উচিত এবং বেশি দেরী হয়ে যাওয়া ও সাহাবীরা মহান রাব্বুল আলামীনের সামনে আমাদের বিপক্ষে স্বাক্ষী দেয়ার আগেই সংশোধন করে নেয়া উচিত।

আমরা প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ (স) সহ পৃথিবীর বড় বড নেতাদের দিকে তাকালে দেখতে পাবো তাদের মধ্যে উদারতা, সহানুভূতি, নিজেদের প্রতি অবিচার ক্ষমা করে দেয়ার আগ্রহ, অন্যদের জন্য উদ্বেগ ও সাহায্য করার মানসিকতা, সত্যবাদীতা, বিশ্বাসযোগ্যতা, দানশীলতা, দরিদ্র ও অসহায়দের পক্ষে দাঁড়ানোর মানসিকতা ইত্যাদি মৌলিক গুণাবলীসমূহ তাদের বাণী প্রচারের অনেক আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। এই সকল গুণাবলী তাকে মানুষের প্রিয় করে তুলেছে, তাকে ভালোবাসতে এবং শ্রদ্ধা করতে উৎসাহিত করেছে এবং তাদের মাঝে তার বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি করেছে। এটা বলা যেতে পারে যে এই সকল গুণাবলীই তার নেতৃত্বের ভিত্তি।

এইসব গুণ একজন নেতাকে শ্রদ্ধার পাত্র এবং অনুসরণীয় করে তুলে। এটা বলা অযৌক্তিক হবে না যে মানুষ যাকে পছন্দ বা শ্রদ্ধা করে না তাকে অনুসরণও করে না। নেতৃত্ব দিতে আগ্রহী ব্যক্তিকে তার নিজের চরিত্র পরীক্ষা করে এই সকল গুণাবলীর নিরিখে সে কোথায় অবস্থান করছে তা বিচার করা উচিত এবং ঘাটতি পূরণের জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা চালানো উচিত কারণ এই সকল গুণাবলীই নেতা হিসেবে তার সফলতা বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করে দিবে।

মুহাম্মদ (স) এর এই সকল গুণাবলী শুধু চমৎকার পর্যায়েই ছিল না, তিনি ছিলেন আইকনিক এবং তাদের মধ্যে রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃত। জনগণ তাকে আস সাদিক আল আমীন বা সত্যবাদী ও বিশ্বাসী উপাধী দিয়েছিল। যে সমাজে বিশ্বাসের মাপকাঠিতে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা (eminence) নির্ণীত হত সেখানে এই উপাধী ছিল একজন যুবকের জন্য অত্যন্ত সম্মানজনক। মুহাম্মদ (স) সব দিক থেকেই অত্যন্ত বিশ্বাসী ছিলেন যা তাকে তাঁর থেকে বয়সে বড়দের কাউন্সিলে প্রবেশাধিকার দিয়েছিল এবং মানুষ তার কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ করতো।

বর্তমানে আমরা একটি নৈর্ব্যক্তিক শহুরে সমাজে বসবাসে অভ্যস্ত হয়ে গেছি বলে আমাদের ব্যক্তিগত গুণাবলী বড়জোর আমাদের ব্যক্তিগত বন্ধু-বান্ধব এবং আত্মীয়-স্বজনের গণ্ডিতে প্রভাব রাখতে পারে। কিন্তু গোত্রবদ্ধ সমাজে একজন ব্যক্তির সাফল্য বা ব্যর্থতা তার বিশ্বাসযোগ্যতার খ্যাতির উপর নির্ভর করতো। কোন ব্যক্তির প্রতিশ্রুতি ছিল তার সম্মানের বিষয় এবং অসম্মানিত হওয়া ছিল মৃত্যুদন্ড। (A man’s word was his honor and to be dishonored was a sentence of death.) তারা কাউজে বিস্বাসযোগ্য মনে হলেই কেবল তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতো, এ কারণে কাউকে মিথ্যাবাদী বললে খুনোখুনীও ঘটে যেতো। বড় বড় অংকের ব্যবসায়ীক লেনদেন কেবলমাত্র উভয়পক্ষের মৌখিক প্রতিশ্রুতির বিনিময়েই সম্পাদিত হত।

এই ধরনের চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে কেউ কখনও প্রশন তুলতো না কারণ একমাত্র হীনতম ব্যক্তিই এ ধরনের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতো। মিথ্যাবাদীতে, প্রতারণা এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা ছিল গুরুতর অপরাধ। এমনক্কক ইসলাম আগমনের পূর্বেও যখন তাদের জীবন ছিল অনৈতিকতা আর নিষ্ঠুরতায় পরিপূর্ণ তখনও আল হিজাজের লোকদের মাঝে এ ধরণের মহৎ গুণ বিদ্যমান ছিল। শুনতে বেশ অদ্ভুত লাগে যে একজন মানুষ মিথ্যা বলবে না কিন্তু আরেকজন মানুষকে হত্যা করা কিংবা অনৈতিক ব্যবহার করতে ইতস্ততও করবে না কিন্তু একই রকম বৈপরিত্য নেটিভ আমেরিকান এবং ওয়েস্টার্ণ আমেরিকানদের মাঝেও বিদ্যমান ছিল।

মুহাম্মদ (স) এর মাঝে তার সময়কার লোকদের সকল ভালো গুণাবলী বিদ্যমান এবং দুর্বলতাসমূহ অনুপস্থিত ছিল যা তাকে তাদের চোখে আরও সম্মানীত করে তুলেছিল। মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হল নিজের দোষ স্বীকার করা এবং যার মধ্যে তা অনুপস্থিত তাকে শ্রদ্ধা করা। এ কারণে মক্কার লোকেরা তাকে পছন্দ করতো এবং ভালোবাসতো এবং হযরত খাদিজা (রা) তাকে এই কথাই স্মরণ করিয়ে দিয়ে সান্তনা দিতে চেয়েছিলেন।

খাদিজা (রা) তাকে তার চাচাতো ভাই ওয়ারাকা বিন নওফেল, একজন খ্রিস্টান সন্ন্যাসী ও বিদ্বান, এর কাছে নিয়ে গেলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স) কে যা ঘটেছে তা বর্ণনা করতে বললেন। সময় ও মাত্রার দুইটি ভিন্ন জগতের দুই সৃষ্টির সাক্ষাতের ঘটনাটি শুনে তিনি বললেন, ওটা ছিল আল মামুস আল আকবর, যে হযরত মূসা (আ) এর কাছেও এসেছিল। আমি যদি যুবক হতাম, (তাহলে তোমাকে সহায়তা করতাম) যখন তোমার লোকেরা তোমাকে তোমার ভূমি থেকে উচ্ছেদ করবে।

মুহাম্মদ (স) বিস্মিত হলেন এবং ওয়ারাকা বিন নওফেল এর বক্তব্য নিয়ে সন্দেহ পোষন করে প্রশ্ন করলেন, তারা আমাকে আমার ভূমি থেকে উচ্ছেদ করবে?’ তার অবাক হবার যথেষ্ট কারণ ছিল। তিনি ছিলেন সর্বাধিক ভালোবাসার পাত্র, সবচেয়ে সভ্রান্ত পরিবারের সন্তান এবং তিনি এমন একটি সমাজে বাস করতেন যেখানে কাউকে বিশেষ করে তার মত সম্ভ্রান্ত বংশ এবং পূর্বপুরুষের উত্তরসূরীকে কোন গোত্র বা ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা ছিল অসম্ভব ব্যাপার। অথচ ওয়ারাকা বলছেন যে লোকগুলো তাকে অন্য যে কারও তুলনায় বেশি ভালোবাসে তারা শুধু তার বিরোধিতাই করবে না, আরব সমাজের অবিশ্বাস্য কাজ, তাকে সমাজ থেকে, মাতৃভূমি থেকে উৎখাত করার মত কাজও করবে। ওয়ারাকা বললেন, যেই এর মত কিছু তার লোকদ্রর সামনে উপস্থাপন করেছে তাকেই তার ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞানের এটা এক বিরাট উপকারিতা হল বিদ্বান ব্যক্তি কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কি ঘটবে তা আগেই বুঝতে পারেন।

এর কারণ হল দাওয়াহ’র দ্বন্দ্ব মানে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে, ভালো এবং মন্দের মধ্যে, নবীগণ এবং শয়তানের মধ্যে দ্বন্দ্ব। এটাই প্রকৃত ও আদি দ্বন্দ্ব যা শেষ বিচারের দিন পর্যন্ত চলবে। সেই দিন মহান রাব্বুল আলামীন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত করবেন এবং সকল দায় পরিশোধ করা হবে। তবে, এই জীবনে এই সংগ্রাম চলতে থাকবে।

এ যুগেও আমরা এই সত্য দেখতে পাই। যতক্ষণ পর্যন্ত একজন মুসলমান নীরবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে তার ধর্ম পালন করে ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ তার বিরোধীতা করে না। কিন্তু যে মুহুর্তে সে ধর্মকে জনসম্মুখে নিয়ে আসে, তা সে তার পোষাকের মাধ্যমে হোক (কাপড়, দাড়ি, পাগড়ি, হিজাব) অথবা দাওয়াহ’র মাধ্যমে, তৎক্ষনাৎ মারাত্মক বিরোধিতা শুরু হয়ে যায়। অবাক হয়ে যাবে যখন কেউ অনুভব করতে পারবে যে একজন ব্যক্তি যে কিনা ইসলামকে উপস্থাপন করছে সে জীবনযাপনের একটি বিকল্প উপায়ের কথা বলছে যা এর পালনকারীকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবে এবং জান্নাতে প্রবেশাধিকার দিবে।

একজন মুসলমান যার কাছে ইসলামকে উপস্থাপন করছে সে তার জন্য সবচেয়ে ভালোটুকুই চায়, শুধু এই জীবনেনা, অনন্তকালের জীবন পরকালেও।যদি কেউ একজন ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে একবেলা খাবার দেয় তবে সে একজন ভালো মানুষ হিসেবে পরিগণিত হয়। কিন্তু কেউ যদি কাউকে চিরন্তন আযাব থেকে রক্ষা করতে চায় তবে তার বিরোধিতা করা হয়, তার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা হয় এবং তাকে আক্রমণ করা হয়। এই সবই মুহাম্মদ (স) এর আগের সকল মবীর ক্ষেত্রে ঘটেছিল এবং রাস্যলুল্লাহ (স) এর ক্ষেত্রে এই কাজ করেছিল তার নিজের লোকেরাই। এটা এমন এক বিষয়, যিনি ইসলাম প্রচারের কাজ করতে আগ্রহী তাকে অবশ্যই এর মুখোমুখি হবার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। যে অন্যকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করতে চায় শয়তান তার সাথে তীব্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় এবং তাদেরকে প্রতিহত করার জন্য সর্বশক্তি ব্যয় করে।

এই যুগে সবাই যে কোন কিছুর ‘বিকল্প’ নিয়ে জোরেশোরে প্রচারণা চালাচ্ছে, হোক সেটা বিকল্প ঔষধ, স্থাপত্য, খাবার, শিক্ষা বা বিকল্প থেরাপী। এই সবকিছুকেই স্বাগত জানানো হয়, গ্রহণ করা হয় এবং তাদের প্রস্তাবিত পদ্ধতি যতই অদ্ভুত হোক না কেন, তাসম্পর্কে প্রচারণা চালানোর অধিকার নিয়ে সকলেই বেশ সচেতন। কিন্তু যে মুহুর্তে আপনি ইসলাম নামে জীবনযাপনের একটি বিকল্প উপায়ের কথা বলবেন, ঘটনা উল্টে যাবে এবং আপনাকে আক্রমণ করা হবে। ইসলামের প্রচার মানে যে শয়তানের বিরুদ্ধে লড়াই করা এই আক্রমণ হল তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নির্দেশক। ওয়ারাকার উচ্চারিত শব্দগুলো ছিল রাসূলুল্লাহ (স) এর জন্য সতর্কবার্তা – তার কাজ সহজ হবে না।

অন্যান্য রাসূলদের মতই রাসূলুল্লাহ (স) সরাসরি আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন এবং তার ঈমান মজবুত হয়েছে সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়ে। এটি হলঃ অন্যকে তার বিশ্বাসের প্রতি আহবান জানানো। আল্লাহ বলেনঃ

আপনি নিকটতম আত্মীয়দেরকে সতর্ক করে দিন। (সূরা শুয়ারা ২৬ঃ২১৪)

প্রথম বাঁধা এলো যখন আল্লাহ সুবাহানাহুতায়ালা রাসূলুল্লাহ (স) কে তার আত্মীয়দেরকে তার প্রতি ঈমান আনা এবং তাদের চলমান বহু-ঈশ্বরবাদে বিশ্বাসী জীবনধারা বজায় রাখা ও সামাজিক দূর্নীতির কঠিন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করার জন্য নির্দেশ দিলেন। আমি ইতোমধ্যেই রাসূলুল্লাহ (স) এর সাফা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে ‘হে সাথীগণ’ বলে চিৎকারের ঘটনাটি বর্ণনা করেছি।

মহান আল্লাহ নবীদেরকে কোনরকম সন্দেহ-সংশয় ছাড়া সরাসরি তার বাণি প্রচারের নির্দেশনা দিয়েছেন। এ কারণে নবীগণ কোনপ্রকার কূটনৈতিকতা, মিষ্টিভাষণ বা ভিন্ন কোন পন্থার আশ্রয় নেননি। রাসূলুল্লাহ (স) সরাসরি এবং সুস্পষ্টভাবে বলেছেন। মানুষ বিস্মিত হয়ে গেল। বস্তুগত কোন সমাজে, বস্তুর গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। মানুষ যা দেখতে পারে, স্পর্শ করতে পারে, ক্রয় বা বিক্রয় করতে পারে তাই বিশ্বাস করে। কিন্তু তাদেরকে মৃত্যু এবং পরকালের বিষয়ে বলে দেখুন, তাদের চোখ জ্বলে উঠবে এবং বক্তার দিকে এমনভাবে আড়চোখে তাকাবে যেন সে কোন পাগল। তাদের দৃষ্টিতে আল গায়েব বা অদৃশ্য সম্পর্কে কথা বলা মানে হল আপনি বুদ্ধিমান, আধুনিক বা বিজ্ঞানসম্মত নন। বস্তুকেন্দ্রিক সমাজ এমনভাবে বসবাস করে যেন তাদের কখনো মৃত্যুবরণ করতে হবে না এবং পুনরুত্থান ও শেষ বিচার বলতে কিছু নেই। কেউ যদি তাদেরকে মৃত্যু ও পরকালের বাস্তবতা সম্পর্কে মনে করিয়ে দিতে চায় তবে তাকে স্বাগত জানানো হয় না এবং তার বিরোধিতা করা হয়। পনেরো শতাব্দী পরে এখনও একই অবস্থা বিরাজমান।

মক্কায় রাসূলুল্লাহ (স) এর জীবনে অসুবিধা এবং বিরোধিতা ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। কিন্তু হেরে যাবার আগ পর্যন্ত বিরোধিতা কেবল শক্তি বৃদ্ধি করে। প্রতিরোধ যত বেশি হবে, এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকলে আপনার শক্তি ততই বৃদ্ধি পাবে। বডি বিল্ডীং এর ক্ষেত্রে দেখুন, ভারোত্তলন আপনার পেশীগুলিকে মজবুত করে গড়ে তুলে৷ দাওয়াহর ক্ষেত্রেও একই রকম, মানুষকে সত্যের দিকে আহবান জানানো এবং সকল বিরোধিতার মুখেও অটল অবিচল থাকার মাধ্যমে ঈমান মজবুত হয়। মক্কায় থাকাকালীন মুসলমানগণ এই শিক্ষাই পালন করেছিল। মুহাম্মদ (স) উপর বিভিনব রকম অত্যাচারের বহু ঘটনা রয়েছে। যারা তাকে অনুসরণ করেছে তারা নিষ্ঠুর নিপীড়নের শিকার হয়েছে, এমনকি শারীরিক যন্ত্রনা ভোগ করতে হয়েছে এবং অনেককে হত্যাও করা হয়েছে৷ এ সবই করা হয়েছে কুরাইশদের ধনী ও ক্ষমতাবান প্রধানদের পূর্ণ সহযোগিতায়। কিন্তু এর ফলে যা হয়েছে তা হল আল্লাহর প্রতি তাদের বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে।

রাসূল (স) নিজে মক্কার কুরাইশ বংশের যে গোত্রের সদস্য ছিলেন -বনু হাশিম – তারাই তাকে সবচেয়ে বেশি অত্যাচার করেছে। তারা তাদের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। তারা হুমকী দিয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছে, তার সুনাম ও সচ্চরিত্রের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়িয়েছে এমনকি তাকে শারীরিকভাবে আক্রমণও করা হয়েছে। যখন কোন কিছুই তাকে ভীত করতে বা ইসলামের প্রচার থেকে বিরত করতে পারল না তখন তারা সিদ্ধান্ত নিল তাকে রাজপদ এবং সম্পদের মাধ্যমে প্রলুব্ধ করবে।

ইবনে আব্বাস বলেন, কুরাইশদের নেতৃবৃন্দ এক ব্যক্তিকে পাঠালেন রাসূলুল্লাহ (স) কে ডেকে আনার জন্য। তাকে দেখে আল্লাহর রাসূল (স) খুশী হলেন যে তারা বোধহয় তাদের অবস্থান পাল্টেছে। উতবা বললেন, আমরা তোমার সাথে মিটমাট করে নেয়ার জন্য তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছি। আমরা এমন কাউকে কখনোই দেখিনি যে নিজের লোকদের জন্য এত দূর্ভাগ্য বয়ে এনেছে। তুমি আমাদের পূর্বপুরুষদের নিয়ে ঠাট্টা করেছো, আমাদের ধর্মের সমালোচনা করেছো, আমাদের দেবতাদের অভিশাপ দিয়েছো এবং আমাদের মধ্যে ফাটল ধরানোর জনু সবকিছু করেছো। যদি তুমি এসব এ কারণে করো যে তোমার অর্থের প্রয়োজন, তাহলে আমরা অর্থ সংগ্রহ করে দিতে থাকবো যতক্ষণ না তুমি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্পদশালী হয়ে যাও। যদি তুমি ক্ষমতা চাও, তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের রাজা নির্বাচিত করবো। যদি তুমি নারী চাও তাহলে আমরা সবচেয়ে সুন্দরী দশজন নারীকে নির্বাচন করবো এবং তোমাকে দিয়ে দেবো। যদি তোমার উপর শয়তানের আছর হয়, তাহলে আমরা আমাদের সকল অর্থ ব্যয় করবো যতক্ষণ না তুমি সুস্থ্য হও।

রাসূলুল্লাহ (স) বললেন, তোমরা যা বলেছো তা আমার জন্য খাটে না। আমি তোমাদের কাছ থেকে সম্পদ বা সম্মান আদায়ের জন্য এই বার্তা নিয়ে আসিনি। তোমাদের উপর কতৃত্ব ফলানোতেও আমার আগ্রহ নেই। আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা আমাকে বার্তাবাহক হিসেবে পাঠিয়েছেন। তিনি আমার উপর একটি বার্তা নাযিল করেছেন এবং নির্দেশ দিয়েছেন তোমাদেরকে সুসংবাদ দেয়ার জন্য এবং সতর্ক করার জন্য। আমি আমার রবের পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য বাণী নিয়ে এসেছি এবং তোমাদেরকে উপদেশ দিয়েছি। যতি তোমরা আমার বার্তা গ্রহণ কর তাহলে তা তোমাদের এই দুনিয়া এবং পরকালের জন্য ভালো হবে। অন্যথায় আমিঅপেক্ষা করবো যতক্ষণ না আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তোমাদের এবং আমার মধ্যকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন।

তারা বলল, ‘তার মানে তুমি আমাদের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিচ্ছো। তুমি তো জানো আমাদের এই ভূমি কত সংকীর্ণ এবং আমরা কত গরীব এবং এখানে জীবন যাপন করা আমাদের জন্য কত কঠিন। তাহলে তুমি তোমার রবকে কেন বলছো না এই পাহাড়গুলোকে সরিয়ে দিতে এবং সিরিয়া ও ইরাকের ন্যায় কিছু নদী এখানে প্রবাহিত করতে। এবং তাকে বল আমাদের পূর্বপুরুষদের জীবন ফিরিয়ে দিতে (কুসাই বিন কিলাব) এবং যদি তারা বলে যে তুমি সত্য বলছো, তাহলে আমরা তোমাকে অনুসরণ করবো।’

আল্লাহর রাসূল (স) বললেন, ‘আমাকে এ কারণে প্রেরণ করা হয়নি। আমি আল্লাহর কাছ থেকে কেবল তাই নিয়ে এসেছি যা আমাকে দেয়া হয়েছে এবং আমি তোমাদের কাছে তা পৌঁছে দিয়েছি। যদি তোমরা তা গ্রহণ কর, তবে তা তোমাদের ইহকাল এবং পরকালের জন্য মঙ্গলকর হবে৷ আর যদি তোমরা তা প্রত্যাখ্যান করো, তাহলে আল্লাহ আমাদের মধ্যে কি বিচার করবেন তার জন্য আমি অবশ্যই ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করবো।’

তারপর তারা বলল, ‘তাহলে তুমি তোমার প্রভুকে একজন ফেরেশতা পাঠাতে বলছো না কেন যে সাক্ষ্য দিবে যে তুমি সত্য বলছো? এবং কেন তুমি আমাদেরকে কিছু প্রাসাদ, বাগান, স্বর্ণ ও রূপা দেয়ার জন্য তাকে বলছো না?এবং কেন তুমি বলছো না যে তোমাকে কাজ করা ব্যতীত জীবিকা সরবরাহের জন্য? আমরা দেখতে পাচ্ছি তুমি আমাদের মতই ব্যবসা করছো। তোমার রবকে বল তোমাকে সম্পদ দেয়ার জন্য যেন তুমি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাবান হতে পারো। তুমি আমাদের সকলের মতই।’ তিনি প্রত্যাখ্যান করলেন।

তারপর তারা বলল, ‘ঠিক আছে, তাহলে তোমার রবকে বল তুমি যে শাস্তির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছো তা পাঠানোর জন্য। তোমার রবকে বলো যেন আকাশকে আমাদের মাথার উপর নামিয়ে আনে যদি তুমি সত্যবাদী হও। তোমার রব কি জানেন না যে আমরা তোমাকে এ সকল প্রশ্ন করবো? এটা কেমন হল যে তিনি তোমাকে এর উত্তর দেয়ার জন্য সহায়তা করছেন না? আমরা জানি কে তোমাকে এ সব কিছু শিখিয়ে দিচ্ছে। সে হল আর রাহমান নামে ইয়ামামার এক ব্যক্তি। আমরা তাকে বা তোমাকে বিশ্বাস করি না।’

আল্লাহর রাসূল (স) প্রত্যাখ্যাত হয়ে দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ফিরে গেলেন। আক্বিল বিনাবু তালিব বর্ণনা করেছেন যে, কুরাইশগন আবু তালিবের কাছে অভিযোগ করল যে মুহাম্মদ (স) তাদের সভাগুলো বিনষ্ট করছে। আবু তালিব নম্রভাবে রাসূল (স) কে তাও দাওয়াহ বন্ধ করতে বললেন। রাসূলুল্লাহ (স) বললেন, ‘চাচা, আপনি কি সূর্য্য দেখতে পাচ্ছেন? আমি যেমন সূর্য্যকে থামাতে সক্ষম নই এবং আপনি যেমন তা থেকে আগুন আনতে সক্ষম নন তেমনি আমি এই বাণী প্রচারেও বিরত থাকতে পারি না।’ আবু তালিব বললেন, আমি তোমাকে বিশ্বাস করি। এগিয়ে যাও এবং তোমার যা করা উচিত করো।’

শেষোক্ত ঘটনাটি তার বিশ্বাস, যে বাণী তার উপর নাযিল হয়েছে এবং তার যে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে তার উপর সম্পূর্ণ আস্থার প্রমাণ। কোন কিছুই তাকে তার বার্তা প্রচার থেকে বিরত বা ধীরগতি বা নিস্তেজ করতে পারতো না। কোন কিছুই তাকে রাজনৈতিকভাবে সঠিক প্রমাণিত করা বা তাকে তার বাণী প্রচার বন্ধ করার জন্য ভীত বা বাধ্য করা, কিংবা কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য সমঝোতা করতে পারতো না। তিনি কেবল তার স্রষ্টার সন্তুষ্টি নিয়েই চিন্তিত ছিলেন এবং তা অর্জনের জন্যই কাজ করে গেছেন, এ জন্য যে মূল্যই দিতে হোক না কেন।

শিক্ষা
যে কোন নেতার জন্যই এই পূর্ণ নিশ্চয়তার বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যার উপর তার বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকাংশে নির্ভর করে। কারও পক্ষে তাই দেয়া সম্ভব যা তার কাছে আছে। ফলে, কোন নেতা যদি আশা করে তার মধ্যকার প্যাশন তার অনুসারীদের হৃদয়ে স্থানান্তরিত হোক, তাহলে তার নিজের বিশ্বাস নড়বড়ে হওয়া চলবে না। নেতাদেরকে তাদের বিশ্বাসের ক্ষেত্রে পরীক্ষা করা হবে এবং এ সময় সংশ্লিষ্ট সকলের নিকট পরিষ্কার হওয়া পর্যন্ত তাদেরকে বিশ্বাসের উপর শক্তভাবে অবস্থান করে এর প্রতি দৃঢ় সংকল্প প্রদর্শন করতে হবে। তবেই সে জনগণের মধ্যে পরিবর্তন দেখতে সক্ষম হবে এবং জনগণের উপর তার পক্ষই বিজয়ী হবে যেমনটি রাসূলুল্লাহ (স) এর ক্ষেত্রে ঘটেছে। জনগণ তাদের চোখ দিয়ে শুনে। আপনি যাই বলেন না কেন তারা যতক্ষণ না আপনার মধ্যে তা দেখতে পাচ্ছে তারা বিশ্বাস করবে না। যখন মানুষ দেখবে তাদের নেতা তার নিজের বলা কথানুযায়ী চলছে তখন তারা অনুভব করতে পারবে তিনি কি বলছেন এবং তার বার্তাকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করতে শুরু করবে। যখন তারা এর ফলাফল জমা হতে দেখবে, আর বেশী মানুষ তাকে অনুসরণ করতে থাকবে।

আল্লাহর রাসূল (স) এর চরিত্র এমন ছিল যে তার শত্রুরা পর্যন্ত তার সত্যবাদীতা এবং আন্তরিকতা স্বীকার করতে বাধ্য হত। তার এই বৈশিষ্ট্যের প্রমাণ পাওয়া যায় এমন সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনাটি ছিল আবু সুফিয়ান এবং বাইজেন্টাইন সম্রাট হেরাক্লিয়াসের সাথে সাক্ষাতের ঘটনায়। ঘটনাটি আবু সুফিয়ানের মুসলমান হবার আগের ঘটনা এবং সেসময় তিনি ছিলেন মুহাম্মদ (স) এর বিরোধীদের নেতা এবং মক্কায় তার সবচেয়ে ক্ষমতাবান শত্রু।

রাসূলুল্লাহ (স) এবং মক্কার কুরাঈশদের মধ্যে হুদাইবিয়ার সন্ধিচুক্তি স্থাপিত হবার পরবর্তী সময়ে তিনি (মুহাম্মদ (স)) প্রতিবেশী রাষ্ট্রপ্রধানদের নিকট ইসলাম গ্রহণের আহবান জানিয়ে চিঠি লিখতেন।

রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীদেরকে বললেন, আমই তোমাদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে বিদেশী রাজাদের নিকট পাঠাতে চাই। বনী ঈসরাইলরা যেমন মরীয়ম (আ) এর পুত্র হযরত ঈসা (আ) কে নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করত, আমাকে নিয়ে তোমরা তেমনটি করো না। তারা বললেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ (স), আমরা আপনার কোন বিষয়েই ভিন্ন মত পোষন করবো না। আমাদের সামনে চলার নির্দেশ দিন।’ বিদেশী রাজাদের বেশীরভাগই ছিল বিরূপ মনোভাবাপন্ন, তাদের নিকট যাওয়া সহজ কোন কাজ ছিল না। এই যাত্রা ছিল বিপদসঙ্কুল কিন্তু সাহাবীদের স্পিরিট এমন ছিল যে তারা রাসূলুল্লাহ (স) এর প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার জন্য নিজেদের মধ্যে রীতিমত প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হত।

আল্লাহর রাসূল (স) পূর্ব রোমান সম্রাজ্যের (বাইজেন্টাইন সম্রাজ্য) সম্রাট হেরাক্লিয়াসের নিকট তার চিঠি পৌঁছানোর জন্য হযরত ইয়াহিয়া বিন থালেসা আল কালবিকে নিযুক্ত করলেন। বাইজেন্টাইন সম্রাজ্যকে মুসলমানরা রোম বলে অবিহিত করতো। বাইজেন্টাইন শব্দটি এক শতকেরও কম সময় আগে থেকে ব্যবহৃত হচ্ছিল এবং রাসূলুল্লাহ (স) এর সময় এতটা প্রচলিত ছিল না। এই সম্রাজ্যের রাজধানী ছিল ইস্তাম্বুল (কনস্টান্টিনোপল)। সমগ্র রোমান সম্রাজ্য পূর্ব ও পশ্চিমভাগে বিভক্ত ছিল, পশ্চিমের রাজধানী ছিল রোম এবং পূর্বের রাজধানী ছিল ইস্তাম্বুল৷ হেরাক্লিয়াস ছিলেন কার্থেজ (তিউনিস) এর সামরিক বাহিনীর কমান্ডার যিনি সেখান থেকে ৬১০ খ্রীস্টাব্দে পূর্ব রোমান সম্রাজ্যের সম্রাট হন।

তখন রোমান সম্রাজ্যের খুব খারাপ সময় চলছিল। পারসিয়ানরা তাদেরকে ক্রমাগত আক্রমণ করছিল এবং রোমানরা তাদের কাছে একের পর এক যুদ্ধে হারছিল। ৬১৩ খ্রীস্টাব্দে দামেস্ক ও ৬১৪ খ্রীস্টাব্দে জেরুজালেমের পতন হল এবং পারসিয়ানরা তথাকথিত ‘আসল ক্রুশ (ট্রু ক্রস)’ নিয়ে গেল। ‘ট্রু ক্রস’ হল কাঠের তৈরি একটি ক্রুশ যেখানে যীশুখ্রীশটকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল বলে খ্রীস্টানরা বিষ্বাস করতো। যদিও ঈসা (আ) কে ক্রুশবিদ্ধই করা হয়নি, ফলে এর কোন সত্যতা ছিল না, খ্রীস্টানরা একে খ্রীস্টান সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বিবেচনা করতো। হেরাক্লিয়াস একজন শক্তিশালী নেতা এবং ভালো সামরিক কমান্ডার হওয়া সত্ত্বেও পারসিয়ানদের নিকট হারছিলেন৷ ৬২১ খ্রীস্টাব্দে হেরাক্লিয়াস পারসিয়ানদের বিরুদ্ধে নিজেই একটি অভিযানের নেতৃত্ব দেন এবং আসল ক্রুশসহ তাদের থেকে দখল নেয়া একের পর এক শহর পুনরুদ্ধার করেন। একপর্যায়ে তিনি পারস্য শহরে প্রবেশ করেন এবং পারসিয়ানদেরকে নিজেদের দেশেই পরাজিত করেন। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পূর্বেই সূরা রূমের ১-২ নং আয়াতে এই ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন। ৬৩০ খ্রীস্টাব্দে হেরাক্লিয়াস খ্রীস্টান ধর্মভীরু তীর্থযাত্রী হিসেবে নগ্নপদে জেরুজালেমে প্রবেশ করেন এবং হোলি সেপালচার (Holy Sepulcher) চার্চে ‘আসল ক্রুশ’ পুনঃস্থাপন করেন। তাকে গালিচা, ফুল ইত্যাদির মাধ্যমে দারুণভাবে স্বাগত জানানো হয় এবং সম্মানীত করা হয়। যে সময় তিনি তার গৌরব ও ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থান করছিলেন তখনই তিনি রাসূল (স) এর নিকট হতে চিঠি গ্রহণ করেন। হেফাক্লিয়াস রাসূল (স) এর দাওয়াত শুনেন এবং প্রত্যাখ্যান করেন। আল্লাহ তায়ালা তোমানদের বিজয়কে উলটে দিলেন এবং তিনি একের পর এক শহর হারাতে থাকেন। মিশর, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, জর্ডান, লেবানন এবং সর্বশেষে মুহাম্মদ আল ফাতেহ এর সময়ে কনস্টান্টিনোপল মুসলমানদের দখলে আসার মাধ্যমে পূর্ব রোমান সম্রাজ্য অস্তিত্বের হুমকীতে পড়ে যায়। (ceased to exist)

ইয়াহিয়া আল কালবি খুব সুদর্শন ব্যক্তি ছিলেন। জীবরাঈল (আ) যখন মানুষের বেশে রাসূল (স) এর নিকট আসতেন, অনেক সময় ইয়াহিয়া আল কালবির রূপ ধরে হাজির হতেন। হেরাক্লিয়াস চিঠিটি পড়ে বললেন, ‘শ্যামকে উলটে দাও এবং এই ব্যক্তির লোকদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে ধরে আনো।’ তার সৈন্যরা গাজায় আবু সুফিয়ান এবং তার সহযোগীদেরকে পেয়ে হেরাক্লিয়াসের নিকট ধরে আনলো। হেরাক্লিয়াস আবু সুফিয়ানের লোকদেরকে তার পেছনে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিলেন এবং তাদেরকে বললেন, ‘যদি সে মিথ্যা বলে তবে আমাকে সংকেত দিবে।’ আবু সুফিয়ান বললেন, ‘আমি কখনো এই মানুষটির মত ধূর্ত এবং বুদ্ধিমান ব্যক্তির সাক্ষাৎ লাভ করিনি। আমি জানতাম আমার লোকেরা তার সামনে আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না কিন্তু আমি সম্মানীত ব্যক্তি এবং তাদের সামনে মিথ্যা বলতে আগ্রহী ছিলাম না। আমার ভয় ছিল যে তারা অন্যদেরকে বলে দিবে এবং আমি মিথ্যাবাদী হিসেবে পরিচিত হবো।’

হেরাক্লিয়াস প্রশ্ন করলেন, ‘মুহাম্মদ কে?’ আবু সুফিয়ান বললেন, ‘হুয়া সাহিরুল কাজ্জাব। সে একজন যাদুকর এবং মিথ্যাবাদী।
হেরাক্লিয়াস বললেন, ‘আমি অভিশাপ শুনতে আগ্রহী নই। আমাকে তার সম্পর্কে বলো।’
হেরাক্লিয়াসঃ সে তোমাদের মধ্যে কেমন বংশের লোক?
আবু সুফিয়ানঃ তার পূর্বপুরুষ বেশ সম্ভ্রান্ত।
হেরাক্লিয়াসঃ তার পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ রাজা ছিলেন?
আবু সুফিয়ানঃ না
হেরাক্লিয়াসঃ তোমাদের মধ্য থেকে তার আগে কেউ এই দাবী নিয়ে এসেছে?
আবু সুফিয়ানঃ না
হেরাক্লিয়াসঃ তার বেশিরভাগ অনুসারী কী অভিজাতশ্রেণির নাকি দরিদ্র লোকজন?
আবু সুফিয়ানঃ তারা দরিদ্র।
হেরাক্লিয়াসঃ তারা কি সংখ্যায় বেড়ে চলছে নাকি কমছে?
আবু সুফিয়ানঃ তাদের সংখ্যা বাড়ছে।
হেরাক্লিয়াসঃ তাদের মধ্য থেকে কেউ কি তার ধর্ম গ্রহণ করার পর পরিত্যাগ করেছে?
আবু সুফিয়ানঃ না।
হেরাক্লিয়াসঃ সে এই দাবী করার পুর্বে কি কখনো তাকে মিথ্যা বলতে দেখেছো?
আবু সুফিয়ানঃ না।
হেরাক্লিয়াসঃ সে কি কখনও বিশ্বাসভঙ্গ করেছে?
আবু সুফিয়ানঃ না। তবে আমরা তার সাথে একটি যুদ্ধবিরতির চুক্তি করেছি, জানিনা সে এই সময়ে কি করবে। (আবু সুফিয়ান বলেন, ‘এটাই ছিল একমাত্র নেতিবাচক কথা যা আমি বলতে সক্ষম হয়েছিলাম’)
হেরাক্লিয়াসঃ তোমরা কখনও তার সাথে যুদ্ধ করেছো?
আবু সুফিয়ানঃ জ্বি।
হেরাক্লিয়াসঃ তার ফলাফল কি?
আবু সুফিয়ানঃ কখনও সে জিতেছে, কখনও আমরা।
হেরাক্লিয়াসঃ সে তোমাদেরকে কি ধরনের নির্দেশ দেয়?
আবু সুফিয়ানঃ সে আমাদেরকে আল্লাহর গুণাবলীর সাথে কাউকে শরীক নাকরে কেবল তার উপাসনা করতে বলে। সে আমাদেরকে বলে আমাদের পিতৃপুরুষদের অনুসরণ না করতে৷ সে আমাদেরকে প্রার্থনা করতে, সথ্যবাদী হতে এবং ব্যাভিচার না করতে ও অন্যান্য মানুষের প্রতি দয়ালু হতে নির্দেশ করে।

তারপর হেরাক্লিয়াস বললেনঃ তুমি বলেছো সে সম্ভ্রান্ত বংশের লোক। সকল নবী ও রাসূলের ক্ষেত্রে এমনটিই ঘটেছিল। তুমি বলেছো তোমাদের মধ্যে তার পূর্বে এমন দাবী কেউ কখনও করেনি। একারণে আমি বলতে পারছি না সে কাউকে অনুকরন করছে । তুমি একথাও অস্বীকার করেছো যে তার পূর্বপুরুষদের কেউ রাজা ছিল না, সুতরাং সে রাজত্বের দাবীদার নয়৷ তুমি আরও বলেছো যে সে এই বার্তা নিয়ে আসার পূর্ব পর্যন্ত মিথ্যাবাদী হিসেবে পরিচিত ছিল না। বেশ, আমি জানি সে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা বলার মাধ্যমে শুরু করবে না। তুমি বলেছো দরিদ্ররা তার অনুসারী। আল্লাহর সকল দূতের ক্ষেত্রেই তা ঘটেছে। তাত অনুসারীদের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ার ঘটনা পূর্ণ হবার আগ পর্যন্ত সত্যিকারের বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কযুক্ত। তুমি আরও বলেছো যে যারা তার ধর্ম গ্রহণ করেছে তাদের কেউই ফেরত আসে নি। এটা হল সত্যিকারের বিশ্বাসের বৈশিষ্ট্য যখন তার আলো মানুষের হৃদয়কে আলোকিত করে৷ সে বিশ্বাসঘাতক এমন কথা তুমি অস্বীকার করেছো এবং আল্লাহর কোন দূতই বিশ্বাসঘাতক ছিলেন না। তুমি আমাকে আরও বলেছো যে সে তোমাদেরকে আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস করতে, প্রার্থনা করতে, সত্যবাদী হতে এবং ব্যাভিচার না করতে আহবান জানায়। তুমি যা বলছো তা যদি সত্যি হয় তবে আমি যেখানে দাঁড়িয়ে সেই আধিপত্য তার হবে। আমি জানতাম তার আসার সময় হয়ে গেছে কিন্তু আমি ভাবিনি সে তোমাদের লোক হবে। আমার ক্ষমতা থাকলে আমি অবশ্যই তার সাথে সাক্ষাৎ করতাম এবং তার পা ধুয়ে দিতাম।

হেরাক্লিয়াসের প্রতি পত্রঃ ইয়াহিয়া আল কালবির মাধ্যমে প্রেরিত
আল্লাহর নামে যিনি দয়ালু এবং কল্যাণময়
আলাহর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে
রোমানদের শ্রেষ্ঠ হেরাক্লিয়াসের প্রতি

 

যারা সত্য নির্দেশনা অনুসরণ করে তাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আমি আপনাকে ইসলামে বিশ্বাস করার আহবান জানাচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করুন এবং আপনি নিরাপদে থাকবেন ও আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ পুরষ্কার দিবেন। আপনি যদি অস্বীকার করেন তবে আপনার লোকদের আবিশ্বাসের দায় আপনি বহন করবেন।

পত্র পড়ার পর, আবু সুফিয়ান বললেন, ‘যখন তিনি যা বলার বললেন এবং পত্র পাঠ শেষ করলেন, শোরগোল এত বেশি হল যে আমাদের বের করে দেয়া হল। আমি আমার লোকদেরকে বললাম, এই ঘটনা (ইবনে আবু কসবা) এতদূর পর্যন্ত গড়িয়েছে যে এমনকি বিবর্ণ চামড়ার রাজাদেরকেও ভয় পাইয়ে দিয়েছে। অতঃপর আমি উপলব্ধি করলাম যে সে বিজয়লাভ করবে এবং আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা আমাকে ইসলামে নিয়ে এলেন।

হেরাক্লিয়াস তার গোত্রপতিদেরকে বললেন তাদের উচিত ইসলাম গ্রহণ করা কিন্তু তারা প্রচন্ড রাগ করলেন এবং তিনি বললেন যে তিনি কেবল তাদের বিশ্বাস পরীক্ষা করছিলেন। তিনি তার রাজ্য নিয়ে ভীত ছিলেন। আবু সুফিয়ান বলেন, যখন পত্রটি পড়া হচ্ছিল তখন হেরাক্লিয়াসের কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছিল। তিনি জানতেন প্রকৃত সত্য কি কিন্তু তা গ্রহণ করার মত সাহস তার ছিল না। তিনি কাউকে বলেছিলেন, আমি যদি পারতাম তবে মুহাম্মদের নিকট পৌছাতাম কিন্তু সে তার রাজ্যের জন্য ভীত ছিল এবং ইসলাম গ্রহণ করেনি।

হেরাক্লিয়াসের এই পুরো ঘটনার মাঝে বিশাল এক শিক্ষা রয়েছে যেখানে এটা স্পষ্ট যে তার নিজ রাজ্যের প্রতি ভালোবাসা ঈমান গ্রহণের উপর বিজয়ী হয়েছে এবং তিনি ইসলাম গ্রহণ না করে এই দুনিয়ায় তার রাজ্যকেই বেছে নিলেন। ইসলামে প্রবেশ নয় বরং এর নিয়মনীতি অনুসরনের বেলায় আমরা কতবার এই একই ফাঁদে পা দেই? যে সকল নিয়ম এই দুনিয়া এবং আখিরাতে আমাদেরঅই কল্যানের জন্য সেগুলো গ্রহণ না করে আমরা শয়তানের ফাঁদে পা দেই অথবা হেরাক্লিয়াসের মতই আমাদের পথভ্রষ্ট বন্ধু ও সহযোগীদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করি এবং আল্লাহর আইন ভঙ্গ করি। আমরা ভুলে যাই যে এই জীবন একটি পরীক্ষা মাত্র এবং এই পরীক্ষার ফলাফল আমরা আল্লাহর সাথে যখন সাক্ষাৎ হবে তখন পাবো।

দ্বিতীয় যে শিক্ষাটি আমরা পাই তা হল যদি নেতার চরিত্র খাঁটি হয় এবং যদি তিনি তার মিশনে আন্তরিক হন তবে তার শত্রুও য়ার পক্ষে কথা বলতে বাধ্য হবে। আল্লাহর রাদূল (স) এর জীবনে এটা খুবই স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। যারা তাঁর ক্ষতি করতে চেয়েছে তারাও তার সম্পর্কে মিথ্যা অভিযোগ বা কুৎসা রটনা করতে সক্ষম হয়নি কারণ তারা তার চরিত্রে এমন কিছু পায়নি যা নিয়ে সমালোচনা করা যায়। তাদের কুৎসায় সত্যিকারের যা ফুটে উঠে তা হলোঃ হতাশামিশ্রিত ক্ষোভ যা তাদেরকে সত্য গ্রহণ করতে বাধা দেয়।

অন্যদিকে, যে কোন ঘটনায় জনগোষ্ঠীর বিশাল এক অংশ যারা সাধারণভাবে নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে, তাদের হৃদয় ধীরে ধীরে মহৎ এবং সত্যবাদী ব্যক্তিটির দিকে আকৃষ্ট হতে থাকে। এভাবে একটি অনুসারীদল তৈরি হয়। তবে, ইসলামের কাজ করার ক্ষেত্রে আমাদের কখনই ভুলে যাওয়া চলবে না যে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টিই আমাদের লক্ষ্য, অনুসারীর সংখ্যা বা জনপ্রিয়তার ব্যাপকতা নয়। রাসূলুল্লাহ (স) এর জীবনে তাই ঘটেছে যেখানে ২৩ বছরের জীবনে তিনি সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি থেকে সবচেয়ে ভালোবাসার পাত্রে পরিণত হয়েছেন। ধৈর্য্য খুব সহজ কোন বিষয় নয়। কিন্তু, ধৈর্য্য সবসময়ই মূল্য দেয়।

বার্তার সাথে আপোষহীনতা

রাসূল (স) যখন তার দ্বীনি দাওয়াহর কাজ শুরু করলেন তখন তার হাতে কি কি বিকল্প পন্থা ছিল দেখা যাক।

১। তিনি কুরাঈশদের রাজা হবার প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারতেন এবং তারপর পরিবর্তন করতেন।
২। তিনি সমঝোতা করতে পারতেন এবং তারপর ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনতেন।
৩। তিনি সামাজিক সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে প্রথমে একজন সমাজ সংস্কারক হয়ে স্থানীয় সহায়তা গ্রহণ করতে পারতেন এবং তারপর তার ধর্মীয় বার্তা প্রচার করতেন।

কিন্তু তিনি এগুলোর কোনটিই বেছে নেন নি। বরঞ্চ তিনি তাই করলেন যা সকল নবীগণ করেছেন- তিনি সরাসরি তার বার্তা উপস্থাপন করলেন। এট তার ঐশ্বরিক নির্দেশনার অন্যতম নিদর্শন এবং মহান আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ কারণ যাকে আল্লাহ পরিচালনা করছেন সে ব্যতীত আর কে তা করতে পারে যা তিনি করেছেন?

আপোষের ব্যাপারে অনাগ্রহ ছিল তার সারাজীবনের মূল বৈশিষ্ট্য।

যখন তার সহযোগিতার খুব প্রয়োজন ছিল তখনও তিনি তায়েফের বনু থাকিফের ইসলাম গ্রহণের প্রস্তাব গ্রহণ করেন নি যখন তারা এই শর্ত উপস্থাপন করেছিল যে তারা তার পথ অনুসরণ করবে এবং প্রার্থনা করবে তবে যাকাত প্রদান করবে না। কিছু ব্যক্তি তার অবস্থানে কোমল হবার জন্য তাকে পরামর্শ দিয়েছিল এবং বলেছিল যে বনু থাকিফের ইসলামকে গ্রহণ করে নেয়া উচিত এবং তারা হয়তো ভবিষ্যতে ঠিকমত যাকাত প্রদান করবে। আল্লাহর রাসূল (স) তার অবস্থান পরিবর্তন করতে রাজী হলেন না এবং বললেন, যে ব্যক্তি সালাত থেকে যাকাতকে আলাদা করে সে মুসলমান নয়। এই সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করেই রাসূল (স) এর মৃত্যুর পর যারা যাকাত প্রদানে অস্বীকার করেছিল তাদের বিরুদ্ধে আবু বকর সিদ্দিক (রা) যুদ্ধ ঘোষনা করেন। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল কিভাবে তিনি মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেন, উত্তরে তিনি রাসূলুল্লাহ (স) এর উক্তি ‘যে যাকাত প্রদানে অস্বীকার করে সে মুসলমান নয়’ উল্লেখ করেন।

যে কোন মহৎ কাজে সবচেয়ে ক্ষতি তাদের দ্বারা হয় যারা, সম্ভবত ভালোর জন্য, নীতির সাথে আপোষ করেন। যখন এমনটি ঘটে তখন পার্থক্যের স্পষ্টতা মুছে যায় এবং বার্তা তার গুরুত্ব হারায়।

মুহাম্মদ (স) এর দাওয়াহর ক্ষেত্রে তার অবস্থান এমন ছিল যে তিনি তার বাণীর সাথে আপোষ করা বা তরল করা কিংবা কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য লঘু করতে রাজী ছিলেন না। ঐশ্বরিক বাণী হবার অনেক প্রমাণের মধ্যে এটিও একটি এবং রাসূলুল্লাহ (স) এর বাহক হবার কারণে স্বাভাবিকভাবেই জানতেন যে এর মধ্যে কোন পরিবর্তন করার কোন অধিকার তার নেই। সামান্য পরিমানে হলেও তার পিতৃপুরুষ এবং গোত্রের লোকদের ধর্ম গ্রহণ করা এবং তাদের জন্য সহজ করা, তাদের রীতিনীতি ও ঐতিহ্য গ্রহণ করার বিশাল মানসিক ও নৈতিক চাপ তার উপর ছিল কিন্তু তিনি উপেক্ষা করেছেন।

তারা চাপ দেয়ার সকল পন্থাই গ্রহণ করেছিল। তাকে স্বর্ণ, নারী, ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব সংক্রান্ত প্রস্তাবের কথা আমই ইতোমধ্যেই উল্লেখ করেছি। তারা তাকে নিজেদের রাজা বানানোর প্রস্তাব করেছিল। তাকে মৃত্যুর ভয় দেখানো হয়েছে। তারা এমনকি এই প্রস্তাবও দিয়েছিল যে তারা একদিন তার খোদার উপাসনা করবে যদি তিনি অন্যদিন তাদের খোদার উপাসনা করতে রাজী হন। তারা বলেছিল যে তারা আল্লাহর একত্ববাদ গ্রহণ করতে সম্মত আছে যদি তিনি এ কথা বলা বন্ধ করেন যে বহুত্ববাদ এবং মূর্তিপূজা করা ভুল। সবশেষে যখন তার চাচা আবু তালিব, যিনি তাকে এতদিন রক্ষা করে এসেছেন, তাকে বললেন, উত্তরে তিনি বললেন, আমার চাচা, তারা যদি আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চন্দ্রও এনে দেয় তাহলেও আমাকে যা বাণী প্রচারের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তা থেকে বিরত হবো না।

সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার আগে আমরা বর্তমানে ইসলামের নামে কৈফিয়তমূলক অবস্থানে থেকে কি করছি তা বলতে চাই। আমরা পিছু হটতে, ইসলামের বাণীকে লঘু করতে, এর মাঝে সকল প্রকার নতুনত্ব প্রবেশ করাতে এবং যে কোন কিছু করতে আগ্রহী কেবল সরাসরি ও সুস্পষ্টভাবে বলতে আগ্রহী না। নিজেকে প্রশ্ন করুন, রাসূলুল্লাহ (স) যদি আজ জীবিত থাকতেন এবং মক্কায় যেরকম অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন সে রকম অবস্থান গ্রহণ করতেন তাহলে আমাদের মধ্যে কতজন তার পাশে দাঁড়াতে আগ্রহী হতাম? আজ আমরা তার সুন্নাত অনুসরণ করতে আর তার অনুসারী দাবী করতেই ভয় পাই। কি লজ্জা! আল্লাহ আমাদের সহায়তা করুন।

শিক্ষা

একজন নেতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল তার বাণী বা মতাদর্শের ভিত্তিতে নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করা। যদি নেতা জনপ্রিয়তার জন্য, পার্থিব লাভের জন্য, অনুসারী বৃদ্ধি বা অন্য কিছুর জন্য নিজের বাণীর সাথে আপোষ করে, তাহলে তার বার্তার স্বতন্ত্রতা হারাবে এবং একটি সুস্পষ্ট আদর্শ যার উপর সকল কাজ নির্ভর করবে তা নষ্ট হয়ে পড়বে। স্বাভাবিকভাবেই এটি খুব সহজ কোন কাজ নয় কারণ বিদ্যমান নিয়ম, মূল্যবোধ এবং রীতিনীতি ধরে রাখার জন্য প্রচুর সামাজিক ও অন্যান্য চাপ থাকে। ভিন্ন পথে চলা, বিশেষ করে যখন তা বিদ্যমান ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে, সহজ নয়। কিন্তু এটি নেতাকে অন্যদের তুলনায় আলাদা করার জন্য একটি অপরিহার্য শর্ত।

আগেও বলেছি, পতাকা শেষ পর্যন্ত এক টুকরা কাপড়ই এবং একে ধুয়ে যদি কাপড় টাঙ্গানোর দড়িতে শুকাতে দেয়া হয় তবে এর আলাদা কোন মর্যাদা থাকে না। কিন্তু সেই একই কাপড় যখন পতাকার দণ্ডে লাগিয়ে উত্তোলন করা হয় এবং বাতাসে এটি পতপত করে উড়তে থাকে, মানুষ তখন একে সালাম জানায়। পতাকার সহজাত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন হয়নি, কিন্তু এর অবস্থানগত বৈশিষ্ট্যের কারণে পার্থক্য তৈরী হয়ে গেছে। যতক্ষণ পর্যন্ত এটি অন্যান্য কাপড়ের সাথে এক দড়িতে ছিল, এর আলাদা কোন মর্যাদা ছিল না। কিন্তু যখনই একাকী স্পষ্টভাবে দেখা যাওয়ার মত করে দাঁড়ালো, প্রতিনিধিত্বকারী একটি রাষ্ট্রের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হল, এটি সম্মান, শ্রদ্ধা এবং সালাম লাভ করল।

একজন নেতাকে অনুসরণ করতে হলে তার পরিচয় জানা, তার লক্ষ্য কি এবং তাকে অনুসরণ করলে অনুসারীদের কী লাভ ইত্যাদি বিষয় যে কারও জন্যই সুস্পষ্ট, দ্ব্যার্থহীন ও অন্যপ্রেরণাদায়ী হতে হবে। পতাকা যখন উঁচুতে উড়ে কেবল তখনই প্রতীক হয়ে উঠে।

ইসলামের বিরোধিতাকারীরা যখন দেখে যে তারা ইসলামের দাওয়াহ প্রচার থেকে বিরত করতে পারছে না, তখন তারা এর বাণীকে আরও তরলীকরণের মাধ্যমে যাদের অন্তরে মুনাফেকী আছে তাদের জন্য ‘রুচিকর’ করে তুলতে চেষ্টা করে। আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী নিজেদের প্রবৃত্তিকে যারা নিয়ন্ত্রণ করতে আগ্রহী নয় তারা যতক্ষণ পর্যন্ত বার্তাবাহক তার বাণীকে তাদের জীবনধারা ও প্রবৃত্তি অনুযায়ী পরিবর্তন না করছে ততক্ষণ তাকে সহযোগিতার ভাণ করতে মোটেও আপত্তি করে না। বর্তমান যুগের মুসলমানদের মধ্যেও আজকাল এই ফতোয়া সদাইয়ের মানসিকতা লক্ষ্য করা যায়। এ মানসিকতার মানুষ এমন ব্যক্তিদেরকে খুঁজে বেড়ায় যারা তাদের আকাঙখা পূরণের অনুমতি প্রদানের জন্য ধর্মের নিয়মকে পালটে দিতে আপত্তি করে না। এ ধরনের ‘উলামা’দেরকে প্রশংসা করা হয়, পুরস্কৃত করা হয়। অথচ যাদের মধ্যে সতর্ক করা, সত্যি কথা বলা এবং মন্দকে নিষেধ করার মত সততা রয়েছে তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষন করা হয়, তারা হয় নির্যাতিত, নিপীড়িত।

অনুগামীত্বের লোভনীয় প্রস্তাবে প্ররোচিত না হওয়া এবং কারও আকাঙখা পূরণ করে তাকে ধর্মান্তরিত করার জন্য বার্তায় কোনরূপ পরিবর্তন না করা যে কোন নেতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বার্তাই নেতাকে সকলের থেকে আলাদা করে তুলে। যখন সে বার্তার সাথে আপোষ করে তখন তাকে সব হারাতে হয়।

অন্যদের থেকে পৃথকীকরণের পক্ষে এবং আত্তীকরণ ও নিজের আইডেন্টিটি হারানোর বিপক্ষে এটাই সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি। যার নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করার প্রত্যয় নেই বরং ভেড়ার পালের অন্যান্য ভেড়ার মত থাকতেই আগ্রহী, তার নেতা হবার জন্য সম্পূর্ণ অযোগ্য। নেতা হবার মানে হলো কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এবং কখনো কখনো একাকী হবার ব্যাপারে অভ্যস্ত হওয়া। বাঘ একাকী ঘুরে বেড়ায়। আর ভেড়ার অনেক সঙ্গী-সাথী থাকে।

নিজেকেও সারিতে রাখা

তৃতীয় যে যে বিষয়টি রাসূল (স) কে অন্যদের তুলনায় আলাদা করেছে তা হল নিজেকে সঠিক পথের উপর রাখার ইচ্ছা। কোন অবস্থাতেই তিনি নিজে যা করতে আগ্রহী না তা করার জন্য অন্যকে প্রেরণ করেন নি। একজন আদর্শ বাহকের যৌক্তিক অবস্থান হল দলের সম্মুখভাগ, সকলের সামনে যেন সকলেই তাকে দেখতে পারে এবং তার আদর্শ অনুসরণ করতে পারে৷ স্বাভাবিকভাবেই এটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ, তবে দায়িত্ব গ্রহণ করার এই মানসিকতা নেতৃত্বের একটি লক্ষণ এবং শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আনুগত্যকে উৎসাহিত করে।

তার সীরাতে অসংখ্য ঘটনা রয়েছে যেখানে তিনি সামনে থেকে অন্যান্যরা টের পাওয়ার আগেই সম্ভাব্য বিপদের মোকাবেলা করেছেন। জীবনের কোন অবস্থায়ই তিনি তাঁর কোন সাথীকে বিপদের মুখে ঠেলে দেননি বা তাদের পেছনে লুকান নি। তাঁর তায়েফে ভ্রমণের ঘটনাটি, যা আমি পরবর্তী অংশে বিস্তারিত বর্ণনা করেছি, একটি ভালো উদাহরণ যেখানে তিনি কাউকে প্রেরণ না করে নিজেই ব্যক্তিগতভাবে ঝুঁকি গ্রহণ করেছেন। আরেকটি ঘটনায় হাওয়াজিমদের বিরুদ্ধে হুনাইন যুদ্ধে যখন মুসলমানরা আচমকা গুপ্ত আক্রমণের মুখে শৃঙ্ক্ষলা ভেঙ্গে পিছু হটেছিল, আবু সুফিয়ান বিন হার্ব তাদের ছত্রভঙ্গ অবস্থা দেখে বলেছিল, ‘একমাত্র সমুদ্রই এখন তাদেরকে থামাতে পারে’, অর্থ্যাৎ, কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত লোহিত সমুদ্র পর্যন্ত তারা মুসলমানদেরকে তাড়া করে নিয়ে যাবে। এই অবস্থায়ও রাসূলুল্লাহ (স) শত্রুর দিকে পিঠ দেখাতে রাজী হলেন না বরং সম্মুখদিকে এগিয়ে যেতে থাকলেন। তাঁর সাথীগণ ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে তাঁকে থামাতে চাইলেও তিনি সামনের দিকে এগোতে থাকেন।

তিনি আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) কে দেখে আনসারদেরকে এবং তাদের মধ্যে তার বিশেষ সৈন্যবাহিনী বনু নাজ্জার গোত্রের লোকদেরকে ডাকার জন্য নির্দেশ দিলেন। তারা এসে তাঁকে ঘিরে ধরলো। সবশেষে, মাত্র একশ’র চেয়ে অল্প কিছু বেশি মানুষ ছিল যারা রাসূলুল্লাহ (স) এর সাথে ছিলেন এবং যুদ্ধের মোড় ঘুড়িয়ে দিয়ে সেদিন জয়লাভ করেছিলেন। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাদেরকে সাহায্য করেছিলেন এবং যখন তিনি বলেন যে তিনি প্রশান্তি নাযিল করেছেন ও সৈন্য পাঠিয়ে সহযোগিতা করেছেন যা তারা দেখতে পায়নি তখন তিনি এই অল্প সংখ্যক মানুষের কথাই বলেছেন। রাসূলুল্লাহ (স) এর সাহস এমনই ছিল যে কেউ তার সমকক্ষ ছিলেন না।

আরেকটি উদাহরণ হল আবদুল্লাজ বিন আবি সারহ এর প্রতি তাঁর আচরণ। সে ছিল ধর্মনিন্দা (blasphemy) ও ইসলাম এবং রাসূল (স) এর ক্ষতি করার জন্য মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ৭ ব্যক্তির অন্যতম। রাসূল (স) তাদের মৃত্যুদন্ড ঘোষনা করলেন এবং বললেন তারা যদি কাবার চাদরও আঁকড়ে থাকে তাদেরকে যেন হত্যা করা হয়। আবদুল্লাহ বিন আবি সারহ তার দুধভাই উসমান ইবনে আফফানের (রা) ঘরে আশ্রয় নিলেন৷ উসমান (রা) তাকে রাসূলুল্লাহ (স) এর কাছে নিয়ে গেলেন। আবদুল্লাহ বিন আবি সারহ বললেন, ‘আমি আপনার নিকট বাইয়াত নিতে এসেছি।’ রাসূলুল্লাহ (সা) উত্তর দিলেন না। আবদুল্লাহ বিন আবি সারহ দুইবার অনুরোধ করলেন। রাসূল (স) নীরব হয়ে রইলেন। যখন তিনি তৃতীয়বারের মত অনুরোধ করলেন, রাসূলুল্লাহ (স) তার বাইয়াত গ্রহণ করলেন এবং তিনি মুসলমান হয়ে গেলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স) এর কাছে থেকে চলে যাওয়ার পর তিনি তাঁর সাথের লোকদের বললেন, ‘তোমরা যখন দেখলে যে আমি চুপ রয়েছি তখন তোমাদের মধ্যে কি এমন জ্ঞানী কেউ ছিল না যে উঠে দাঁড়িয়ে তাকে হত্যা করতে পারে?’ আনসারগণ বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (স), আপনি যদি সামান্য ইঙ্গিত দিতেন তাহলে আমরা তাকে হত্যা করতাম।’ আল্লাহর রাসূল (স) বললেন, নবীগণ ইঙ্গিতের মাধ্যমে হত্যা করে না।’ আবদুল্লাহ বিন আবি সারহ একজন ভালো মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন এবং খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব ও উসমান ইবনে আফফানের সময় উঁচু পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি ফজর নামাজের সিজদারত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

এই ঘটনায় আল্লাহর রাসূল (স) সত্য ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতি তার অঙ্গীকার প্রদর্শন করেছেন যেখানে তিনি তার নিকৃষ্টতম শত্রুর বিরুদ্ধেও গোপনে কোন পদক্ষেপ নেন নি।

শিক্ষা
একজন নেতার জন্য শারীরিক ও মানসিক সাহসিকতা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বলা হয়ে থাকে, মানুষ পদবীকে অনুসরণ করে না, সাহসকে করে।’ বর্তমান সময়ে, নিজের হাতে অন্যের জীবন নেয়ার প্রয়োজন পরে না বটে, কিন্তু নিজের বিশ্বাসের পক্ষে বা ঝুঁকি নিয়ে অন্যের পক্ষে দাঁড়ানো আনুগত্য তৈরীতে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে এবং লক্ষ্যের প্রতি ব্যক্তির নিজের অঙ্গীকার তুলে ধরে।

এই ধরণের ঘটনাগুলো পরিকল্পনা করে সংঘটিত হয় না। এ কারণে সাহসিকতার গুণটি নেতার মধ্যে সহজাত বৈশিষ্ট্য হিসেবে গড়ে উঠা উচিত যেন প্রয়োজনের সময়ে সাহসিকতা নিজে থেকেই প্রস্ফূটিত হয়৷ নেতৃত্ব সবসময় সামনে থেকে দিতে হয় এবং অনেকসময় এটি বিপদজনক জায়গায় পরিণত হয়। স্মরণ রাখা ভালো, কাপুরুষ নেতার মত হীন আর কিছু নেই।

আগেই বলেছি, মানুষ তাদের চোখ দিয়ে শুনে। আপনি কি করেন তা না দেখা পর্যন্ত তারা আপনি যা বলছেন তা পাত্তাই দিবে না। আপনার কথার প্রতি মনযোগ দেয়ার তুলনায় আপনি কি করছেন তা দেখার প্রতি তাদের মনযোগ বেশি থাকবে। যদি তারা দেখে যে আপনি তাদেরকে যা বলেন তা থেকে ভিন্ন কিছু করেন, তাহলে তারা আপনার উচ্চারিত শব্দকে নয় বরং আপনার কর্মকে বিশ্বাস করবে এবং অনুসরণ করবে৷ এভাবে আপনার নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। কথা ও কাজের ফাঁকের মাঝে পড়ে বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়, হারিয়ে যায়।

আল্লাহর রাসূল (স) সবসময়ই এ ব্যাপারে সচেতন ছিলেন এবং তার কথাকে নিজের জীবনে পালনের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। এ কারণে যখন কেউ সাইয়্যেদা আয়েশা (র) কে রাসূলুল্লাহ (স) এর জীবন সম্পর্কে প্রশ্ন করতেন তখন তিনি বলতেন, ‘তুমি কি কোরআন পড় নি?’ তিনি বুঝাতে চাইতেন যে রাসূল (স) এর জীবন ছিল কাজের মাধ্যমে কোরআন এর বহিঃপ্রকাশ।

সীরাত পাঠ বর্তমানে খুবই উপেক্ষিত এবং আমি সীরাত পাঠের গুরুত্বের উপর জোর দিতে চাই। সীরাত হল কোরআনের জীবন্ত তাফসীর। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নির্দেশ পরিপালনের পদ্ধতি সীরাত। আল্লাহর নির্দেশনা কিভাবে অনুসরণ করতে হবে তা জানার জন্য আমরা যদি সেখানে খোঁজ না করি তবে আমরা কোথায় খুঁজতে চাই? পরিতাপের বিষয়, আমাদের ধর্মীয় স্কুলগুলোতেও সীরাত স্বাধীন বিষয় হিসাবে পড়ানো হয় না। শিক্ষার্থীরা রাসূল (স) এর জীবন সম্পর্কে জানতে পারে হাদীস থেকে এবং কোরআন এর তাফসীর পড়তে গিয়ে শানে নুযূল (আসবাব উন নুযুল) থেকে। এটা যথেষ্ট নয়। আমাদের সীরাত পাঠ করা উচিত কারণ আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা বলেছেন তার জীবন হল অনুসরণের জন্য সর্বোত্তম উদাহরণ অথচ আমরা তার মহিমান্বিত জীবন অধ্যয়নের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করি না। এটা কতটুকু যৌক্তিক? জেগে উঠুন!!

Resilience: নিষ্ঠুর সত্যের মুখোমুখি হওয়া এবং সফলতায় নিশ্চিত বিশ্বাস

মক্কায় সফল না হওয়ায় মুহাম্মদ (স) তায়েফে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। সেখানে হিজাজের আরেকটি বড় গোত্র বনু থাকিফ বসবাস করত। তিনি শা করেছিলেন, তারা তাঁর বার্তা অপেক্ষাকৃত ভালোভাবে গ্রহণ করবে৷ বনু থাকিফকে কুরাঈশদের মতই আরবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোত্রগুলোর একটি হিসেবে সম্মান করা হতো এবং তাদের শহরেও একটি দেবদেবীর মন্দির ছিল।

তারা আরও খারাপ প্রমাণিত হলো। তিনি বনু থাকিফের গোত্রপ্রধানদের নিকট তার দাওয়াত পেশ করলেন। কিন্তু শয়তানের প্ররোচনা এমন, যখন তাদের সামনে ইসলামের দাওয়াত পেশ করা হল তারা তাদের আচার-ঐতিহ্য ভেঙ্গে এমন আচরন করল যে বনু থাকিফ ও আরবের ইতিহাসে তাদের পূর্বপুরুষদেরকে এমনভাবে লজ্জিত আর কেউ করেনি। (shamed themselves for posterity in the annals of the history of Banu Thaqeef and the Arabs.) আরবরা তাদের অতিথিদেরকে সম্মান জানানোর আচরনের জন্য বিখ্যাত ছিল। আরবের ইতিহাসে এর অনেক বিখ্যাত ঘটনা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (স) হযরত যায়েদ বিন হারিস (রা) কে সঙ্গে নিয়ে তায়েফে গিয়েছিলেন এবং বনু থাকিফের তিন গোত্রপ্রধান সহোদরের নিকট ইসলামের বাণী তুলে ধরতে চেষ্টা করলেন। As I have mentioned hospitality and generosity towards the guest was a time honored code among all tribal societies, especially so among the Arabs. It must have been in the mind of Rasoolullah that given this tradition and his own status, the chiefs of Banu Thaqeef would at least give him a hearing. But to his utter astonishment, instead of greeting him with the civility that was his right as a guest and as he was a member of the aristocracy of the Quraysh, the Banu Hashim, they violated every rule of honoring the guest and treated him shamefully dishonoring themselves and the honor of Banu Thaqeef. Their story is written in words of shame in the annals of history to the end of time and Allah decreed that when the Banu Thaqeef of At-Ta’aif eventually came to Islam, they came as conquered people, losing all their wealth to the Muslims. Allah doesn’t forgive those who trouble His Anbiya.

রাসূলুল্লাহ (স) বনু থাকিফের তিন গোত্রপ্রধান ভাইয়ের সাথে সাক্ষাতের চেষ্টা করেছিলেন৷ দুজন তার সাথে সাক্ষাত করলেও একজন সাক্ষাতে অস্বীকার করে। একজন বলল, আল্লাহ যদি তোমাকে নবী করে পাঠায় তবে আমি কিসওয়াতুল কাবা ছিঁড়ে ফেলবো।

দ্বিতীয়জন বলল, আল্লাহ কি তোমার চেয়ে ভালো কাউকে নবী হিসেবে পাঠানোর জন্য পান নি?

তৃতীয়জন স্রেফ সাক্ষাত করতে অস্বীকৃতি জানালো এবং বলল, আমি তোমার সাথে কথা বলবো ন কারণ তুমি যদি সত্যি সত্যিই নবী হও তবে আমি তোমার সাথে কথা বলার মত যোগ্য নই। আর যদি তুমি মিথ্যাবাদী হও, তবে আমি কেন তোমার সাথে কথা বলবো?

সর্বশেষ প্রচেষ্টা হিসেবে রাদূলুল্লাহ (স) তাদেরকে বললেন, ‘যদি তোমরা আমার আহবান গ্রহণ করতে না পারো তবে অন্ততঃ এই আলোচনাটুকু গোপন রেখো।’ কিন্তু তারা অস্বীকার করল এবং এর পরিবর্তে তাদের দাস ও অন্যান্যদেরকে লেলিয়ে দিল যেন তারা তাদেরকে গালিগালাজ করে ও পাথর নিক্ষেপ করে শহর থেকে বের করে দিতে পারে। যায়েদ বিন হারিস (রা) রাসূল (স) কে রক্ষার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করল। কিন্তু লোকেরা চতুর্দিক থেকে পাথর ছুঁড়ছিল, তারা দুজনেই জখম হলেন। রাসূলুল্লাহ (স) এতটা রক্তাক্ত হলেন যে তার রক্ত জুতায় জমাট বেঁধে গেল। খুবই দুঃখজনক ব্যাপার, মানুষ তাকেই আক্রমণ করে যে কেবল তাদেরকে সাহায্য করতে চায়।

ভেবে দেখুন, কুরাইশদের সম্ভ্রান্ত একজন মানুষ, পৃথিবীর বুকে যারা পদচারনা করেছে তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিটিকে গালিগালাজ, নির্যাতন করা হয়েছে, একমাত্র কারণ তিনি এই বাণী প্রচার করছেন যে আল্লাহ ছাড়া আর কেউই উপাসনার যোগ্য নয়।

স্মরণ রাখবেন এই মহাবিশ্ব আর জান্নাত-জাহান্নামের স্রষ্টা সবকিছু দেখছেন৷ তিনি এমনটি ঘটতে দিলেন যেন সকল সময়ের সকল মানুষের কাছে রাসূলুল্লাহ (স) এর কমিটমেন্ট স্পষ্ট হয়ে উঠে। এটা স্রষ্টারই ইচ্ছা যে মুহাম্মদ (স) হবেন সর্বশেষ নবী এবং পরবর্তীতে তার বাণী প্রচার করবে তাঁরই অনুসারীরা। এবং এ কারণে অঙ্গীকারের এমন একটি মডেল স্থাপিত হওয়া জরুরী ছিল যেন তা যারা অসহিষ্ণু পৃথিবীতে ইসলামের দাওয়াত প্রচার করতে গিয়ে কোনরূপ সমস্যার সম্মুখীন হলে তাদের জন্য সহায়তার বাতি হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারে৷ রাসূল (স) এর জীবনী যে পড়েছে সে কোনদিনও বলতে পারবে না যে তার কাজ আল্লাহর রাসূলের তুলনায় বেশি কষ্টসাধ্য।

এ কারণেই এই বিশ্বজগতের যিনি স্রষ্টা এবং সবকিছু যার নিয়ন্ত্রনাধীন, তিনি তার রাসূলের দিকে নিক্ষেপকৃত একটি পাথরকেও আঘাত করা থেকে বাধা দেন নি, বরঞ্চ তার নবী যে ইসলাম প্রচারের জন্য চেষ্টার বিন্দুমাত্র কমতি করেন নি তার সাক্ষী হয়েছেন।

শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (স) এবং যায়েদ বিন হারিস (রা) মক্কার দুইজন লোকের মালিকানাধীন একটি খামারে আশ্রয় নিলেন। তারা রাসূলুল্লাহ (স) এর অবস্থা দেখে তাদের খ্রীস্টান দাস আদ্দাসকে দিয়ে কিছু আঙুর এবং পানি দিয়ে তাদের নিকট পাঠালেন৷ তারা ছিল তাঁর শত্রু, তা সত্ত্বেও তারা আরবদের অতিথিয়তার ঐতিহ্য রক্ষার্থে তাঁকে সহায়তা করল। আদ্দাস যখন রাসূলুল্লাহ (স) কে আঙুর দিলেন, তিনি একটি তুলে নিলেন এবং বললেন, ‘বিসমিল্লাহ’। আদ্দাস বললেন, ‘এই অঞ্চলের লোকেরা এই কথা বলে না।’ রাসূলুল্লাহ (স) তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কোথা থেকে এসেছো এবং তোমার ধর্ম কি?’

আদ্দাস বললেন, ‘আমি ইরাকের নিনাভে (Nineveh) থেকে আগত একজন খ্রীস্টান।’ আল্লাহর রাসূল (স) বললেন, মানে তুমি আল্লাহর নবী ধার্মিক মানুষ ইউনূস ইবনে মাত্তা’র ভূমি থেকে এসেছো।’ আদ্দাস বললেন, ‘আপনি ইউনূস (আ) সম্পর্কে কিভাবে জানলেন?’ রাসূল (স) বললেন, ‘তিনি আমার ভাই কারণ উনিও নবী ছিলেন এবং আমিও একজন নবী।’ আল্লাহ তাদেরকেই পথ দেখান যারা সত্যের প্রতি আন্তরিক। আদ্দাস নিচু হয়ে রাসূলুল্লাহ (স) এর পায়ে, হাতে এবং কপালে চুম্বন করলেন। তার মালিকেরা এই দৃশ্য দেখে বলল, দেখেছো সে কিভাবে সবাইকে বশ করে নেয়? আমাদের দাসও এখন তাঁর ধর্ম গ্রহণ করে নিল।’

আদ্দাস ফিরে এলে তারা জানতে চাইল কেন সে মুহাম্মদ (স) এর হাতে ও কপালে চুম্বন করলো। আদ্দাস বলল, ‘এই দুনিয়ায় তার চেয়ে সুন্দর আর কেহই নেই। তিনি আমাকে এমন কিছু বলেছেন যা কোন নবী ব্যতীত আর কেউ বলতে পারে না।’ তারা বললেন, তার কথায় নিজের ধর্ম ত্যাগ করো না কারণ তোমার ধর্ম তার ধর্মের তুলনায় অধিকতর ভালো। এই আলাপে মজার বিষয় হল যারা তাকে খ্রীষ্টধর্ম ত্যাগ না করার পতামর্শ দিচ্ছে তারা নিজেরা মূর্তিপূজারী এবং খ্রীষ্টধর্ম সম্পর্কে কিছুই জানে না। তা সত্ত্বেও তারা ইসলাম গ্রহণ করতে আগ্রহী ছিল না।

শত্রুতা এক অদ্ভুত রোগ, যারা এ রোগে আক্রান্ত তারা এমন অন্ধ হয়ে যায় যে ভালো জিনিসও তারা গ্রহণ করতে আগ্রহী হয় না যদি তা এমন কারও নিকট থেকে আসে যাকে তারা ঘৃণা করে।

রাসূলুল্লাহ (স) এর অবস্থা কল্পনা করুন। তিনি তায়েফের লোকদের নিকট ইসলামকে উপস্থাপনের চেষ্টায় বিফল হলেন। মক্কার অধিবাসীদের ক্ষেত্রেও তার সফলতা খুব সীমিত। এই ব্যর্থতার সবচেয়ে নিকৃষ্ট ক্ষেত্রে আজ তিনি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে নিপীড়িত এবং নির্যাতিত হয়েছেন, এমন অবস্থায় তার মানসিক অবস্থা কেমন হওয়া উচিত? তিনি সিজদায় নত হয়ে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে দোয়া করলেন যা তার সীরাতে বিখ্যাত হয়ে আছে।

তায়েফের দোয়া
হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট আমার দুর্বলতা, আমার রসদের স্বল্পতা এবং লোকদের দ্বারা আমি যেভাবে অপমানিত হয়েছি তার ব্যাপারে অভিযোগ করছি। হে পরম দয়ালু, হে দুর্বলের রব এবং আমারও রব। তুমি আমাকে কার উপর পাঠিয়েছো? এত দূরবর্তী মানুষের কাছে যারা আমাকে শত্রু হিসেবে গ্রহণ করেছে? নাকি এমন শত্রুর নিকট যাকে তুমি আমার উপরে কতৃত্ব দান করেছো? তুমি যতক্ষণ আমার উপর রাগান্বিত না হও, আমি

To whom have you entrusted me? To a distant person who receives me with hostility? Or to an enemy to whom you have granted authority over my affair? So long as You are not angry with me, I do not care. Your favor is expansive relief to me. I seek refuge in the light of Your Face by which all darkness is dispelled and every affair of this world and the next is set right, lest Your anger or Your displeasure descends upon me. I desire Your pleasure and satisfaction until You are
pleased.

There is no power and no might except by You.’

আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা তার নবীর দোয়া শুনলেন এবং জীবরাঈল (আ) কে পাঠালেন। জীবরাঈল (আ) আরেকজন ফেরেশতাকে সাথে নিয়ে আগমন করলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স) বললেন, ‘আপনার রব আপনার দোয়া শুনেছেন এবং এই ফেরেশতাকে নিয়ে আপনার নিয়ন্ত্রনে দেয়ার জন্য নির্দেশ করেছেন। আপনি যা নির্দেশ দিবেন সে তা পালন করবে।’ ফেরেশতা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (স), আমি পর্বতের ফেরেশতা। আপনার রব আমাকে আপনার নির্দেশের জন্য নিজেকে হাজির হতে নির্দেশ দিয়েছেন। আমাকে নির্দেশ করুন এবং আমি তায়েফের দুইপ্রান্তের দুই পাহাড় একত্র করে দেবো এবং যারা আপনাকে নির্যাতন করেছে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।’

আল্লাহর রাসূল (স) বললেন, আল্লাহ আমাকে মানুষকে হত্যার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন নি। আল্লাহ আমাকে মানুষকে সেই পথনির্দেশ করার জন্য প্রেরণ করেছেন যা তাকে সন্তুষ্ট করে। আমার রবের নিকট আমার প্রত্যাশা, এই লোকগুলো যদি আজ আমার বার্তা গ্রহণ নাও করে, তার বংশধরেরা একদিন করবে।’ আল্লাহর রাসূল (স) এমনই ছিলেন, তার উদারতা এবং করুণা সকল যুগের জন্যই একটি উদাহরণ।

এই ঘটনার মধ্যে প্রতিশ্রুতি / অঙ্গীকার (commitment) এর প্রধান শিক্ষা ছাড়া আরও শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। এর একটি হল রাসূল (স) এর প্রতি সাহাবীদের ভক্তি। যায়েদ বিন হারিসা (রা) রাসূল (স) এর নিরাপত্তায় নিজের শরীরকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। রাসূল (স) এর প্রতি নিক্ষিপ্ত পাথর তিনি নিজের শরীরে গ্রহণ করেছিলেন। বদর ও উহুদের প্রান্তরে অন্যান্য সাহাবীরা তাকে তীরের আঘাত থেকে রক্ষার জন্য একই কাজ করেছিলেন। আবু তালহা আল আনসারীর ডানহাতে এত সংখ্যক তীর বিদ্ধ হয়েছিল যে Abu Talha Al Ansari took so many arrows on his right arm that his arm bristled with them এবং যারা তাকে দেখেছে তারা অবাক হয়ে গিয়েছিল তিনি কিভাবে রাসূল (স) এর জন্য মানব বর্ম হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

বর্তমান সময়ে তার সুন্নাতকে রক্ষা করা আর রাসূল (স) এর পবিত্র দেহকে রক্ষা করা সমার্থক। আবু মুসলিম আল কাওলানী (র) বলেন, রাসূলের সাহাবীরা কি ভেবেছেন যে আমরা রাসূল (স) তাদের কাছেই রেখে দিতে দিবো? না, আমরা রাসূলের বারাকার জন্য তাদের সাথে প্রতিযোগিতা করবো এবং আমাদের অংশ আদায় করে নিবো।’ এই যুগে আমরা যখন সুন্নাত পালনের মাধ্যমে একে রক্ষা করি, রাসূল (স) এর সম্মান সংরক্ষণ করি এবং যারা তার অসম্মান করতে চায় তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করি, তখন আমরা হয়তো হযরত জায়েদ বা আবু তালহা যা করেছিলেন সেরকম বিশাল কিছু করি না তথাপিও আমরা যদি তার রাসূলের এবং তার সুন্নাতের অনুসরণ করি তাহলে আল্লাহ আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হবেন এবং তার মহিমা ও অনুগ্রহে আমাদের পুরষ্কৃত করবেন। অনুরূপভাবে, সুন্নাত পরিত্যাগ করা কিংবা একে আক্রমণ করা বা হাদীসের গুরুত্বকে অস্বীকার করা আর তায়েফের লোকদের মতই রাসূলুল্লাহ (স) ও তার পবিত্র শরীরকে আঘাত করার সমতূল্য। কোন দলের সাথে আমরা থাকবো – সাহাবীদের দলে নাকি কাফের মুনাফিকদের, জান্নাতীদের দলে নাকি জাহান্নামীদের – সেটা আমাদের পছন্দ।

উল্লেখ্য, রাসূল (স) যখন তায়েফের লোকদের দাওয়াত দিয়েছিলেন, খালিদ আ উদওয়ানি আস-সাকাফি তখন ছোট বালক ছিলেন। তিনি বলেনঃ রাসূল (স) সূরা তারিক পাঠ করেন এবং আমি সূরাটি শুনে মুখস্ত করে নেই। পরবর্তীতে তিনি ইসলাম গ্রহণের পরে বলেন, এই সূরাটি আমি মুখস্ত করার সময় থেকেই জানি অথচ আমি তখন মুসলমানই ছিলাম না।

এই দোয়ার মধ্যে যে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে উঠে তা হল রাসূল (স) কিভাবে তার নিজের দুর্বলতা এবং প্রভাবহীনতার কথা বলেছেন। যারা তাকে পরিত্যাগ করেছে, অপমান বা নির্যাতন করেছে তাদেরকে তিনি অভিশাপ দেন নি। যারা তার বাণী গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে তাদের উপর আল্লাহর আযাব কামনা করেন নি। তিনি নিজের দুর্বলতাকে মেনে নিয়ে আল্লাহর কাছে শক্তির প্রার্থনা করেছেন। তিনি আল্লাহকে বলেছেন, যতক্ষন তিনি (আল্লাহ) তার উপর সন্তুষ্ট রয়েছেন, তিনি পৃথিবীর মতামতের পরোয়া করেন না। এবং তিনি (আল্লাহ) যদি তার উপর সন্তুষ্ট না হন তবে তিনি (মুহাম্মদ স) তার সকল ক্ষমতা ব্যবহার করে কাজ করে এতে থাকবেন যতক্ষণ না তিনি (আল্লাহ) সন্তুষ্ট হন।

প্রশংসার মধ্যে থেকে লক্ষ্যের প্রতি নির্দিষ্ট হওয়া সহজ। যখন আপনার কাজের জন্য আপনি সমালোচিত হচ্ছেন এবং যখন আপাতদৃষ্টি আপনার কোন সহায়তা নেই, তখন লক্ষ্যের প্রতি নির্দিষ্ট হওয়া খুব কঠিন। বিশেষ করে এই সমালোচনা যদি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মত নোংরা রূপ গ্রহণ করে। নিজের পছন্দের পথে চলমান থাকা এবং মানুষকে বোঝাতে ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েও সাফল্যের ব্যাপারে সন্দিহান না থাকা যে কোন নেতার জন্যই বিশাল এক পরীক্ষা। অন্ধকার রাতে, যখন নিজের অন্তরের অন্ধকার রাতের অন্ধকারের চেয়েও বেশী স্পষ্ট হয়ে উঠে, যখন কোন ব্যক্তি দৃশ্যমান কোন সাহায্য ছাড়া একাকী দাঁড়িয়ে থাকে, তখনই সে বুঝতে পারে যে সত্যিকারের সহায়তা ভেতর থেকেই আসতে হবে। এবং এটা আসে যখন সে তার সকল সমস্যা একমাত্র সমাধানকারী আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার কাছেই সমর্পন করে স্বস্তি বোধ করে।

রাসূল (স) এর জন্য তায়েফের ঘটনা ভীতিকর বা আশা হারানোর মত কিছু ছিল না বরং তার সংকল্পের নবায়ন এবং উৎসাহের শক্তিবৃদ্ধির উপায় ছিল। তায়েফের এই ঘটনার পরে অবস্থার ক্রমাগত অবনতি ঘটল। যে দুইজন ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি সর্বাধিক সহযোগিতা পেতেন, তার চাচা আবু তালিব এবং তার স্ত্রী সাইয়্যিদা খাদিজা (রা) খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে মৃত্যুবরণ করেন। তার মিশন, অনুসারী এবং নিজের জীবনের প্রতি হুমকী অনেক অনেক বেড়ে গেল এবং বাধ্য হয়ে তাকে তার এবং তার পূর্বপুরুষদের জন্মভূমি মক্কা ত্যাগ করতে হল। কিন্তু এ সব কিছুর মধ্যেও যে সত্যটি স্পষ্ট হয়ে উঠে তা হল তিনি এক মুহূর্তের জন্যও তার বাণী প্রচার থেকে বিরত হন নি। তিনি বিরতিহীনভাবে কেউ তার কথা শুনতে আগ্রহী হোক বা অনাগ্রহী আল্লাহর একাত্ববাদের দাওয়াত প্রচার করে যেতে থাকেন। তিনি তার প্রচেষ্টায় ঘাটতি করেন নি কিংবা আশা ত্যাগ করেন নি।

নেতৃত্ব দিতে আগ্রহী কাউকে শিক্ষাদানের জন্য এই দোয়াটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। কষ্ট ভোগ করলেও যারা তাকে কষ্ট দিচ্ছে তাদেরকে তিনি অভিশাপ দেননি। বরং এর পরিবর্তে তিনি আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেন এবং ঘোষনা করলেন যে তিনি সকল বাঁধা আলিঙ্গন করে যতক্ষণ না পর্যন্ত স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব না হয় চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। সকল বাঁধা বিপত্তি সত্ত্বেও প্রচেষ্টায় একটুও কমতি না করে এগিয়ে চলা একজন ব্যাতিক্রমী নেতার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। বাঁধা বিপত্তি তার কমিটমেন্টকে আরও মজবুত ও শাণিত করে তোলে।

বিরোধিতার মণে এই নয় যে আপিনি ভুল পথে রয়েছেন বরং আপনি সঠিক বলেই বিরোধিতার মুখোমুখি হচ্ছেন। এটা আপনাকে দুর্বল নয় বরং আরও শক্তিশালী করে তুলবে।

শিক্ষা
আপাতদৃষ্টিতে রেজিলেন্স এ দুইটি ভিন্নমুখী বিষয় রয়েছেঃ
বাস্তবতাকে কোনভাবে লুকানোর চেষ্টা না করে ব্যর্থতার মুখোমুখি হওয়া এবং একই সাথে সাফল্যের কোনরকম চিহ্ন না দেখা সত্ত্বেও সফলতার ব্যাপারে গভীর বিশ্বাস স্থাপন করা।

গবেষনায় প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মানুষ যখন বিশাল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায় তখন সে নিচের বিষয়গুলো অনুভব করেঃ

  • বিচ্ছিন্নতা (Disorientation): ঘৃণা ও অসমর্যহনের সমুদ্রে দ্যোদুল্যমান অবস্থা।
  • হতাশা (Depression): ভয় দেখানো, আক্রমণ, পরাজয় ইত্যাদির কারণে লুকানোর ইচ্ছা থাকলেও লুকানোর জায়গার অভাব।
  • উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলা (Loss of purpose): নেতৃত্বের অভাব বোধ করা, নির্দেশনার খোঁজে হাতরে ফেরা।
  • নিশ্চিহ্ন হবার ভয় (Fear of elimination): ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ভয় থেকে আড়াল খোঁজা।

 বর্তমানে মুসলমানদের কথা, লেখা এবং কাজে যে ধরনের অচলাবস্থা দেখছি সেই মানসিকতা এরকম সময়েই তৈরি হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে মানুষ দুই ধরনের আচরণ করেঃ তারা ভীত হয়ে পড়ে এবং সমালোচনা ও প্রোপাগান্ডা এমনভাবে হজম করতে শুরু করে যে তারা সবসময় কুণ্ঠিত ও আত্মসমালোচনায় বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অথবা তারা চরমপন্থা বেছে নিয়ে সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু করে এবং তাদের সদস্যদের সকল কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করতে শুরু করে, তা সে যাই হোক না কেন।

এ ধরনের সর্বনাশা ও ব্যাপক পরিবর্তনের সময়ে টিকে থাকার জন্য তিনটি উপায় রয়েছেঃ
১। আশা না হারিয়ে নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া
২। কি ঘটছে তা অনুধাবন করা এবং
৩। এর মধ্য থেকেই পরিত্রানের উপায় তৈরি করে নেয়া

কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের বন্দীদের উপর চালানো গবেষনা থেকে দেখা যায় যারা তাদের অবস্থার নির্মম বাস্তবতাকে কোনরকম রঙ না লাগিয়ে অথবা কল্পনার রাজ্যে ডুবে না থেকে মেনে নিতে পারে তারাই শেষ পর্যন্ত টিকে যায় এবং পালাতে সক্ষম হয়। তারা সাহায্য অতি নিকটে বলে নিজেদেরকে সান্তনাও দেয় না, আবার কোন উদ্ধারকর্তা এসে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে বলে অপেক্ষাও করে না। তাদের গ্রেফতারকারী হঠাৎ নিজেদের ভুল বুঝতে পারবে কিংবা তাদের পক্ষে অবস্থান নিবে এমন চিন্তাও তারা করে না। সহজ কথায়, তারা নিজেদেরকে বোকা বানায় না। বরং তারা নিজেদ্রকে বলে, আমরা ভীষণ বিপদে আছি এবং আমাদের অস্তিত্ব হুমকীর সম্মুখীন। এ কারণেই আমরা এখানে। নিশ্চিহ্ন হওয়াসহ এই সবই আমাদের ক্ষেত্রে ঘটতে পারে। তারা তাদের অপহরণকারীদের অভিযুক্ত করে বা দোষ দিয়ে বা নিজেদের কষ্ট দিয়ে অথবা আফসোস করে সময় ক্ষেপন করে না।

এর পরিবর্তে তারা নিরপেক্ষভাবে পরিস্থিতিকে গ্রহণ করে এবং সাহসিকতার সাথে এর মুখোমুখি হয়ে এর ভয়াবহতা, গভীরতা বোঝার চেষ্টা করে।

তারা তাদের সাফল্যের সম্ভাবনা সম্পর্কেও আশা ত্যাগ করে না। তাদের ঈমান ও আদর্শের জোরে তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে তারা বেঁচে যাবে এবং গ্রেফতারকারীদের কবল থেকে মুক্তি পাবে। তারা বিশ্বাস করে যে প্রতিরোধ করা এবং যে কোন ধরনের শাস্তি হজন করার ক্ষমতা তাদের আছে। এই আত্মবিশ্বাস রেজিলেন্সের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি এই বোধও থাকতে হবে যে সাময়িকভাবে হারলেও তারা সঠিক পথে রয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে।

সাদা চোখে দুইটি আপাতবিরোধী আচরণঃ নির্মম সত্যের প্রতি দৃষ্টিপাত করা অথচ যত কঠিনই মনে হোক না কেন, সফলতার জন্য আশা ত্যাগ না করা। পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম কিছু কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের বন্দীদের সাফল্যের মূল চাবী ছিল এগুলো। এবং ইতিহাস বলে তারা সফল হয়েছিল।

একটু বিস্তারিতভাবে ধাপগুলোর দিকে দৃষ্টি দেয়া যাকঃ
১। নিষ্ঠুর সত্যের মুখোমুখি হওয়া (কি ঘটেছে?)
# রঙ না লাগিয়ে বা ফ্যান্টাসীতে না ডুবে প্রকৃত বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া
# অন্তিম সাফল্য সম্পর্কে আশা ত্যাগ না করা
# যা ঘটেছে তার জন্য নিজেকে বা অন্যদেরকে দোষারোপ না করা
# প্রশংসাও নয়, দোষারোপও নয়
# প্রশ্ন করা ‘কি, কেন এবং কিভাবে’

২। অর্থ উদ্ধার (এই তথ্যাদি কি নির্দেশ করে?)
# যা ঘটেছে তার কারণ বিশ্লেষণ করা
# ভেবে দেখা কিভাবে এর প্রতিরোধ করা সম্ভব হতো
# বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এই ঘটনাগুলো কিভাবে খাপ খায় তা ভেবে দেখা
# বর্তমা অকে ছাপিয়ে উন্নততর ভবিষ্যতের খোঁজ করা
# সামনের দিকে অগ্রসর হবার জন্য নিকটবর্তী লক্ষ্য ঠিক করা

৩। কর্মপন্থা গুছিয়ে নেয়া (কি করা হবে?)
# বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় ভবিষ্যতের কাজ ঠিক করা
# ‘আমিই কেন দুর্ভাগা’ ধরনের সিন্ড্রোম থেকে বের হয়ে আসা
# এখন কি করা সম্ভব?
# নিজের সুরক্ষা, রসদ সংগ্রহ এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা কিভাবে সম্ভব?
# কর্মপ্রক্রিয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ

সাফল্যের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও কাজ করে যাওয়ার আরেকটি উদাহরণ হল দাঁড়িপাল্লার মত।

আমাদের দেশে শস্য ওজন করার জন্য সাধারণ যে দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করা হয় সেগুলো দেখেছেন? উপরের একটি দন্ডের দুই প্রান্তে সুতোয় বাঁধা ঝুলন্ত দুটো পাত্র থাকে যার মাধ্যমে ভারসাম্য সৃষ্টি করা হয়৷ একটি পাত্রে বাটখারা রাখা হয় এবং অন্য পাত্রে যা ওজন করা হচ্ছে তা রাখা হয়। এর মধ্যে জীবনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। পরেরবার আপনি যখন চাল বা এই ধরণের কিছু কিনতে যাবেন, তখন বিক্রেতা কি করে সেটা খেয়াল করে দেখবেন।

প্রথমে সে একপাশে একটি বাটখারা দেয়। ধরা যাক, এর ওজন বিশ কেজি৷ তারপর সে একটি চামচ সদৃশ পাত্র ব্যবহার করে অন্যপাশের পাত্রে চাল দিতে শুরু করে৷ পাত্রটি যখন পূর্ণ হয়ে যায়, এমনকি এর মধ্যে ১৯ কেজি চাল দেয়া হয়ে যায়, তখন কি ঘটে? কিছুই না। অবস্থার মধ্যে কোন পরিবর্তন ঘটে না। যে পাত্রটিতে বাটখারা দেয়া, সেটি কাউন্টারের উপর স্থির হয়ে বসে থাকে এবং চাল ভর্তি পাত্রটি শূন্যে ভাসতে থাকে। খেয়াল করে দেখবেন, দোকানদার চাল দেয়া বন্ধ করে না কারণ সে তার চেষ্টার ফলে কোন পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছে না। সে জানে, ফল অবশ্যই পাওয়া যাবে এবং চাল দিতে থাকে যতক্ষণ না সে পাত্রগুলোর মধ্যে সামান্য পরিবর্তন দেখতে পায় ও চালের পাত্রটি নিচের দিকে নামতে শুরু করে। এমনটি যখন ঘটে এবং দাঁড়িপাল্লার পাত্রদুটি প্রায় সমান্তরালে থাকে তখন সে চাল দেয়ার পদ্ধতি পরিবর্তন করে ফেলে। এবার চামচ সদৃশ পাত্রের পরিবর্তে সে হাত ব্যবহার করতে শুরু করে৷ সে হাতের মুঠো চাল ভর্তি করে নেয় এবং খুব সামান্য পরিমানে চালের পাত্রে ছাড়তে থাকে। একসময় চালের পাত্রটি কাউন্টারের কাছাকাছি নেমে আসে এবং বাটখারাসহ পাত্রটি বাতাসে ভাসতে শুরু করে।

আমি যখন এটা দেখেছি, এ থেকে আমি জীবনের দুটো গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করেছি। এর দুটোই সমানভাবে সত্যিঃ
শিক্ষা ১ঃ ১৯ কিলোগ্রাম না হওয়া পর্যন্ত কিছু হবে না।
শিক্ষা ২ঃ শেষের কিছু দানাই পার্থক্য সূচিত করে।

এই জীবনের ক্ষেত্রেও যখন ১৯ কেজি পরিমান প্রচেষ্টা চালানো হয়ে গেছে এবং কিছু ঘটছে না বলে আমরা যখন হাল ছাড়তে শুরু করি তখন আমাদের মনে রাখা ভালো যে কোন কিছু ঘটার কথাও নয়। এটা যে বুঝতে পারে সে আশা বা শক্তি হারায় না বরং শেষ প্রান্তে পৌছানোর আকাঙ্খায় হাসতে শুরু করে কারণ সে জানে খুব শীঘ্রই পাত্রটি কাউন্টারের উপর নেমে আসবে।

লক্ষ্যের অগ্রাধিকার

একজন নেতার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় সে কোন বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে – তার ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দ, বন্ধুত্ব ও শত্রুতা নাকি চূড়ান্ত লক্ষ্যের সফলতা? বিষয়টি কঠিন পরীক্ষা হবার কারণ হল প্রায়ই এমন প্রয়োজন উদ্ভুত হয় যেখানে আপনাকে নিজের ব্যক্তিগত পছন্দকে পাশে রেখে আপনি সম্পর্ক স্থাপন এবং কাজ করতে অপছন্দ করেন এমন মানুষের সাথে কাজ করতে হতে পারে।

আল্লাহর রাসূল (স) এই বিষয়ে অসাধারণ উদাহরণ স্থাপন করেছেন। বিখ্যাত সামরিক কমান্ডার খালিদ বিন ওয়ালিদ সারা জীবন আল্লাহর রাসূল (স) এবং ইসলামের শত্রু ছিলেন। উহুদের যুদ্ধের বিশৃঙ্খলার জন্য, যার পরিণতিতে রাসূল (স) এর চাচা হযরত হামজা বিন আবদুল মুত্তালিব সহ ৭০ জন সাহাবী শাহাদাত বরণ করে, তিনি দায়ী ছিলেন। হামজা (রা) মুহাম্মদ (স) এর সমবয়সী এবং প্রথম যুগে ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম ছিলেন। তিনি রাসূল (স) এর শক্তি ও সহযোগিতার অন্যতম উৎস ছিলেন। তার মৃত্যুতে তিনি গভীর দুঃখ পেয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও খালিদ বিন ওয়ালিদ এবং আমর ইবনুল আ’স যখন ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে মদীনায় গমন করলেন, রাসূল (স) তাদেরকে স্বাগত জানাকেন এবং তার বিরুদ্ধে তাদের সকল শত্রুতা ক্ষমা করে দিলেন।

আমর ইবনুল আ’স বলেন, ‘আমি বদরের যুদ্ধে মুহাম্মদ (স) এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি এবং আল্লাহ আমাকে রক্ষা করেছেন। আমি উহুদের যুদ্ধে মুহাম্মদ (স) এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি এবং আল্লাহ আমাকে রক্ষা করেছে। আমি খন্দকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স) এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি এবং আল্লাহ আমাকে রক্ষা করেছেন। আমি বুঝতে শুরু করেছিলাম, যাই হোক না কেন, মুহাম্মদ (স) জয়লাভ করতে যাচ্ছেন। তার বাহিনী দিনে দিনে ভালো, তার দোয়া শক্তিশালী হচ্ছিল এবং আমরা দিন দিন আরও সীমাবদ্ধ হচ্ছিলাম। ফলে আমার হৃদয় ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়ছিল।’ তিনি মক্কা ত্যাগ করে একাকী বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তার সহায় সম্পদ ও পরিবার নিয়ে কিছুদিন একাকী বসবাসও করলেন। তারপর হুদাইবিয়ার সন্ধি হল যেখানে কুরাইশরা রাসূল (স) কে স্বীকৃতি ও তার সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হলো। আমি বিষয়টি পরবর্তীতে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করবো কারণ এখান থেকেও নেতৃত্বের অনেক শিক্ষা গ্রহণের বিষয় রয়েছে। আমর ইবনুল আস জানতেন যে রাসূলুল্লাহ (স) এর মক্কা বিজয় অনিবার্য। তিনি মক্কা ও তায়েফকে বিবেচনা থেকে বাদ দিলেন কারণ দুটো শহরই রাসূল (স) এর দখলে আসবে। তিনি কিছু বিশ্বস্ত লোককে ডেকে বললেন, মুহাম্মদ (স) এর বিষয়টি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং একসময় কুরাইশদেরকে গ্রাস করে নিবে। তাই আমার মনে হয় আমাদের এখানে মক্কায় থাকা উচিত হবে না, বরং চলো আমরা আবিসিনিয়ায় খ্রিস্টান রাজা আন নাজাশির অধীনে বসবাস করতে শুরু করি। মুহাম্মদ (স) যদি বিজয়ী হয় তবে আমরা তার থেকে দূরে আর কুরাইশরা বিজয়ী হলে তার জানবে আমরা তাদের সাথেই আছি।’ তিনি আরও বকতেন, যদি সকল কুরাইশও মুসলমান হয়ে যায়, আমি মুসলমান হবো না।’

সুতরাং তারা সবাই মিলে মক্কা ছেড়ে আবিসিনুয়ায় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তারা আবিসিনিয়ার রাজা নাজাশির জন্য চামড়া দিয়ে হাতের তৈরি বিভিন্ন জিনিস উপহার হিসেবে নিলেন, তারপর নৌকায় করে আবিসিনিয়ায় পাড়ি দিলেন। পৌঁছানোর পর তারা দেখলেন আমর বিন উমাইয়্যা আল দামারি নাজাশীর দরবার থেকে বেরিয়ে আসছে। রাসূল (স) তাকে তার বার্তাবাহক করে আবু সুফিয়ানের মেয়ে উম্মে হাবীবাকে বিয়ে করার জন্য পাঠিয়েছিলেন। উম্মে হাবীবা আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন যেখানে তার স্বামী ইন্তিকাল করেন। রাসূল (স) এবং নাজাশী এই বিয়ের আয়োজন করেন এবং তিনি ছিলেন রাসূল (স) এর প্রতিনিধি।

আমর ইবনুল আস তার বন্ধুবর নাজাশীর দরবারে প্রবেশ করলেন এবং প্রথানুযায়ী নাজাশীকে সিজদা করলেন। নাজাশী তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন এবং জানতে চাইলেন তার জন্য কোন উপহার এনেছে কী না। আমর ইবনুল আস তার সাথে আনা চামড়ার তৈরিতে বস্তুগুলো পেশ করলেন। রাজা অত্যন্ত খুশি হলেন এবং কিছু উপহার তারা সভাসদদের মাঝে বিতরণ করে বাকিগুলো তার কোষাগারে পাঠিয়ে দিলেন। অভ্যর্থনা শেষে আমর ইবনুল আ’স বললেন, হে রাজা, আমি এইমাত্র একজনকে আপনার দরবার থেকে বের হয়ে যেতে দেখলাম যে আমাদের ওই শত্রুর লোক যে কিনা আমাদের সম্ভ্রান্ত লোকদেরকে হত্যা করেছে। আপনি কি তাকে আমার নিকট হস্তান্তর করবেন যেন আমি তাকে হত্যা করতে পারি?এই কথায় নাজাশী প্রচন্ড রাগান্বিত হয়ে আমর ইবনুল আ’সের মুখে এত জোরে আঘাত করলেন যে তিনি পড়ে গেলেন এবং তার নাক দিয়ে এত রক্তপাত হতে লাগল যে তিনি ভাবলেন তার নাক ভেঙ্গে গিয়েছে। কি করা উচিত তিনি বুঝতে পারলেন না। তিনি একজন রাজার দরবারে দাঁড়িয়ে সবার সামনে অপমানিত হয়েছেন অথচ প্রতিশোধ নেওয়াও তার পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি বললেন, যে লজ্জা ও ভয় আমি পেয়েছি, মাটি যদি আমাকে গিলে ফেলতো!’

নিজের মান সম্মান রক্ষার প্রচেষ্টায় তিনি বললেন, ‘হে রাজা, আমি যদি জানতাম আমি যা বলেছি আপনি তা অপছন্দ করবেন তবে আমি তা বলতাম না।’ তারপর নাজাশী বললেন, হে আমর, তুমি আমাকে তাকে হস্তান্তর করতে বলছো যে কিনা সেই ব্যক্তির দূত যিনি আল মামুস আল আকবর গ্রহণ করেছেন?’

আমর ইবনুল আ’স বলেন, আমি অনুভব করলাম, আমার হৃদয় পরিবর্তন হয়ে গেছে৷ আমি নিজেকে বললায়াম, সকল আরব-অনারব এটা চিনতে পারল, আর আমি পারলাম না? তাই তিনি নাজাশীকে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কি আপনার সাক্ষ্য? নাজাশী বললেন, আল্লাহর সামনে এটাই আমার সাক্ষ্য। তারপর নাজাশী বললেন, আমার কথা শুনো আমর আর তার অনুসারী হও কারণ আল্লাহর নামে বলছি, মুসা (আ) যেভাবে সকল ফেরাউনের উপর বিজয়ী হয়েছিলেন তিনিও সেভাবে তার সকল শত্রুর উপর বিজয়ী হবেন। এই কাহিনীতে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো আবিসিনিয়ার রাজা নাজাশী কখনোই রাসূল (স) এর সাক্ষাৎ লাভ করেন নি অথচ তার উপর ঈমান এনেছেন, মুসলমান হয়েছেন যদিও তার রাজ্য খ্রিস্টান ধর্মাবলাম্বী এবং দাওয়াত দিচ্ছেন আমর ইবনুল আ’সকে যিনি ১৩ বছর রাসূল (স) এর সাথেই বসবাস করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। দাওয়াহর ক্ষেত্রে কোন যুক্তিই বাঁধা মানে না। আমর ইবনুল আ’স নাজাশীর কাছে রাসূল (স) কে অনুসরণ এবং ইসলাম গ্রহণের বায়াত পেশ করলেন এবং নাজাশী তার বায়াত গ্রহণ করলেন। আমর ইবনুল আ’সের পোষাক রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছিল বলে নাজাশী তাকে নতুন পোষাক দেয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন। আমর ইবনুল আ’স নাজাশীর দরবার ত্যাগ করে নিজের ক্যাম্পে ফিরে গেলেন।

তার বন্ধুরা তাকে নতুন কাপড় পরিহিত দেখে খুব খুশি হলো। তারা জানতে চাইল আমর বিন উমাইয়্যা আল দামারিকে তাদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য নাজাশী রাজী হয়েছে কি না। আমর ইবনুল আ’স (রা) বলকেন, আজ যেহেতু প্রথম সাক্ষাৎ, আমি তাকে চাই নি। আগামীকাল আবার দেখা হলে তাকে চাইবো। তার সাথীগণ ভাবলেন এটা ভালো বুদ্ধি। তারপর তিনি তাদেরকে বললেন তার কিছু কাজ রয়েছে এবং তারপর একটি নৌকা নিয়ে তিনি মদীনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। তিনি তার বন্ধুদেরকে কোন ব্যাখ্যা না দিয়ে, এমনকি কোথায় যাচ্ছে তাও না বলে আবিসিনিয়ায় ফেলে গেলেন।

মাররাদ দাহরান (Marradh Dahran) এ পৌঁছে তিনি দুজন ব্যক্তিকে দেখলেন – একজন তাঁবুতে, অন্যজন উট বাঁধছে৷ তারা ছিলেন খালিদ বিন ওয়ালিদ এবং উসমান ইবনে তালহা। তিনি তাদের কায়ায়াছে গিয়ে জানিতে চাইলেন তারা কোথায় যাচ্ছে৷ খালিদ বিন ওয়ালিদ জবাব দিলেন, ‘Nobody worth anything is left among us anymore. মুহাম্মদ (স) বিজয়ী হচ্ছে, আর তাই আমি ভাবছি আমাদের তার সাথে যোগ দেয়া উচিত।আমর ইবনুল আ’স বললেন, আমিও ঠিক তাই ভাবছিলাম। সুতরাং তারা একত্রে চলতে লাগলো। কেউ তাদের আসতে দেখে রাসূলুল্লাহ (স) কে অবগত করলেন, ‘এই দুই ব্যক্তির পরে মক্কা তার লাগাম আপনার হাতে তুলে দিল।’ এই দুই ব্যক্তি ছিল ইসলামের শত্রুদের দুইজন শীর্ষ নেতা। তাদের পূর্বপুরুষ – আল ওয়ালিদ বিন মুগাইরা, উতবা বিন রাবিয়্যা, উমাইয়্যা বিন খালাফ, আবু জেহেল, আবু লাহাব এবং অন্যান্যরা নিহত হয়েছিল। তাদের প্রজন্মের একমাত্র সুফিয়্যান জীবিত ছিল কারণ তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নি। ফলে, দ্বিতীয় প্রজন্ম তখন নেতৃত্ব দিচ্ছিল।

রাসূল (স) তাদেরকে দেখে অত্যন্ত খুশী হলেন। তাদেরকে আসতে দেখে তিনি মৃদু মৃদু হাসছিলেন। তার প্রতি তাদের দ্বারা কৃত সকল অপরাধ তিনি ক্ষমা করে দিলেন। এ সকল তরুণ নেতাদের নিজের সাথে পাওয়া এবং ইসলামের প্রচারে তাদের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। আমর ইবনুল আ’স বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (স), আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম এই শর্তে যে আপনি আল্লাহকে বলবেন তিনি যেন আমার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেন। আমি আমার ভবিষ্যতের গুনাহগুলো মাফ করে দেয়ার জন্য দোয়া চাইতে ভুলে গিয়েছিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বললেন, হে আমর, তুমি কী জানো না ইসলাম গ্রহণ তার পূর্বের সব (গুনাহ) মুছে ফেলে এবং হিজরত তার পূর্বের সব (গুনাহ) মুছে ফেলে এবং হজ্জ তার পূর্বের সব (গুনাহ) মুছে ফেলে? আমর বলেন, আল্লাহর রাসূল (স) তার জীবনের পুরোটা সময় আমাদের যত্ন করেছেন এবং আবু বকর (রা) ও উমার (রা)-ও। খালিদ (রা) এর সাথে উমর (রা) এর সম্পর্ক এমন ছিল না যে তিনি এমন কিছুকে অপছন্দ/অমনোনীত করতেন না যা খালিদ (পছন্দ/মনোনীত) করেছে।

মক্কা বিজয়

রাসূল (স) আট বছর পর মক্কায় প্রবেশ করলেন। তের বছর ধরে মক্কায় তারা সকল প্রকার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করেছে, তারপর তাদেরকে বিতাড়িত করা হয়েছে এবং তাদের সহায় সম্পত্তি জব্দ করা হয়েছে। কিন্তু এখন তিনি যখন মক্কায় প্রবেশ করছেন, তিনি সূরা ফাতহ পাঠ করতে করতে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে প্রবেশ করলেন। তার মাথা এত নীচু যে তার পবিত্র শশ্রু উটের পিঠে বাঁধা স্যাডল প্রায় ছুঁয়ে যাচ্ছিল। তার পরনে ছিল একটি কালো পাগড়ী এবং একটি সাদা পতাকা।

তিনি কাবা ঘর তাওয়াফ করলেন এবং তারপর ঊসমান বিন তালহাকে ডেকে কাবার চাবী আনতে বললেন। আজও উসমান বিন তালহার পরিবার বনু আবদিদ দা’র কা’বার চাবী সংরক্ষণকারী। উসমানের মা প্রথমে দিতে অস্বীকার করলেও পরে তাকে চাবী দেন। তিনি রাসূল (স) কে চাবী এনে দেন এবং রাসূল কাবার দরজা খুলেন। কাঠের তৈরি একটি কবুতরের মূর্তি ছিল যা তিনি ধ্বংস করেন। সেখানে ফেরেশতাদের ছবি ছিল এবং একটি ছবি ছিল যেখানে হযরত ইবরাহীম (আ) ঐশ্বরিক তীর নিক্ষেপ করছেন। রাসূলুল্লাহ (স) বললেন, আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা তাদের হত্যা করুক, তারা আমাদের পূর্ববর্তীদের এমন কিছু করেছে দেখিয়েছে যা তারা কখনও করেনি।’

তারপর তিনি হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) কে সকল চিত্র মুছে ফেলার নির্দেশ করলে তা পালন করা হলো। তারপর তিনি বের হয়ে এলেন এবং প্রবেশপথের উঁচু স্থানে দাঁড়ালেন। এবার সকলে শ্রদ্ধার সঙ্গে তার কথা শোনার জন্য এগিয়ে এলো। প্রথম ওহী নাযিলের পরে যখন তিনি সবাইকে ডেকেছিলেন তখন তারা যে ঔদ্ধত্য দেখিয়েছিল তার তুলনায় এ এক বিশাল পরিবর্তন। তিনি যখন জমজমের নিকট গিয়ে অযূ করলেন, সাহাবীরা তার বাহু থেকে চুঁয়ে পড়া পানির বরকত লাভের জন্য ছুটে গেল। মক্কার লোকেরা এ দৃশ্য দেখে বলল, আমরা এর আগে কখনোই এরকম বাদশাহ দেখিনি।’ আসূল (স) সেই একই ব্যক্তি ছিলেন কিন্তু আজ তার এমন ক্ষমতা যে সকলেই তার কথা শুনতে এসেছে।

আল্লাহর রাসূল (স) লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষন দিলেনঃ আলহামদুলিল্লাহ, সাদাকা ও’য়াদা, নাসারা আবদাহ, ওয়া হাজামাল আহযাবা ওয়াহদা। কাউকে দুর্ঘটনাক্রমে হত্যা করা হলে তার পরিবারকে রক্তপণ বাবদ ১০০ উট প্রদান করা হবে। জাহিলিয়াত যুগের সকল বংশগত সুবিধা ও গর্ব সমাপ্ত হলো। এই সকল সুবিধা আমার পায়ের নীচে।’ রাসূল (স) এর হাতে কা’বা ঘরের চাবী ছিল। আলী ইবনে আবু তালিব বললেন, ‘হে রাসূলুল্লাহ (স), হাজীদেরকে খাওয়ানো এবং কা’বা ঘরের চাবী সংরক্ষণের সম্মান আমাদেরকে দান করুন।’ কিন্তু আল্লাহর রাসূল (স) উসমান (রা) কে ডেকে বললেন, এটা নাও, সারাজীবন তোমাদের কাছে রাখো এবং জালিম ছাড়া কেউ কখনও তোমাদের কাছ থেকে এটা নিবে না।’ আজ পর্যন্ত সেই একই পরিবার কা’বার চাবী সংরক্ষণ করে চলছে এবং তাদের কাছ থেকেই সৌদি আরবের শাসক বাৎসরিক উৎসব উপলক্ষ্যে পরিষ্কারের উদ্দেশ্যে চাবী সংগ্রহ করে নেন এবং ফেরত দেন। রাসূল (স) তার উটে চড়ে কা’বার চারদিকে ঘুরলেন এবং হাতের লাঠি দিয়ে কা’বায় স্থাপিত মূর্তিগুলো নির্দেশ করলেন এবং সেগুলো ফেলে দেয়া হলো। কা’বার চতুর্দিকের ৩৬০টি মূর্তির ক্ষেত্রেই তিনি এই কাজ করলেন। তিনি পাঠ করলেনঃ ক্বুল জা’ল হাক্কা ওয়া জাহাক্বাল বাতিলিন্নাল বাতিলা কানা যাহুকা (বলো, সত্য সমাগত এবং মিথ্যা নির্বাসিত। নিশ্চয়ই এটাই নিয়ম যে মিথ্যা নির্বাসিত হবে)

তারপর তিনি কুরাইশদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের কি ধারণা আমি তোমাদের সাথে কিরূপ আচরণ করবো?’ তারা বলল, ‘আনতা আখিল কারীম ওয়া ইবনুল আখিল কারীম'(আপনি আমাদের সম্মানীত ভাই, আমাদের সম্মানিত ভাইয়ের সন্তান)। তিনি বললদন, ‘ইদ-হাবু ফা আন্তামুল তুলাক্বা’ (যাও তোমরা মুক্তিপ্রাপ্ত)। তারা ছিল রাসূল (স) এর বন্দী এবং তিনি তাদের সকলকে হত্যা করতে পারতেন কিন্তু তিনি তাদেরকে কোনরকম মুক্তিপণ ছাড়াই মুক্ত করে দিলেন। এ কারণে যারা মক্কা বিজয়ের পরে ইসলাম গ্রহণ করেছিল তাদের বলা হতো আত-তুলাক্বা।

আল্লাহর রাসূল (স) হযরত বিলাল বিন রাবাহ (রা) কে আযান দেয়ার জন্য নির্বাচন করলেন এবং কা’বার ছাদে দাঁড়িয়ে আযান দেয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন। একজন মুহাদ্দিস বলেছেন, তিনি মুশরিকদের ক্ষেপিয়ে দেয়ার জন্য এমনটি করেছিলেন। রাসূল (স) তৎকালীন সকল প্রকার বর্ণ-গোত্র প্রথা ধ্বংস করা এবং শুধুমাত্র ধার্মিক ব্যক্তির মর্যাদা যে সুউচ্চে তা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এমনটি করেছিলেন।

সাইয়্যেদ বিন মুসায়্যিব বলেন, মক্কা বিজয়ের রাত্রী সাধারণ বিজয়ের মত উৎসবের রাত্রী ছিল না। সাহাবীরা কাবা শরীফ তাওয়াফ করছিলেন এবং সারারাত্রী ধরে তাকবির তাহলিল পড়ছিলেন। আবু সুফিয়ান তার স্ত্রী হিন্দার কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলেন, তোমার কি ধারনা এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে? তিনি উত্তর দিলেন, হ্যা, এটা আল্লাহর তরফ থেকে। পরে তিনি আল্লাহর রাসূল (স) এর সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং রাসূল (স) তাকে বলেন, তুমি হিন্দার কাছে জানতে চেয়েছো এটা আল্লাহর তরফ থেকে কিনা। আবু সুফিয়ান বললেন, আশহাদু আল্লাহ ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।

আল্লাহর রাসূল (স) মক্কাকে আল হারাম ঘোষনা করলদন যেখানে মারামারি, শিকার এবং গাছ কাটা নিষিদ্ধ। একই নিয়ম মদীনায় মসজিদে নববীর আশেপাশেও প্রযোজ্য।

মুয়াবিয়া (রা) এর সময়ে একজন তাবেঈন আবু হুরাইরা (রা) কে তার বাসায় নিমন্ত্রণ করতে চাইলেন। (আবু হুরাইরা (রা) মানুষকে সবচেয়ে বেশি নিমন্ত্রণ করতেন এবং এই তাবেঈন আবু হুরাইরা (রা) কে নিম্নত্রণ করতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি খাদ্য প্রস্তুত করে আবু হুরাইরা (রা) কে নিমন্ত্রণ করলেন। আবু হুরাইরা (রা) বললেন, সাবাকতানি (তুমি আমাকে হারিয়ে দিয়েছো – অর্থ্যাৎ আমি তোমাকে দাওয়াত করার আগেই তুমি আমাকে দাওয়াত করেছো)।

সন্ধ্যায় তিনি যখন খেতে আসলেন, তিনি বললেন, হে আনসার, আমি কি তোমাকে এমন একটি হাদীস বলবো যা তোমার জন্য?’ সবাই তাকে বলার অনুরোধ করলো। তিনি বললেন, আল্লাহর রাসূল (স) যখন মক্কায় এলেন, জুবায়ের (রা) একটি অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, খালিদ বিন ওয়ালিদ আরেকটির এবং আবু উবাইদা (রা) পদাতিক সৈন্য বাহিনীর। আল্লাহর রাসূল (স) ছিলেন তার ব্যাটালিয়নে। তিনি আমাকে দেখে বললেন, হে আবু হুরাইরা, আনসারদের আমার কাছে ডেকে দাও এবং আনসাররা ছাড়া আর কেউ যেন না আসে। আমি আনসারদেরকে ডাকলাম এবং তারা সবদিক থেকে এসে রাসূল (স) এর চারদিকে জড়ো হলো। রাসুল (স) বললেন, ‘আবু সুফিয়ানের গৃহে যে প্রবেশ করলো সে নিরাপদ। যে নিজের গৃহে প্রবেশ করল সে নিরাপদ।’ তারপর তিনি বললেন, তোমরা কী বলেছো যে আমি তোমাদের ত্যাগ করবো এবং মক্কায় অবস্থান করবো?’ তারা বলল, জ্বী। তিনি বললেন, ‘আমি আল্লাহর দাস। আমি আল্লাহর কাছে এবং তোমাদের কাছে হিজরত করেছি। আমার জীবন তোমাদের সাথে এবং আমার মৃত্যু তোমাদের সাথে।’ তারা কাঁদতে শুরু করে বলল, আমরা এমনটা বলেছি কারণ আমরা আল্লাহ এবং তার রাসূল (স) কে ভালোবাসি।’ তিনি বললেন, আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা এবং তার রাসূল (স) সাক্ষী, তোমরা সত্য বলেছো।’

শিক্ষা
যারা আপনাকে নির্যাতন করেছে তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন কাজ, বিশেষ করে যখন আপনার ক্ষমতা আছে। আল্লাহর রাসূল (স) কে যারা নির্যাতন করেছে এবং ঘর থেকে বিতাড়িত করেছে, মহান আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা তাদের উপরই তাকে ক্ষমতা দান করেছেন। প্রতিশোধ গ্রহণের সম্পুর্ণ অধিকার তার ছিল। কিন্তু তিনি প্রতিশোধ নেন নি। বরঞ্চ ক্ষমা করে দিয়ে তিনি তাদেরকে ঋণের বাঁধনে জড়িয়ে ফেললেন। রাসূল (স) মক্কা বিজয়ের ফলে তারা যখন তার ক্ষমতার অধীন, তখন নিজেদের অনিশ্চিত অবস্থা সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ অবগত ছিল, ফলে তার ক্ষমাসুলভ আচরণে তারা তার প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ ছিল।

রাসূল (স) যদি প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন তাহলে যে শত্রুতা তৈরী হতো তার রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়াটাও তার শত্রুদের একতরফা ক্ষমা করে দেয়ার আরেকটি বিশাল উপকারিতা। যে সমাজে তুচ্ছ বিষয়েও দ্বন্দ্ব হয় সেখানে শত্রুদেরকে হত্যা করলে তার প্রভাব কিরকম হতো ভেবে দেখা উচিত। এদের সবাইকে ক্ষমা করে দেয়ার মাধ্যমে তিনি তাদেরকে মুসলিম উম্মাহর অন্তর্গত করে নিলেন এবং সারা জীবনের জন্য তার ঘরকে রক্ষা করলেন। ক্ষমা হলো আত্মার মলম, শুধু যাকে ক্ষমা করা হলো তার জন্যই নয়, যে ক্ষমা করে তার জন্য বরঞ্চ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ কাজের জন্য বড় হৃদয়ের অধিকারী হতে হয় এবং আল্লাহর নবী ছাড়ার আর কার হৃদয় বড় হতে পারে?

স্মৃতি প্রভাবশালী কিংবা দুর্বলকারক হতে পারে। আমাদের অনিষ্ট করা হয়েছে এমন স্মৃতি সারাজীবন জাগরূক থেকে আমাদের জীবন এবং সম্পর্ককে ধ্বংস করে দিতে সক্ষম – অবশ্যই যদি আমরা এমনটি করতে দেই। ক্ষমা এমন মলম যা ক্ষতকে উপশম করে এবং মহান রাব্বুল আলামীন দয়াপরবশ হয়ে এমন ব্যক্তিকে এই গুণ দেন যার প্রতি অন্যায় করা হয়েছিল। একমাত্র সেই ক্ষমা করতে সক্ষম হয়। এবং যদি সে তা করে, তাহলে সে নিজেকে সারিয়ে নেয়, পাশাপাশি যে তার প্রতি অন্যায় করেছিল তাকেও। আমাদের প্রতি অন্যায় করেছে এমন কাউকে ক্ষমা করা খুব কঠিন মনে হতে পারে যতক্ষণ না আমরা অনুভব করতে পারি, আমাদের প্রতি যে অন্যায় করা হয়েছে তার স্মৃতি বহন করে বেঁচে থাকা কতটা কঠিন। ক্ষমা করে দেয়ার মাধ্যমে বোঝা অপসারণ করা এবং নতুন ভোরের দিকে এগিয়ে যাওয়া কত সহজ? এবং রাসূল (স) তাই করেছিলেন।

পূর্বের শত্রুদের নিঃশর্ত ক্ষমা করে দেয়ার ফলে লাভ হয়েছিল যে কেউ যদি বিদ্রোহ করতে চাইলেও তার নৈতিক অবস্থানের কারণে তা করতে পারতো না। আপনার ভালো করেছে যে তার অনিষ্ট করার ব্যাপারে কে আপনাকে সহায়তা করবে? এই এক কাজের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (স) তার শাসন সংহত করলেন, নতুন বন্ধু ও সমর্থক বানালেন এবং তার মাতৃভূমিতে ইসলাম প্রবেশের দরজা খুলে দিলেন। এর ফলাফল এতই সুদূর প্রসারী ছিল যে তার মৃত্যুর পরে একমাত্র এই মক্কা থেকে কোন প্রকার বিদ্রোহ হয় নি এবং আবু বকর (রা) যখন অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিদ্রোহ মোকবিলা করছেন, তখন মক্কা সম্পর্কে তার কোন দুশ্চিন্তা ছিল না।

কথা ও কাজের মিল

রাসূল (স) প্রতিবেশির অধিকারের গুরুত্ব সম্পর্কে প্রচার করেছেন এবং তিনি তার প্রতিবেশির কাছে সর্বোত্তম ছিলেন। তিনি নারীর অধিকার সম্পর্কে প্রচার করেছেন এবং তিনি বিশ্বের কাছে একটি আইন উপস্থাপন করেছেন যেখানে নারীদেরকে এমন অধিকার দেয়া হয়েছে যা এমনকি ১৪শ বছর পরে বর্তমান সময়েও অনেক জুরিসপ্রুডেনশিয়াল সিস্টেমে নেই। তিনি সত্যবাদিতার মূল্য সম্পর্কে প্রচার করেছেন এবং তাকে ‘আল সাদিক আল আমিন’ বা সত্যবাদী ও বিশ্বাসী নামে ডাকা হতো, এমনকি তার শত্রু কুরাইশরাও। তিনি নিজের জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে ইসলামকে প্রদর্শন করেছেন। এবং তিনি তার সঙ্গীদেরকে তা নিজেদের জীবনে পালন করতে শিখিয়েছেন। এর ফলাফল হল অন্যান্য ধর্মের সাথে যুদ্ধ বিবাদের মাধ্যমে নয় বরং রাসূল (স) যেভাবে শিখিয়েছেন সাধারণ মুসলমানরা সে অন্যযায়ী জীবন যাপন করার ফলে ইসলাম বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হলো। প্রচার-প্রচারনার চেয়ে ব্যবহারিক ইসলাম মানুষকে অনেক বেশি প্রভাবিত করতে সক্ষম। রাসূল (স) তার নিখুঁত উদাহরণ স্থাপন করেছেন।

আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা বলেনঃ

যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে। (সূরা আহযাব ৩৩:২১)

প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম আজ-জুহুরির একটি কথা মনে করিয়ে দিতে চাই, তিনি বলেছেন, ‘মক্কা বিজয়ের পর ইসলামের দ্রুত প্রসার ঘটার কারণ হলো প্রথমবারের মতো অমুসলমানেরা সাধারণ মুসলমানদের জীবন যাপন পদ্ধতি এত কাছ থেকে দেখতে পেয়েছিল।’ এখানে মজার বিষয় হলো তিনি ইসলামের উৎকর্ষতা বিষয়ে অন্যকে প্রভাবিত করার সবচেয়ে ভালো উপায় হিসেবে একজন সাধারণ মুসলমান ব্যক্তির জীবন্যাপন পদ্ধতির উল্লেখ করেছেন। মানুষ তাদের চোখের সাহায্যে ‘শুনতে পায়।’ একটি জীবন পদ্ধতিতে তারা তখনই প্রভাবিত হয় যখন তারা এর প্রবক্তাদেরকে সেই মত জীবন্যাপন করতে দেখে। যদি তারা দেখে যে যারা এই মত প্রচার করছে তারা নিজেরাই তা পালন করছে না, তখন যত কথাই বলা হোক না কেন, মানুষ তাতে প্রভাবিত হয় না। এটা বার্তার সকল বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে দেয়। আল্লাহর রাসূল (স) এবং তার সঙ্গী-সাথীরা তা কখনই হতে দেন নি।

রাসূল (স) মানবাধিকার এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ সম্পর্কে প্রচার করেছেন। মুসলিমান হোক বা না হোক, প্রতিবেশীর অধিকারের প্রতি তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন। একবার রাসূল (স) সাহাবীদেরকে প্রশ্ন করলেন, তোমরা কি জানো প্রতিবেশীদের হক কি? তারপর তিনি বললেনঃ
১। যখন সে সহযোগিতা চায় তখন সাহায্য করা।
২। তার প্রয়োজন হলে তাকে ঋণ দেয়া।
৩। অভাবী হলে তাকে সাহায় করা।
৪। অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া।
৫। মারা গেলে তার শেষকৃত্যে অংশগ্রহণ লরা।
৬। তার সুসংবাদে অভিনন্দন জানানো।
৭। বিপদে তাকে সান্ত্বনা দেয়া।
৮। প্রতিবেশির অনুমতি ব্যতীত ঘরের দেয়াল এত উঁচু না করা যা তার ঘরের বায়ুচলাচলকে বাধাগ্রস্থ করে।
৯। ফল কিনলে কিছু উপহারস্বরূপ তাকে পাঠানো। তা সম্ভব না হলে লুকিয়ে ফল বাসায় নিয়ে যাওয়া যেন সে তা দেখতে না পায়। বাচ্চাদেরকে খোলা জায়গায় ফল খেতে না দেয়া যেন প্রতিবেশির বাচ্চারা দেখতে পেয়ে কষ্ট পায়।
১০। ঘরের ধোঁয়া যেন তার ঘরে গিয়ে বিরক্তির কারণ না হয়।

এসব হলো প্রতিবেশির অধিকার।’ তারপর আল্লাহর রাসূল (স) ঘোষনা করলেন, আল্লাহর কসম, আল্লাহ সহায় না হলে কেউ কখনো এই অধিকারগুলো বুঝতে পারবে না।’

আরেকটি হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূল (স) শপথ করে বললেন, ‘আল্লাহর কসম সে ঈমানদার নয়, আল্লাহর কসম সে ঈমানদার নয়, আল্লাহর কসম সে ঈমানদার নয়।’ একজন জানতে চাইল, কে ঈমানদার নয়?’ রাসূল (স) বললেন, সে যে তার প্রতিবেশির অনিষ্টের/দুর্দশার কারণ।’ আরেকটি হাদীসে বলা হয়েছে এমন ব্যক্তি কখনই জান্নাতে প্রবেশ করবে না।

শিক্ষা
দিনের শেষে বলার দরকার পড়ে না যে একটি ছবি এক হাজার শব্দের চেয়ে এবং একটি পদক্ষেপ দশ লক্ষ শব্দের চেয়ে শক্তিশালী। এমন একটি বিশ্বের কথা ভাবুন যারা এই মূল্যবোধগুলো পরিপালন করে। মানুষ তাদের চোখের মাধ্যমে শুনতে পায়, এ কারণে কোন নেতা যদি চায় কেউ তাকে অনুসরণ করুক, তাহলে সে যা বলে তা নিজের জীবনে পালন করা উচিত। এটাই তার পরীক্ষা।

ঝুঁকি গ্রহণ

বদরের যুদ্ধ

মুসলমানরা প্রথম যে সামরিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল সেটা ছিল বদরের প্রান্তরে। এটা পরিকল্পিত কোন মোকাবিলা ছিল না বরং উদ্ভুত পরিস্থিতিতে ঝুকিঁ গ্রহণের পাশাপাশি সুযোগ গ্রহণের মতো বিষয় ছিল। আমরা এই অধ্যায়ের শেষের দিকে ঝুকিঁ গ্রহণের শিক্ষা সম্পর্কে আলোচনা করবো, তার আগে সে সময়ের ঘটনাবলীর দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক।

রাসূল (স) তালহা বিন ওবায়দুল্লাহ (রা) এবং সা’দ বিন জায়েদ (রা)-কে উত্তরদিকে কুরাইশদের কাফেলার দিকে নজরদারি করার জন্য পাঠিয়েছিলেন। তারা কয়েকদিন আল হাওরায় অবস্থান করলেন, তারপর আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে একটি কাফেলা তাদেরকে অতিক্রম করে গেল। তারা দ্রুত মদীনায় ফিরে এলো এবং রাসূল (স) কে জানালো যে ৫০ হাজার স্বর্ণমুদ্রা মূ্ল্যের সম্পদ ৪০ জনের পাহাড়ায় মদীনার পাশ দিয়ে যাচ্ছে। মুসলমানদের জন্য এটা বেশ প্রলুব্ধকর লক্ষ্য ছিল কারণ তারা নিজেদের বাসগৃহ থেকে উচ্ছেদ হয়েছিল এবং তাদের সকল সম্পদ কুরাইশরা লুট করে নিয়েছিল। একই সাথে এর মাধ্যমে মক্কার মুশরিকদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক ভিতকে নাড়িয়ে দেয়ার মতো শক্তিশালী পদক্ষেপ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

রাসূলুল্লাহ (স) মুসলমানদেরকে দ্রুত গিয়ে কাফেলাটি আটক করে মক্কায় নিজেদের হৃত সহায় সম্পদ উদ্ধারের উৎসাহ দিলেন। তিনি সবার জন্য পালনীয় নির্দেশ দিয়ে বাধ্য করেন নি, বরং যাওয়ার অথবা না যাওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা দিলেন কারণ তিনি ভেবেছিলেন এটি ছোট অভিযান হবে। কয়েকজন বাড়ীতে গিয়ে তাদের উট এবং অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আসার অনুমতি চাইলে তিনি নিষেধ করে বললেন, কেবলমাত্র যারা প্রস্তুত আছে তারা যেন তার সাথে যায়। এ কারণে আওস গোত্রের তুলনায় খারাজ গোত্রের অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বেশি ছিল কারণ আওস গোত্র মসজিদে নববী থেকে একটু দূরে বসবাস করতো এবং এ কারণে তাদের বেশিরভাগ রাসূল (স) এর সাথে অংশগ্রহণ করতে পারে নি।

আল্লাহর রাসূল (স) বদরের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় থামার নির্দেশ দিলেন। হাব্বাব ইবনে মুনযির (রা) প্রশ্ন করলেন, আল্লাহ কি আপনাকে ওহীর মাধ্যমে এর বেশী না এগুতে এবং এখানেই থামার নির্দেশ দিয়েছেন নাকি এটা আপনার নিজের মত এবনভ যুদ্ধ পরিকল্পনা?

আল্লাহর রাসূল (স) বললেন, এটা ব্যক্তিগত মত এবং যুদ্ধ পরিকল্পনা। তখন সে বলল, আমাদের উচিত তাদের সবচেয়ে কাছের কূপ পর্যন্ত এগিয়ে যাওয়া এবং সেখানে থামা। তারপর কূপ বন্ধ করা এবং একটি চৌবাচ্চা নির্মান করে সেটা পানি দিয়ে পূর্ণ করা। এর ফলে তারা পানি পাবে না।’ রাসূল (স) তার এই পরামর্শ পছন্দ করে গ্রহণ করলেন এবং সে অনুযায়ী নির্দেশ দিলেন।

যুদ্ধের রাতে আল্লাহর রাসূল (স) একটি স্বপ্ন দেখলেন। স্বপ্নে তিনি শত্রুদলের সৈন্যবাহিনীকে প্রকৃত আকারের তুলনায় ছোট দেখলেন। পরের দিন সকালে বৃষ্টি হয়েছিল। বৃষ্টির কারণে মুসলমানদের দিকের মাটি ভিজে শক্ত এবং সতেজ হয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে, কুরাইশদের দিকে মাটি এত বৃষ্টি হয়েছিল যে মাটি কাদা হয়ে গিয়ে তাদের চলাফেরা কঠিন হয়ে গিয়েছিল। একই বৃষ্টি দুই দলের উপরেই পড়ল কিন্তু তাদের ফলাফল হলো দুরকম। এটা বদরের যুদ্ধের অনেকগুলো অলৌকিক বিষয়ের একটি। মহান রাব্বুল আলামীন তার এই দয়া সম্পর্কে বলেন:

যখন তিনি আরোপ করেন তোমাদের উপর তন্দ্রাচ্ছন্ন তা নিজের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রশান্তির জন্য এবং তোমাদের উপর আকাশ থেকে পানি অবতরণ করেন, যাতে তোমাদিগকে পবিত্র করে দেন এবং যাতে তোমাদের থেকে অপসারিত করে দেন শয়তানের অপবিত্রতা। আর যাতে করে সুরক্ষিত করে দিতে পারেন তোমাদের অন্তরসমূহকে এবং তাতে যেন সুদৃঢ় করে দিতে পারেন তোমাদের পা গুলো। (সূরা আনফাল ৮:১১)

মুসলমান সৈন্যবাহিনীতে ৩০০-৩১৭ জন মানুষ ছিল, যার মধ্যে ৮২-৮৬ জন মুহাজির, আওস গোত্র থেকে ৬১ জন এবং খারাজ গোত্র হতে ১৭০ জন। তারা সুসজ্জিত ছিল না এবং যথেষ্ট মাত্রায় প্রস্তুতও ছিল না। কেবল মাত্র জুবায়ের বিন আল আওয়াম এবং মিকদাদ বিন আল আসওয়াদের কাছে দুটি ঘোড়া এবং প্রতি দুই বা তিনজনের জন্য একটি করে মোট ৭০টি উট ছিল। রাসূল (স), আলী ইবনে আবু তালিব (রা) এবং মুরশিদ বিন আবি মুরশিদ আল গানায়ির জন্য একটি উট ছিল। রাসূলুরল্লাহ (স) এর বাকী দুই সঙ্গী তাকে উটটি এককভাবে ব্যবহারের প্রস্তাব করলে রাসূল (স) তা ফিরিয়ে দিয়ে বলেন, ‘তোমরা আমার চেয়ে অধিকতর বলবান নও এবং তোমাদের মত আমিও অধিক পুরস্কারের প্রত্যাশী।’

তিনি নেতৃত্বের এমন একটি মান স্থাপন করেছিলেন যেখানে নেতা তার অনুসারীদের সমান কেবল পার্থক্য হলো সে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এটা এমন একটি বিষয় যা অনুসারীদেরকে তাদের নেতাকে ভালোবাসতে এবং দ্বিধাহীন চিত্তে নেতাকে অনুসরণ করতে উৎসাহিত করে।

মদিনার দায়িত্ব প্রথমে ইবনে উম্মে মাকতুমের উপর ন্যস্ত করা হলেও পরবর্তীতে আবু লুবাবা ইবনে আবদুল মুনজীরে কাছে হস্তান্তর করা হলো। সামগ্রিক নেতৃত্বের দায়িত্ব দেয়া হলো মুস’আব বিন উমায়ের আল কুরায়েশি আল আবদারীর উপর এবং তাদের পতাকার রং ছিল সাদা। ছোট সৈন্যবাহিতনীটিকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হলো – হযরত আলী ইবনে আবু তালিবের পতাকাতলে মুহাজিররা এবং সা’দ বিন মুয়াজের পতাকাতলে আনসাররা। জুবায়ের বিন আল আওয়াম (রা)কে ডানভাগ, মিকদাদ ইবনে আমর (রা)কে বাম এবং সম্মুখভাগের সৈন্যবাহিনীর দায়িত্ব দেয়া হলো ক্বায়েস বিন আবু সাসাহ (রা) এর উপর। রাসূলুল্লাহ (স) ব্যক্তিগতভাবে এই অংশের নেতৃত্ব দিলেন এবং প্রধান সড়ক ধরে মক্কার দিকে যাত্রা করলেন। তারপর তিনি বামে বদরের দিকে ফিরলেন এবং আস-সাফরায় পৌঁছে দুজনকে কুরাইশদের উটের খোঁজ নেয়ার জন্য প্রেরণ করলেন।

অন্যদিকে, আবু সুফিয়ান ছিলেন সর্বোচ্চ সতর্ক। তিনি খুব ভালোভাবেই জানতেন তিনি যে পথ ধরে যাচ্ছেন সেটা খুবই বিপজ্জনক। তিনি রাসূল (স) এর লোকদের চলাফেরা জানার জন্য বেশ উদ্বিগ্ন ছিলেন। তার অনুচরেরা খবর দিল যে মুসলমানরা তার কাফেলাকে অ্যামবুশ করার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। নিরাপত্তার জন্য তিনি দামদাম বিন আমর আল গিফারীকে কুরাইশদের কাছে সাহায্য চেয়ে সংবাদ পাঠানোর জন্য নিয়োজিত করলেন। সংবাদবাহক দ্রুত এবং উন্মত্ত অবস্থায় মক্কায় পৌঁছলেন। উট থেকে লাফিয়ে নেমে কাবার সামনে নাটকীয়ভঙ্গিতে দাঁড়ালো, তারপর উটের নাকে ও কান কেটে দিয়ে, উটের স্যাডল উলটে দিয়ে, নিজের জামা সামনে-পিছে ছিঁড়ে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, হে কুরাইশরা! তোমাদের সম্পদ! আবু সুফিয়ানের কাছে। কাফেলা মুহাম্মদ (স) এবং তার সাথীদের দ্বারা রুদ্ধ হয়েছে। ওগুলোর কি অবস্থা হবে আমি বলতে পারবো না। সাহায্য চাই! সাহায্য!’

এই চিৎকার চেঁচামেচির ফল হলো ত্বড়িৎ। খবরটি কুরাইশদের হতভম্ব করে দিয়েছিল। মুসলমানরা হাদরামি কাফেলা রুদ্ধ করার খবরে আহত অহংকার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। তারা খুবই দ্রুততার সাথে তাদ্দ্র প্রায় সকল বাহিনী একত্র করলো এবং আবু লাহাব ছাড়া আর কেউ বাকী রইল মা। আবু লাহাব তার কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছিল এমন একজনকে নিযুক্ত করল। আবু লাহাব বললেন যে তিনি নিশ্চিত, রাসূল (স) এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে গেলে তিনি অবশ্যই নিহত হবেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, রাসূলুল্লাহ (স) এর শত্রুরা তিনি যা বলতেন তার সবই বিশ্বাস করতেন, কেবলমাত্র আল্লাহর উপাসনা করা ছাড়া। কুরাইশরা কিছু আরব গোত্রকেও রাসূল (স) এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগদানের ব্যাপারে উৎসাহিত করেছিল। কুরাইশদের একমাত্র বনু আদি ব্যতীত সকল বংশই তাদের সম্মতি দিল।

শীঘ্রই ১০ ঘোরসওয়ার এবং ৬০০ বর্ম পরিহিত সৈন্য বিপুল সংখ্যক ঊটসহ ১৩০০ উত্তেজিত সৈন্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলো। খাবারের জন্য তারা উট জবাই করল, প্রথম দিনে দশটি এবং তার পরদিন নয়টি করে৷ অবশ্য তাদের একটি শঙ্কা ছিল, বহু পুরাতন ও গভীর শত্রুতা থেকে বনু বকর পেছন থেকে আক্রমণ করতে পারে। এই সময় বনী কিনানার প্রধান সুরাকা বিন মালিক বিন জুশাম আল মুদলাজির রূপ ধরে ইবলিশ শয়তান তাদের সামনে উপস্থিত হয়ে বললঃ আমি নিষচয়তা দিচ্ছি, পেছন থেকে কোন ক্ষতি হবে না।

মহান আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা এভাবে বলেন:

গর্বিতভাবে এবং লোকদেরকে দেখাবার উদ্দেশে। আর আল্লাহর পথে তারা বাধা দান করত। (সূরা আনফাল ০৮:৪৭)

তারা দ্রুত উত্তরদিকে বদর মুখে চলল। পথিমধ্যে তারা আবু সুফিয়ানের কাছ থেকে পুনতায় আরেকটি বার্তা পেল। আবু সুফিয়ান জানিয়েছে তার কাফেলা মুসলমানদের থেকে পালাতে সক্ষম হয়েছে, তাই তারা যেন ঘরে ফিরে যায়। মুসলমানদের অভিপ্রায় বুঝতে পেরে আবু সুফিয়ান তার কাফেলাকে প্রধান রাস্তা থেকে সরিয়ে লোহিত সাগরের মুখে চালাতে শুরু করেছিল। এই পদক্ষেপের কারণে সে মুসলমানদের অ্যামবুশকে এড়িয়ে তাদের নাগাল থেকে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল।

আবু সুফিয়ানের বার্তা পেয়ে মক্কাবাসীরা ফিরে যাওয়ার আগ্রহ প্রদির্শন করল। কিন্তু আবু জেহেল খুব জোর দিয়ে বলল বদরের প্রান্তরে গিয়ে তাদের তিন রাত্রি থেকে উদযাপন করা উচিত। বদর একটি মৌসুমী বাজার ছিল। তাছাড়া, আবু জেহেল লোকদেরকে কুরাইশদের শক্তি প্রদর্শন করতে আগ্রহী ছিল যেন লোকেরা বুঝতে পারে কুরাইশরা অন্যান্যদের তুলনায় ভালো অবস্থায় আছে এবং এই অঞ্চলে তখনও তাদের আধিপত্য বিদ্যমান। আবু জেহেলের হুমকী ও জোরাজুরি সত্ত্বেও আখনাস বিন শুরাইকের পরামর্শে বনু জাহরা গোত্র দল থেকে বেরিয়ে মক্কার দিকে ফিরে চললেন। এর পর থেকে আখানাসকে বনু জাহরার ‘the well-rubbed palm tree’ হিসেবে গণ্য করা হতো এবং সকল বিষয়ে অন্ধভাবে তার আনুগত্য করা হতো।

বনু হাশিমও দল ছেড়ে চলে আসার ব্যাপারে আগ্রহী ছিল কিন্তু আবু জেহেল এর হুমকীতে সেই চিন্তা থেকে সরে আসতে বাধ্য হলো। বাকী সৈন্যদল, এখন সংখ্যায় ১০০০, বদরের দিকে এগিয়ে গেল এবং উদওয়াত আল কুসওয়া নামক মরুদ্যানের পরে তাঁবু ফেলল। সৈন্যদলের গুপ্তচর রাসূল (স) কে জানালেন যে মক্কাবাসীদের সাথে সংঘাত এড়ানো অসম্ভব এবং এই পরিস্থিতিতে দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

রাসূলুল্লাহ (স) পরিবর্তিত পরিস্থিতি পুনর্বিবেচনা করার উদ্দেশ্য উপদেষ্টাদের সাথে জরুরী সভায় বসলেন এবং সেনাবাহিনীর নেতৃবৃন্দের সাথেপরামর্শ করলেন। কিছু মুসলমান ব্যক্তি ভয় পেয়ে গিয়েছিল এবং তাদের সাহস স্তিমিত হয়ে যাচ্ছিল, এ অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ বলেনঃ

যেমন করে তোমাকে তোমার পরওয়ারদেগার ঘর থেকে বের করেছেন ন্যায় ও সৎকাজের জন্য, অথচ ঈমানদারদের একটি দল (তাতে) সম্মত ছিল না। তারা তোমার সাথে বিবাদ করছিল সত্য ও ন্যায় বিষয়ে, তা প্রকাশিত হবার পর; তারা যেন মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে দেখতে দেখতে। (সূরা আনফাল ০৮:০৫-০৬)

আল্লাহর রাসূল (স) তার অনুসারীদের ডাকলেন এবং অবস্থার গভীরতা তুলে ধরে তাদের পরামর্শ চাইলেন। আবু বকর (রা) সর্বপ্রথম মুখ খুললেন এবং রাসূল (স) এর নেতৃত্বের প্রতি নিঃসঙ্কোচ আনুগত্যের নিশ্চয়তা ঘোষণা দিলেন। তারপর ওমর ইবনুল খাত্তাব উঠে দাঁড়ালেন এবং তার বন্ধুর মতামতের প্রতি একাত্মতা ঘোষনা করলেন। তারপর মিকদাদ বিন আমর দাঁড়ালেন এবং বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (স), আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা আপনাকে যেদিকে নির্দেশ করেছে আপনি সেদিকেই চলুন, আমরা আপনার সাথে আছি। আমরা বলবো না যেমনটি বনী ইসরাইলের সন্তানেরা মুসা (আ) কে বলেছিল, যাও তুমি এবং তোমার রব যুদ্ধ করো, আমরা এখানে থাকলাম। আল্লাহর কসম, আপনি যদি আমাদেরকে বারক আল ঘিমাদেও নিয়ে যান, আমরা এর প্রতিরোধকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়াই করবো যতক্ষণ না আপনি তা জয় করে নেন।’

রাসূল (স) তাকে ধন্যবাদ দিলেন এবং তার জন্য দোয়া করলেন। যে তিনজন নেতা কথা বললেন তারা সকলেই মুহাজির এবং মুহাজিররা সৈন্যদলের ছোট্ট একটি অংশ মাত্র। আল্লাহর রাসূল (স) আনসারদের মতামত শুনতে চাচ্ছিলেন কারণ সৈন্যদের বড় অংশ ছিল তারাই এবং এই যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির বড় অংশ তারাই বহন করবে। উপরন্তু, মিনায় আকাবার শপথ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনসাররা কেবল রাসূল (স) কে মদীনার সীমার মধ্যে সুরক্ষা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং সীমানার বাহিরে লড়াই করার ব্যাপারে কোন প্রতিশ্রুতি দেন নি। আমি পরবর্তীতে এই গুরুত্বপূর্ণ শপথের ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি, তবে আলোচনার সুবিধার্থে আমাদের অনুধাবন করা উচিত রাসূল (স) তার সকল অনুসারীদের, এমনকি আনসারদের মতো দৃঢ় প্রতিজ্ঞ অনুসারীদের সমর্থনের ব্যাপারেও কতটা সতর্ক এবং যত্নবান ছিলেন। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আনসারগণ কি অবস্থান গ্রহণ করছে বিশেষ করে যা তাদের আনুষ্ঠানিক চুক্তি দ্বারা বাধ্য ছিল না তা জানার জন্য রাসূল (স) আগ্রহী ছিলেন। তাই রাসূল (স) পুনরায় বললেনঃ পরামর্শ দিন হে লোকসকল! এর মাধ্যমে তিনি আনসারদেরকে নির্দিষ্ট করে বুঝালেন।

এবার সা’দ বিন মুয়াজ (রা) উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, ‘আল্লাহর কসম, আমার মনে হচ্ছে আপনি চাচ্ছেন আমরা (আনসারগণ) কথা বলি।’ রাসূল (স) সরাসরি বললেন, ‘হ্যা।’ সা’দ বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (স), আমরা আপনার প্রতি ঈমান এনেছি এবং আপনি আমাদের জন্য যা নিয়ে এসেছেন আমরা তার সাক্ষী এবং আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষনা করছি যে আপনি যা নিয়ে এসেছেন তাই সত্য। আমরা আপনার প্রতি আমাদের আনুগত্য ও ত্যাগের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করছি। আপনি আমাদেরকে যাই আদেশ করুন না কেন আমরা অত্যন্ত আগ্রহের সাথে তা মান্য করবো এবং মহান আল্লাহর কসম, যিনি আপনাকে সত্যিসহ প্রেরণ করেছেন, আপনি যদি আমাদেরকে সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে বলেন, আমরা সাথে সাথেই তা পালন করবো এবং আমাদের একজনও পিছুপা হবে না। আমরা শত্রুর সাথে লড়াই নিয়ে ভাবি না। আমরা যুদ্ধে অভিজ্ঞ এবং লড়াইয়ে বিশ্বস্ত৷ আমাদের আশা, মহান আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা আমাদের হাত দিয়ে সাহসের সেই কাজ করিয়ে নিবেন যা আপনার চোখকে সন্তুষ্ট করবে। দয়া করে আল্লাহর নামে আমাদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে নিয়ে চলুন।’

বাকীটা ইতিহাস। মুসলমানরা যুদ্ধে জয়লাভ করলো এবং কুরাইশরা শোচনীয় পরাজয় বরণ করলো। আবু জেহেলসহ তাদের প্রায় সত্তর জনের অধিক নেতৃবৃন্দ মৃত্যুবরণ করল। মহান রাব্বুল আলামীন মুসলমানদের সাহায্যার্থে ফেরেশতাদেরকে পাঠিয়েছিলেন। এই দিন সম্পর্কে আল্লাহ কুরআনে বলেনঃ

বস্তুতঃ আল্লাহ বদরের যুদ্ধে তোমাদের সাহায্য করেছেন, অথচ তোমরা ছিলে দুর্বল। কাজেই আল্লাহকে ভয় করতে থাক, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হতে পারো। (সূরা আল ইমরান ০৩:১২৩)

শিক্ষা
এই পুরো ঘটনা থেকে নেতৃত্বের তিনটি প্রধান শিক্ষা হলোঃ

১। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার সম্ভাব্য উপকারিতা দেখতে পাওয়ার ক্ষমতাঃ একজন নেতাকে অবশ্যই ঝুঁকি বিবেচনা করে তা গ্রহণ করা উচিত হবে কিনা তা বোঝার ক্ষমতা থাকতে হবে। ঝুঁকি গ্রহণের মাধ্যমে কি কি অর্জন করা যাবে এবং এর বিনিময়ে কি কি হারাতে হতে পারে তা বিবেচনায় নিয়ে দুয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। সুবিধাগুলো চিহ্নিত করা এবং সফলতার সম্ভাবনা সঠিকভাবে যাচাই করার ক্ষমতা একজন নেতার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন।

২। পরামর্শমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণঃ আপনি যদি আপনার লক্ষ্য অর্জনে অনুসারীদের প্রতিশ্রুতি আশা করেন তবে তাদের আস্থা অর্জন করা খুবই জরুরী। নেতাকে অবশ্যই প্রাসঙ্গিক সকল তথ্য শেয়ার করতে হবে, নিজের লোকদেরকে অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে এবং নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে যে কোন সময় পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তাকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে তিনি তার সকল অনুসারীদের প্রকৃত সমর্থনই পাচ্ছেন এবং যে কোন প্রকার দ্বিধা বা দ্বন্দ্বের সমাধানে তিনি যত দ্রুত সম্ভব যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছেন। খুবই বিদ্ধংসী পদক্ষেপ হবে যদি তিনি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে নেন এবং তারপর আবিস্কার করেন তার প্রধান লোকদের সমর্থনই তিনি পাচ্ছেন না। একই সাথে সফলতার নিশ্চয়তা এবং এ থেকে সম্ভাব্য লাভের উপর ফোকাস রাখতে হবে এবং সব কিছু মিলে একটি উপযোগি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ইতিবাচক শক্তি ভেসে গিয়ে সেখানে অবস্থান নিবে ভয়। সফলতার সম্ভাবনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সর্বোপরি, উত্তেজনা হলো সফলতা অর্জনের ব্যাপারে ভয় পাওয়া।

৩। আভ্যন্তরীণ বিশ্বাস ও আল্লাহর সাথে সম্পর্কঃ প্রকৃতপক্ষে নেতৃত্ব হলো রাব্বুল আলামীনের সামনে একাকী দাঁড়িয়ে মিশন অর্জনের জন্য তার সাহায্য কামনার ইচ্ছা পোষন করা। এ জন্য তাকে স্রষ্টার সাথে এমন সম্পর্ক তৈরি করতে হবে যেন তিনি এই আত্মবিশ্বাস উপলব্ধি করতে পারেন যে মহান আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা তার আবেদন শুনতে পান এবং তিনি এর উত্তর দিবেন। আমি মনে করি এই বিষয়টি প্রায়ই বাদ পড়ে যায় যা একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ঘাটতি।

বৃহৎ উদ্দেশ্যের জন্য ক্ষুদ্র উদ্দেশ্য সমর্পন

রাসুলুল্লাহ (স) এর জীবনের কোন ঘটনাকে যদি সূচনা হিসাবে বর্ণনা করা যায় তবে সেটি হলো হুদায়বিয়ার চুক্তির ঘটনা। রাসূল (স) এবং কুরাইশদের মধ্যে সম্পাদিত এই চু্ক্তিটি কল্পনার অতীত একপেশে ছিল। আমার বিশ্বাস এই পর্যায়ে কি কি ঘটনা এই বিখ্যাত চুক্তি সম্পাদনে প্রভাবিত করেছিল এবং এর ফলাফল কি তা ব্যাখ্যা করা উচিত। এই ঘটনাটি রাসূল (স) ও সাহাবীদের জন্য গ্রাজুয়েশন পরীক্ষা ছিল যেখানে তারা সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছে। এটি ছিল তাদের ঈমানের জন্য চূড়ান্ত পরীক্ষা যার মাধ্যমে এমন বিষয়ে আল্লাহর প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশের ব্যাপার ছিল যা তাদের ইচ্ছাধীন।

হুদাইবিয়ার সন্ধি

আল্লাহর রাসূল (স) একদিন স্বপ্ন দেখলেন। তিনি দেখলেন, তিনি কাবাঘর তাওয়াফ করছেন এবং তারপর তাদের মস্তক মুণ্ডন করছেন। মক্কা ছেড়ে আসার পর ৬ বছর পার হয়ে গিয়েছিল, তাই তারা সকলেই মক্কায় যাওয়ার জন্য উদগ্রীব ছিলেন। আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা তার ঘরকে বলেছেন- মাসাবা লিন নাস- এমন ঘর যেখানে আপনি বারবার ফিরে যেতে চাইবেন, তার সাহাবীরা সেখানে যাওয়ার ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। সকল ঈমানদারই, এমনকি তারা বিদেশী হলেও, যখন প্রথমবারের মতো কা’বা শরীফ দেখে, তারা প্রভাবিত হয় এবং এই পবিত্র হারাম শরীফকে নিজের ঘর আর নিজের ঘর বলে মনে করে এবং নিজের ঘরের আরাম বোধ করে।

রাসূল (স) এর স্বপ্নও ওহী। তাই রাসূল (স) মুসলমানদেরকে উমরাহ পালনের আহবান জানালেন এবং সব মিলিয়ে ১৪০০ মুসলমান তার সাথে যাত্রা করলেন। জুল হুলাইফায় গিয়ে তারা ইহরাম বাঁধলেন, কোরবানির পশু চিহ্নিত করলেন এবং তালবিয়া বলতে শুরু করলেন। পবিত্র হজ্জযাত্রীরা মক্কার দিকে চলতে থাকলেন। তারা বেশ শান্ত ছিলেন এবং আরবরা সাধারণভাবে যে অস্ত্র বহন করে তা ছাড়া আর কোন অস্ত্র তাদের সাথে ছিল না। তারা যুদ্ধে অংশ নেয়ার নন্য কোন সেনাবাহিনী ছিল না। তবে, আব্বাদ বিন বশিরের নেতৃত্বে রাসূল (স) এর ২০ জনের একটি স্কাউট দল ছিল যারা তার নিরাপত্তা এবং পথ পরিস্কারের জন্য ঘোড়ায় চড়ে সামনের দিকে ছিল। বিশর ইবনে সুফিয়্যানকে মক্কায় তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রেরণ করা হয়েছিল। ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (স), আপনি কি বিনা অস্ত্রে সে সকল লোকদের মধ্যে প্রবেশ করতে চান যারা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধরত? চলুন আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকি যদি তারা তাই চায়।’ তাই রাসূল (স) একমত হলেন এবং মদীনা থেকে অস্ত্র নিয়ে আনার জন্য লোক পাঠালেন। তবে সেগুলো আলাদা রাখা হবে যেন এই শান্তিপূর্ণ যাত্রায় বিঘ্ন না ঘটে।

বিশর ইবনে সুফিয়ান মক্কা থেকে ফিরে বললেন, কুরাইশরা আল আহাবিশ (তিন বা তার অধিক বেদুঈন গোত্র) এর সাথে মিত্রতা স্থাপন করেছে এবং যুদ্ধের জন্য অগ্রসর হচ্ছে। এটা খুবই গুরুতর বিষয় ছিল কারণ আরব সমাজে হজ্জ ও উমরাহ পালনে কাউকে বাঁধা দেয়া হারাম ছিল। এটা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য কাজ হিসেবে গণ্য হতো। তা সত্ত্বেও কুরাইশরা এই কাজ করার পরিকল্পনা করেছিল এবং এ কাজে কিছু গোত্র তাদের সাথে যোগ দিয়েছিল।

আল্লাহর রাসূল (স) এ সংবাদ জানার পর সাহাবীদের পরামর্শ চাইলেন এবং বললেন, ‘আমরা কি আদিবাসী গোত্রগুলোর ঘরে (নারী ও শিশুদের) আক্রমণ করবো যাতে তারা কুরাইশদের ত্যাগ করে এবং তারপর আমরা কুরাইশদের সাথে মোকাবিলা করতে পারি?’ আবু বকর (রা) বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (স), আমরা কারও সাথে লড়াই করতে আসিনি। তাই কাজকে আক্রমণ করবো না। চলুন আমরা উমরাহ পালনের জন্য অগ্রসর হতে থাকি। কেউ যদি আমাদেরকে থামায় তবে আমরা তাদ্দ্র মোকাবেলা করবো। কিন্তু যদি তা না হয়, তাহলে আমরা প্রথমে আক্রমণ করবো না। রাসূল (স) একমত হলেন এবং বললেন, ‘আল্লাহর নামে এগিয়ে চলো।’

কুরাইশরা খালিদ বিন ওয়ালিদ ও ইকরিমাহ বিন আবু জেহেল এর নেতৃত্বে তাদের সেনাবাহিনী প্রেরণ করেছিল। রাসূল (স) জানতে চাইলেন, কুরাইশদের সেনাবাহিনীকে পাশ কাটিয়ে মক্কায় পৌছানোর কোন রাস্তা কেউ চিনে কিনা। আসলাম গোত্রের একজন একটি খুবই রুক্ষ ও বিস্তৃত প্রান্তর পেরিয়ে পথ দেখিয়ে নেয়ার প্রস্তাব করলো কিন্তু তারা হুদাইবিয়ার সমতলে পৌঁছুলেন। খালিদ বিন ওয়ালিদ এই সংবাদ জানতে পেরে তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে দ্রুত মক্কায় ছুটে গেলেন। কুরাইশরা জানলো যে মুহাম্মদ (স) মাত্র একদিনের পথ দূরত্বে অবস্থান করছেন। হুদাইবিয়ায় পৌঁছানোর পর রাসূল (স) এর উষ্ট্রী কাসওয়া বসে পড়ল এবং নড়তে আপত্তি করল। সকলে তাকে তাড়া দিলেও সে নড়ল না। লোকেরা বলল, কাসওয়া বিদ্রোহী হয়ে গেছে। কিন্তু রাসূল (স) বললেন, বিদ্রোহ করা কাসওয়ার স্বভাব নয়। তাকে তিনি ধরে রেখেছেন যিনি হাতিকে ধরে রেখেছিলেন।’ ইবনুল হাজর আল আসক্বালানি বলেন, আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা জানতেন যে মক্কার অধিবাসীরা মুসলমান হয়ে যাবে তাই তিনি আবরাহার হাতিকে এবং কাসওয়াকে রক্তপাত প্রতিরোধ করার জন্য ধরে রেখেছিলেন। আবরাহার ক্ষেত্রে আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা তাকে এবং তার সৈন্যবাহিনীকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। রাসূল (স) এর ক্ষেত্রে, আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা তাকে ধরে রেখেছিলেন যেন রক্তপাত প্রতিরোধ করা যায়।’

রাসূল (স) কুরাইশদের সাথে যুদ্ধে আগ্রহী ছিলেন না। তাদের মধ্যে তার নিজের পরিবার এবং পুরানো বন্ধুরা ছিল। তিনি উমরাহ পালন করতে এসেছেন যেমনটি তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন এবং তিনি তা সম্পন্ন করে ঘরে ফিরে যেতেই আগ্রহী ছিলেন। রাসূল (স) বললেন, যার মুষ্ঠিতে আমার প্রাণ তার কসম, পবিত্র স্থানের সম্মান রক্ষা এবং রক্তপাত বন্ধে তাদের যে কোন প্রস্তাবই আমি গ্রহণ করবো।’ তিনি সকলের কাছে বিষয়টি পরিস্কার করলেন যে তিনি যুদ্ধ করতে বা কোন রক্তপাত ঘটাতে চান না।

হুদাইবিয়ায় একটি কুয়া ছিল। কিন্তু সাহাবীরা কুয়াটিকে শুকনা অবস্থায় আবিষ্কার করলো। বিষয়টি তারা রাসূল (স) কে জানালে তিনি তার তূণীর থেকে একটি তীর দিয়ে কুয়ার মধ্যে ফেলতে বললেন। তীরটি কুয়ায় ফেলা হলে তা যথেষ্ট পরিমান পানিতে ভরে গেল যা দিয়ে কাফেলা যতক্ষণ সেখানে ছিল প্রয়োজন মিটল।

পরিস্থিতি জটিল এবং উত্তেজনাকর হয়ে উঠেছিল। রাসূল (স) মক্কার কুরাইশদের কাছে একটি প্রতিনিধি পাঠিয়ে জানাতে চাইলেন যে তিনি যুদ্ধ করতে নয়, কেবল উমরাহ পালন করতে এসেছেন। তাই তিনি খুজা গোত্র থেকে খারাস বিন উমাইয়্যাকে বাছাই করলেন। খারাস মক্কায় প্রবেশ করলে কুরাইশরা তার উটকে হত্যা করল এবং তাকেও প্রায় হত্যা করে ফেলছিল, এমন সময় আহাবিশ বাধা দিলেন এবং তাকে উদ্ধার করলেন। বিপর্যস্ত এবং হতাশ হওয়ায় কুরাইশরা রাসূল (স) এর প্রতিনিধিকে কূটনীতির সাধারণ আচরণও প্রদর্শন করেনি। খারাস ফিরে এলে রাসূল (স) আরেকজন প্রতিনিধি প্রেরণ করতে চাইলেন। তিনি হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) কে ডেকে প্রতিনিধি হিসেবে প্রেরণের ব্যাপারে তার মতামত জানতে চাইলেন। উমর (রা) বললেন, ‘আপনি নির্দেশ দিলে আমি যাবো, তবে মক্কায় আমার পরিবারের (বনু আদি) কেউ নেই এবং কেউ আমাকে সুরক্ষা দিবে না। কুরাইশরা তাদের প্রতি আমার শত্রুতা সম্পর্কে অবগত আছে। রাসূল (স) নিরব হয়ে আছেন দেখে উমর (রা) হযরত উসমান ইবনে আফফানের নাম প্রস্তাব করলেন, কারণ তিনি ছিলেন কুরাইশদের অন্যতম বড় গোত্র বনু আব্দ মানাফের অংশ বনু উমাইয়্যা গোত্রের সন্তান। কুরাইশদের দুটি প্রধান শাখা হলো বনু মাখজুম এবং বনু আবদ মানাফ। আবু জেহেল, ওয়ালিদ বিন মুগিরা এবং খালিদ বিন ওয়ালিদ বনু মাখজুম গোত্রের সদস্য। বনু আবদ মানাফের দুটি প্রধান শাখা হলো বনু হাশিম (রাসূল (স) এর পরিবার) এবং বনু উমাইয়্যা। উসমান ইবনে আফফান (রা) যেতে সম্মত হলেন। তিনি মক্কায় পৌঁছামাত্র আব্বান বিন সাঈদ ইবনুল আ’স তাকে নিরাপত্তা দিলেন। (আবু সুফিয়ান তখন মক্কার বাহিরে ছিলেন তাই আব্বান বিন সাঈদ তখন নেতৃত্বের দায়িত্বে ছিলেন) আব্বান হযরত উসমান (রা) কে তার উটের পিঠে তুলে নিলেন এবং তার প্রতি দেয়া নিরাপত্তার বিষয়টি ঘোষনা করলেন। উসমান (রা) কুরাইশদের নেতৃত্বের প্রতি উদ্দেশ্য করে বললেন, আল্লাহর রাসূল (স) তোমাদেরকে ইসলামের প্রতি ও আল্লাহর প্রতি এবং আল্লাহর ধর্মে প্রবেশের আহবান জানাতে পাঠিয়েছেন কারণ আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা তার ধর্মকে বিজয়ী করবেন এবং তার রাসূল (স) কে সম্মানিত করবেন। দ্বিতীয়ত, কাউকে এই বিষয়টি যত্ন নেয়ার দায়িত্ব দাও, যদি তারা রাসূল (স) কে পরাজিত করতে সক্ষম হয় তাহলে তোমরা যা চাও পাবে এবং যদি তা না পারো, তাহলে তোমরা ঠিক করো কি করবে। এর মাঝে তোমরা কিছু বিশ্রাম পাবে কারণ যুদ্ধের কারণে তোমরা বেশ পরিশ্রান্ত এবং তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিরা নিহত হয়েছে। আল্লাহর রাসূল (স) আমাকে এই বলার জন্য পাঠিয়েছেন যে আমরা এখানে কারও সাথে লড়াই করতে আসিনি বরং উমরাহ পালন করতে এবং আমাদের কোরবানির পশু কোরবানি করতে এসেছি এবং তারপর আমরা চলে যাবো।’ তিনি তাদেরকে সরাসরি ও কাটখোট্টা বার্তা পৌছেঁ দিলেন।

আব্বান বিন সাঈদ সাইয়্যিদিনা উসমান (রা) কে বললেন, ‘আপনি যদি তাওয়াফ করতে চান তাহকে আমার নিরাপত্তায় করতে পারেন। আপনাকে কেউ থামাবে না।’ উসমান ইবনে আফফান বললেন, ‘আল্লাহর রাসূল (স) তাওয়াফ না করা পর্যন্ত আমি তাওয়াফ করবো না।’ কিছু সাহাবী বলছিলেন যে, উসমান (রা) ভাগ্যবান কারণ তিনি তখন তাওয়াফ করছেন। কিন্তু তাদের কথা শুনে রাসূল (স) বললেন, উসমান এর প্রতি আমার বিশ্বাস হলো, সে যদি মক্কায় অনির্দিষ্ট সময়কালও অবস্থান করে, আমি তাওয়াফ না করা পর্যন্ত সে তাওয়াফ করবে না।’ এবং তাই ঘটেছিল।

কুরাইশরা খুজা গোত্রের বুদাইর বিন ওয়ারাকা-কে রাসূল (স) এর সাথে সাক্ষাতের জন্য প্রেরণ করলেন। বুদাইর তার গোত্রের কিছু লোককে নিয়ে গেলো। গোত্রটি রাসূল (স) এর প্রতি বেশ সহানুভূতিশীল ছিল এবং তাদের মধ্যকার মুসলমান ও মুশরিক উভয়েই রাসূল (স) এর পরামর্শদাতা ছিল। খুজা গোত্র বনু হাশিমের মিত্র এবং যেহেতু রাসূল (স) বনু হাশিমের প্রধান, তাই তারা নিজেদেরকে তার মিত্র মনে করতো এবং তাদের মধ্যকার পুরানো গোত্রীয় সম্প্রীতির প্রতি বিশ্বস্ত ছিল। ফলে রাসূল (স) কুরাইশ এবং তাদের লোকদের সম্পর্কে ভিতরের তথ্য পেলেন। বুদাইর ইবনে ওয়ারাকা রাসূল (স)কে বললেন যে কুরাইশরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে এসেছে, তাদের বাঘের চামড়া পরিধান করেছে, উটের দুধ দোহন করছে এবং দীর্ঘ সময় অবস্থানের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।

আল্লাহর রাসূল (স) বললেন, ‘আমি কারও সাথে যুদ্ধ করার জন্য আসিনি। কুরাইশরা যুদ্ধে ক্ষয়প্রাপ্ত এবং ক্লান্ত। আমি কুরাইশদেরকে কিছু অবকাশ দিতে চাই। আমাকে একাকী তাদের মধ্যে যেতে দাও এবং আমি যদি তাদেরকে বুঝাতে পারি তাহলে তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। আমি হেরে গেলে তারা কিছু বিশ্রাম ও সময় পেতো। যদি তা না হয় এবং তারা যুদ্ধ করতে চায়, তাহলে আমি শপথ করছি, শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি হাল ছাড়বো না এবং আল্লাহ আমাদের মধ্যে সিদ্ধান্ত দিবেন।’ বুদাইর ইবনে ওয়ারাকা ফিরে এলো এবং তিনি যা জেনেছেন তা কুরাইশদেরকে বললেন। কুরাইশরা তা পছন্দ করলো না এবং উপেক্ষা করলো। এবার কুরাইশরা মিকরাজ বিন হাফসকে পাঠালো। রাসলূ (স) বললেন, ‘সে এমন একজন যাকে বিশ্বাস করা যায় না।’ পরে মিকরার ৫০জনকে সাথে নিয়ে এলেন এবং মুসলমানদের বন্দী করার উদ্দেশ্যে ক্যাম্পকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তাদের সবাইকে মুসলমানরা আটক করতে সক্ষম হলো এবং একমাত্র মিকরাজ পালিয়ে যেতে পারলো। কিন্তু রাসূল (স) সবাইকে বিনা শর্তে মুক্ত করে দিলেন কারণ তিনি যে যুদ্ধ করতে আসেন নি সকলের কাছে স্পষ্টভাবে এই বার্তা দিতে চেয়েছিলেন। তারপর আহাবিসদের প্রধান হুলাইস বিন আলক্বামাকে রাসূল (স) এর সাথে সাক্ষাত করার জন্য প্রস্তাব করা হলো। রাসূল (স) বললেন, তিনি সে লোকদের প্রধান যারা ধর্মপ্রাণ। তাই কুরবানীর পশুগুলোকে তাড়িয়ে দাও যেন সে দেখতে পারে আমরা কেবল উমরাহ পালনের জন্য এসেছি।’ মুসলমানগণ তাই করলেন। হুলাইস এ দৃশ্য দেখে এতটাই প্রভাবিত হলেন যে তিনি এমনকি রাসূল (স) এর সাথে সাক্ষাতই করলেন না এবং কুরাইশদের নিকট ফিরে গিয়ে বললেন, মহান আল্লাহর প্রশংসা, এই লোকগুলোকে কা’বায় আসতে বাধা দেয়া ঠিক হবে না। আমাদের সংস্কৃতিতে এর অনুমতি নেই এবং আমরা কা’বায় হজ্জ করা থেকে কাউকে বিরত রাখতে পারি না। আল্লাহর কসম, আমরা জিদাম, কিনদাহ, হিমায়ার লাহাম (ইয়েমেনের উপজাতি)দেরকে আসার ও আল্লাহর ঘর ভ্রমণের অনুমতি দেই অথচ আব্দুল মুত্তালিবের ছেলেকে বাধা দিচ্ছি।’

কুরাইশরা তাকে বলল, ‘বসে পড়ো। তুমি হলে জ্ঞানহীন বেদুঈন।’ হুলাইস এত রাগান্বিত হলেন যে তিনি বললেন, যারা আল্লাহর ঘরে আসতে চায় তাদেরকে এখানে আসতে বাধা দেয়ার কোন অধিকার তোমাদের নেই। যদি তোমরা না থামো, তাহলে আমি সকল আহাবিশকে তোমাদের বিরুদ্ধে শেষ মানুষটি জীবিত থাকা পর্যন্ত চালিত করবো।’ শেষ পর্যন্ত কুরাইশরা তাকে শান্ত করতে সক্ষম হলো এবং তিনি নিশ্চুপ থাকলেন।

তারপর উরওয়া বিন মাসুদ রাসূল (স) এর নিকট গিয়ে সমঝোতা করার প্রস্তাব করলেন। তার মা কুরাইশ বংশের ছিলেন এবং তিনি ছিলেন তায়েফের আল থাকিফ গোত্রের। তিনি আরবের একজন মহান ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি খুবই ক্ষমতাবান এবং বিখ্যাত মানুষ ছিলেন। তিনি তাদেরকে বললেন, আমি কি তোমাদের সন্তান নই? তোমরা কি চাও যে আমি যাই এবং এই মানুষটির সাথে কথা বলি?’ তারা একমত হলো। তিনি বললেন, আমি দেখলাম তোমরা দূত পাঠাও এবং তারপর তারা যখন ফিরে আসে, তখন তোমরা যা চাও তা না নিয়ে আসলে তোমরা তাকে হীন ও অপমান করো। আমি এর অংশীদার হতে চাই না। তাই এ ব্যাপারে আমাকে নিশ্চয়তা প্রদান করো, তবেই আমি মুহাম্মদ (স) এর সাথে কথা বলতে যাবো।’ তারা একমত হলো।

উরওয়া  বিন মাসুদ খুব উদ্ধত প্রকৃতির ছিলেন এবং আরবদের মধ্যে তার সমুচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তিনি রাসূল (স) এর কাছে গিয়ে বললেন, এই যে মুহাম্মদ (স), তুমি কি দেখতে পাচ্ছো না যে তুমি তোমার নিজের লোকদের নষ্ট করছো? কখনো শুনেছো কোন আরব তার নিজেদ লোকদের নষ্ট করেছে? আমি তো কোন মুখ দেখতে পাই না (অর্থ্যাৎ আমি উল্লেখযোগ্য বা সম্মানিত কাউকে দেখছি না)। আমি তো কতগুলো জগাখিচুড়ি লোক দেখতে পাচ্ছি যারা তুমি হেরে গেলে দৌড়ে পালাবার যোগ্য।’ রাসূল (স) এর সাথীদের মধ্যে কিছু গোত্র যেমন আসলাম, গিফার ও জুহায়ান এর লোকদেরকে প্রধান গোত্রগুলো যেমন কুরাইশ, তাকিফ, আসাদ ও ঘাতাফান এর লোকেরা দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ হিসেবে গন্য করতো। রাসূল (স) বললেন, শেষ বিচারের দিনে দাঁড়িপাল্লায় এই ক্ষুদ্র গোত্রগুলো আজকের সম্মানিত বড় গোত্রগুলোর তুলনায় অনেক ভারী হবে।’

আবু বকর (রা) উরওয়াহ বিন মাসুদের কথাকে খুবই অপমানজনম হিসেবে নিলেন এবং তাকে খুব খারাপ অভিশাপ দিলেন। তার কথায় উওরওয়াহ বিন মাসুদ অত্যন্ত প্রভাবিত হলেন এবং বললেন, তুমি যদি আমার উপকার না করতে তাহলে আমি এই অপমানের জবাব দিতাম। কিন্তু আমি নীরব থাকছি এবং এই নিরবতার মাধ্যমে আমি তোমার ঋণ সম্পূর্ণ পরিশোধ করে দিলাম।’ হিজরতে পূর্বে আবু বকর তার হয়ে রক্তপণ বাবদ ১০টি উট পরিশোধ করেছিলেন যা উরওয়াহ তখনও পরিশোধ করে নি। আবু বকর (রা) এর জবাব থেকেই বোঝা যায় তারা রাসূল (স) কে কী পরিমাণ ভালোবাসতেন। তারা রাসূল (স) এর প্রতি কোন কুৎসা, অপমান বা অশ্রদ্ধাকে মুখ বুঝে প্রতিবাদ না করে সহ্য করতেন না। তারা যে কোন মূল্যে রাসূল (স) এর পাশে থেকেছেন। তার উক্তি ‘আমাদের পিতা মাতা আপনার জন্য কোরবান হোক’ শুধু কথার কথা ছিল না। তারা রাসূলের জন্য তাদের ভালোবাসা, প্রতিশ্রুতির প্রমাণ বারবার দিয়েছেন।

ইবনুল হাজার আলা আসক্বানি বলেন, ‘উরওয়া তৎকালীন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতির কারণে দুটি অপশনকেই অপছন্দ করছিল (নিজের লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা অথবা পরাজিত হওয়া)। অথচ শরীয়াহর দৃষ্টিতে দুটোই প্রশংসনীয়, ইসলামের জন্য এমনকি নিজের লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এবং জয়ী হওয়া, প্রশংসনীয় আবার এরকম যুদ্ধে পরাজিত হওয়া এবং আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হওয়াও প্রশংসনীয়।’ সুতরাং ইসলাম আমাদের বিচারের ক্রাইটেরিয়া পরিবর্তন করে এবং জীবন সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী, কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ, জয় বা পরাজয় কী তার ধারণা পালটে দিয়েছে।

সে যুগের রীতি অনুযায়ী উরওয়া কথা বলার সময় আল্লাহর রাসূল (স) এর পবিত্র দাড়ি মুবারক ধরার জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। রাসূল (স) এর পাশে নিরাপত্তার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন মুগীরা বিন উকবা। তিনি তার তরবারির বাট দিয়ে উরওয়ার হাতে আঘাত করলেন এবং বললেন, ‘তোমার হাত তোমার কাছেই রাখো, নাহয় তোমার হাত তোমার কাছে ফিরবে না।’ উরওয়া বিন মাসুদ এই ব্যবহারে খুব কষ্ট পেলেন কারণ তিনি বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন এবং তিনি নিজের হাতে এরকম চাপড় খেতে অভ্যস্ত ছিলেন না। তিনি জানতে চাইলেন, ‘এই লোকটি কে?’ তিনি বর্মে ঢাকা মুগীরা (রা) কে দেখতে পাচ্ছিলেন না। রাসূল (স) বললেন, ‘এ তোমার ভাতিজা মুগীরা।’ তার নিজের ভাতিজার কাছ থেকে এরকম ব্যবহার পেয়ে তিনি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন (আরবরা তাদের চাচাকে বাবার মতই সম্মান করতো)। এর মাধ্যমে বুঝা যায় ইসলাম বিশ্বস্ততাকে কিভাবে পরিবর্তন করে এবং রাসূল (স) এর প্রতি বিশ্বস্ততা সব কিছুকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

উরওয়া কুরাইশদেরকে বললেন, আমি অনেক রাজার নিকট গিয়েছি। আমি সিজার এবং খুসরো এবং নিগাসের দরবারে গিয়েছি। কিন্তু আমি কখনো মানুষকে তাদের রাজাকে এত ভালোবাসতে এবং শ্রদ্ধা করতে দেখিনি যেমনটি মুহাম্মদ (স) এর অনুসারীরা করে। যদি সে থুতু ফেলে যা কারও হাতে পড়ে তবে সে তা নিজের মুখ বা শরীরে মাখিয়ে নেয়। তিনি কথা বললে তারা তা পালন করার জন্য ছুটে যায় এবং যখন তারা কথা বলে, তারা নীচু স্বরে কথা বলে এবং তাদের শ্রদ্ধাভক্তি থেকে কখনোই তার চোখের দিকে তাকায় না। তারা কখনোই তাকে ত্যাগ করবে না। সে তোমাদের একটি প্রস্তাব দিয়েছে, তোমরা তা গ্রহণ করে নাও।’ উরওয়াহ বিন মাসুদ পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং দুনিয়া ও আখেরাতে আশির্বাদপ্রাপ্তদের একজন হন।

উসমান (রা) তখনও মক্কায় ছিলেন এবং এমন সময় গুজব রটলো যে তাকে হত্যা করা হয়েছে। রাসূল (স) বনু নাজ্জার গোত্রের ক্যাম্পের দিকে চললেন। উম্মে আম্মারা (রা) বলেন, ‘আমি তাকে আমাদের ক্যাম্পের দিকে আসতে দেখলাম এবং ভাবলাম তার কোন কিছুর প্রয়োজন।’ সেখানে পৌঁছে তিনি বসলেন এবং বললেন, ‘আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা আমাকে বাইয়াত গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।’ বনু নাজ্জার গোত্র খাজরাজ থেকে আগত এবং তারা রাসূল (স) এর মায়ের দিকের আত্মীয়। তিনি মদীনায় আসার পর প্রথমদিকে তাদের সাথে ছিলেন এবং এবার তিনি তাদের তাঁবুর দিকেই প্রথমে গেলেন। তারা ছিল তার ব্যক্তিগত রক্ষী এবং নিকটতম। তাদের তাঁবুতে শপথ গ্রহণ করা হলো। শপথটি ছিলঃ আমরা মৃত্যুবরণের শপথ করছি। আমরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন না করার শপতব করছি। আপনার অন্তরে যাই থাকুক না কেন আমরা সে অনুযায়ী শপথ করছি।’ একে বাইয়াতে রিদওয়ান বলা হয়। রাসূল (স) এর প্রতি সাহাবীদের বিশ্বাস কোন স্তরে ছিল দেখুন। তারা ‘অন্তরে যাই থাকুক’ বলে শপথ গ্রহণ করছে অথচ তারা জানে না সেখানে কি আছে তবে জানে এর মানে হলো প্রয়োজনে তাদের জীবনও বিলিয়ে দিতে হতে পারে।

উম্মে আম্মারা (রা) বলেন, ‘আমি তাঁবু থেকে একটি লাঠি নিলাম এবং বেল্টে একটি ছুরি বাধলাম কারণ আমি রাসূলুল্লাহ (স) এর উপর কোন আক্রমণ হলে প্রতিরোধ করতে চেয়েছিলাম। আমার স্বামী হাতে তরবারি নিয়ে বাইয়াত গ্রহণ করলেন।’ সাহাবীরা ছিলেন স্পেশাল এবং আনসাররা ছিলেন সাহাবীদের মধ্যেও স্পেশাল।

রাসূল (স) সালামা ইবনে আল আকওয়াকে ডাকলেন এবং বাইয়াত গ্রহণের নির্দেশ দিলেন। সে বাইয়াত গ্রহণ করলো। রাসূল (স) দেখলেন যে তার কোন বর্ম নেই, তাই তিনি তাকে ছোট একটি ঢাল দিলেন। তারপর তিনি তাকে পুনরায় দেখলেন এবং বললেন, আসো এবং শপথ নাও। সালামা বললো, হে রাসুলুল্লাহ (স), আমি ইতোমধ্যেই বাইয়াত গ্রহণ করেছি। রাসূল (স) বললেন, আসো এবং আবার গ্রহণ করো। তারপর রাসূল (স) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাকে যে ঢালটি দিলাম সেটি কি করেছো? সে বললো, আমার চাচার কিছু নেই বলে তাকে দিয়েছি। রাসূল (স) বললেন, তোমার উদাহরণ হলো তার মতো যে বলে, হে আল্লাহ, আমাকে এমন কাউকে দাও যে আমাকে তার নিজের চেয়ে বেশি ভালোবাসে। তারপর রাসূল (স) তাকে পুনরায় দেখলেন এবং ডেকে বললেন, এসো, বাইয়াত গ্রহণ করো। সালামা তৃতীয়বারের মতো বাইয়াত গ্রহণ করলো।

শিয়ারা হযরত উসমান (রা) কে বাইয়াত গ্রহণ না করা এবং বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করা নিয়ে দোষারোপ করে। এটি মিথ্যা অভিযোগ, এর কারণ হলো, প্রথমত: সাইয়্যিদিনা উসমান (রা) বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেন নি কারণ রাসূল (স) তাকে তার মৃত্যুশয্যায় শায়িত স্ত্রী, যিনি রাসূল (স) এর কন্যা, এর পাশে থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বাইয়াতে রিদওয়ানের ক্ষেত্রে বিষয়টি হলো, প্রথমত এটি তার জন্যই গ্রহণ করা হয়েছিল এবং দ্বিতীয়ত, রাসূল (স) তার এক হাতের উপর অন্য হাত রেখে বললেন, এটি হলো উসমানের হাত এবং আমি তার পক্ষ হতে বাইয়াত গ্রহণ করলাম।’ সুতরাং, তার বাইয়াত হলো সর্বাপেক্ষা উত্তম কারণ রাসূল (স) নিজে তার হয়ে তা গ্রহণ করেছিলেন।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,

আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি অবস্থা ব্যক্তকারীরূপে, সুসংবাদদাতা ও ভয় প্রদর্শনকারীরূপে। যাতে তোমরা আল্লাহ ও রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর এবং তাঁকে সাহায্য ও সম্মান কর এবং সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা কর। যারা আপনার কাছে আনুগত্যের শপথ করে, তারা তো আল্লাহর কাছে আনুগত্যের শপথ করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর রয়েছে। অতএব, যে শপথ ভঙ্গ করে; অতি অবশ্যই সে তা নিজের ক্ষতির জন্যেই করে এবং যে আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করে; আল্লাহ সত্ত্বরই তাকে মহাপুরস্কার দান করবেন। (সূরা আল ফাতহ ৪৮:৮-১০)

অতঃপর এই বাইয়াত সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা বলেনঃ

আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, যখন তারা বৃক্ষের নীচে আপনার কাছে শপথ করল। আল্লাহ অবগত ছিলেন যা তাদের অন্তরে ছিল। অতঃপর তিনি তাদের প্রতি প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদেরকে আসন্ন বিজয় পুরস্কার দিলেন। (সূরা আল ফাতহ ৪৮:১৮)

আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা যে সকল সাহাবী বাইয়াত গ্রহণ করেছিল তাদের প্রশংসা করলেন। আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা তাদের এই বাইয়্যাত প্রত্যক্ষ করেছেন এবং বললেন রাসূল (স) এর হাতের উপর তার হাত ছিল। বাইয়্যাত গ্রহণ শেষ হলে রাসূল (স) বললেন, তোমরা এই পৃথিবীর বুকে সর্বোত্তম৷ আন্তুম খিয়ারুল আরদ।

পরে জানা গেল যে উসমান (রা) কে হত্যা করা হয় নি এবং তার মৃত্যুর খবরটি গুজব ছিল। বাইয়াত ছিল ঈমানদারদের জন্য একটি পরীক্ষা এবং কোন যুদ্ধ না করা সত্ত্বেও তারা এজন্য পুরস্কৃত হলো। অন্য একটি হাদীসে বলা হয়েছেঃ আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা একমাত্র লাল উটের মালিক ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। এ ব্যক্তিটি ছিলেন আজাদ বিন খায়েস যিনি শপথ গ্রহণ করেন নি এবং শপথ গ্রহণ থেকে বেচে থাকার জন্য নিজের লাল উটের পেছনে লুকিয়ে ছিলেন।

কুরাইশরা সুহাইল ইবনে আমরকে রাসূল (স) এর সাথে নেগোশিয়েট করার জন্য পাঠালো। সুহাইল রাসূল (স) এবং সাহাবীদেরকে মক্কায় প্রবেশে সম্মতি দেয়ার ব্যাপারে তীব্র বিরোধী ছিলেন এবং একে চুক্তির একটি শর্ত বানিয়ে নেন। এটা হাজিলিয়্যাতের – কুরাইশদের গোত্রীয় অহংকারের – একটি চিহ্ন যার ফলে তীর্থযাত্রীদেরকে মক্কায় প্রবেশে বাঁধা দেয়া যে একটি অন্যায় কাজ সেই সত্য অনুধাবন করতে দেয় নি। রাসূল (স) এই নিয়ে তর্ক করতে চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু কোন ফল হয় নি। শেষ পর্যন্ত রাসূল (স) মত দিলেন কারণ তিনি চেয়েছিলেন চুক্তিটি হোক। রাসূল (স) যা করেছিলেন তা নিশ্চিতভাবেই মহান আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালার নির্দেশক্রমে করেছিলেন, তা সত্ত্বেও, এটা তার এবং সাহাবীদের জন্য খুবই কঠিন এক পরীক্ষা ছিল। সর্বোপরি, তারা সকলেই রাসূল (স) এর আহবানে উমরাহ করতে এসেছেন এবং এখন তাদেরকে অন্যায়ভাবে বাধা দেয়া হচ্ছে।

ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা) এসব কথাবার্তায় খুবই হতাশ হয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি রাসুল (স) এর নিকট গিয়ে বললেন, ‘আপনি না আল্লাহর রাসূল (স)?’ তিনি বললেন, ‘হ্যা।’ ওমর (রা) প্রশ্ন করলেন, ‘আমরা কি মুসলমান নই?’ তিনি জবাব দিলেন, ‘হ্যা।’ ওমর (রা) জানতে চাইলেন, ‘তারা কি মুশরিক নয়?’ রাসূল (স) ‘হ্যা’ বললেন। এবার ওমর (রা) প্রশ্ন করলেন, তাহলে আমরা কেন আমাদের ধর্মকে হেয় করছি এবং বিতর্ক করছি?’ আল্লাহর রাসূল (স) বললেন, ‘আমি আল্লাহর দাস। আমি তার অনানুগত্য করবো না এবং তিনি আমাকে পরিত্যাগ করবেন না।’ ওমর (রা) এবার আবু বকর (রা) এর নিকট গেলেন এবং একই প্রশ্ন করলেন। আবু বকর (রা) বললেন, ‘তাকে অনুসরণ করুন। তিনি আল্লাহর রাসূল (স) এবং তিনি তাকে পরিত্যাগ করবেন না।’ ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা) পরে এই বিতর্কের জন্য আফসোস করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন আল্লাহর রাসূল (স) যা করেছিলেন তা ওহীর কারণে এবং তিনি তাই করেছিলেন যা তাকে আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সাইয়্যিদিনা ওমর (রা) এর বিতর্ক করার উদ্দেশ্য সহীহ ছিল কারণ তিনি ইসলাম এবং তার সম্মানের ব্যাপারে খুবই সংবেদনশীল ছিলেন। কিন্তু যখন তিনি রাসূল (স) এর সাথে তর্ক করার ভুল বুঝতে পারলেন, তিনি বলেন, ‘আমি রোজা রাখলাম, প্রার্থনা করলাম, সাদাকা দিলাম এবং দাস মুক্ত করলাম যেন সেদিন আমি যা বলেছিলাম এবং যা করেছিলাম তা যেন আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা আমাকে ক্ষমা করে দেন।

আল্লাহর রাসূল (স) চুক্তির শর্তসমূহ বললেন এবং আলী ইবনে তালিব (রা) সেগুলো লিখলেন। রাসূল (স) বললেন, ‘লিখ – বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।’ আলী (রা) লিখলেন। সুহাইল বিন আমর, যিনি কুরাইশদের পক্ষ থেকে সমঝোতাকারী ছিলেন, আপত্তি করলেন এবং বললেন, ‘আমরা আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালাকে জানি কিন্তু আর রাহমান এবং আর রাহীম সম্পর্কে জানি না। সুতরাং বিসমিকাল্লাহুম্মা লিখ।’ আল্লাহর রাসূল (স) আলী (রা) কে তেমনটিই লিখতে বললেন কিন্তু আলী (রা) যা লিখেছিলেন তা মুছতে ইতস্তত করছিলেন। তাই রাসূল (স) নিজে তা মুছে দিলেন। তারপর তিনি বললেন, লিখ – আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ এবং মক্কার কুরাইশদের মধ্যে সুলাহ।’ আলী (রা) লিখলেন কিন্তু সুহাইল আপত্তি করলেন এবং বললেন, আমরা মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহকে চিনি কিন্তু কোন রাসুলুল্লাহকে চিনি না। যদি আমরা তোমাকে আল্লাহর রাসূল হিসেবে স্বীকার করে নেই তাহলে আমাদের মধ্যে কোন ঝগড়া থাকে না। তাই মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ লিখ।’ আল্লাহর রাসূল (স) এই পরিবর্তনের নির্দেশ দিলেন এবং আলী (রা) আবারও লিখতে অনাগ্রহ প্রকাশ করলেন। রাসূল (স) নিজেই পরিবর্তন করে দিলেন। সাইয়্যিদিনা আলী ইবনে তালিবের জন্য এই পরিবর্তনগুলো করা অসম্ভব ছিল কারণ এসবের উপরই ছিল তার ঈমানের ভিত্তি। এখন আল্লাহর নাম এবং আল্লাহর রাসূলের নাম মুছে ফেলা ছিল আলী (রা) এর চিন্তার বাইরের অসম্ভব কিছু।

হুদাইবিয়ার সন্ধির শর্তসমূহঃ
১। উভয়পক্ষ দশ বছরের জন্য সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত যে সময়ে সকলে শান্তি ও নিরাপত্তা উপভোগ করবে এবং একে অপরকে আক্রমণ করবে না।
২। অভিভাবক বা নেতার অনুমতি না নিয়ে কুরাইশদের কেউ যদি মুহাম্মদের দলে যোগ দিলে তাকে কুরাইশদের নিকট ফেরত পাঠানো হবে।
৩। মুহাম্মদের ক্যাম্প থেকে কেউ যদি কুরাইশদের সাথে যোগ দেয়, তবে তারা তাকে ফেরত পাঠাতে বাধ্য নয়।
৪। দুই পক্ষই একমত যে তারা একে অপরের প্রতি ভালো ধারণা পোষণ করবে।
৫। চুরি অথবা বিশ্বাসঘাতকতাকে ক্ষমা করা হবে না।
৬। কেউ যদি মুহাম্মদের সাথে জোট বাঁধতে চায় তবে সে তা করতে পারে এবং কেউ যদি কুরাইশদের সাথে জোট বাঁধতে চায় তবে সেও তা করতে পারে।
৭। আরও একমত যে মুহাম্মদ এ বছর মক্কায় প্রবেশ না করেই ঘরে ফিরে যাবে। এক বছর পরে আমরা মক্কা খালি করে দেব যেন তোমরা তোমার অনুসারীদের নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করে মাত্র তিনদিন অবস্থান করতে পারো। তোমরা কেবল ভ্রমণকারী প্রয়োজনীয় অস্ত্র তথা কোষবদ্ধ তরবারী বহন করতে পারবে। তোমরা অন্য কোন অস্ত্র বহন করবে না।

এই অসম শর্তে সম্মত হয়ে রাসূল (স) শান্তিপূর্ণভাবে ইসলাম প্রচারের দরজা খুলে দিলেন। শত্রুতা স্থগিত হলে মুসলমানরা মুক্তভাবে চলাচল করা ও ইসলামের বার্তা প্রচার করার সুযোগ পেল। এর ফল হলো আরবের প্রায় সমগ্র অংশই ইসলাম গ্রহণ করল। দীর্ঘমেয়াদে জয়ের জন্য অনেক সময় ক্ষণস্থায়ী বা স্বল্পমেয়াদী প্রাপ্তি ত্যাগ করতে হয়। এটা অনেক সময় বেশ বেদনাদায়ক বিশেষ করে যখন এর জন্য ব্যক্তিগত অহংকার স্যাক্রিফাইস করতে হয়।

আমি হুদাইবিয়ার সন্ধিকে মক্কার কঠিন সময়, হিজরত এববগ মদীনার যুদ্ধগুলোর পরে ‘গ্রাজুয়েশন’ এর জন্য কঠিনতম পরীক্ষা বলে মনে করি। এটা ছিল দুর্যোগপূর্ণ সমিয়ে তাদের আনুগত্যের চূড়ান্ত পরীক্ষা। তাই মহান আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা তাদেরকে এত কঠিন পরীক্ষায় ফেললেন যে সাহাবীদের মধ্যে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা) এর মতো নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকেও কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল।

এই পরীক্ষা চুক্তির মাধ্যমেই শেষ হয় নি। তারা যখন চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে যাবে তখন আবু জিনিদাল (রা) উপস্থিত হলেন। তিনি ছিলেন সুহাইল বিন আমরের পুত্র যিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং এ কারণে কুরাইশরা তাকে বন্দী করেছিল যেখান থেকে তিনি পালিয়ে এসেছেন। তিনি চুক্তি সম্পর্কে বা যা ঘটছে সে সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। রাসূল (স) এর ক্যাম্পে পৌঁছতে পরে তিনি যারপরনাই আনন্দিত ছিলেন। সুহাইল বিন আমর তাকে দেখতে পেয়ে বললেন, ‘এ হলো এই চুক্তির আওতায় প্রথম ব্যক্তি। তাকে আমাদের নিকট হস্তান্তর করো, নাহয় আমরা এই চুক্তি মেনে নিবো না।’ তাকে কোন প্রস্তাবেই টলানো গেল না, ফলে রাসূল (স) অবশেষে আবু জিনদাল (রা) কে সুহাইল বিন আমরের সাথে যেতে বললেন। আবু জনদাল (রা) অত্যন্ত ব্যথিত হলেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (স), আপনি কি আমার ঈমানের পরীক্ষা নেয়ার জন্য তাদের কাছে ফেরত পাঠাচ্ছেন?’ আল্লাগর রাসূল (স) বললেন, ‘ধৈর্য্য ধরো, আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা তোমাকে এবং তোমার কারণে যারা যন্ত্রণা ভোগ করছে তাদের সহায়তা করবেন।’

এই ঘটনাটি ছিল সাহাবীদের জন্য খুবই কঠিন পরীক্ষা এবং তাদের নৈতিক অবস্থানের প্রতি বিশাল আঘাত। এমন বিষয় যা তারা পরিষ্কারভাবে ঘৃণা ও অপছন্দ করতো এমন বিষয়ে রাসূল (স) এর প্রতি তাদের আনুগত্যের পরীক্ষাও ছিল এই ঘটনাটি। সাহাবীদের মধ্যে যাদের প্রবল মান সম্মান বোধ ছিল এবং মহান আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালার প্রতি যাদের দৃঢ় আস্থা ছিল তাদের পক্ষে তাদেরই এক মুসলমান ভাইকে কাফেরদের হাতে তুলে দেয়ার দৃশ্য বেশ কঠিন ছিল। তার চেয়েও কঠিন ছিল রাসূল (স) কে এ ব্যাপারে সম্মত হতে দেখা এবং প্রতিহত করতে কিছু করতে না পারা। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা উচিত, রাসূল (স) নিজেও ব্যাপারটিকে খুবই অপছন্দ করেছিলেন, তা সত্ত্বেও তিনি এটা করেছিলেন কারণ মহান রাব্বুল আলামীনের কাছ থেকে তিনি ওহী এবং মুসলমানদেরকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি পেয়েছিলেন। মুসলমানদেরকে কাফেরদের হাতে তুলে দেয়া যাবে – এই ঘটনার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাবে না। বরং এমনটি করা হারাম এবং যে এমনটি করবে সে ইসলামের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করলো এবং এজন্য সে জাহান্নামী হবে।

আবু জিনদাল (রা) কে যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, হযরত ওমর (রা) তার কাছে গিয়ে নিজের ততবারী দেয়ার চেঢটা করলেন যেন তিনি সুহাইল বিন আমরকে আক্রমন করে পালাতে সক্ষম হন। কিন্তু আবু জিনদাল (রা) রা গ্রহণ করলেন না এবং হযরত ওমর (রা) বললেন, ‘সে তার পিতাকে রক্ষা করল এবং তাকে আক্রমণ করল না।’

চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়ে যাওয়ার পর সুহাইল বিন আমর চলে গেলে আল্লাহর রাসূল (স) সাহাবীদেরকে মাথা মুন্ডন করা এবং কোরবানী সম্পন্ন করার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু এই প্রথমবারের মতো কেউ তার তার কথা শুনলো না। আল্লাহর রাসূল (স) তাদের এই আপাতঃ অবাধ্যতায় খুবই মর্মাহত হলেন। তিনি তার নির্দেশ পুনরায় উচ্চারণ করলেন না কারণ তিনি জানতেন যদি তিনি তা করেন এবং সাহাবীরা না মানেন তবে তাদের ঈমান অস্বীকার করা হবে। তিনি তাদের থেকে সরে গিয়ে তাঁবুতে ঢুকলেন এবং বললেন, ‘মুসলমানেরা নিজেরকে ধ্বংস করছে। আমি নির্দেশ করলাম অথচ তারা অমান্য করলো’। রাসূলুল্লাহ (স) এর স্ত্রী উম্মে সালামা (রা) এ যাত্রায় তার সাথে ছিলেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (স), এই চুক্তি করতে গিয়ে আপনি যত সমস্যার মোকাবেলা করেছেন তার কারণে মুসলমানেরা অনেক চাপের মধ্যে রয়েছে। আপনি যদি তাদেরকে এই নির্দেশ মান্য করাতে চান, তাহলে আপনি বাহিরে গিয়ে নিজে পালন করুন, তাহলেই সবাই অনুসরণ করবে।’ আল্লাহর রাসূল (স) তার পরামর্শ গ্রহণ করলেন এবং তাঁবু থেকে বের হয়ে তার মাথা মুন্ডন ও উট কোরবানীর নির্দেশ দিলেন। তার দেখাদেখি সকল সাহাবী একই কাজ করলেন। তারা অত্যন্ত বিমর্ষ ছিল এবং কাজটি তাদের জন্য অনেক কঠিন হলেও তারা রাসূল (স) এর নির্দেশ মান্য করলো। একে অপরের মাথা মুন্ডনের সময় তারা কাঁদছিলেন। কারও কারও মাথা কেটে গিয়েছিল। রক্ত আর চোখের পানি মিশে একাকার। শ্রেষ্ঠ যোদ্ধারা কাঁদছেন অথচ বিনা বাক্যব্যায়ে নেতার নির্দেশ মেনে নিচ্ছেন – কী অভূতপূর্ব দৃশ্য! আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা এই দৃশ্য এত পছন্দ করলেন যে কুরআনে এর উল্লেখ করেছেন।

হযরত ওমর (রা) ও অন্যান্যদের মতো যোদ্ধাদের কাছে এই সন্ধি খুবই অবমাননাকর ছিল। কিন্তু এটি ছিল রাসূল (স) এর প্রতি তাদের আনুগত্যের পরীক্ষাও ছিল। মহান আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালার পরিকল্পনা সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন। সাহাবীরা যখন হজ্জ সম্পন্ন করতে না পারার রাগ-ক্ষোভ-হতাশা সত্ত্বেও রাসূল (স) এর নির্দেশনা মেনে নিলেন, মহান রাব্বুল আলামীন একে সুস্পষ্ট বিজয় হিসেবে অভিহিত করলেন।

নিশ্চয় (হে মুহাম্মদ) আমি আপনাকে সুস্পষ্ট বিজয়  দান করেছি। (সূরা আল ফাতহ ৪৮:১)

শিক্ষা
এই ঘটনায় দুটি প্রধান শিক্ষা রয়েছে।
১। একজন নেতার সর্বদা তার লক্ষ্যের প্রতি দৃষ্টি থাকা জরুরী এবনভ এ জন্য যা করা প্রয়োজন সব করতে প্রস্তুত থাকা উচিত, এমনকি যদি লক্ষ্য অর্জনে তার ব্যক্তিগত অহং বোধকেও ত্যাগ করতে হয়। নেতা যদি তার ব্যক্তিগত তৃপ্তি অর্জনের দিকে বেশি গুরুত্ব দেয় তাহলে পরিণামে তা উদ্দেশ্যের হানি ঘটাতে পারে। নেতার সবসময় মনে রাখা উচিত যে তার সাফল্য, খ্যাতি, মূল্য ও উত্তরাধিকার সবই কেবলমাত্র একটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে এবং সেটি হলো তার মিশনের সফলতা। এ কারণে বাকী সব কিছু সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্যই হওয়া উচিত। যদি তার মিশনের দরজা খুলে যাওয়ার জন্য সাময়িকভাবে পিছু হটার প্রয়োজনও হয়, মিশনের স্বার্থে তা করার প্রস্তুতি থাকা উচিত। তীর ছোড়ার জন্য হাতকে পেছনে টানতেই হয়। যত পেছনে টানা সম্ভব, তত বেশি দূরে তীর নিক্ষিপ্ত হবে।

যে নেতা এই বিষয়টি না বুঝে নিজের অহংবোধকে বেশি গুরুত্ব দেয় তিনি শেষ পর্যন্ত সাফল্যকে ত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং এ ব্যর্থতার কারণেই তিনি স্মরিত হন, সাফল্যের জন্য নন। আল্লাহর রাসূল (স) সারা জীবন তার নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে এতটাই নিঃসংশয় ছিলেন যে তার মিশনের সফলতার জন্য তিনি সব কিছুকে ত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিলেন। তিনি যে চুক্তি সম্পাদন করতে যাচ্ছেন তা তার অনুসারীদের জন্য পছন্দনীয় ছিল না, তা সত্ত্বেও তারা কোন বাধা দেয় নি, নিঃসঙ্কোচে মেনে নিয়েছে এবং পাশে থেকেছে, এটাই হলো তার প্রতি তার অনুসারীদের বিশ্বস্ততার প্রমাণ। শুধু ভালো নেতার কারণে বিজয় অর্জিত হয় না, ভালো অনুসারী পাওয়া বরং বেশি জরুরী।

২। নেতার অনুসারীদেরকে সবসময়বতাদের নেতাকে বিশ্বাস করা এবং পাশে থাকতে ইচ্ছুক হতে হবে। এমনকি নেতা যদি এমন কোন কাজ করে যা তারা সে সময় পছন্দ করতে পারছে না বা বুঝতে পারছে না তখনও এই মনোভাব বজায় থাকতে হবে। নেতা নির্বাচিত হয়ে যাওয়ার পর তাকে নিঃসংকোচে বিশ্বাস করতে হবে। রাসূল (স) এর ক্ষেত্রেএটা তাদের ঈমানের অংশ ছিল কারণ তারা জানতো তিনি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল (স) এবং তার কাছে ওহী নাযিল হয়। তারা বুঝতে পেরেছিল, তিনি যদি কিছু করেন তবে তা ঐশ্বরিক নির্দেশনা অনুসারেই করেন, ফলে পছন্দ না করলেও বা বুঝতে সক্ষম না হলেও তারা তাকে অনুসরণ করেছেন, সহায়তা করেছেন। বলাবাহুল্য, পরবর্তী ঘটনাবলী প্রমাণ করেছে যে তিনি সঠিক কাজটিই করেছিলেন।

যাহোক, সাধারণ নেতা যিনি ঐশ্বরিক নির্দেশনাপ্রাপ্ত নন তার ক্ষেত্রেও তার অনুসারীদের মধ্যে বিনা প্রশ্নে অনুসরণের মতো বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরী করতে হবে। এর মানে এই নয় যে অনুসারীরা কখনও প্রশ্ন করবে না বা তাদেরকে কখনও প্রশ্ন করতে দেয়া হবে না। প্রশ্নের ধরনটা গুরুত্বপূর্ণ – বোঝার জন্য প্রশ্ন নাকি তার কর্তৃত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন?

যদি প্রথমটি হয় তবে একে উৎসাদিত করা উচিত। কিন্তু প্রশ্নের উদ্দেশ্য যদি পরেরটি হয় তাহলে তা একটি বিপদসংকেত এবং নেতার উচিত সময়ের আগেই তা সংশোধন করে নেয়া। অনুসারীদের সাথে প্রায়শঃই খোলামেলা এবং নিঃসংকোচ কথাবার্তা বলার এটাও একটি কারণ। একজন নেতা যত বেশি সহজগম্য হবেন, তার অনুসারীরা তত বেশি বুঝতে পারবে তিনি কী কাজ করছেন এবং কেন করছেন। তার অনুসারীদের প্রতি তিনি যত শ্রদ্ধা পোষন করবেন তার অনুসারীরা তাকে রোল মডেল হিসেবে তত বেশি বিবেচনা করবে, তত বেশি তাকে বিশ্বাস করবে। একজন নেতার মধ্যে এ সকল গুণাবলী গড়ে তোলা খুবই জরুরী।

মহানুভবতা ও ক্ষমাপরায়নতা

রাসূল (স) এর জীবন থেকে সর্বশেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে শিক্ষাটি নিতে চাই তা হলো উদারতা ও ক্ষমা। বিজয়ী হিসেবে মক্কায় প্রবেশের পর তার আচরণ সকল সময়ের সমগ্র মানবজাতির জন্য ব্যক্তিগত নম্রতা, উদার হৃদয় এবং দয়ার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। যে কুরাইশরা তাকে নির্যাতন করেছে, ঘর থেকে বিতাড়িত করেছে, তার স্ত্রী, চাচাগণ, কন্যা -যাদেরকে তিনি সর্বাধিক ভালোবাসতেন – তাদের মৃত্যুর জন্য যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দায়ী, যারা তাকে অবর্ণনীয় শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা দিয়েছে তারা এখন তার দয়ার প্রত্যাশী।

তিনি কি করলেন? তিনি তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিলেন। তিনি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে বললেন কোন প্রতিশোধ গ্রহণ করা হবে না। আরবে বহু বছরের পুরাতন প্রথা ছিল প্রতিশোধের জন্য সম্পদ লুট করা হতো, পুরুষদের হত্যা করা হতো এবং নারী ও শিশুদের দাসবৃত্তিতে বাধ্য করা হতো। মক্কার লোকেরাও একই আচরণ প্রত্যাশা করেছিল।

লোকেরা হতভম্ব হয়ে গেল। তারা তাদের চোখ-কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। প্রথমে তারা নিজেদের ঘরে গিয়ে লুকিয়েছিল। তাদের ধারণা ছিল বিজয়ী দল সাধারণত যা করে বিজয়ী মুসলমানেরাও সেরকমভাবে তাদের বাড়িঘর ভেঙ্গে লুটপাট ও তান্ডব চালাবে। কিন্তু তেমন কিছুই ঘটল না। অবশেষে আভু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা কি ঘটেছে তা দেলহার জন্য বেড়িয়ে এলেন। হিন্দা ছিলেন আল্লাহর রাসূল (স) এর চরম শত্রু। উহুদের যুদ্ধে ওয়াশি কর্তৃক রাসূল (স) এর চাচা হযরত হামজা বিন আবদুল মুত্তালিবকে হত্যা এবং তার মৃতদেহ বিকৃত করার পেছনে হিন্দাই দায়ী ছিলেন। এই ঘটনা আল্লাহর রাসূল (স) কে খুব কষ্ট দিয়েছিল৷ হিন্দা কি দেখলেন? তিনি দেখলেন আল্লাহর রাদূল (স) এবং সাহাবীরা মসজিদুল জারামে নামাজ আদায় করছেন, আল্লাহর দয়া কামনা করছেন এবং সাহায্যের জন্য কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন।

এটা সত্যি যে বিজয়ী হিসেবে আল্লাহর রাসূল (স) প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু এর ফলে নতুন ক্ষত তৈরি হতো যা পরবর্তীতে নতুন সংঘর্ষের সূচনা করতো অথবা তার মিশনের সাফল্যের পথে বা তার দাওয়াত প্রচারে বাঁধা হয়ে দাঁড়াতো। যারা তার ক্ষতি করেছিল তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়ার মাধ্যমে তিনি শক্তিশালী বার্তা সকলের কাছে পৌঁছে দিলেন আর এটি হলো তার মিশন সকল ব্যক্তিগত বিবেচনার উর্ধ্বে। আর এর মাধ্যমে যারা অন্যায় করেছিল তাদের সকলকে তিনি ঋণের বাঁধনে বাঁধলেন। তার সাথে লড়াই করা বা তাকে ঘৃণা করার পরিবর্তে এবার তার শত্রুরা তার প্রতি কৃতজ্ঞ এবং তাকে সন্তুষ্ট করতে আগ্রহী। এই এক কথার মাধ্যমে তিনি তার অনুসারীদের মধ্যে ভবিষ্যতের সকল বিবাদের সম্ভাবনাকে তিনি নস্যাৎ করে দিলেন এবং এটি ছাড়া তার মিশন ব্যর্থ হয়ে যেতো। নেতাকে মিশনের লক্ষ্য অর্জনের জন্য অবশ্যই তার ব্যক্তিগত লাভ ত্যাগ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে এবং এজন্য ব্যক্তিগত উদাহরণ স্থাপন করতে হবে। অনুসারীরা তখনই নেতাকে অনুসরন করে যখন তার মধ্যে একই আচরণ দেখতে পায়। মিশনের সাফল্য হলো এর ফলাফল। ক্ষমা হলো এই সফলতার ভিত্তি।

ব্যক্তিগত আবেগ অনুভূতির চেয়ে আন্দোলনের উদ্দেশ্য বৃহত্তর।

আন্দোলনের উদ্দেশ্যের প্রতি আল্লাহর রাসূল (স) এর অঙ্গীকার এবং এর জন্য ব্যক্তিগত আবেগ বিসর্জনের সম্ভবত সর্বোত্তম ও সবচেয়ে তীক্ষ্ণ উদাহরণ হলো তার প্রিয় চাচা ও সাহায্যকারী হযরত হামজা বিন আবদুল মুত্তালিবের হত্যাকারীর প্রতি আচরণ।

উহুদ যুদ্ধের ৭০ জন শহীদ সাহাবীর মধ্যে হযরত হামজা বিন আবদুল মুত্তালিব (রা) কে শহীদদের নেতা উপাধি দেয়া হয়। দুইজন তাবেঈন একদিন আল ওয়াসি (রা) এর কাছে গেলেন এবং জানতে চাইলেন তিনি কিভাবে হযরত হামজা (রা) কে হত্যা করেছিলেন। ওয়াসি (রা) তখন বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। ওয়াসি (রা) বললেন, ‘আমি কি তোমাদেরকে সেভাবে বলবো যেভাবে আল্লাহর রাসূল (স) এর প্রশ্নের জবাবে বলেছিলাম? আমি বদরের যুদ্ধে নিহত তুয়াইমা বিনুদাইবির ভাস্তে জুবায়ের বিন মুতাইমের দাস। কুরাইশরা যখন উহুদের যুদ্ধে গেল, জুবায়ের আমাকে বলল, ‘তুমি যদি আমার চাচা হত্যার প্রতিশোধে মুহাম্মদ (স) এর চাচা হামজাকে হত্যা করো, তাহলে তুমি হবে মুক্ত মানব।’ আমি আবিসিনিয়ার লোক এবং আমার দেশের লোকদের মতই আমিওবর্শা নিক্ষেপে দক্ষ, আর আমার কদাচিৎ লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। সৈন্যবাহিনীদ্বয় যখন যুদ্ধ শুরু করলো, আমি তখন হামজাকে খুঁজতে থাকলাম। আমি তাকে যুদ্ধের মাঝখানে পেলাম। তিনি যেন প্রকাণ্ড উষ্ট্রের ন্যায় তার তরবারী নিয়ে আমাদের লোকদের উপর আঘাত করছিলেন। কোন কিছুই তার সামনে দাঁড়াতে পারছিল না। আমি ঝোপ আর পাথরের আড়াল ব্যবহার করে তার নিকটে পৌঁছুলাম কিন্তু আমার আগেই সিবা বিন আবদুল উজ্জা তার কাছে পৌঁছে গেল। হামজা তাকে ডেকে বলল, খৎনাকারী নারীর পুত্র, এদিকে আসো।’ তিনি এত জোরে আঘাত করলেন যে মনে হল তিনি মাথায় আঘাত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু যখন মাথাটি উড়ে গেল তখন আমি বুঝলাম যে তিনি লক্ষ্যভ্রষ্ট হন নি। আমি সতর্কভাবে আমার বর্শা তাক করলাম এবং নিশ্চিত হওয়ার পর বর্শাটি ছুড়ে মারলাম। আমার বর্শা তার নাভীর নিচে আঘাত করে দুই পায়ের মাঝখান দিয়ে বের হয়ে পড়ল। তিনি আমার দিকে এগোতে চেষ্টা করলেন কিন্তু পারলেন না। আমি বর্শাসহ তাকে রেখে চলে আসলাম যতক্ষণ না তিনি মারা যান। তারপর আমি ফিরে গিয়ে আমার বর্শা উদ্ধার করে আমার ক্যাম্পে ফিরে এলাম। হামজা ছাড়া, যাকে আমি কেবলমাত্র আমার মুক্তির জন্য হত্যা করেছি, আর কারও সাথে আমার কাজ ছিল না।’

আল্লাহর রাসূল (স) তার চাচার মৃত্যুসংবাদ শুনে বিধ্বস্ত হয়ে পড়লেন৷ রাসূল (স) এর জীবনের সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনাগুলোর একটি এটি। তিনি তার চাচার মৃতদেহ দেখতে গেলেন। তিনি গিয়ে দেখলেন তার পাকস্থলী উন্মুক্ত করে ভেতরের জিনিসপত্র বের করা হয়েছে। তাকে যে লোকটি নিয়ে গিয়েছিল সে বলল, ‘আমি তাকে এভাবে পাই নি। তাকে বিকৃত করা হয়েছে।’ আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে উতবাহ হামজা (রা) এর কলিজা খাওয়ার শপথ নিয়েছিল, তাই সে তার কলিজা ছিঁড়ে নেয়ার নির্দেশ দেয়। হামিজা (রা) এর মৃতদেহের প্রতি এই আচরণ রাসূল (স) এর কষ্টকে আরও বাড়িয়ে দিল এবং তিনি অঝোরে কাঁদতে লাগলেন।

ওয়াসি তখন বললেন, ‘আমি মক্কায় ফিরে গেলাম এবং আল্লাহর রাসূল (স) মক্কায় না আসা পর্যন্ত সেখানেই থাকলাম। তারপর আমি তায়েফে পালিয়ে গেলাম এবং সেখানকার প্রতিনিধিদল ইসলাম গ্রহণ করার জন্য আল্লাহর রাসূল (স) এর নিকট গমন করার আগ পর্যন্ত থাকলাম। এরপর আমি কোথায় যাবো জানতাম না। আমি লোকেদের বললাম যে আমি সিরিয়া অথবা ইয়েমেন বা অন্য কোন দেশে চলে যাবো। তখন কেউ একজন বলল, যে কেউ তার ধর্ম গ্রহণ করবে তাকে তিনি হত্যা করবেন না। তিনি তোমাকে ক্ষমা করে দিবেন।’ সুতরাং আমি মদীনায় গিয়ে তার সামিনে উপস্থিত হয়ে ইসলামের সাক্ষ্য দিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি ওয়াসি?’ আমি বললাম, জ্বী, হে আল্লাহর রাসূল (স)’। ইনি বললেন, ‘বসো এবং আমাকে বলো কিভাবে তুমি আমার চাচা হামজা (রা) কে হত্যা করলে।’ তারপর আমি তোমাদেরকে যেভাবে বললাম সেভাবেই তাকে পুরো ঘটনা বললাম। বলা শেষ হলে তিনি বললেন, ‘ওয়াসি, দয়া করে আমার সামনে থেকে তোমার মুখ সরাও। যাও, আল্লাহর রাস্তায় সেভাবে লড়াই করো যেভাবে আল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলে।’ তাই আমি তাকে এড়িয়ে চলতাম যেন আমার মুখ তাকে দেখতে না হয়। তারপর আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা তাকে তার নিকট নিয়ে গেলেন।’

ওয়াসি তারপর মুসাইলিমা আল কাজ্জাব (মিথ্যাবাদী মুসাইলিমা) এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। প্রতারক মুসাইলিমা আল্লাহর রাসূল (স) বেঁচে থাকতেই নিজেকে নবী দাবী করেন। আল্লাহর রাসূল (স) মুসাইলিমার সাথে সাক্ষাৎ করে এ কাজ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন কিন্তু মুসাইলিমা তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং মদীনা আক্রমণের প্রস্তুতি নেন। আল্লাহর রাসূল (স) তার বিরুদ্ধে সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন যারা যুদ্ধে বিজয়ী হয় এবং মুসাইলিমা আল কাজ্জাবকে হত্যা করা হয়। ওয়াসি যুদ্ধে তার ভূমিকা বর্ণনা করে বলেন, ‘যে বর্শা দিয়ে আমি হামজা (রা) কে হত্যা করেছিলাম সেটি তুলে নিলাম এবং দেখলাম মুসাইলিমা তার তরবারী হাতে দাঁড়িয়ে আছে। আমি তার দিকে বর্শা তাক করে লক্ষ্য স্থির করলাম এবং ছুঁড়ে মারলাম। একই সময়ে আরেকজন মুসলমান তাকে অন্যদিক থেকে তরবারী দিয়ে আক্রমণ করে। প্রথমে আমার বর্শা এবং তারপর তার তরবারী তাকে আঘাত করে।’ অন্য ব্যক্তিটি ছিলেন আবু দুজানা যাকে আল্লাহর রাসূল (স) তার তরবারীটি দিয়েছিলেন। ওয়াসি (রা) বলেন, যদি আমি সেই লোক হই যে তাকে হত্যা করেছে তবে এই বর্শা দ্বারা আমি সর্বোত্তম মানুষকে এবং নিকৃষ্টতম মানুষকে হত্যা করেছি।’

আন্দোলনের স্বার্থে রাসূলুল্লাহ (স) ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দকে পাশ কাটিয়ে গেছেন এমন আরেকটি উদাহরণ হলো হযরত জায়েদ বিন খালিদ (রা) এর ইসলাম গ্রহণের কাহিনী।

খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) বলেন, ‘আমি মুহাম্মদ (স) এর বিরুদ্ধে বহু যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। প্রত্যেক যুদ্ধের শেষে আমার মনে হতো আমি আমার সময় নষ্ট করেছি এবং শেষ পর্যন্ত মুহাম্মদ (স) ই জয়ী হবেন।’ হুদাইবিয়ার সন্ধি চুক্তির পূর্বে একদিন আমি ২০০ লোকের দল পরিচালনা করছিলাম। আমি মুহাম্মদ (স) এর মুখোমুখি হলাম, তিনি তখন তার লোকদেরকে নিয়ে জোহর নামাজ আদায় করছিলেন। নামাজের মধ্যেই তাদেরকে আক্রমণ করে শেষ করে দেয়ার একটি বিশাল সুযোগ ছিল। কিন্তু কিছু একটা আমাকে টেনে রেখেছিল এবং আমি আক্রমন করিনি। আমি তাদেরকে পরের নামাজের সময় আক্রমনের সিদ্ধান্ত নিলাম কিন্তু তখন তারা ভিন্নভাবে নামাজ পড়ছিল, ফলে আমি বুঝতে পারলাম তাকে সুরক্ষা প্রদান করা হচ্ছে।’ সালাতুল খাওফের আয়াত নাজিল হয়েছে এবং সাহাবীরা এমনভাবে নামাজ পড়ছিল যে তাদেরকে আক্রমণ করা সম্ভবপর ছিল না। খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) খুবই বুদ্ধিমান ছিলেন এবনভ তিনি বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন।

হুদাইবিয়ার চুক্তির বছরে আল্লাহর রাসূল (স) যে উমরা পালন করতে পারেন নি তার কাযা আদায় করার জন্য যখন হুদাইবিয়ার চুক্তির পরের বছর মক্কায় এলেন, তখন খালিদ বিন ওয়ালিল (রা) এর ছোট ভাই ওয়ালিদ বিন ওয়ালিদ (রা), যিনি মুসলমান ছিলেন এবং রাসূল (স) এর সাথে ছিলেন, তার ভাইয়ের সাথে দেখা করতে গেলেন। খালিদ তখন অন্যান্য কাফের সহযোগীদের সাথে মক্কা খালি করে অন্যত্র গিয়েছিলেন, তাই ওয়ালিদ তার ভাইয়ের জন্য একটি চিঠি রেখে এলেন। চিঠিতে লিখলেন, ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। ইসলামের প্রতি আপনার বেদ্বেষের চেয়ে অদ্ভুত আর কিছুকে আমি জানি না। আপনার মতো বুদ্ধিমান কেউ কি ইসলামের মতো কিছুকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে? আল্লাহর রাসূল (স) আপনার কথা জিজ্ঞেস করেছে এবং জানতে চেয়েছে, ‘খালিদ কোথায়?’ আমি বলেছি, ‘আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা তাকে ইসলামে নিয়ে আসবেন।’ তারপর তিনি বললেন, ‘তার মতো কেউ কিভাবে ইসলামকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে? যদি সে তার শক্তি ও বীরত্বকে ইসলামের জব্য ব্যয় করতো তবে তার জন্য ভালো হতো। আমরা তাকে অবশ্যই অন্যদের চেয়ে প্রাধান্য দিতাম।’ কী ভালো জিনিস হারাচ্ছেন তার লক্ষ্য রাখবেন ভাই।’

খালিদ (রা) বলেন, ‘আল্লাহর রাসূল (স) আমার সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন চেয়েছেন -এই কথা আমাকে খুব প্রভাবিত করল এবং তার কাছে যেতে বাধ্য করল।’ অন্যের জন্য সত্যিকারের উদ্বেগ হলো তার আখিরাতে জন্য উদ্বিগ্ন বোধ করা। এটাই দাওয়াহর তাৎপর্য।

খালিদ (রা) একদিন স্বপ্নে নিজেকে সংকীর্ণ একটি স্থানে দেখতে পেলেন যেখান থেকে তিনি হেঁটে বের হয়ে একটি বিস্তীর্ণ এবং খুবই চমৎকার একটি স্থানের দিকে যেতে দেখলেন। পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণের পর তিনি হযরত আবু বকর (রা) কে স্বপ্নের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, এর অর্থ হলো তিনি শির্ক ত্যাগ করে ইসলামে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন।

খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) তার কতিপয় বন্ধুর সাথে মুসলমান হবার ব্যাপারে পরামর্শ করার জন্য সাক্ষাৎ করলেন। তিনি সাফওয়ান বিন উমাইয়ার গিয়ে তার মনের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। সাফওয়ান বললেন, ‘আমি ছাড়া বাকী সকলেই ইসলাম গ্রহণ করলেও আমি করবো না।’ তারপর তিনি ইকরিমা বিন আবু জেহেল এর কাছে গেলেন এবং বললেন, ‘মুহাম্মদ (স) এর সাথে আমাদের অবস্থা এখন গর্তের শিয়ালের মতো। গর্তে এক বালতি পানি ঢেলে দিলে এটি দোউড়ে বেরিয়ে আসবে।’ ইকরিমা ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে খালিদ তাকে তার কথা কাউকে না জানানোর জন্য বললেন। তারপর তিনি গেলেন উসমান বিন তালহা (রা) এর নিকট যিনি উহুদের যুদ্ধে তার পরিবারের সাতজন সদস্যকে হারিয়েছেন। প্রথমে খালিদ তার সাথে কথা বলতে ইতঃস্তত করছিলেন কারণ তিনি ভেবেছিলেন উসমান অবশ্যই এর বিরোধিতা করবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি কথা বলার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাকে বিস্মিত করে দিয়ে উসমান তার সাথে তখনই যাওয়ার ব্যাপারে একমত হলেন। দাওয়াহর ব্যাপারে তাই আমাদের অবশ্যই পূর্ব থেকে ধারণা করা উচিত নয়। যে চায় আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা তাকে পথ প্রদর্শন করেন। খালিদ (রা), আমর (রা( এবং উসমান (রা) মদীনার প্রান্তে পৌঁছে রাসূল (স) এর সাথে সাক্ষাতের জন্য উত্তম পোষাক পরলেন। ইসলাম গ্রহণের পর আল্লাহর রাসূল (স) বললেন, সকল প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালার যিনি তোমাদেরকে ইসলামের দিকে পরিচালিত করেছেন। তোমরা বুদ্ধিমান বলে আমি আশা করেছিলাম যে তোমাদের বুদ্ধিমত্তা তোমাদেরকে কেবলমাত্র কল্যাণের দিকেই পরিচালিত করবে।’

আল্লাহর রাসূল (স) লোকদের ক্ষমতা বুঝতে পারতেন এবং তাদেরকে সে অনুযায়ী দায়িত্ব অর্পণ করতেন। এ কারণে তিনি খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) এবং আমর ইবনুল আ’স (রা) কে অন্যদের উপর কর্তৃত্ব প্রদান করলেন। আল্লাহর রাসূল (স) খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা)কে তার চেয়ে সিনিয়র সাহাবীদের উপরে সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ ঘোষনা করলেন এবং সাইফুল্লাহ বা আল্লাহর তরবারী উপাধি দিলেন। খালিদ (রা) তার তেজস্বীতা এবং আল্লাহর রাসূল (স) এর সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণ করেন। অনেক বছর বাদে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) যখন মৃত্যুশয্যায় তখন তার এক বন্ধু তার সাথে সাক্ষাৎ করতে এলেন। খালিদ (রা) কে খুব বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। তিনি বন্ধুকে বললেন, ‘আমার শরীরের মাথার তালু থেকে পায়ের তলা পর্যন্ত এমন কোন জায়গা নেই যেখানে কোন তীর, বর্শা কিংবা তরবারীর আঘাত নেই। এর সবগুলোই আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করতে গিয়ে পেয়েছি। তা সত্ত্বেও আমাকে আমার বিছানায় উটের ন্যায় মৃত্যুবরণ করতে হচ্ছে যুদ্ধের ময়দানে শাহাদাত নয়।’

তার বন্ধু তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, নিজেকে যন্ত্রণা দিও না। আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা তোমাকে তোমার প্রচেষ্টার জন্য পুরষ্কার দিবেন। তোমার ভাগ্য তখনই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল যখন আল্লাগর রাসূল (স) তোমাকে সাইফুল্লাহ উপাধি দিয়েছিলেন। আল্লাহর তরবারী কি করে যুদ্ধের ময়দানে খসে পড়বে?’

শিক্ষা
এটা সুস্পষ্ট যে নেতার ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের তুলনায় আন্দোলনের উদ্দেশ্য অগ্রগামী হতে হবে। প্রিয় চাচার মৃত্যুতে শোকাহত এবং হত্যাকারীর প্রতি ক্রুদ্ধ হলেও রাসূল (স) চেয়েছেন ওয়াসি যেন সঠিক পথে ফিরে আসে এবং এবং ইসলাম গ্রহণ করে। এ কারণে নেতার উচিত তার ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ যেন দ্বীন বা মানবতার সাধারণ উদ্দেশ্যকে ক্ষতি না করে সে দিকে লক্ষ্য রাখা। এমনকি যদি কোন ব্যক্তি বা বস্তুর প্রতি আমাদের তীব্র ভালোবাসা থাকে তাহলেও তা এমন হওয়া উচিত না যে এর কারণে বৃহত্তর কল্যাণ কোথায় তা বুঝতে পারছি না। এ ধরণের পরিস্থিতি অনেক সময়ই নতুন দরজা খুলে দেয়। এ ধরণের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলে মানুষের হৃদয়ের দরজা খুলে যায় এবং নিজের স্বার্থকে পাশে রেখে উদ্দেশ্যের কল্যাণ লাভের প্রচেষ্টাকে জনগণ ভালোভাবে গ্রহণ করে। এ ধরনের পরীক্ষা যেন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, ‘তোমার উদ্দেশ্যের বিজয় তুমি সত্যিকারে কতটুকু চাও?’ আমাদের কর্মই এর উত্তর দিবে।

এটি করার চেয়ে বলা সহজ কিন্তু এটিই সম্ভবত উদ্দেশ্যের প্রতি নেতার অঙ্গীকারের সবচেয়ে শক্তিশালী ও পরিষ্কার নির্দেশক। উদ্দেশ্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া এবং ব্যক্তিগত আবেগ এবং উদ্দেশ্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা নেতার কর্তব্য। নেতার নিজস্ব অঙ্গীকার সকল বাধাকে ছাপিয়ে যায় এবং সকল হতাশা ও বিপত্তি সত্ত্বেও উদ্দেধ্যের জন্য কাজ করে যেতে সক্ষম করে তোলে। উদ্দেশ্যের প্রয়োজনে এই আবেগকে কখনও কখনও আত্মত্যাগ করতে হয়। এটি বিশাল আত্মত্যাগ এবং হাদীসে আছে, রাসূল (স) বলেছেন, ‘সকল নবীই নিজের লোকদের দ্বারা নির্যাতিত ও বাধার সম্মুখীন হয়েছেন এবং আমি সর্বাপেক্ষা বেশী নির্যাতিত।’ তিনি তার চুক্তি এবং ঐশ্বরিক বার্তা বহনের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন এবং এর পুরস্কারসরূপ তার চরম শত্রুকেও তার আন্দোলনের সাথে যুক্ত করতে পেরেছিলেন।

ব্যক্তি-পরিচালনা থেকে প্রক্রিয়া-পরিচালনায় স্থানান্তর

একজন নেতা যিনি তার নেতৃত্বের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব দেখতে আগ্রহী, যিনি চান যে তার বার্তাগুলো তার মৃত্যুর পরেও ছড়িয়ে যেতে থাকবে তাকে অবশ্যই ব্যক্তি-কেন্দ্রিক নেতৃত্ব থেকে সরে গিয়ে প্রক্রিয়া-কেন্দ্রিক নেতৃত্বে আসতে হবে৷ সুতরাং, একটি আন্দোলনের বৈশ্বিক প্রকৃতি অর্জন এবং এর প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর পরেও টিকে থাকা ও বৃদ্ধি পাওয়ার শর্তগুলো কি কি? আমার দৃষ্টিতে তিনটি শর্ত পূরণ করলে আন্দোলনটি বৈশ্বিক রূপ লাভ করতে সক্ষম হবে।

মূল ভাবাদর্শ

যে কোন বৈশ্বিক আন্দোলনের প্রথম শর্ত হলো এর একটি মূল ভাবাদর্শ থাকবে যেটি সহজ, স্পষ্ট কিন্তু শক্তিশালী কনসেপ্ট, সাধারণ মানুষ ও বিশ্বাসীদেরকে আকৃষ্ট করবে এবং অপরকে শিক্ষা দেয়া ও অনুসরণ করা সহজ হবে। নেতারা হবেন আদর্শিক, তারা আদর্শ শিক্ষা দিবেন, সময়ে সময়ে সংশোধন করবেন, ব্যাখ্যা করবেন, প্রচার করবেন এবং সর্বোপরি সততা বজায় রাখবেন। এর মধ্যে স্কুল-কলেজ, লেখক, শিক্ষক, গবেষক-পন্ডিতরাও অন্তর্ভূক্ত যারা এই আদর্শ পড়াশোনা করবেন এবং এর আজীবন প্রবক্তা হবেন।

মানুষ যখন একজন নেতাকে অনুসরণ করতে শুরু করে তখন তারা বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে আসে ফলে নেতাকে দ্রুত এমন কিছু তৈরি করতে হয় যা তাদের সকলকে নিজেদের গন্ডি ছাপিয়ে একত্রিত করতে সক্ষম হয়। এ ব্যতীত সকল মানুষকে একজন মানুষে পতিণত করতে পারে এমন কিছু নেই।

আল্লাহর রাসূল (স) যখন ইসলামের প্রচার শুরু করলেন, তখন আরবের লোকেরা বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত, নিজের গোত্রের পরিচয়ে পরিচিত। নিজেদের গোত্রের প্রতি আনুগত্য তাদের অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য বিষয় ছিল। এ কারণে কিছু গোত্র ইসলাম গ্রহণ না করা সত্ত্বেও আল্লাহর রাসূল (স) কে সমর্থন করেছিল। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, ঠিক একই কারণে তার নিজের গোত্র কুরাইশের লোকেরা প্রকাশ্যে তার বিরোধিতা করেছিল। গোত্রীয় আনুগত্যের কারণেই আরবে প্রাক-ইসলাম যুগে আরবরা তাদের বিবাদকে সমগ্র গোত্রের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য বিখ্যাত ছিল। এমনকি খুব ক্ষুদ্র বিষয়েও বিবাদ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলতো, পিতা থেকে পুত্রের মাঝে এই বিবাদ স্থানান্তরিত হতো।

মদীনায় এই পরস্পরবিধ্বংসী যুদ্ধ এতটা প্রকট আকার ধারণ করেছিল যে আল্লাহর রাসূল (স) খন হিজরত করেছেন ততদিনে আরবের দুটি প্রধান গোত্র আওস এবং খাজরাজ এর প্রধান নেতৃবৃন্দ সংঘর্ষে নিহত হয়েছিল। আল্লাহর রাদূল (স) এর জন্য প্রধান কাজ ছিল এই সকল বিশৃঙখল উপজাতিদেরকে এক ছায়াতার নিচে নিয়ে আসা এবং তাদেরকে একটি সাধারণ পরিচয় দান করা যা তাদেরকে একত্রে বেঁধে রাখতে সাহায্য করবে। এটা এমন এক বিষয় যা সে সময় অজানা ছিল এবং অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বর্তমানে আবারও সেই পুরানো ঘটনাই ঘটে চলছে।

ধর্মীয় বিশ্বাস ভিত্তিক ভাতৃত্ব

মজার ব্যাপার হলো ইসলামিক ক্যালেন্ডার আল্লাহর রাসূল (স) এর জন্ম বা মৃত্যু থেকে শুরু হয়নি বরং আল্লাহর রাদূল (স) যখন ধর্মীয় বিশ্বাস বা ঈমানের ভিত্তিতে ভাতৃত্ববোধ তৈরি তথা মুসলিম উম্মাহ গঠন ও ইসলামী রাষ্ট্র তৈরীর লক্ষ্যে মদীনার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেন তখন থেকে শুরু হয়। কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি আচরণকে প্রভাবিত করে।

নির্দিষ্ট কাঠামো ব্যতীত আচরণ ব্যক্তির ইচ্ছার উপর নির্ভর করে যা যে কোন সময় পাল্টে যেতে পারে এবং এক প্রজন্মের পরিশ্রম মুহুর্তে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। যদি শক্তিশালী কাঠামো তৈরী করা যায় যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে পরিবেশন করবে তাহলে মূল ভাবাদর্শ যা মানুষকে নতুন জীবন দিয়েছে, তা সদা স্পন্দনশীল ও সামর্থ্যবান থাকবে বলে নিশ্চিত হয়া যায়। আগেই বলেছি, আল্লাহর রাসূল (স) এর কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বংশপরম্পরায় শত্রু এমন লোকদেরকে একত্রিত করা। কেবলমাত্র একটি প্লাটফর্মে একত্রিত করা শুধু নয়, তাদেরকে একে অপরের ভাই বানিয়ে দেয়া এবং এমনভাবে পরস্পরকে ভালোবাসতে শেখানো যে তার একসময়ের শত্রুর নিরাপত্তার জন্যও যেন নিজের জীবনকে ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকে। এটি এমন একটি চ্যালেঞ্জ ছিল যা আল্লাহর রাসূল (স) ছাড়া আর কেউ কখনও চেষ্টাই করেনি, আর এটি আল্লাহর রাসূল (স) এর নবীত্বের আরেকটি প্রমাণ। এটি ছিল এমন একটি চ্যালেঞ্জ যা আল্লাহর রাসূল (স) এর সাহায্য ছাড়া অর্জন করা কখনই সম্ভব হতো না।

একজন ব্যক্তি যে কিনা জাতি-গোত্র-বংশের গন্ডিতে চিন্তা করতে অভ্যস্ত এবং এর ভিত্তিতেই একে অপরের সাথে বৈষম্য রচনা করতো, কোন সে ধাতু সকল গোত্রীয় ও জাতিগত বিবেদ সত্ত্বেও তাদেরকে একত্রে বাঁধতে সক্ষম হলো? এখানেই মূল ভাবাদর্শ – ইসলাম – এর ভূমিকা যা তাদেরকে এক সূত্রে বাঁধার ভূমিকা পালন করেছে। একজন মানুষ অন্যের ভাই হয়ে গেলো, গোত্র বা জাতের কারণে নয় বরং এমন কিছু যা তারা হৃদয়ে ধারণ করে – এই বিশ্বাস যে মহান আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা ব্যতীত আর কেউ উপাসনার যোগ্য নয় এবং মুহাম্মদ (স) তার প্রেরিত সর্বশেষ রাসূল। এটা এমন বিশ্বাস যা কেবল আরব গোত্রীয়দের সাথে আরব গোত্রীয়দেরকে এক করেনি, আরবদের সাথে অনারব, সারা বিশ্বের সাদা-কালো-লাল-হলুদ মানুষদের একত্রিত করেছে। এসব কিছু আজকের এই দিনে অদ্ভুত মনে হতে পারে কারণ আমরা এসব কিছু হারিয়ে ফেলেছি এবং ইসলাম-পূর্ব যুগের অজ্ঞানতার অন্ধকার, বৈষম্য আর সাম্প্রদায়িক চিন্তা ভাবনার যুগে ফিরে গিয়েছি অথচ আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা রাসূল (স) এর অলৌকিক এ কর্মকান্ডের সাক্ষ্য দিয়েছেন।

আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা ধর্মের ভিত্তিতে পরিচিতি তৈরী সম্পর্কে আয়াত নাযিল করলেন:

তারা সকলেই তোমাদের ধর্মের; একই ধর্মে তো বিশ্বাসী সবাই এবং আমিই তোমাদের পালনকর্তা, অতএব আমার বন্দেগী কর। (সূরা আম্বিয়া ২১:৯২)

আপনাদের এই উম্মত সব তো একই ধর্মের অনুসারী এবং আমি আপনাদের পালনকর্তা; অতএব আমাকে ভয় করুন। (সূরা মু’মিনুন ২৩:৫২)

আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা লোকদেরকে তাদের অতীতকে স্মরণ করিয়ে দিলেন। ইসলাম পূর্ব রীতিনীতির কারণে তারা নিজেদের উপর যে যন্ত্রণা এবং অনিশয়তা চাপিয়ে নিয়েছিল তা নিয়ে তারা নিজেরাও অসুখী ছিল। ইসলাম এসে তাদের অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতার দাসত্ব থেকে মুক্তি দান করে। তিনি বলেন:

আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ কর; পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আল্লাহ তোমাদিগকে দান করেছেন। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে, এখন তোমরা তাঁর অনুগ্রহের কারণে পরস্পর ভাই ভাই হয়েছ। তোমরা এক অগ্নিকুন্ডের পাড়ে অবস্থান করছিলে। অতঃপর তা থেকে তিনি তোমাদেরকে মুক্তি দিয়েছেন। এভাবেই আল্লাহ নিজের নিদর্শনসমুহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা হেদায়েত প্রাপ্ত হতে পার। (সূরা আল ইমরান ৩:১০৩)

আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা আরও বলেন:

আর প্রীতি সঞ্চার করেছেন তাদের অন্তরে। যদি তুমি সেসব কিছু ব্যয় করে ফেলতে, যা কিছু যমীনের বুকে রয়েছে, তাদের মনে প্রীতি সঞ্চার করতে পারতে না। কিন্তু আল্লাহ তাদের মনে প্রীতি সঞ্চার করেছেন। নিঃসন্দেহে তিনি পরাক্রমশালী, সুকৌশলী। (সূরা আল-আনফাল ৮:৬৩)

আল্লাহর রাসূল (স) যখন মদীনায় একজন মুহাজির (বিদেশী – যিনি ইসলামের খাতিরে মদীনায় হিজরত করেছেন) এর সাথে একজন আনসার (সহযোগী – মদীনার অধিবাসী) এর সম্মিলন ঘটিয়ে দিলেন তখন কি ঘটেছিল তার একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। আনসার সাহাবীগণ আল্লাহর রাসূল (স) এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, ‘দয়া করে খেজুরের বাগান আমাদের ও মুহাজিরদের মাঝে ভাগ করে দিন।’ রাসূল (স) সম্মত হলেন না। তখন তারা বলল, তাহলে মুহাজিরদেরকে আমাদের বাগানে কাজ করার অনুমতি দিন এবং আমরা উৎপাদিত শস্য তাদের সাথে ভাগ করে নিবো।’ আল্লাহর রাসূল (স) সম্মতি দিলেন। কিন্তু আনসারগণ নিজেরা বেশীরভাগ কাজ করতেন এবং ফসল তাদের সাথে ভাগ করে দিতেন। এবার মুহাজিরগণ আল্লাহর রাসূল (স) এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাগর রাসূল (স), আমরা এদের মতো মানুষ কখনও দেখিনি। তারা যখন দরিদ্র তখন তারা আমাদের স্বস্তি দেয় আর যখন তারা সচ্ছল তখন তারা দিলদরিয়া। তারা তাদের নিজেদের খামারে কাজ করে, তাসত্ত্বেও ফসল আমাদের মাঝে ভাগ করে দেয়। আমরা আশঙ্কা করছি তারা নিজেরা আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালার কাছ থেকে সকল পুরষ্কার নিয়ে যাবে এবং আমাদের জন্য কিছুই থাকবে না।’ রাসূল (স) বললেন, না, যতক্ষন পর্যন্ত তোমরা কৃতজ্ঞ থাকবে এবং তাদের জন্য দোয়া করবে, আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা তোমাদেরকেও পুরস্কৃত করবেন।’

হে আল্লাহ! আমাদের আজ কী হলো? এ সকল আক্সরণ আজ কোথায় হারালো? এসব কী আর কখনও ফিরে আসবে? নাকি আমরা যারা আপনাকে ভালোবাসি, আপনার দ্বীনকে ভালোবাসি তাদের ভাগ্যে আপনার সাথে সাক্ষাতের আগ পর্যন্ত কেবল কান্নাকাটিই লিখা রয়েছে?

উম্মাহর নতুন আইন – পুরাতন বন্ধন ছিন্ন করা

মদীনায় অনেক সম্প্রদায় এবং তাদের মধ্যকার নানাবিধ চুক্তির কারণে রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুব জটিল ছিল। আল্লাহর রাসূল (স) ঈমানের ভিত্তিতে নতুন বন্ধনের মাধ্যমে এবং পুরাতন ঐতিহ্যগত বন্ধন ছিন্ন করে একটি নতুন জাতি গঠন করছিলেন। পুরাতন সম্পর্ক ছিন্ন করে ইসলামের ভিত্তিতে নতুন সম্পর্ক গড়ার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা আয়াত নাযিল করেন। তিনি বলেন:

হে ঈমানদারগণ! তোমরা স্বীয় পিতা ও ভাইদের অভিভাবকরূপে গ্রহণ করো না, যদি তারা ঈমান অপেক্ষা কুফরকে ভালবাসে। আর তোমাদের যারা তাদের অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা সীমালংঘনকারী। বল, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান-যাকে তোমরা পছন্দ কর-আল্লাহ, তাঁর রসূল ও তাঁর রাহে জেহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর, আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত, আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হেদায়েত করেন না। (সূরা তওবা ৯:২৩-২৪)

 

মুমিনগণ, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদেরকে বন্ধরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা তো তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও, অথচ তারা যে সত্য তোমাদের কাছে আগমন করেছে, তা অস্বীকার করছে। তারা রসূলকে ও তোমাদেরকে বহিস্কার করে এই অপরাধে যে, তোমরা তোমাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস রাখ। যদি তোমরা আমার সন্তুষ্টিলাভের জন্যে এবং আমার পথে জেহাদ করার জন্যে বের হয়ে থাক, তবে কেন তাদের প্রতি গোপনে বন্ধুত্বের পয়গাম প্রেরণ করছ? তোমরা যা গোপন কর এবং যা প্রকাশ কর, ত আমি খুব জানি। তোমাদের মধ্যে যে এটা করে, সে সরলপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। তোমাদেরকে করতলগত করতে পারলে তারা তোমাদের শত্রু হয়ে যাবে এবং মন্দ উদ্দেশ্যে তোমাদের প্রতি বাহু ও রসনা প্রসারিত করবে এবং চাইবে যে, কোনরূপে তোমরা ও কাফের হয়ে যাও। তোমাদের স্বজন-পরিজন ও সন্তান-সন্ততি কিয়ামতের দিন কোন উপকারে আসবে না। তিনি তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করবেন। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা দেখেন। (সূরা মুমতাহিনা ৬০:১-৩)

আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা মুসলমানদেরকে তাদের পুরানো গোত্রীয় পারস্পরিক সম্পর্ক ছিন্ন করে ঈমানের ভিত্তিতে নতুন সম্পর্ক গড়ার নির্দেশ দিলেন। ঈমান এবং ভাতৃত্ব গঠনে সাহচর্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা এই দিকটিই স্পষ্ট করে দিলেন। এটি অত্যন্ত জরুরী ছিল কারণ আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে তাদের গোত্রীয় বন্ধন ছিল অনেক বছরের পুরানো এবং তা পরিচালিত হতো ঐতিহাসিক প্রথা অনুযায়ী। ঈমানের ভিত্তিতে গড়া এই নতুন সম্পর্ক নিয়ে আরবদের কোন অভিজ্ঞতা ছিল না, অথচ পুরাতন সকল কুসংস্কার ত্যাগ করে যে যাই করে থাকুক না কেন ঈমানের ভিত্তিতে সকলকে ভাই হিসেবে গ্রহণ করতে হয়েছিল। রি বন্ধন তাদের জন্য ঈমানের তীব্র পরীক্ষা ছিল কারণ এটিই ইসলাম আর এর মাধ্যমে কুরআন ও আল্লাহর রাসূল (স) এর নবীত্বে তাদের বিশ্বাসের পরীক্ষা করা হচ্ছিল। বিশ্বাসের সত্যিকারের পরীক্ষা কাজের মাধ্যমেই হয় এবং সাহাবীরা এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বলে প্রমাণিত হন।

বন্ধুত্বের নতুন পদ্ধতি

পুরাতন বন্ধন ছিন্ন করে এবার আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা পরস্পরের সম্পর্ক স্থাপনের নতুন উপায় বাতলে দিলেন। আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা জানিয়ে দিলেন মুসলমানদের সত্যিকারের বন্ধু কারা এবং কিসের ভিত্তিতে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে হবে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ বন্ধু মানুষকে পথ প্রদর্শন করে আবার পথভ্রষ্টও করে। আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা মুমিনদের পরিচয় এবং গুণাবলী সম্পর্কে বর্ণনা করলেন যেন তাদেরকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। কোথা থেকে সাহায্য ও নির্দেশনা গ্রহণ করতে হবে আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা তার উৎস দেখিয়ে দিলেন। মুসলমানদের আগে যারা কিতাব পেয়েছিল তাদের ভুলগুলো আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা দেখিয়ে দিলেন, তাদের কর্মকান্ড বর্ণনা করলেন এবং মুসলমানদেরকে সতর্ক করে দিলেন এ সকল ভুলের যেন পুনরাবৃত্তি না হয়। তিনি নিশ্চয়তা দিলেন যদি তারা সত্যবাদী হয় এবং তাদের ধর্মের প্রতি অনুগত থাকে তাহলে তারা দুনিয়া ও আখিরাতে বিজয়ী হবে।

তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ তাঁর রসূল এবং মুমিনবৃন্দ-যারা নামায কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং বিনম্র। আর যারা আল্লাহ তাঁর রসূল এবং বিশ্বাসীদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারাই আল্লাহর দল এবং তারাই বিজয়ী। হে মুমিনগণ, আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে যারা তোমাদের ধর্মকে উপহাস ও খেলা মনে করে, তাদেরকে এবং অন্যান্য কাফেরকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করো না। আল্লাহকে ভয় কর, যদি তোমরা ঈমানদার হও। আর যখন তোমরা নামাযের জন্যে আহবান কর, তখন তারা একে উপহাস ও খেলা বলে মনে করে। কারণ, তারা নিবোর্ধ। (সূরা আল মায়েদা ৫:৫৫-৫৮)

কুরআনের এই সকল আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর রাদীল (স) সুস্পষ্টভাবে ভালো এবং মন্দ, ভুল এবং শুদ্ধের মধ্যে পার্থক্য উপস্থাপন করতে সক্ষম হলেন এবং যারা তাকে অনুসরণ করেছে তাদেরকে জাতিগত এবং গোত্রীয় চিন্তাভাবনা ও মুল্যবোধ থেকে মুক্ত করে নতুন সম্পর্ক স্থাপনের ভিত্তি গড়ে দিলেন। এটা তাদের নতুন পরিচিতি যা তাদেরকে একত্রিত রেখেছিল।

শিক্ষা
একটি বৈশ্বিক আন্দোলন শুরু করার জন্য কি কি প্রয়োজন সেগুলো আগেই বলা হয়েছে, তাই পুনরাবৃত্তি করতে চাই না। গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি উল্লেখ করা প্রয়োজন সেটি হলো শুরুর দিকে নেতার ব্যক্তিত্ব মানুষকে আন্দোলনের দিকে আকৃষ্ট করতে বিশাল ভূমিকা পালন করে। আল্লাহর রাসূল (স) এর ব্যক্তিত্ব, আচরণ, কূটনীতি, দয়া ও মহত্ব মানুষকে তার ও ইসলামের দিকে টেনে এনেছে। এমন একজনও ছিল না যিনি আল্লাহর রাসূল (স) কে পছন্দ করতেন না কিন্তু আধ্যাত্মিক বিবেচনায় ইসলাম গ্রহণ করেছেন। সাহাবীরা আল্লাহর রাসূল (স) কে নিজেদেরসহ অন্য যে কোন কিছুর চেয়ে বেশী ভালোবাসতেন। আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা এর সাক্ষী এবং তিনি বলেন:

নবী মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা অধিক ঘনিষ্ঠ এবং তাঁর স্ত্রীগণ তাদের মাতা। আল্লাহর বিধান অনুযায়ী মুমিন ও মুহাজিরগণের মধ্যে যারা আত্নীয়, তারা পরস্পরে অধিক ঘনিষ্ঠ। তবে তোমরা যদি তোমাদের বন্ধুদের প্রতি দয়া-দাক্ষিণ্য করতে চাও, করতে পার। এটা লওহে-মাহফুযে লিখিত আছে। (সূরা আহযাব ৩৩:০৬)

সুতরাং আনুগত্য পেতে হলে নেতাকে অবশ্যই ভালো লাগা এবং ভালোবাসার মত একজন হতে হবে কারণ শুরুতে এই কারণেই মানুষ কারও আনুগত্য করে। বিশেষ করে যখন অনুসারীরা নেতার সাথে একমত হয় না বা নির্দিষ্ট কোন সিদ্ধান্ত সমর্থন করতে পারে না তখন এটি খুব জরুরী। এর স্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায় হুদাইবিয়ার চুক্তি স্বাক্ষরিত হবার পর যেখানে সাহাবীরা চুক্তির শর্তসমূহ পছন্দ না করলেও আল্লাহর রাসূল (স) কে অনুসরণ করেছে শুধুমাত্র তাকে ভালোবাসার জব্য, তার প্রতি বিশ্বাস থাকার জন্য এবং তাদের ব্যক্তিগত অনুভূতি ও দ্বিধাকে তারা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিল।

সিদ্ধান্ত গ্রহণে কঠোরতা অবলম্বন না করা

উহুদ যুদ্ধের সময় যখন কুরাইশরা মদীনা আক্রমণ করতে যাবে তখন মদীনাকে রক্ষা করার জন্য দুটি উপায় ছিল।

একটি ছিল মদীনায় থেকেই যুদ্ধ করা যেন মদীনার নারী শিশুরাও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারে। আল্লাহর রাসূল (স) এবং মুনাফিকদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ভিন্ন ভিন্ন কারণে এই মত পোষন করেছিলেন৷

অন্য আরেকটি মত ছিল মদীনার বাইরে গিয়ে লড়াই করা। যুবকরাসহ বেশিরভাগের এই মতের পক্ষে ছিল। এরা বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারে নি এবং তাদের ধারণা ছিল শত্রু মদীনায় প্রবেশের সাহস করবে না ফলে তারা যদি যুদ্ধে না যায় তাহলে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। তারা বলল, শত্রুকে মফীনায় প্রবেশের সুযোগ দেয়া লজ্জাজনক হবে এবং এ কারণে তারা বাহিরে লড়াই করতে আগ্রহী। তারা আল্লাহর রাসূল (স) কে এমনটি করার জন্য ক্রমাগত চাপ দিচ্ছিল বলে তিনি ঘরের ভিতরে গেলেন যুদ্ধের সাজ নেয়ার জন্য।

রাসূল (স) তার মর্যাদা এবং তার প্রতি সাহাবীদের ভালোবাসা, মুগ্ধতা এবং শ্রদ্ধা থেকে সহজেই তার মতামত চাপিয়ে দিতে পারতেন এবং কিউ তার বিরোধিতাও করতো না। তা সত্ত্বেও তিনি বেশিরভাগের মতামত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিলেন। সেদিন ছিল জুমাবার, রাসূল (স) খুতবায় যুদ্ধের ময়দানে স্থিরপ্রতিজ্ঞ থাকার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিলেন। নামাজের পর কিছু সাহাবী বুঝতে পারলেন যে তারা সম্ভবত নিজেদের মতামতের উপর বেশী জোর দিয়েছে এবং আল্লাহর রাসূল (স) এর উন্নততর দৃষ্টিভঙ্গি ও বিবেচনাবোধের বিরিদ্ধে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। আনসারদের দুজন প্রভাবশালো নেতা সাদ ইবনে মুয়াজ ও উসায়েদ বিন হুদাইর (রা) সবার পক্ষ থেকে এই বার্তা নিয়ে গেলেন যে তারা তার উপর চাপ প্রয়োগের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী এবং তিনি যেমনটি চান তা করতে আগ্রহী। আল্লাহর রাসূল (স) নিজের ব্যক্তিগত কক্ষে ছিলেন। হামজা (রা) তার কাছে এই বার্তা নিয়ে গেলেন। আল্লাহর রাসূল (স) বের হয়ে এলেন এবং বললেন, ‘একজন নবীর পক্ষে বর্ম পরিধান করা এবং খুলে ফেলা শোভা পায় না যতক্ষন পর্যন্ত না আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা তার এবং শত্রুর মাঝে ফয়সালা করে না দেন।’

অন্যান্য শিক্ষা
১। যিনি কর্তৃত্বের দায়িত্বে আছেন তার নিজের ইচ্ছা অনুসারীদের উপর চাপিয়ে দেয়া অনুচিত। সিদ্ধান্ত গ্রহণে নেতাদের কঠোর হওয়া উচিত নয় এবং তার অধীনস্তদের মতামত, আবেগ-অনুভূতি ইত্যাদি শোনা এবং গ্রহণ করার প্রস্তুতি থাকা উচিত। এ কারণে নয় যে নেতা কি করা উচিত তা জানেন না বরং এ কারণে যে সিদ্ধান্তের সফল বাস্তবায়ন তখনই সম্ভব যখন এর সাথে জড়িত সকলের দৃঢ় অঙ্গীকার থাকে। নেতা যদি তার অনুসারীদের কথা না শুনেন বা তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো গ্রহণ না করেন তাহলে যথেষ্ট সম্ভাবনা থেকে যায় তারা, বিশেষ করে যাদের অঙ্গীকারে ঘাটতি রয়েছে, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মনোযোগী হবে না বা পুরোপুরি উপেক্ষা করবে। অন্যদের মতামত শোনা মানেই যে সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা তা নয়, বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শুধুমাত্র তাদের কথা ধৈর্য্য ধরে ও মন দিয়ে শোনা উচিত যেন তারা নিশ্চিন্ত হয় যে নেতা সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে তাদের ভয়, আকাঙ্ক্ষা, উদ্বেগ ইত্যাদিকে বিবেচনায় নিবেন।

অধীনস্তদের কথা শোনা এবং নিজের সিদ্ধান্ত প্রয়োগ থেকে বিরত থাকার আরেকটি কারণ হলো লোকদের কাছে এমন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকতে পারে যা নেতার গৃহিতব্য সিদ্ধান্তের ফলাফলকে প্রভাবিত করবে। এই তথ্য যদি নেতার কাছে না থাকে কিংবা লোকেরা যদি তিনি শুনবেন না বলে না জানায় অথবা নেতার ব্যক্তিগত পছন্দের তুলনায় বিপরীত বলে নেতাকে জানাতে ভয় পায় তাহলে নেতার সিদ্ধান্ত ভুল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। যারা এই তথ্য জানতো কিন্তু নেতাকে জানায়নি, নেতার সিদ্ধান্তের প্রতি তাদের কমিটমেন্ট কেবল কম থাকবে তাই নয়, ভুল সিদ্ধান্তের কারণে যদি কোন নেতিবাচক প্রভাব পড়ে তবে তা ভবিষ্যতে নেতার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও সন্দেহ তৈরী করবে।

সহযোগিদের সাথে পরামর্শ করা উচিত কারণ পরামর্শের কারণে সিদ্ধান্তে বরকত লাভ হয় এবং সবার মধ্যে আন্তরিকতা বৃদ্ধি পায়। পরামর্শের কারণে নেতা সম্ভাব্য দ্বন্দ্বের প্রাথমিক পর্যায়েই সঙ্কেত পায় যা দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে জটিল আকার ধারণ করে। সর্বোপরি, পরামর্শ একজন নেতাকে তার অনুসারীদের কমিটমেন্ট কতটুকে তা পরিমাপ করতে সহায়তা করে। এ কারণেই আল্লাহর রাসূল (স) ওহী লাভ করলেও আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা তাকেও শুরা বা আলোচনার পরামর্শ দিয়েছেন। এ কারণে ভুল জানা বা ভুল করার বিষয়টি উত্থাপিত হয় নি। শুরা সন্দেহাতীতভাবে নেতাকে উপকৃত করে, তবে এর সবচেয়ে বড় উপকার হলো এর প্রকৃতি যা ঐক্যমত্য তৈরী করতে ভূমিকা পালন করে।

যারা তাদের পালনকর্তার আদেশ মান্য করে, নামায কায়েম করে; পারস্পরিক পরামর্শক্রমে কাজ করে এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে (সূরা আশশুরা ৪২:৩৮)

২। একবার সিদ্ধান্ত হয়ে গেলে যতটুকু সম্ভব এটি পালন করা উচিত এবং যারা এই সিদ্ধান্তের পক্ষে ছিল না তারা সহ সকলকে শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য প্রচেষ্টা চালানো উচিত। এটাই টিমওয়ার্কের সারমর্ম। দলের সদস্যরা যখন একবার তাদের মতামত প্রকাশ করে ফেলে তারপর তাদের কর্তব্য হলো নেতার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তাদের মনমতো না হলেও এর বাস্তবায়নের জন্য দৃঢ়ভাবে পাশে থাকা। এটা আন্দোলনের প্রতি কমিটমেন্ট প্রকাশ করে এবং আন্দোলনের উদ্দেশ্যের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকা আনুগত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ। ভর্তমান সময়ে আমরা নেতৃত্বের অভাব সম্পর্কে কথা বলছি কিন্তু আমরা আনুগত্যের গুরুত্ব ভুলে যাই। রাসূলুল্লাহ (স) এর সিরাত এবং সাহাবীদের থেকে অসংখ্য ঘটনার উদাহরণ দেয়া যাবে যেখানে নেতার সিদ্ধান্তের সাথে মতানৈক্য হয়েছে এবকং তারা তা প্রকাশ করেছে, তা সত্ত্বেও নেতার পাশে দৃঢ়ভাবে অবস্থান করে নেতার প্রতি তাদের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। এমনকি এজন্য যদি নিজেদের জীবন ত্যাগের সম্ভাবনাও থাকে। হুদাইবিয়ার ঘটনা, জায়েদ বিন হারিসার সৈন্যবাহিনীকে মুয়াতার উদ্দেশ্যে প্রেরণের ঘটনা, মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সবই এই অনুগামিত্বের উদাহরণ এবং আল্লাহর রাসূল (স) ও তার খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) এর সাফক্যের গোপন সূত্র এটিই। সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর দ্বিধাদ্বন্দে ভোগা কখনই কাম্য নয়। সংকটপূর্ণ সময়ে একাধিক মতের দোলাচলে থাকা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

৩। নেতার সংস্পর্শে যেই আসুক না কেন তাকে গুরুত্ব দিতে হবে। নেতার আবশ্যকীয় গুণাবলীসমূহের মধ্যে একটি হলো তার অনুসারীদের এবং অধীনস্তদের আস্বস্ত করা যে তারা নেতার কাছে অবহেলিত নয় বা তাদেরকে ত্যাগ করা হয়নি। আল্লাহর রাসূল (স) এর অসাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে একটি ছিল যে তিনি সাহাবীদের সাথে এমনভাবে আচরণ করতেন যে প্রত্যেক সাহাবীই মনে করতেন তিনিই তার সবচেয়ে কাছের মানুষ। যে ব্যক্তিই রাসূল (স) এর সাথে কথা বলতো, তিনি সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে ও তার দিকে ফিরে পূর্ণ মনযোগ দিয়ে শুনতেন। এমনকি জনগণের উদ্দেশ্যে ভাষন দেয়ার সময়েও তিনি এভাবে কথা বলতেন এবং লোকেদের দিকে সরাসরি তাকাতেন যেনো তারা মনে করে তার উদ্দেশ্যেই তিনি কথা বলছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা) একদিন রাসূল (স) কে প্রশ্ন করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (স), লোকদের মধ্যে আপনার সবচেয়ে নিকটবর্তী কে?’

আল্লাহর রাসূল (স) উত্তর দিলেন, ‘আয়েশা।’ আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা) জানতে চাইলেন, ‘আর পুরুষদের মধ্যে?’ রাসূল (স) বললেন, ‘তার পিতা।’ এই উত্তর শুধু এ কারণে নয় যে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা) তার সবচেয়ে নিকটবর্তী সহযোগী ও বন্ধু ছিলেন বরং এর একটি ধর্মীয় দিকও রয়েছে যেটি হলো আল্লাহর রাসূল (স) এর পর খলিফা হিসেবে আবু বকর (রা) অনুসরনীয়। রাসূল (স) এর এই উত্তর সত্ত্বেও প্রকৃতপক্ষে সকল সাহাবীই আল্লাহর রাসূল (স) এর কাছ থেকে গ্রহণযোগ্যতা এবং পূর্ণ মনযোগ পাওয়ার কারণে মনে করতেন যে তিনিই তার সবচেয়ে নিকটবর্তী। তাকে সবকিছুর উর্ধ্বে ভালোবাসা এবং তার জন্য যে কোন কিছু ত্যাগ করার ইচ্ছার পেছনে এটি অন্যতম কারণ।

কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ

বৈশ্বিক আন্দোলনের দ্বিতীয় নিয়ামক হলো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ যা এর আদর্শ প্রচার ও পালনের জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত তৈরী করবে। তিনটি পৃথক ভাগের সমন্বয়ে এটি তৈরী হবে।

আইন-বিধি: অনুমোদিত এবং অননুমোদিত কাজ এবং এর সাথে যুক্ত পুরস্কার ও শাস্তি বর্ণনা সম্বলিত আইন। এই আইন আবশ্যিকভাবে জীবনের সকল দিক আবৃত করবে এবং এতে অবশ্যই এমন নমনীয়তা থাকতে হবে যা এই আদর্শ তৈরীর সময় ছিল না এমন উদ্ভুত পরিস্থিতিতেও সমাধান দিতে পারবে।

বিচারকবর্গ: যারা আইনের ব্যাখ্যা করবেন এবং বিধি-লংঘন, প্রশ্ন এবং স্পষ্টতা তৈরী সংক্রান্ত কাজ করবেন। বিচারকবর্গকে একই সাথে আইন বিষয়ে পণ্ডিত এবং আধুনিক বিষয়াদি ও মানুষের জীবনে তার প্রভাব সম্পর্কে সম্যক অবগত থাকতে হবে। কেবল তখনই তারা এমনভাবে আইনের ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হবেন যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সময়, মানুষ ইত্যাদি পরিবর্তিত হলেও সেই আইন প্রয়োগযোগ্য থাকবে।

নির্বাহী: বেসামরিক প্রশাসন (সিভিল এডমিনিস্ট্রাশন) নিশ্চিত করবে যে আইন অনুসরণ করা হচ্ছে, যারা এর অনুসরণ করছেন তারা সুবিধা এবং যারা আইনের লংঘন করছেন তারা শাস্তি পাচ্ছেন। নির্বাহীগণ হলেন কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের হাত যারা নিশ্চিত করবে যে ব্যক্তিগত গোঁড়ামি যেন মূল আদর্শকে ক্ষতিগ্রস্থ না করে। নৈরাজ্য এবং স্বৈরতন্ত্রের মধ্যবর্তী পথ নিশ্চিতের জন্য নির্বাহীদের মধ্যে অবশ্যই চূড়ান্ত সততা, প্রজ্ঞা, কূটনীতি এবং দৃঢ়তা থাকতে হবে। নৈরাজ্য এবং স্বৈরতন্ত্র – এই দুটি বিষয় মূল আদর্শের দীর্ঘমেয়াদী কার্যকারিতা নষ্ট করে।

মদীনায় আল্লাহর রাসূল (স) এর বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বহুত্ববাদী ও বহু-ধর্মের একটি স্টেটে ইসলামিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা। হিজরতের সময় মদীনায় দুটি বড় গোত্র ছিল আওস ও খাজরাস। এই দুই গোত্রেই মুসলমান এবং মুশরিক সদস্য ছিল। এছাড়া আল্লাহর রাসূল (স) এর সাথে যোগ দেয়ার উদ্দেশ্যে মক্কা ও অন্যান্য জায়গা থেকে আগত মুহাজির ও মুসলমানরা ছিল। তিনটি বড় ইহুদী গোত্র ছিল – বনু নাজির, বনু কুরাইজা ও বনু কায়নুকা। এছাড়াও ছিল বিবিধ গোত্রের লোকজন যেখানে মুসলমান এবং মুশরিক উভয়েই অন্তর্ভূক্ত ছিল। এ কারণে এমন আইন প্রণয়নের দরকার ছিল যা সকলের অধিকারকে বিবেচনায় রাখবে এবং সকলের প্রতি ন্যয়বিচার নিশ্চিত করবে। রাসূল (স) সম্ভবত তৎকালীন সময়ে রাষ্ট্রের প্রথম সংবিধান তৈরী করেছিলেন।

চুক্তি

রাসূল (স) মুহাজির এবং মদীনার অধিবাসীদের মধ্যে একটি চুক্তি করে দিলেন। এর মধ্যে মুসলমনাগণ এবং মদীনায় বসবাসরত ইহুদীগণও ছিল। দুই পক্ষই এই চুক্তিতে আবদ্ধ ছিল এবং এই চুক্তি লংঘন করার দরুণ শেষ পর্যন্ত ইহুদীরা মদীনা থেকে বিতাড়িত হয়। এই চুক্তিকে রাসূল (স) এর প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক রাষ্ট্রের সংবিধান বলা যায় এবং পৃথিবীর ইতিহাসে এ ধরণের দলিল এটিই প্রথম যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাস যাই হোক না কেন সকল মানুষকে সমান অধিকার দেয়া হয়েছিল। যত কিছুই বলা হোক না কেন, নিজের প্রতিষ্ঠিত একটি ধর্মের নেতার জন্য এরকম একটি দলিলের লেখক হওয়া বিস্ময়কর। এটা সত্যি যে ইসলাম কোন নতুন ধর্ম ছিল না কারণ এটি সময়ের শুরু থেকে সকল নবীরই ধর্ম ছিল কিন্তু তৎকালীন লোকদের কাছে এটি নতুনই ছিল এবং মুহাম্মদ (স) ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা। আর তিনিই কিনা সকলের জন্য সমান অধিকার প্রস্তাব করছেন হোক তারা তার ধর্মের অনুসারী বা নয়।

ইবনে ইসহাক: মুহাজির এবং আনসারদের মধ্যে চুক্তি।

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)। এই চুক্তি নিরক্ষর নবী মুহাম্মদ (স) এর পক্ষ থেকে, কুরাইশ ও ইয়াসরিবের বিশ্বাসী ও মুসলমান ও তাদের অনুসারীগণ, মিত্র ও সমর্থকদের মধ্যে, সকল কিছুর ঊর্ধ্বে একটি একক রাষ্ট্র প্রতিষ্টজার জন্য।

কুরাইশের অভিবাসীগণ তাদের বর্তমান প্রথা মেনে চলবে এবং নিজেদের মধ্যে রক্তপণ চুক্তি সম্মান করবে এবং তাদের দুর্বলতর সদস্যদেরকে দয়া ও ন্যায়বিচার করবে। বনু আওফ তাদের বর্তমান প্রথা চালু রাখবে ও তাদের পূর্বেকার রক্তপণ চুক্তি সম্মান করবে এবং সকল বিশ্বাসীদের মধ্যে তাদের দুর্বলতর সদস্যদেরকে দয়া ও ন্যায়বিচার প্রদর্শন করবে। (এরপর তিনি তাদের আনসার ও অন্যান্য সকল পরিবারের কথা উল্লেখ করেন।)

বিশ্বাসীগণ তাদের নিজেদের কাউকে দয়া না দেখিয়ে বা তার দেনা মুক্তিপণ বা রক্তপণ পরিশোধ না করে ত্যাগ করবে না।

কোন বিশ্বাসী অন্য বিশ্বাসীর সাথে তার মুনিবের অনুমতি ব্যতীত চুক্তিবদ্ধ হবে। ধর্মনিষ্ঠ বিশ্বাসীগণ তাদের নিজেদের কেউ যদি অনিষ্টের চর্চা করে বা ক্ষতি, পাপ, আগ্রাসন বা দূর্ণীতি করতে চায় তবে তা প্রতিহত করবে। এমন ব্যক্তিদের কেউ নিজের ছেলে হলেও বিশ্বাসীগণ একত্রিত হয়ে প্রতিহত করবে।

কোন বিশ্বাসী কোন অবিশ্বাসীর জন্য অন্য বিশ্বাসীকে হত্যা করবে না বা কোন অবিশ্বাসীকে কোন বিশ্বাসীর বিরুদ্ধে সহায়তা করবে না। আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালার নিরাপত্তা একক, এর সামান্যটুকুও আরেকজনের নিরাপত্তার জন্য দেয়া যেতে পারে। বিশ্বাসীগণ একে অপরের মিত্র, অন্য সকল মানুষের পরিবর্তে।

ইহুদীদের মধ্যে যারা আমাদের অনুগামী হবে তারা সাহায্য ও সমতা পাবে। তাদের প্রতি জুলুম করা হবে না, তাদের বিরুদ্ধে অন্যদেরকে সাহায্যও করা হবে না। আল্লাহর পথের যুদ্ধে এক বিশ্বাসী অন্য বিশ্বাসীদের ছাড়া সন্ধিতে আবদ্ধ হবে না। তাদের মধ্যে অবশ্যই সমতা ও ন্যায়বিচার বজায় থাকবে। যে কোন অভিযানে সওয়ারীগণ একে অপরের স্থলবর্তী হবে। আল্লাগর রাস্তায় প্রবাহিত রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণে পরস্পরকে সাহায্য করবে।নিষ্ঠাবান বিশ্বাসীগণ শুদ্ধতম ও সুন্দরতম আচরনে প্রতিষ্ঠিত।

কোন মুশরিককে কুরাইশদের ব্যক্তি বা সম্পত্তিকে সুরক্ষা প্রদান করা যাবে না, না কোন বিশ্বাসীর বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা যাবে। যার সম্পর্কে নিরাপরাধ বিশ্বাসীকে জেনেবুঝে হত্যা করা প্রমাণিত হয়, তাকে ঐ কারনে হত্যা করা হবে, যদি না নিহতের স্বজনরা সন্তুষ্ট হয়। বিশ্বাসীরা একত্রিত হয়ে তার বিরুদ্ধে পরক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং এমনটি না করার কোন কারণ গ্রহণ করা হবে না। কোন বিশ্বাসী যে এই দলিলে যা আছে গ্রহণ করেছে এবং আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান এনেছে তার জন্য বৈধ নয়, কোন দুষ্কৃতিকারীকে সাহায্য করা বা তাকে আশ্রয় দেয়া। কোন বিশ্বাসী যে এমনটি করবে তার উপর কেয়ামত দিবসে আল্লাহর গযব ও লা’নত পতিত হবে। তার নিকট থেকে না তওবা কবুল করা হবে, না ফিদয়া। যে বিষয়ে তোমাদের মাঝে মতভেদ হয় তবে অবশ্যই আল্লাহর সমীপে এবং মুহাম্মদ (স) এর সমীপে উপস্থাপিত হবে।

ইহুদিরা বহন করবে তাদের নিজেদের ব্যয়ভার ও মুসলিমরা তাদের নিজেদের, যতক্ষণ না তারা যুদ্ধে পরস্পরের মিত্র। বনু আউফের ইহুদিরা মুমিনদের সাথে এক দলভুক্ত- ইহুদিদের জন্য ইহুদিদের ধর্ম, মুসলিমদের জন্য মুসলিমদের ধর্ম। এটি তাদের মুক্তদাস ও নিজেদের জন্য প্রযোজ্য। তবে যে জুলুম করে ও পাপ করে তার জন্য নয়। সে তো কেবল ধ্বংস করে নিজেকে ও নিজের পরিবারকে।

বনু আওফের জন্য যা প্রযোজ্য তা বনু নাজ্জার, বনু হারিস, বনু সা’দা, বনু জুসান, বনু আওস, বনু ছালাবা, জুফনা এবং বনু সুতাইবার জন্যও প্রযোজ্য হবে। ইহুদীদের নিকটতম সহযোগীরাও তাদের একজন হিসেবে গণ্য হবে। মুহাম্মদ (স) এর অনুমতি ব্যতীত তাদের কেউ যুদ্ধে যাবে না। তবে আঘাতের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য সে বাধাপ্রাপ্ত নয়।

যে কেউ অন্যের উপর আক্রমণ করে সে নিজের এবং তার পরিবারকে রক্ষা করতেই করবে এবং কোন অন্যায় আচরণ করবে না। আল্লাহ সুবহানাহুতায়াল এ ধরনের কাজের নিন্দা করেন।  ইহুদীরা তাদের নিজেদের ব্যয় বহন করবে, মুসলমানগণ তাদের। যারা এই চুক্তি গ্রহণ করেছে তাদের সাথে যারা যুদ্ধ করে তাদের বিরুদ্ধে প্রত্যেকে একে অপরকে অবশ্যই সহায়তা করবে। তারা অবশ্যই একে অপরকে সলা-পরামর্শ দিবে, ভালো করবে এবং মন্দ পরিহার করবে। একজন ব্যক্তিকে তার মিত্রের পরিবর্তে দোষী সাব্যস্ত করা হবে না।  যারা ভুল করেছে তাদেরকে সহায়তা করা উচিত।

যারা এই চুক্তিতে সম্মত হয়েছে তাদের জন্য ইয়াসরিব পবিত্র আশ্রয়স্থল (স্যাংচুয়ারী)। একজনের প্রতিবেশীকে কোন ক্ষতি বা অন্যায় না করে নিজের মত একজন হিসেবে ভাবতে হবে।

কোনও সম্পত্তির মালিকের অনুমতি ব্যতীত প্রবেশ করা হবে না। যারা এই চুক্তির সাথে একমত তাদের মধ্যে যে কোনও বিবাদ বা ঘটনার ক্ষেত্রে বিষয়টি অবশ্যই আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা এবং মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ (স) এর কাছে প্রেরণ করা হবে। এই দলিলটিতে যা কিছু খুব ভাল এবং পবিত্র আল্লাহ তা স্বীকার করেছেন।

কুরাইশ এবং তাদের সহায়তাকারীগণ কোন আশ্রয় পাবে না। এই চুক্তিতে সম্মত সবাই ইয়াসরিবের বিরুদ্ধে যে কোন আক্রমণের বিরুদ্ধে একে অপরকে অবশ্যই সহায়তা করবে। যদি তাদেরকে শান্তি স্থাপনে আহবান জানানো হয় আর তারা তা গ্রহণ করে এবং বজায় রাখে, তাহলে তারা শান্তি থাকবে। যদি তারা একই রকম দাবী করে তাহলে সম্মত হওয়া মুসলমানদের উপর নির্ভর করবে যদি না, যুদ্ধটি বিশ্বাস সংক্রান্ত হয়।

প্রত্যেক অংশগ্রহণকারী তাদের ভাগের যুদ্ধে বিজিত সম্পদের মধ্যে থেকে তার জন্য বরাদ্দকৃত অংশ পাবে।

পাপী বা অন্যায়কারী কাউকে এই চুক্তিপত্র নিরাপত্তা প্রদান করবে না। যারা যুদ্ধে যাবে তারা নিরাপদে থাকবে এবং যারা শহরে থাকবে তারা নিরাপদে থাকবে কেবলমাত্র যারা পাপ বা অন্যায় করেছে (তারা নয়)। আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা ভালো এবং ধার্মিকদের নিরাপত্তা দেন।

চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ উপাদানসমূহ:

১। আইন প্রণেতাই নেতা। আল্লাহর রাসূল (স) পারস্পরিক সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে একটি দলিল প্রস্তুত করলেন এবং এর মাধ্যমে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলো এবং তিনি বিচারক হলেন। সকল মতানৈক্য অবশ্যই আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা এবং মুহাম্মদ ((স) এর নিকট উল্লেখ করা হবে। একমাত্র উচ্চারিত নামটি আল্লাহর রাসূল (স) এর। এর মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালার সাথে আল্লাহর রাসূল (স) এর সম্পর্ক পরিষ্কারভাবে সংজ্ঞায়িত হলো। এর মাধ্যমে এই সত্যও প্রতিষ্ঠিত হলো যে রাসূল (স) এর কর্তৃত্ব আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালার পক্ষ থেকে এসেছে এবং আল্লাহর শাসনই এখানে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

২। অন্যদের বাদ দিয়ে মুসলিম উম্মাহ একটি একক গোষ্ঠী। মুসলমানদের স্বতন্ত্র পরিচয় এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

৩। ইহুদীদের সমান অংশিদারিত্ব ছিল, নিজেদের ধর্ম পালন করার অনুমতি ছিল এবং তারা মুসলমানদের দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। তাদেরকে মুসলমানদের সহায়তা ও পরামর্শ দিতে হতো। মুহাম্মদ (স) এর অনুমতি ব্যতীত কেউ মদীনা ত্যাগ করতে পারতো না যেভাবে বর্তমানকালে পাসপোর্ট ছাড়া কেউ দেশ ত্যাগ করতে পারে না।

৪। মদীনাকে আল-হারাম ঘোষনার মাধ্যমে ইয়াসরিবের কেন্দ্রকে একটি পবিত্র আশ্রয়স্থল বানানো হলো যেখানে শিকার, গাছ কাটা বা মারামারি নিষিদ্ধ।

শিক্ষা
নতুন পরিস্থিতিতে নেতার জন্য সকল উদ্যোগ বন্ধ করে নিজের অবস্থান সুসংহত করা গুরুত্বপূর্ণ। সকলের জন্য নিরপেক্ষ আইন প্রনয়ন করা এবং নেতাকে মধ্যস্থতাকারী বানানোর মাধ্যমে কোন গোষ্ঠীর ফোকাস ব্যক্তি কেন্দ্রিক থেকে প্রক্রিয়াকেন্দ্রিকের দিকে স্থানান্তরিত করতে সহায়তা করে ফলে মানুষ ব্যক্তি নয়, সিস্টেমের অনুগামী হয়। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ সব মানুষই একদিন নিঃশেষ হবে কিন্তু সিস্টেম প্রজন্ম প্রজন্মান্তরে বেঁচে থাকে। আর যে নেতা তার বার্তাকে পৌঁছে দিতে চায় তার জন্য এটা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। মুহাম্মদ (স) এর নেতৃত্বের সফলতা কেবলমাত্র সেইসব সৌভাগ্যবান মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়তার কারণে নয় যারা তাদের জীবদ্দশায় তাকে কাছে পেয়েছিল বরং এর মাধ্যে যে বিগত ১৪০০ বছর ধরে শত নির্যাতন সত্ত্বেও তার বার্তা বিশ্বের দরবারে প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছে।

আইন প্রণয়নের আরেকটি উপকারিতা হলো যারা রাসূল (স) এর চেইন অব কমান্ডকে সফল করবে এবং ভবিষ্যত প্রজন্ম, যারা আনুগত্য ধরে রাখা ও আইন অনুসরণ করবে, তাদের জন্য একটি ভিত্তি প্রদান করা। যখন আবু বকর (রা) খলিফা হলেন তখন এর ফলাফল প্রথম স্পষ্টভাবে টের পাওয়া গেল। তিনি তার উদবোধনী বক্তৃতায় বললেন, ‘হে লোকসকল, আমি যতক্ষণ আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা এবং তার রাসূল (স) এর আনুগত্য করি ততক্ষণ আমার আনুগত্য করো আর আমাকে শুধরিয়ে দিও যদি আমি সেখান থেকে বিচ্যুত হই।’ তিনি নিজের এবং সকল মুসলমান কর্তৃক প্রদত্ত অঙ্গীকার – আইনের প্রতিনিধি যেই হোক না কেন তার অনুসরণ করা – নবায়ন করে নিলেন। এই কথার মাধ্যমে তিনি এটাও পুণর্ব্যাক্ত করলেন যে যিনি আইনের প্রতিনিধি তিনিও একই আইনের আওতায়, এর বাহিরে নন। পৃথিবীতে এটা এক অদ্বিতীয় উদাহরণ কারণ এটা ধরেই নেয়া হতো যে রাজাদের ঐশ্বরিক অধিকার রয়েছে এবং তারা সকল প্রকার আইনের উর্ধ্বে। মুহাম্মদ (স) এর ক্ষেত্রে যিনি কিনা স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা কর্তৃক প্রেরিত রাসূল এবং তিনি যে আইন এনেছেন সে আইনের উর্ধ্বে থাকার জন্য তিনিই সবচেয়ে যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তিনি এর বিপরীত কাজ করলেন এবং নিজেকে ও তার পরে যারা আসবে তাদের সকলকেই আইনের অধীন হিসেবে ঘোষনা করলেন।

আইনের শাসনের এটাই সত্যিকারের অর্থ যা সভ্য সমাজকে সামন্তবাদ বা মানুষের শাসন থেকে পৃথক করেছে।

বিশৃঙ্ক্ষলা এড়ানো এবং বার্তার অখণ্ডতা বজায় রাখার জন্য কর্তৃত্বের কেন্দ্রীভূতকরণ খুবই জরুরী, বিশেষ করে যখন প্রকৃত নেতা ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থেকে নিশ্চিত করতে পারেন না।

তহবিল
বিষয়টি হয়তো এখানে উপস্থাপন কিরা যথার্থ হবে না কিন্তু একটি প্রবাদের কথাও মনে পড়ছে – ‘টাকা দুনিয়াকে পরিচালনা করে’। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী আমরা বিশ্বাস করি যে আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা তার নিজ ক্ষমতা ও দয়া দাক্ষিণ্য থেকে আমাদেরকে দান করেন তবে জন্য আমাদের অবশ্যই জাগতিক সকল উপায় উপকরণকে কাজে লাগিয়ে প্রচেষ্টা চালাতে হবে। রাসূলুল্লাহ (স) এর জীবনে অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যেখানে দেখা যায় তিনি সকল প্রকার সতর্কতা অবলম্বন করেছেন, সব ধরণের জাগতিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন এবং সকল শারীরিক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন এবং তারপর আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেছেন, দোয়া করেছেন। কী পরিমায় উপার্জন করা যাবে ইসলাম সে ব্যাপারে কোন সীমা নির্ধারণ করে দেয়নি বটে, কী উপায়ে এই অর্থ উপার্জন করা যাবে তা নিয়ন্ত্রণ করেছে। কী উপায়ে সম্পদ আহরিত হয়েছে এবং কী উপায়ে তা ব্যয়িত হয়েছে তা ইসলামের বিবেচনার বিষয়, সম্পদের পরিমাণ কতটুকু তা নয়।

ইসলাম বলে যে সম্পদ আহরণ করতে হবে বৈধ উপায়ে, কোনপ্রকার ছলচাতুরীর আশ্রয় ব্যতিরেকে, সুদবিহীন পন্থায়, শ্রমিক ও সমাজকে শোষণ না করে। ইসলাম অন্যের ক্ষতি না করার মাধ্যমে সম্পদ আহরণে জোর দেয়, এ কারণে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মজুদ, বিশেষতঃ খাদ্যদ্রব্য, করা নিষিদ্ধ করেছে। ইসলাম চায় যে সম্পদ সমাজের কল্যাণে ব্যয়িত হবে, এ কারণে দানকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং ব্যক্টিক সীমা পূর্ণ করার পর অতিরিক্ত দান করাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। আল্লাহর রাসূল (স) কখনই কাউকে ব্যবসা করা থেকে বিরত করেন নি, বরং এমনটি বলেছেন যে আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা ব্যবসার মধ্যে বরকতের দশভাগের নয় ভাগ রেখেছেন। এক ঘটনায়, জিনিসপত্রের দাম যখন খুব বেশী ছিল, আল্লাহর রাসূল (স) তখন দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণ আরোপে আপত্তি করলেন বরং লোকদেরকে সমাজের সকল ধরণের মানুষের প্রতি সুবিচার করার জন্য উৎসাহিত করলেন। ইসলাম আল্লাহর নিকট জবাবদিহিতা ভিত্তিক সামাজিক দায়বদ্ধতা সম্বলিত ফ্রি এন্টারপ্রাইজ নীতি অনুসরণ করে এবং আখিরাতে চূড়ান্ত ফলের প্রত্যাশা করে।

এই নীতিকে মাথায় রেখে আমাদের পরামর্শ হলো যে কোন বৈশ্বিক আন্দোলন সফল হতে হলে কেন্দ্রীয়ভাবে তহবিল সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার একটি মেকানিজম বা পদ্ধতি থাকতে হবে। এতে আন্দোলনের মূল আদর্শের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে তহবিল সংগ্রহের একটি কাঠামো থাকবে, তববিল আদায়ের পদ্ধতি থাকবে এবং তহবিল আদায় ও ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকবে। কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের প্রতি আনুগত্য এবং মূল ভাবাদর্শের মধ্যে সন্নিহিত পরিশোধ ব্যবস্থা উভয়ই বিদ্যমান থাকা জরুরী যেন বিশ্বাসী অনুসারীগণ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আদর্শের প্রতি অর্থনৈতিক সমর্থন প্রদান করতে শুরু করে। এর মাধ্যমে আন্দোলনেও বাৎসরিক ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ তহবিলের পরিমাণ নিশ্চিত করা যায় যা নীতিমালা অনুযায়ী আন্দোলনের কল্যাণে ব্যয় করা যাবে। আমাদের যুক্তি হলো এই তনটি উপকরণের সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থান ব্যতিরেকে কোন আন্দোলন বৈশ্বিক রূপ লাভ করতে পারে না বা সময়ের ব্যবধানে টিকে থাকতে পারে না।

সফলতা ও ব্যর্থতার ঐতিহাসিক উদাহরণ

এই মডেল বিভিন্ন বৈশ্বিক আন্দোলনে কিভাবে ব্যবহৃত হয়েছে সংক্ষেপে তার কেছু উদাহরণ দেখা যাক।

ক্যাথলিক চার্চ
ক্যাথলিক চার্চ পূর্ণবিকাশকালীন সময়ে ইউরোপ এবং নতুন দুনিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতো। পোপ অনুগতদের মাঝে বিতরণ করতেন, অবাধ্যদের বহিষ্কার করতেন, রাজাসহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দিতেন, খ্রীষ্টবাদ প্রচারের নামে দক্ষিণ আমেরিকার সভ্যতাকে ধ্বংসের এবং আফ্রিকার কালো দাস কেনাবেচার অনুমতি দিতেন, ক্রুসেড শুরু করতেন ও বৈধতা দিতেন এবং মানুষ কিভাবে জীবনযাপন করবে সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিতেন। ক্যাথলিক বিশ্বাসীরা তাদের আয়ের এক দশমাংস খাজনারূপে চার্চকে দিতেন এবং ভ্যাটিকান ও তার পোপ অবিশ্বাস্যরকম ধনী হয়ে গিয়েছিল। আদর্শ, কর্তৃত্ব ও তহবিলের মডেল বেশ ভালোভাবে কাজ করছিল।

তারপর এলো সংস্কার, প্রটেস্ট্যান্টবাদ (জার্মানীতে শুরু – মার্টিন লুথার), অ্যাংলিকানিজম (ইংল্যান্ডের চার্চ যার প্রধান পোপ বা অন্য কোন ধর্মযাজক নয় বরং ব্রিটিশ রাজা), ফ্রেঞ্চ রিভল্যুশন (সমতা ও ভাতৃত্বের বাণী নিয়ে), কমিউনিজম (জার্মানীর কার্ল মার্ক্স) এবং বিজ্ঞানের নামে সাধারণ নাস্তিকতাবাদ। এক পর্যায়ে ক্যাথলিক চার্চের ক্ষমতা হ্রাস পেল।

রিফর্মেশন বা সংস্কার সম্পর্কে উইকিপিডিয়ায় বলা হয়েছে: ‘প্রটেস্ট্যান্ট সংস্কার যা প্রটেস্ট্যান্ট বিপ্লব বা প্রটেস্ট্যান্ট বিদ্রোহ নামেও পরিচিত, হলো ১৭ শতকে পশ্চিম ইউরোপের ক্যাথলিক চার্চসমূহের সংস্কার আন্দোলন। এই সংস্কার মার্টিন লুথার কর্তৃক অসংযমের ৯৫টি অনুশীলন সংক্রান্ত নিবন্ধের মাধ্যমে শুরু হয়। বলা হয়, ১৫১৭ সালের ৩১ অক্টোবর তারিখে তিনি এই আপত্তিগুলো জার্মানীর উইটেনবার্গের ক্যাসল চার্চে পোস্ট করেন যা সাধারণত ইউনিভার্সিটি কমিউনিটিকে নোটিশ প্রদানের জন্য ব্যবহৃত হতো। নভেম্বরে তিনি এগুলো বিভিন্ন ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরণ করেন। বিভাজন এবং নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমে এই সংস্কার শেষ হয়। এই সংস্কার থেকে সরাসরি চারটি ধারার উৎপত্তি হয়েছে। এগুলো হলো – লুথারান ট্র‍্যাডিশন, রিফর্মড/ক্যালভিনিস্ট/প্রেসবাইটেরিয়ান ট্র‍্যাডিশন, আনাব্যাপ্টিস্ট ট্র‍্যাডিশন এবং অ্যাংলিকান ট্র‍্যাডিশন। পরবর্তী প্রটেস্ট্যান্ট ধারাগুলোর মূল এই চারটি ধারায় মিশেছে। এ থেকে রোমান ক্যাথলিক চার্চের মধ্যে ক্যাথলিক বা কাউন্টার রিফর্মেশনের মাধ্যমে বিভিন্ন রকমের নতুন আধ্যাত্মিক আন্দোলন, ধর্মীয় কমিউনিটির সংস্কার, সেমিনারি প্রতিষ্ঠা, ক্যাথলিক ধর্মতত্ত্বের ব্যাখ্যা এবং চার্চের কাঠামোগত পরিবর্তন ইত্যাদি সূত্রপাত ঘটে।’

ক্যাথলিক চার্চের আয় এবং ক্ষমতা, ধর্মীয় ও প্রশাসনিক উভয়ই, বহুলাংশে কমে গিয়েছিল। এখন ক্যায়হলিক চার্চ ও এর ক্ষমতা ভ্যাটিকানের দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব কেবলমাত্র ক্যাথলিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং ইউরোপে তারা নামেমাত্র ধার্মিক। ইউরোপীয় গীর্জাগুলোতে প্রার্থনার উদ্দেশ্যে বিশ্বাসীদের তুলনায় অনেক বেশী পর্যটক যাতায়াত করে। ইউরোপ আর আমেরিকার চার্চগুলো শুণ্য থেকে শূন্যতর হয়ে যাচ্ছে। ক্যাথলিকতাবাদ আর খ্রীশঠবাদের পতনের সর্বশেষ চিহ্ন হলো – তাদের অনেকগুলো চার্চ অন্য ধর্মীয় দলের নিকট প্রার্থনা করার জন্য বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। মুসলমানদের উপর আক্রমণ আর ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হলো চার্চ কর্তৃক খ্রীষ্টবাদকে জাগিয়ে তোলার সর্বশেষ প্রচেষ্টা।

এই মডেলের কার্যকারিতার আরও উদাহরণ- ঈসমাইলি শিয়ারা তাদের নেতা দ্বারা, আগা খান ও দাউদী বহরারা তাদের নেতা সাইয়্যিদিনা দ্বারা পরিচালিত হয়। এখানেও আমরা একটি আদর্শ দেখতে পাই যেখানে আগা খান/সাইয়্যিদিনার নেতৃত্বে বিশ্বাসীরা একত্রিত থাকে। এখানেও একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব আছে যা ঐশ্বরিক অনুমোদন ও সমর্থনের দাবী করে এবং একটি তহবিল ব্যবস্থা আছে (প্রত্যেক ঈসমাইলি/বোহরা তাদের আয়ের ১২.৫% তাদের নেতাকে খাজনারূপে ব্যয় করে এবং এই অর্থ থেকে তাদের নেতা প্রশ্নাতীতভাবে ব্যয় করতে পারে) যা কঠোরভাবে পালন করা হয় ও বিভিন্ন ধর্মীয় অনুমোদন এবং বহিষ্কারের ভয় দেখিয়ে অনুসরণ নিশ্চিত করা হয়। এর বাহিরে ঈসমাইলি/বোহরাদেরকে তাদের গোত্রের মধ্যে টিকে থাকার জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রীতি-নীতি, উৎসব-পার্বন উপলক্ষে আবশ্যিকভাবে সম্পূরক দান করতে হয়। এটা সত্য যে, এই অর্থ এ সকল কমিউনিটির নেতাদেরকে পৃথিবীর বিলিয়নিয়ারদের একজন বানিয়েছে, তহবিলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন শিক্ষাগত এবং সামাজিক ফাউন্ডেশন ও ট্রাস্টের মাধ্যমে তাদের লোকদের উন্নয়নের জন্য ব্যয় করা হয়।

উপরের উদাহরণগুলোতে আমরা যেমন দেখেছি, বৈশ্বিক আন্দোলনের সকল উপাদান যতক্ষণ পর্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে কাজ করবে, আন্দোলনে শক্তি এবং অগ্রগতি থাকবে। উপাদানগুলোর এক বা একাদিক ত্রুটিপূর্ণ হয়ে গেলে বা ঠিকমতো কাজ না করলে আন্দোলন তার নিজস্ব গতি হারায়, এমনকি সম্পূর্ণ বন্ধও হয়ে যেতে পারে।

ইসলামের বৈশ্বিক আন্দোলনের মডেল

মূল ভাবাদর্শ

ইসলাম এমন একটি আদর্শ উপস্থাপন করেছে যা ন্যায়বিচার, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সকল প্রকার জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়াকে তুলে ধরে। আধ্যাত্মিক ভিত্তিকে বাস্তব কর্ম এবং জীবনাচারে রূপান্তরিত করায় এটি একটি সামাজিক মডেলে রূপ নিয়েছে। ইসলামে কেবল আল্লাহর একাত্ববাদ ও মুহাম্মদ (স) আল্লাহর প্রেরিত রাসূল – এটুকু বিশ্বাস করাই যথেষ্ট নয়। প্রকৃত বিশ্বাসী কিনা তা প্রমাণের জন্য অবশ্য পালনীয় সুনির্দিষ্ট কর্মকান্ডের সুস্পষ্ট নির্দেশনাও রয়েছে। এর প্রথমটি হলো নামাজ, এবং দ্বিতীয়টি, যা একই সাথে উচ্চারিত হয় তা হলো যাকাত। যাকাত হলো শরীয়াহ নির্দেশিত শর্তানুযায়ী প্রত্যেক মুসলমান কর্তৃক কেন্দ্রীয় কোষাগারে জমা করা বাধ্যতামূলক দান। একটি থেকে আরেকটিকে আলাদা করা যায় না এবং প্রকৃতপক্ষে, একটি অপরটিকে বাড়িয়ে তোলে। মজার ব্যাপার হলো, ইসলামের প্রাচীন ইতিহাস পাঠ করলে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়, ইসলামের সকল প্রকার বিরোধিতার শেকড় এর কেন্দ্রিয় আদর্শ নয়, বরং প্রকৃতপক্ষে ইসলামের নিয়মনীতি অনুসরণের অনিচ্ছার মধ্যে প্রোথিত, আর এদের প্রায় সবগুলোই ছিল সামাজিক, পারিবারিক এবং রাষ্ট্র সম্পর্কীয়। এই ধারা আজও চলমান। আধুনিক যুগের মুসলমানগণ সহ যারা ইসলাম পালনে অসুবিধা বোধ করছেন তাদের উচিত ব্যক্তিগত বাসনার দিকে দৃষ্টিপাত করে তাদের অনাগ্রহ বা বিরোধিতার আসল কারণ চিহ্নিত করা উচিত। আধ্যাত্মিক যুক্তি নয়, প্রকৃত সত্য হলো ইসলাম কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকৃতির ধর্ম নয়, বরং কর্মের মাধ্যমেই এটি সুসংহত হয়। ইসলাম বলতে যদি শুধুমাত্র আল্লাহর একাত্ববাদে বিশ্বাস করলেই হতো তাহলে রাসূল (স) এর কাজ অনেক সহজ হয়ে যেতো।

একটি ঘটনা বর্ণিত আছে যেখানে মক্কার নেতৃবৃন্দ আল্লাহর রাসূল (স) এর নিকট এসে বললেন যে তারা একদিন আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালার ইবাদত করতে প্রস্তুত আছে যদি মুহাম্মদ (স) পরের দিন তাদের দেবদেবীর পূজা করে। আজকে দুনিয়ায় একে খুবই যৌক্তিক প্রস্তাব মনে হতে পারে এবং কেউ যদি এরকম ‘যৌক্তিক’ প্রস্তাবে সম্মত না হয় তবে তাকে ‘চরমপন্থী’ বা ‘গোঁড়াপন্থী’ আখ্যা দেয়া হতে পারে। যাহোক, রাসূল (স) এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন নি। কারণ এই প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে ধর্মের পূর্ণ দর্শন যা দাবী করে এটি স্বয়ং আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে এসেছে, এটি বহু-ঈশ্বরবাদের সম্পূর্ণ বিরোধী এবং রাসূল (স) এর প্রচারের জন্য প্রেরিত হয়েছেন তা ভিত্তিহীন হয়ে যায়। নেতাকে এ ধরণের পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয় এবং যত কঠিনই হোক না কেন, কোন যুক্তির পক্ষে আপোষ থেকে বিরত থাকতে হয়। অন্যথায়, অন্যদের থেকে আলাদা হবার পথ থেকে তিনি বিচ্যুত হবেন।

কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ
ইসলাম ‘সাংবিধানিক শাসক’ – খলিফা, যিনি ঐশ্বরিক আইন দ্বারা শাসন করেন প্রতিষ্ঠা করেছে। তিনি এমন আইন দ্বারা শাসন করেন যা তিনি তৈরি করেননি এবং যার অধীনে তিনি তার তত্ত্বাবধানে নাগরিকদের মধ্যে সর্বনিম্ন হিসাবেও দায়বদ্ধ। খলিফা ছিলেন জনগণের প্রকৃত বান্দা, যিনি প্রকাশিত ধর্মপ্রাণতা, প্রজ্ঞা এবং রাষ্ট্রপরিচালনার দক্ষতার ভিত্তিতে নির্বাচিত হয়েছিলেন। যেমনটি ইসলামিক ইতিহাসের প্রথম দিক থেকে স্পষ্ট , খিলাফত-এ-রাশিদা তাদের সহকর্মীদের দ্বারা নির্বাচিত হয়েছিল কারণ তারা তাদের প্রতি উঁচু শ্রদ্ধাবোধ থেকে আনুগত্য করতে রাজী ছিল। এটা বিভিন্ন ঘটনা থেকেও দেখা যায় যেখানে সাধারণ জনগণ তাদের খলিফার সাথে একমত নন কিন্তু এই মতবিরোধ বহাল ছিল। সুতরাং তাদের আনুগত্য আদর্শের অধীনে ছিল।

তহবিল
ইসলাম আইন করেছে যে সঞ্চয়ের সর্বনিম্ন ২.৫% অবশ্যই রাষ্ট্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি সাধারণ তহবিলে জমা করতে হবে যা কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হবে। এর উদ্দেশ্য দুইটি। একটি হলো অর্থনীতির মধ্যে অর্থ সঞ্চালন কার্যকর করা। এ কারণেই যাকাত কেবল সঞ্চিত অর্থের উপরই নয়, স্বর্ণ ও রূপাতেও প্রদেয় কারণ এগুলো যে কারও কাছেই সঞ্চিত অর্থ সংরক্ষণের সবচেয়ে সাধারণ উপায়। একইভাবে ফসল, ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে মজুদকৃত পণ্য, ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে কেনা জমির উপর জাকাত প্রদেয়। এই সব কিছু নিশ্চিত করে যে ধনী ব্যক্তিরা অর্থকে সঞ্চালনের বাইরে (out of circulation) নিতে পারে না এবং একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সর্বদা সিস্টেমে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

যাকাতের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা অনুযায়ী সেগুলি কাজে লাগানোর জন্য কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের হাতে পর্যাপ্ত পরিমাণ তহবিল দেওয়া। যাকাত হলো উন্নয়নের অর্থায়নের সবচেয়ে কার্যকর উপায় এবং যদি মুসলমানরা যাকাত আদায় করার কথা ছিল যেভাবে আদায় করে; সম্পূর্ণ পরিমান এবং সাধারণ তহবিলে প্রদান করে; তবে বিশ্বে কেবলমাত্র একজন দরিদ্র মুসমানই থাকবে না তা নয়, বরং মুসলমানরা সারা বিশ্বের অন্যান্য বঞ্চিত মানুষের সামাজিক উন্নয়ন করতেও সক্ষম হবে। এটি দাওয়াহর সবচেয়ে শক্তিশালী পদ্ধতি হতো যা যাকাতেরও অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য।

উপরের সমস্ত উদাহরণ থেকে আমরা যেমন দেখেছি; যতক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী আন্দোলনের তিনটি উপাদান একত্রে কাজ করে, আন্দোলন শক্তি এবং অগ্রগতি থাকে। যখন এক বা একাধিক উপাদান ত্রুটিযুক্ত হয়ে ওঠে বা কাজ করা বন্ধ করে দেয়, আন্দোলন তার গতি হারায় এবং এমনকি পুরোপুরি বন্ধও হয়ে যেতে পারে।

ইসলামিক মডেলে ঐতিহাসিক পরিবর্তনসমূহ

ইতিহাস তার আইনগুলি পরিবর্তন করে এমন কাউকেই রেহাই দেয় না এবং তা মুসলমানদেরও রেহাই দেয়নি। মুসলমানরা যেহেতু বিশ্বব্যাপী আন্দোলনের মডেলটির বিশুদ্ধতা পরিবর্তন করেছিল, তেমনি তাদের ভাগ্যও প্রভাবিত হয় এবং প্রভাবিত হতে থাকে। এর প্রভাব তার বৈশ্বিক-প্রকৃতি হারাতে থাকে এবং প্রকৃত পর্যবেক্ষণযোগ্য সত্যের চেয়ে তাদের উপস্থিতি ইতিহাসের বইগুলিতে বেশি দেখা যেতে শুরু করে। বেদনাদায়ক হলেও ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা যা বিশ্বব্যাপী ইসলাম এবং মুসলমানদেরকে প্রভাবিত করেছিল পরীক্ষা করে দেখা উচিত। .

আদর্শ
যেহেতু ইসলাম সময়ের সাথে সাথে আরব উপদ্বীপ থেকে এবং রাসুলুল্লাহর সময় থেকে আরও দূরে সরে গিয়েছে এবং মিশর, সিরিয়া, ইরান এবং ভারতে প্রবেশ করেছে, ফলে এটি কপটিক খ্রিস্টান, গ্রীক এবং রোমান দর্শন এবং পৌরাণিক কাহিনী, জরথুস্থ্রবাদ এবং হিন্দু ধর্ম থেকে প্রভাবিত হয়। তাওহীদের মতবাদের পবিত্রতা – অংশীদার এবং মধ্যস্থতাকারী ব্যতিরেকে আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালার একত্ব এবং স্রষ্টা ও বান্দার মধ্যে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক – অংশীদারিত্বের বিভিন্ন তত্ত্ব দ্বারা বিভিন্নভাবে ঢাকা পড়ে। মানুষের দুর্বলতা, ভয় এবং নিজের আধ্যাত্মিক রূপ বিকাশের অলসতার সুযোগে নতুন নতুন দার্শনিক তত্ত্ব ভূমিকা পালন করতে থাকে এবং অস্তিত্বহীন সাহায্যকারীদের উপস্থাপন করে যারা তাকে ঐশ্বরিক অনুগ্রহ থেকে শুরু করে জান্নাত পর্যন্ত প্রদানের নিশ্চয়তা প্রদান করে। মানুষের এ ব্যাপারে যে জ্ঞান থাকা উচিত ছিল তা না থাকায় কখনও প্রশ্ন করেনি কোন ক্ষমতাবলে এই প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে। মানুষ এই প্রতিশ্রুতিগুলি বিশ্বাস করেছে এবং এই মিথ্যা সুরক্ষা যারা প্রদান করেছে তাদেরকে বিনিময়ে অর্থ, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি দান করেছে।

তাওহীদের অনন্য পরিচয়টি যেমন দুর্নীতিগ্রস্থ হয়েছে, তেমনিভাবে ইসলাম তার নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যও হারিয়েছে। ইসলাম ও মুসলমানরা তাদের জীবনযাত্রা, আচার-অনুষ্ঠান, রীতিনীতি ও রীতিতে হিন্দু, খ্রিস্টান এবং অন্যদের সাথে সাদৃশ্যযুক্ত হতে থাকে। তারা মরুভূমির বায়ুর মতো পরিষ্কার এবং খাঁটি আদর্শের বাহক হওয়া বন্ধ করে দেয় অথচ এই মরূর বায়ুই ইসলামের গৌরবের প্রথম সাক্ষী। এটি বনের অন্ধকারের জলাভূমির মতো ঘোলা হয়ে উঠেছে, যার নীচের অংশ গাছপালা ও জলকাদায় পরিপূর্ণ এবং যার পানি এত ধীরে বয় যে একটি শুকনো পাতাকেও নড়াতে সক্ষম হয় না।

মানুষ যখন ইসলামের স্বতন্ত্রতা দেখা বন্ধ করে দিয়েছে, তখন তারা এতে আকৃষ্ট হওয়াও বন্ধ করেছে। তারা যা দেখছে তা তারা যা বিশ্বাস করে তার থেকে খুব আলাদা না ফলে তাদের সমস্যা থেকে উত্তোরণের কোন সমাধান তারা পায় না এবং ফলে নাম বা প্রতীমা বদল ছাড়া আর কিছুই পরিবর্তন হয় নি।

সর্বোপরি, সত্যিকারের ট্র্যাজেডিটি ছিল উম্মাহর বিচ্ছেদ। বিভিন্ন ব্যাখ্যা, দর্শন এবং সংস্কৃতি শুরু হওয়ার সাথে সাথে মুসলিম উম্মাহ ভেঙে যেতে শুরু করে। পাশাপাশি শিরক ও কুফরের বিরুদ্ধে সংঘাত বাহ্যিকের চেয়ে আরও অভ্যন্তরীণ বিষয় হয়ে ওঠে। সমগ্র উম্মাহকে ভাঙ্গার বিনিময়ে নিজস্ব সমর্থকদের ছোট দ্বীপ গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতারা পারস্পরিক বিদ্বেষের শিখাগুলিকে উসকে দিয়েছেন। মুসলমানরা মুসলমানদের হত্যা শুরু করে। মুসলমানরা মুসলমানদের সহযোগিতা করতে অস্বীকার করে। মুসলমানরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাজ করতে থাকে। জাতি, জাতীয়তা, গোত্র, বর্ণ এবং সম্প্রদায় সবকিছু মুসলমান হওয়ার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাসূলুল্লাহ (স) এর এত প্রচেষ্টার মাধ্যমে মুছে ফেলা সকল সীমানা আবারও উম্মতের মধ্যে ফিরে আসে এবং মুসলিম উম্মাহ তাদের পূর্বসূরীদের মতো খণ্ড-খণ্ড হওয়ার পথে নামল এবং এর ফলাফল হিসেবে প্রভাব, শক্তি এবং সম্পদ সবই হারালো।

কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ

এটি আসলে আক্রমণের শিকার ও দুর্বল হওয়া প্রথম জিনিসগুলির মধ্যে একটি। শুরুটা হয়েছিল খেলাফতকে নির্বাচিত অফিস থেকে বংশগত প্রথায় পরিণত করার পরিবর্তনের মাধ্যমে। খলিফা তাই একজন রাজা হয়ে গেলেন, যদিও তাকে তখনও আমির-উল-মো’মেনীন বলা হতো। কাঠামোটি একটি খালি খোলের আকারে রয়ে গেছে যার ভেতরে ভিন্ন একটি প্রাণী বাস করে। যেহেতু যোগ্যতা নেতৃত্বের কোন মানদণ্ড হিসেবে গণ্য ছিল না এবং নেতৃত্ব হয়ে উঠেছিল বংশানুক্রমিক, যোগ্যতাকে অযোগ্য নেতৃত্বের প্রতি হুমকীরূপে দেখা হতে থাকে। তারিক বিন জিয়াদ ও মোহাম্মদ বিন কাসিমের মতো উজ্জ্বল জেনারেলদেরকে তাদের অভিযানের শিখর থেকে ফিরিয়ে এনে তাদের কাজে সফল হওয়ার জন্য শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। এই বংশগত ধারা এমনকি ধর্মীয় নেতাদের মধ্যেও রীতি হয়ে ওঠে এবং ছেলেরা সুফি ধারা বা ধর্মীয় স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসাবে পিতার স্থান উত্তরাধিকার সূত্রে পেতে শুরু করে। নেতৃত্বের মোড়কে উত্তরাধিকারী নির্বাচনের জন্য নিজের আত্মীয়দের বেছে না নেওয়ার ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (স) যে উদাহরণ স্থাপন করেছিলেন তা তাঁর মৃত্যুর পরে খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়। ফলস্বরূপ ইসলাম এবং এর আধিপত্যের বিশ্ব অবস্থানটি ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং ধীরে ধীরে পতিত হয়।

সময় বদলায় এবং খলিফার আচরণও সেই সাথে বদলে গিয়েছে। সাইয়্যিদিনা আবু বকর সিদ্দিক (রা) এবং উমর ইবনে আল খাত্তাব (রা) এর মতো খলিফাগণ নিজেরা কোষাগার থেকে এক দিরহাম ব্যবহার করার স্বপ্নও দেখতেন না। তাদের এই সততা এমন পরিস্থিতিতে পরিবর্তিত হয়েছিল যেখানে কোষাগার খলিফা / রাজা এবং তার পরিবারের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে পড়ে। তারা এমন প্রাসাদ তৈরি করে এবং এত পরিমাণ সম্পদ জমা করে যে তা কিংবদন্তি হয়ে উঠেছে। কর আদায় করা হতো জনকল্যাণে ব্যয় করার জন্য নয় বরং রাজা এবং তাঁর আভিজাত্যের জীবনধারা নির্বাহের জন্য। যুদ্ধে লড়াই করা হতো, ইসলামের বাণী প্রচারের জন্য বিশ্বের দরজা খোলার জন্য নয়, জমি ও সম্পদ অর্জনের জন্য। ইসলামে নতুন ধর্মান্তরিত ব্যক্তিদের বলা হয়েছিল যে তাদেরকে যাকাত ছাড়াও, যা তারা মুসলমান হিসাবে প্রদান করতে বাধ্য ছিল, জিজিয়া দিতে হবে কারণ তারা শাসক শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত নয়। মুসলিম শাসকরা লোকদের ইসলামে প্রবেশের সহায়তাকরী না হয়ে মানুষকে ইসলাম থেকে দূরে থাকার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

অবশেষে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে ব্রিটিশদের দ্বারা শিক্ষিত-দীক্ষিত, ধর্মত্যাগী কামাল পাশা যিনি আতাতুর্ক নামেও পরিচিত কর্তৃক শেষ খলিফাকে ক্ষমতাচ্যুত করার মাধ্যমে খিলাফতের ভণ্ডামি শেষ হয়। আসল ট্রাজেডি হলো ব্রিটিশরা যেভাবে তুর্কি ও আরবদের মধ্যে জাতিগত ও উপজাতির বৈষম্যের বীজ বপন করতে সক্ষম হয়েছিল এবং অটোমান সাম্রাজ্যকে ভেঙে দিয়েছিল। মুসলমানদের ভূমি বিজয়ীদের মধ্যে বিভক্ত করা হলো যারা নিজেদের ছোট্ট রাজত্বে পুতুলকে চালকের আসনে বসিয়েছিলেন যা আসলে ব্রিটিশদের দ্বারাই শাসিত ছিল। এই পুতুলদের কারও খিলাফতকে হারিয়ে যেতে না দেয়ার মতো দূরদুষ্টিও ছিল না। এই খিলাফতকে হারিয়ে যেতে দেয়া হয় এবং তার স্থলে ছোট ছোট রাজত্ব এমন লোকদের দ্বারা শাসিত হতে থাকে যাদের কোন দূরদৃষ্টি ছিল না এবং যারা প্রকারান্তরে খেলাফতের নামে চলা সেই প্রহসনের ধারাই বজায় রেখেছে। এইসব ঘটনা নিয়েই মানুষের ইতিহাস। মুসলমানদের খেলাফতের সূর্য সম্ভবত চিরকালের জন্য অস্ত গিয়েছে।

তহবিল

বিশ্বব্যাপী আন্দোলনের তৃতীয় উপাদানটিতে আসা যাক। রাষ্ট্রকে বাধ্যতামূলক পরিশোধের উদ্দেশ্যে ইসলাম যাকাত ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে। আগেই বলেছি, যাকাতের উদ্দেশ্য দুটি: দেশের অর্থনীতি চলমান রাখতে প্রয়োজনীয় অর্থ সঞ্চালন করা এবং ব্যবস্থাপনামূলক ও কার্যকরভাবে ব্যয় করতে সক্ষম হওয়ার জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যাপ্ত অর্থ সংগ্রহ করা। কেন্দ্রীয়ভাবে সংগ্রহ ও বিতরণ ব্যতীত রাষ্ট্রের পক্ষে কোনও কৌশলগত উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। যাকাতের প্রতিষ্ঠানটি এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে একে সালাতের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে এবং প্রার্থনার আরেকটি উপায়, প্রার্থনার আর্থিক দিক, হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। যে ব্যক্তিরা যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল তারা নিজেরা ইসলাম থেকে বের হয়ে এসেছে মর্মে ঘোষণা করা হয়েছিল। এবং সাইয়্যিদিনা আবু বকর সিদ্দিক (রা) এর সময়ে যখন লোকজন রাষ্ট্রের যাকাত আদায়কারীদের নিকট যাকাত দিতে অস্বীকৃতি জানালো, তখন তিনি তাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী প্রেরণ করলেন এই যুক্তিতে যে যারা যাকাত দিতে অস্বীকার করেছে তারা ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে গিয়েছে।

আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা রাসূল (স) কে লোকদের নিকট হতে যাকাত আদায়ের নির্দেশ দেন এবং একে সম্পদের ‘পরিশুদ্ধতা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। যাকাত রাষ্ট্র কর্তৃক আদায় করা হয় এবং বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। এ সকল ক্ষেত্রগুলোও নির্দেষ্ট করা হয়েছে।

তাদের মালামাল থেকে যাকাত গ্রহণ কর যাতে তুমি সেগুলোকে পবিত্র করতে এবং সেগুলোকে বরকতময় করতে পার এর মাধ্যমে। আর তুমি তাদের জন্য দোয়া কর, নিঃসন্দেহে তোমার দোয়া তাদের জন্য সান্ত্বনা স্বরূপ। বস্তুতঃ আল্লাহ সবকিছুই শোনেন, জানেন। (সূরা তওবা ৯:১০৩)

 

যাকাত হল কেবল ফকির, মিসকীন, যাকাত আদায় কারী ও যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন তাদে হক এবং তা দাস-মুক্তির জন্যে-ঋণ গ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জেহাদকারীদের জন্যে এবং মুসাফিরদের জন্যে, এই হল আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। (সূরা তওবা ৯:৬০)

এই গুরুত্ব কেবল যাকাত আদায়ের জন্য দেয়া হয় নি বরং কেন্দ্রীয় তহবিলে প্রদান করতে বলা হয়েছে। যাকাতের এই সামষ্টিক ব্যবস্থাপনা এখন বাস্তবে উপস্থিত নেই। এখন এমন এক সময়ে আমরা পৌঁছেছি যখন অনেক মুসলমান কোন যাকাত প্রদান করে না। শুধু তাই নয়, বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয়ভাবে যাকাত আদায় ও ব্যবস্থাপনার কোন ব্যবস্থাও নেই।কিছু মুসলিম দেশে যাকাত আদায়ের স্থানীয় ব্যবস্থা আছে বটে কিন্তু যেসব দেশে প্রচুর সংখ্যক মুসলমান বাস করে যেমন ভারত, চীন, রাশিয়া, আমেরিকা – সেখানে যাকাত আদায় ও বিতরণের কেন্দ্রীয় কোন ব্যবস্থাই নেই। ফলস্বরূপ, যাকাতের কোন লিভারেজই বর্তমান নেই।

ট্র্যাজেডি হলো, এখনও সারা বিশ্বে প্রতিবছর বিলিয়ন পরিমাণ যাকাত আদায় করা হয় কিন্তু যেহেতু এটা ক্ষুদ্র পরিমাণে ও বিচ্ছিন্নভাবে প্রদান করা হয়, এর কোন লিভারেজ পাওয়া যায় না। নির্দিষ্ট বার্ষিক প্রবাহের নিশ্চয়তা নেই বলে কোনও বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া যায় না। কিছু সংস্থার চাহিদা কখনই পূর্ণ হয় না এবং তাদের পরিষেবার মানের ক্ষতি হয়। অন্যান্য ক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত রয়েছে যা প্রায়শই জনসাধারণের খাওয়ানোর মতো সামান্য কাজে দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যয় করে। দীর্ঘমেয়াদে কারও উপকার হয় না, যদিও তারা ক্ষণিকের জন্য সামান্য উপকার লাভ করতে পারে।

উত্তরাধিকার পরিকল্পনা এবং নেতৃত্ব তৈরি

কোন ব্যক্তিই একাকী কোন লক্ষ্য অর্জন করতে পারে না, সে যতই মেধাবী বা ধনী ব্যক্তি হোক না কেন। যে কোনও নেতার পক্ষে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, প্রকৃতপক্ষে একটিই কারণ যা তার মিশনের সাফল্য বা ব্যর্থতা নিয়ে আসতে পারে, হলো তার লক্ষ্যটি অর্জনের জন্য অন্যকে তাকে অনুসরণ করতে এবং সময়, শক্তি, সম্পদ এবং প্রতিভা কাজে লাগানোর জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করার ক্ষমতা। মানুষের এই মনোযোগ এবং প্রতিশ্রুতি অর্জনের বিষয়টি অর্থ প্রদান বা অনুগ্রহ করা বা অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য দেওয়ার মাধ্যমে হয় না, বরং প্রকৃতপক্ষে তিনি তার অনুগামীদেরকে কতটা ভালবাসেন এবং যত্ন করেন তা দেখানোর মধ্যে অর্জিত হয়। দেখানো বলতে আমি কোনও ভণ্ডামি বুঝাচ্ছি না কারণ অভিনয় শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে না। দেখানোর অর্থ অনুসরণকারীদের প্রতি ভালবাসা এবং উদ্বেগ প্রকাশ করা যা আপনি সত্যি সত্যিই অনুভব করেন এবং তারাও এটি জানে।

বলা হয়ে থাকে, ‘তারা থোড়াই কেয়ার করে আপনি কি বলছেন যতক্ষণ না তারা জানতে পারছে যে আপনি কেয়ার করেন।’

রসুলুল্লাহর উদ্বেগ কেবল তাঁর অনুসারীদের জন্য ছিল না, এমনকি তাদের জন্যও যারা তাকে অস্বীকার করেছিল এবং তার ক্ষতি করার চেষ্টা করেছিল কারণ তিনি তাদেরকে সত্যের দিকে দাওয়াত দিতে এবং জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। শুনতে অদ্ভুত লাগে কারণ দুনিয়াবী সকল বিষয়ে মানুষ তাকেই ভালোবাসে যে বিনামূল্যে কিছু দিতে রাজী থাকে। কিন্তু যখন কেউ একজনকে চিরন্তন সাফল্যের দিকে আমন্ত্রণ জানায়, তখন কিছু লোক এটিকে আপত্তিকর বলে মনে করে এবং সেই ব্যক্তির সাথে লড়াই করে এবং তার বিরোধিতা করে, এমনকি তার ক্ষতি করারও চেষ্টা করে।

এটি রাসুলুল্লাহর সাথে বহুবার এবং বিভিন্ন উপায়ে ঘটেছে। সর্বোপরি তাঁর হতাশা এবং দুঃখ এই ছিল যে তাঁর সর্বোত্তম প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাঁর নিজের লোকেরা তাঁর কথা শুনতে অস্বীকার করেছিল। তাদের প্রতি তাঁর উদ্বেগ এমন ছিল যে আল্লাহ নাযিল করলেন:

তারা বিশ্বাস করে না বলে আপনি হয়তো মর্মব্যথায় আত্নঘাতী হবেন। (সূরা আশ-শুয়ারা ২৬:৩)

 

যদি তারা এই বিষয়বস্তুর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করে, তবে তাদের পশ্চাতে সম্ভবতঃ আপনি পরিতাপ করতে করতে নিজের প্রাণ নিপাত করবেন। (সূরা আল কাহফ ১৮:৬)

এই উদ্বেগের কারণেই তারা সাড়া দিয়েছে এবং তাকে কেবল বিশ্বাসই করেনি বরং তাকে সহায়তা করেছে এবং তার সুরক্ষার জন্য ও তার বাণী প্রচারে যে কোন কিছু করতে রাজী ছিল, এমনকি যদি জীবন হারানোর প্রয়োজনও হয়।

অনুসারীদের জন্য রাসূল (স) এর ভালোবাসার কথা সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা বলেন:

তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রসূল। তোমাদের দুঃখ-কষ্ট তার পক্ষে দুঃসহ। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল, দয়াময়। (সূরা তওবা ৯:১২৮)

নেতা হিসাবে রাসুলুল্লাহ (স) এর চরিত্র সম্পর্কে যদি একটি বিষয় স্পষ্ট থাকে তবে তা হলো তার ধৈর্য এবং নম্রতা। তাঁর জীবনের বেশ কয়েকটি উদাহরণ রয়েছে যেখানে অন্যরা তাঁর সাথে এমন নির্বোধ ও কঠোর আচরণ করেছিল যে তাঁর সাথে যারা ছিল তারা ব্যক্তিটিকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য তরোয়াল টেঁনে নিয়েছিল। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (স) তাদের কখনও সে পথ অবলম্বন করতে দেননি। তিনি এ ধরনের ঘটনায় সবচেয়ে কঠোর ব্যবহারের মোকাবেলা করতেন শান্ততা, নম্রতা এবং মৃদু হাসির মাধ্যমে।

আল্লাহ সুবহানাহুহায়ালা বলেন:

আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন পক্ষান্তরে আপনি যদি রাগ ও কঠিন হৃদয় হতেন তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য মাগফেরাত কামনা করুন এবং কাজে কর্মে তাদের পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন কোন কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহ তা’আলার উপর ভরসা করুন আল্লাহ তাওয়াক্কুল কারীদের ভালবাসেন। (আল ইমরান ৩:১৫৯)

মক্কার এক মহিলার বিখ্যাত কাহিনী রয়েছে যে রাসুলুল্লাহ (স) এর প্রতি নিছক ঘৃণা প্রকাশ করার জন্য তার বাড়ির উপরের তলায় তার জন্য অপেক্ষা করত এবং যখন তিনি তার নীচের রাস্তা দিয়ে যেতেন তখন সে তার উপর আবর্জনা ফেলে দিত। তিনি কিছুই বলতেন না, কেবল নিজের কাপড় পরিষ্কার করে তাঁর পথে চলতেন। দীর্ঘদিন একই ঘটনা ঘটে যাচ্ছিল। যাইহোক একদিন তিনি যখন সেই বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিল তখন কিছুই ঘটল না। তাই ফিরে আসার সময় রাসুলুল্লাহ (স) দরজায় কড়া নেড়ে মহিলাটির বিষয়ে জিজ্ঞাসা করিলেন। যে দরজা খুলেছিল সে জানালো যে মহিলাটি অসুস্থ। আল্লাহর রাসূল (স) তাকে দেখার অনুমতি চাইলেন এবং ভেতরে গিয়ে তার খোঁজখবর নিলেন। যে ব্যক্তি কেবল তার কারণে কেবল কষ্টই পেয়েছে অথচ তার খবর নেয়ার জন্য ঘরে এসেছেন – এই সত্য বুঝতে পেরে ভদ্রমহিলা নিজের আচরণে এতই লজ্জা পেয়েছিলেন এবং অবাক হয়েছিলেন যে শেষ পর্যন্ত তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

আরেকটি গল্প আছে যেখানে রাসুলুল্লাহ (স) দেখলেন যে এক প্রবীণ মহিলা পথের পাশে কিছু বস্তা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন এবং মহিলাটি বলল যে, তিনি কারও সহায়তার জন্য অপেক্ষা করছেন যে কিনা তার বস্তা মক্কাগামী কোন ক্যারাভান পর্যন্ত পৌছেঁ দিতে পারে কারণ তিনি নগর ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রসুলুল্লাহ বস্তাটি তাঁর মাথায় ও কাঁধে নিয়ে কাফেলা শিবিরের দিকে চললেন। পথে ভদ্রমহিলা তাকে বললেন যে তিনি স্থানান্তরিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কারণ মুহাম্মদ (স) নামের যুবকটি যে কিনা নিজেকে আল্লাহর রাসূল বলে দাবি করেছে এবং মানুষকে তাদের পূর্বপুরুষদের বহুশাস্ত্রবাদ ত্যাগ করতে ও একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালার ইবাদতের জন্য প্ররোচিত করছে এই খবরে তিনি খুবই অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। এই বলে তিনি রাসূল (স)কেও সতর্ক করে দিলেন। তিনি বললেন, ‘তুমি খুবই চমৎকার একজন যুবক, খুবই সাহায্যকারী এবং দয়ালু। ঐ লোকটি থেকে দূরে থেকো, নাহয় সে তোমাকেও বিপথগামী করবে।’ গন্তব্যে পৌঁছে প্রবীণ মহিলাটি তার প্রয়োজনের সময়ে সদয় হওয়ার জন্য রাসূল (স)কে ধন্যবাদ দিল। তারপর তিনি বললেন, ‘তোমার নাম কি বাছা?’ রাসূল (স) বললেন, ‘মা, আমার নাম মুহাম্মদ।’ যার সমালোচনা করেছেন সে কেবল তাকে সহায়তাই করেনি, একটি শব্দও বলে নি ও নিজের সমালোচনা শুনে গিয়েছে বুঝতে পেরে ভদ্রমহিলা এতটাই হতবাক হয়েছিলেন যে তিনি বললেন, ‘তুমিই যদি মুহাম্মদ হও তবে আমি বিশ্বাস করি যে আল্লাহর রাসূল হওয়া সম্পর্কে তুমি যা দাবী করছো তা সত্য। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ব্যতীত উপাসনার যোগ্য আর কেউ নেই এবং তুমিই তাঁর রাসূল (স)।’

মদীনার একটি ঘটনা আনাস বিন মালিক (রা) বর্ণনা করেন: ‘আমরা রাসূলুল্লাহ (স) এর সাথে মসজিদে ছিলাম, এমন সময় একজন অন্ধ বেদুইন এসে মসজিদে প্রস্রাব করা শুরু করলো। সাহাবীগণ তাকে থামাতে ছুটে গেল। রাসূল (স) বললেন, ‘ওর শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাধা দিও না। রাসুলুল্লাহ (স) তাকে মাঝপথে থামিয়ে দেয়ার সম্ভাব্য পরিণতির কথা ভাবছিলেন, সে হয়তো সাহাবীদের কাছ থেকে দৌড়ে পালিয়ে যেতে গিয়ে মসজিদের আরও বেশি জায়গা অপবিত্র করে ফেলবে। রাসুলুল্লাহ (স) বুঝতে পেরেছিলেন যে সে যা করছে তা শেষ না করা পর্যন্ত করতে দেয়া দুটি কাজের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম মন্দ ছিল। তার প্রস্রাব শেষ হয়ে যাওয়ার পরে রাসূল (স) তাকে বাইরে নিয়ে গেলেন এবং সে কি করেছে তা তাকে জানালেন। তারপর জায়গাটি ধুয়ে ফেললেন।

আগেই উল্লেখ করেছি, আল্লাহর রাসূল (স) কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁর সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করার জন্য আল্লাহর নির্দেশ অবিচ্ছিন্নভাবে অনুসরণ করতেন। এটি আশ্চর্যজনক বলে মনে হতে পারে কারণ তিনি ওহী (প্রত্যাদেশ) প্রাপ্তির কারণে তাদের তুলনায় বেশি এবং ভালো জানেন। এছাড়া, তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী এবং সবচেয়ে অভিজ্ঞ। তবুও আমরা এর প্রজ্ঞা উপলব্ধি করতে পারি যখন দেখতে পাই রাসূল (স) এর এই পরামর্শগুলো সাহাবীদের মধ্যে কী প্রভাব রেখেছিল।

১। এটি তাদের নিজেদেরকে অন্তর্ভুক্ত, মূল্যবান হিসেবে অনুভব করতে সাহায্য করেছে এবং প্রচেষ্টা এবং ফলাফলের জন্য দায়বদ্ধ করেছে।

২। এটি উদ্দেশ্যের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করেছে কারণ তাদের সাথে পরামর্শ করা হয়েছিল।

৩। কখনও কখনও তাদের কাছে স্থানীয় বিষয়গুলি সম্পর্কে খুবই সংবেদনশীল তথ্য ছিল যা তাদের সাথে পরামর্শ করার মাধ্যমে জানা যেতো এবং এর ফলে ভাল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সক্ষম হতো।

৪। ভবিষ্যতে যখন রাসুলুল্লাহ আর তাদের মধ্যে থাকবেন না সেই সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য এটি তাদের প্রশিক্ষণ ছিল।

৫। এটি তাদের মধ্যে সংহতি সৃষ্টি করেছিল এবং তাদের উপজাতি ও স্থানীয় গণ্ডি পেরিয়ে সমস্ত সংশ্লিষ্টদের কল্যাণ এবং ইসলাম প্রচারের মিশনের সাফল্যের জন্য চিন্তা করতে সক্ষম করেছিল।

সঠিক ব্যক্তিদের বাছাই, একটি উঁচু স্তরে ব্যক্তিগত উদাহরণ স্থাপন এবং নিবিড় প্রশিক্ষণের জন্য রাসুলুল্লাহ (স) একজন নয়, বরং এমন একদল নেতা তৈরি করেছিলেন যারা তাঁর মৃত্যুর পরও দীর্ঘদিন তার বার্তাটি এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। এটা সত্য যে তাঁর মৃত্যুর তিন দশক পরে বিভিন্ন রকম দ্বন্দ্ব হয়েছিল যা এমন পরিণতির দিকে নিয়ে গিয়েছে যা তিনি চাইতেন না বা অনুমোদন করতেন না। তবে এই বাস্তবতা কেবল সেই প্রকৃত সত্যকেই তুলে ধরে যে, কোনও মহান প্রচেষ্টাই সর্বকালের জন্য পর্যাপ্ত নয়। এর ফলাফল অবিরত রাখতে হলে এটি অবশ্যই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জারী রাখতে হবে।

ইতিহাসে যাই ঘটুক, মুহাম্মাদ (স) বিশ্বের জন্য যে উদাহরণ ও মডেল রেখে গেছেন, যে কেউ এর থেকে উপকৃত হতে আগ্রহী তার জন্য এটি স্পষ্ট, প্রাণবন্ত এবং কার্যকরী। এটা সত্য যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সময় থেকে বিশ্ব অনেক বদলেছে কিন্তু তিনি যে নীতিগুলি রেখে গেছেন তা এখনও প্রকৃতির অন্যান্য নিয়মের মতোই সত্য যে সব নিয়ম সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয় না। মহাকর্ষ বা বায়ুবিদ্যুতের সূত্রের মতোই এই পৃথিবীতে এবং পরবর্তী সময়ে সাফল্যের সূত্র একই থাকে। বিশ্বকে এই শিক্ষা দেওয়ার জন্যই মুহাম্মদ (স) কে প্রেরণ করা হয়েছিল। আমরা এর সাক্ষ্য দিই এবং আল্লাহকে আমাদের তাঁর অনুগামী হওয়ার যোগ্য করে তুলতে প্রার্থনা করি।

শেষ কথা

আমি গত এক বছর ধরে যখন এই বইটি লিখছি, বিশ্ব মনে হচ্ছে আত্ম-ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলেছে। আল্লাহ এ সম্পর্কে যা বলেছেন তা আমার স্মরণ হচ্ছে:

কসম যুগের (সময়ের)। নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। কিন্তু তারা নয়, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে তাকীদ করে সত্যের এবং তাকীদ করে সবরের। (সূরা আসর ১০৩:১-৩)

আমি বিশ্বাস করি যে বিশেষত এই সময়ে মানুষের সব কিছুর উপরে যা প্রয়োজন তা হলো নীতি ভিত্তিক নেতৃত্ব। আল্লাহর রাসূল, মুহাম্মদ (স) এর জীবনের চেয়ে উত্তম মডেল আর কী হতে পারে। এমন একটি জীবন যা স্পষ্টভাবে নথিভুক্ত, কিংবদন্তি ও পৌরাণিক কাহিনী থেকে মুক্ত এবং একটি জীবন্ত উদাহরণ যে অন্যের প্রতি সহানুভূতি সহকারে এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং একই সাথে জীবনে সফল হওয়া, নৈতিক ও দায়িত্বের সাথে বেঁচে থাকা সত্যিই সম্ভব। এ কারণেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে তাঁর পবিত্র জীবনযাপন সম্পর্কে যা কিছুই আমি জানি আধুনিক ভাষা-পরিভাষার মাধ্যমে আপনাদের সামনে তুলে ধরবো যেন আমরা সবাই, মুসলমান ও অমুসলমান, বুঝতে পারি। আমার আশা যে আপনি এ থেকে উপকার পাবেন।

(সমাপ্ত)

(সর্বশেষ আপডেট: ২৯/০৯/২০১৯)

2 Comments on “রাসূলুল্লাহ (স) এর জীবন থেকে নেয়া নেতৃত্বের শিক্ষা”

    1. যা করতে পেরেছি তা এখানেই আছে, বাকীটুকু করা হয় নি। রোজার আগে শেষ কাজ করেছিলাম। আবার শুরু করার ইচ্ছা আছে, ইনশাআল্লাহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *