সত্যজিৎ রায়ের অরণ্যের দিনরাত্রি

sjff_01_img0039অরণ্যের দিনরাত্রি মুক্তি পায় ১৯৭০ সালে। সত্যজিৎ রায়ের মাস্টারপিস সিনেমা। এই সিনেমার আগে গোটা ষোল-সতেরোটি সিনেমা বানিয়ে নিজেকে ‘সিরিয়াস’ চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে পরিচিত করেছিলেন। এই বদনাম ঘোচাতে কিনা জানি না, তিনি গুপী গাইন বাঘা বাইনের মত হাস্যরসে ভরপুর চলচ্চিত্র নির্মান করেন ১৯৬৯ সালে। এর পরের বছরই ১৯৭০ সালে অরণ্যের দিনরাত্রি মুক্তি পায়। এই ছবিটিকে হাস্যরসাত্মক বা কমেডি ছবি বলতে এই অঞ্চলের সিনেমা দর্শকদের একটু কষ্ট হবে, কিন্তু রয় স্ট্যাফোর্ড নামের একজন শিক্ষক ও লেখক জানিয়েছেন, পশ্চিমা বিশ্বে নাকি এই চলচ্চিত্রটি কমেডি হিসেবে চিহ্নিত এবং উনি এই অবস্থানের বিপক্ষে দাড়িয়ে।

অরণ্যের দিনরাত্রি নামে পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি উপন্যাস আছে। সত্যজিৎ রায়ের অরণ্যের দিনরাত্রি সেই উপন্যাস অবলম্বনেই নির্মিত। সুনীল সম্পর্কে যাদের ধারনা আছে তারা জানেন, যৌবনে তিনি এবং তার কয়েক বন্ধু মাঝেমধ্যেই কোন পরিকল্পনা-ব্যতিরেকেই বেড়িয়ে পড়তেন। অরণ্যের দিনরাত্রি উপন্যাসটিও এরকম চারজন যুবককে কেন্দ্র করে লেখা যাদের একজন লেখক নিজেই। অনেকটা বাস্তব ঘটনার উপর ভিত্তি করেই উপন্যাসটি রচিত, কিন্তু ঠিক কোন অংশটি সুনীলের কল্পনাপ্রসূত তা আমার অজানা।

সুনীলের এই উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মান করলেও সত্যজিৎ তার নিজস্বতা যোগ করেছেন বিভিন্ন অংশে। উপন্যাসের চার যুবক ঝটিকা গন্তব্যহীন ভ্রমণে ট্রেনে উঠে পড়ে এবং হঠাৎ-ই এক রেলস্টেশনে নেমে পড়েছিল। কিন্তু সত্যজিৎ এই জায়গাটুকুতে পরিবর্তন করে চার যুবকে হাজির করেছেন তাদেরই একজন অসীমের প্রাইভেট গাড়িতে করে। এতে অবশ্য অসীমের চরিত্র চিত্রায়নে সহজ হয়। বাকী চরিত্রদের মধ্যে রয়েছে সঞ্জয় যে কিনা সরকারী চাকুরে, আছে হরি যে একজন স্পোর্টসম্যান এবং সদ্য প্রেম-প্রত্যাখ্যাত যুবক। আর আছে শেখর যে এখনো বেকার এবং সিনেমায় হাস্যরস উৎপাদক চরিত্র। এই চার যুবকের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আলাদা এবং এরা একেক ধরনের মানসিকতাকে উপস্থাপন করে। ছবিতে আছে তিন রমণী, দুজন কোলকাতার শহুরে আরেকজন স্থানীয় সাওতাঁল তরুণী। উপন্যাসে শহুরে দুই তরুণীর একজন অসীমের পরিচিত হলেও চলচ্চিত্রে তা নয়।

শহুরে ছেলেরা বনে-জঙ্গলে-অপরিচিত জায়গায় যায় ফূর্তি করতে – এটা স্বীকৃত বিষয়। অরণ্যের দিনরাত্রি উপন্যাস বা ছবিতেও একই বিষয় উঠে এসেছে। পার্থক্যটা হল – অল্প সময়ের যে ঘটনাপ্রবাহ তা তাদের জীবনে ছাপ রেখে যাওয়ার মতই ঘটনা। কাহিনীর সাথে জড়িত প্রধান ছয় চরিত্রকে নিয়ে পিকনিক সিকোয়েন্স সম্ভবত এই ছবির সবচে দুর্দান্ত অংশ – দৃশ্যায়ন এবং খেলায়। এই ছবির ব্যকগ্রাউন্ড স্কোর কি সার্জিও লিওনি-র সিনেমার মিউজিক দ্বারা প্রভাবিত কিনা আমি নিশ্চিত নই, বেশ কয়েকবার তাই মনে হল। সত্যজিৎ পশ্চিমা সঙ্গীত-স্টোরিটেলিং দ্বারা প্রভাবিত, সুতরাং অসম্ভব কিছু না। মজার বিষয় হল – ক্যামেরার অবস্থান। বেশিরভাগ চরিত্রকেই তুলে ধরা হয়েছে লো অ্যাঙ্গেল শটের মাধ্যমে। এর মাজেজাও আমার অজানা।

সিনেমাবোদ্ধারা অরণ্যের দিনরাত্রি সম্পর্কে নানা রকম অবস্থান নিয়েছেন, নানা ভাবে এই দৃশ্য এবং কর্মকান্ড ব্যাখ্যা করেছেন। শিক্ষা নিয়েছেন সিনেমা নির্মাতারাও। এই একই সিনেমার সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে গৌতম ঘোষ বানিয়েছেন আবার অরণ্যে – যদিও একে সিক্যুয়াল বলা যায় না, তবে ঘটনাপ্রবাহের মিল পাওয়া যায়। অঞ্জন দত্তের চল লেটস গো ছবির চরিত্রগুলো এসেছে এই সিনেমা থেকে। আরও হয়তো পাওয়া যাবে – যা প্রকাশিত হয় নি। অর্থ্যাৎ অরণ্যের দিনরাত্রি একটি প্রভাববিস্তারী সিনেমা। এই প্রভাববিস্তার আজও অব্যাহত আছে, থাকবে আরও বহুদিন!


দারাশিকো

নাজমুল হাসান দারাশিকো। চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখক ও ব্লগার। কোঅর্ডিনেটর, বাংলা মুভি ডেটাবেজ (বিএমডিবি) যোগাযোগ - [email protected]

You may also like...

ফেসবুক মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares