দুবাইফেরত আজিজভাইয়ের বিয়েতে

সোহাগ কমিউনিটি সেন্টারে দুবাই ফেরত আজিজ ভাইয়ের বিয়ে হচ্ছে আর আমি বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে পালিয়ে থাকার জন্য আমি মোবাইল ফোন সাইলেন্ট মোডে নিয়ে অফিস থেকে মতিঝিলে মনির ভাইয়ের অফিসে গিয়ে বসে থাকলাম।

আজিজ ভাই হল আমার বন্ধু মাহাবুবের ইমিডিয়েট বড় ভাই, মাঝে মাঝেই মাহাবুবের বাসায় গিয়ে রাত থাকার সুবাদে তার সাথে খাতির হয়ে গিয়েছিল। উনার সাথে পরিচয়ের বছর দেড়েক পরে তিনি দুবাই চলে যান, সেখানে বছর দুয়েক চাকরী করে কিছুদিন আগে দেশে ফিরে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দুবাই ফিরে যাবেন না। বিলেত থেকে ফিরলে যদি বিলেতফেরত হতে পারেন, দুবাই থেকে ফিরলে তবে কেন দুবাইফেরত হবেন না – আমাদের এই কারণ দর্শানো নোটিশের সন্তোষজনক জবাব দেয়ার আগেই আজিজ ভাইয়ের নাম হয়ে গেল ‘দুবাইফেরত আজিজভাই’, আজ উনার বিয়ে।

দুবাইফেরত আজিজভাই যে আমার গার্লফ্রেন্ডকে বিয়ে করছেন তা না, বিয়ের অনুষ্ঠান আমার কাছে কেমন গ্যাঞ্জাম গ্যাঞ্জাম লাগে।বহুদিন দেখা সাক্ষাত হয় না এমন মানুষজনের সাথে দেখা হয়ে যায় – আমার কেমন অস্বস্তি লাগে। প্রায় সব বিয়ের অনুষ্ঠানের দিনই আমার হয় শরীর খারাপ করে, নাহয় পরেরদিন পরীক্ষা বা অ্যাসাইনমেন্ট সাবমিশন টাইপের জরুরী কাজ পড়ে যেত স্টুডেন্ট লাইফে, এখন অফিসে কাজের চাপ বেড়ে যায়, নয়তো বসের সাথে মিটিং করা লাগে। আজকে বসের সাথে মিটিং।

মনির ভাই আমাকে তাদের ক্যান্টিনে চা খাওয়াতে নিয়ে গেল। ক্যান্টিনটা তাদের পাচঁতলা বিল্ডিং এর টপ ফ্লোরে। সম্ভবত ক্যান্টিনের ইজারাদারের আজকেই প্রথমদিন, ব্যারাছ্যাড়া অবস্থা। বারো তেরো বছরের কিশোর ছেলেটা চা দিয়ে গেল। চা বলতে গরম পানিতে একটা টিব্যাগ ডুবানো, নিজে নেড়ে চেড়ে লিকার ঠিক করে নিতে হবে। টিব্যাগের মাথা ধরে বেশী নাড়াচাড়া করছিলাম সম্ভবত, হঠাৎ ব্যাগটা খুলে চায়ের কাপে পড়ে গেল। কি মুশকিল। ছেলেটাকে ডেকে বললাম, ‘ব্যাগটা ভেতরে পরে গেছে, একটা চামচ দাও’ – সে হাতে করে চামচের বদলে আরেকটা টি-ব্যাগ নিয়ে এল। নতুন টিব্যাগটা রেখে তাকে বুঝিয়ে বলতে হল – তারপর সে চামচ নিয়ে এল। আমি চায়ে ডুবিয়ে পরোটা খেতে শুরু করলাম।

মনিরভাই এতক্ষন চায়ে চুমুক দেয় নি, আমি চায়ে পরোটা ডুবাতে তিনিও মুখে দিলেন। ‘অ্যাক! একফোটা চিনিও দেয় নাই’ – ছেলেটাকে আবার ডাকা হল – ‘চায়ে চিনি কই?’

ছেলেটা সরল হেসে চায়ের কাপ নিয়ে গেল। চিনি দিয়ে ফেরত দিয়ে দাড়িয়ে থাকল। মনির ভাই চুমুক দিয়েই কাপ নামিয়ে রাখল – ‘এইবার শরবত বানায়া ফেলছস’ – ছেলেটা এইবারও দাঁত দেখিয়ে হাসল। ‘আজকে পরথম বানাইলাম’ – প্রথমদিনের তুলনায় তার স্ট্যাটাস ভালো, চায়ে টি-ব্যাগ দিতে ভুলে নাই!

চা খেতে খেতে মনিরভাই আমার মোবাইল নিয়ে দেখছিল। হঠাৎ ‘ইরে, রিসিভ করে ফেলছি’ বলে ফোনটা বাড়িয়ে দিল। আমি হাতে নিয়ে দেখি দুবাইফেরত আজিজভাইয়ের কল, উনি হ্যালো হ্যালো করছেন।

আমি মোবাইল কানে নিয়ে ফিসফিস করে বললাম, ‘আজিজভাই, আমি মিটিং এ, বসের সাথে! আপনারে পরে ফোন দিতেছি।’

‘দাঁড়া খারাশিকো’ – মোবাইলে আজিজভাইয়ের চিৎকার শুনলাম। ‘তোর বস ডঃ আইয়ূব না? সে আমার শ্বশুরের সাথে কথা বলতেছে, তোরে দেখি না ক্যান? তোর বসরে জিগামু?’

আমি কেশে গলা পরিস্কার করে নিলাম – ‘আরে কি যে বলেন, আমি আইসা পড়লাম প্রায়, একটু মজা নিতেছিলাম আরকি!’

সোহাগ কমিউনিটি সেন্টারে পৌছাতে মিনিট বিশেক লাগল, by বাইসাইকেল। পাগড়ি পড়া দুবাইফেরত আজিজ ভাইয়ের সাথে কোলাকুলি করার সময় তিনি আমার ডান কান টেনে ধরে বাম কানে বললেন – ‘তোর গায়ে চাপাতির গন্ধ ক্যান? মনে হচ্ছে কফিন থেকে উঠে আসছস।’ সর্বনাশ! মনিরভাইয়ের ক্যান্টিনে ছেলেটা যে টি-ব্যাগটা দিয়েছিল সেটা কখন যেন শার্টের পকেটে ঢুকিয়ে ফেলেছিলাম – এখন ভুর ভুর করে গন্ধ বের হচ্ছে!

‘চাপাতি না, সেন্ট। দার্জিলিং থেকে আনছে, আজকে প্রথম ইউজ করলাম। আপনার পাগড়িটা দেন তো, একটা ছবি তুলি’ – দুবাইফেরত আজিজভাইয়ের পাগড়িটা মাথায় দিয়ে কয়েকটা ছবি তুললাম, সিঙ্গল একটা, আর মাহাবুব সহ অন্যান্য বন্ধুবান্ধব সহ কয়েকটা।

রাত দেড়টার দিকে দুবাইফেরত আজিজভাই’র ফোনে আমার ঘুম ভাংল – হারামজাদা তুই আমার পাগড়ির মধ্যে টি ব্যাগ রাখছস ক্যান! আমি তাড়াতাড়ি মোবাইলটা বালিশের নিচে ঢুকিয়ে ফেললাম!

(পাগড়ি পরা ছবিটা হারায়া ফেলছি। দুবাইফেরত আজিজভাইয়ের প্রি-বিবাহ অনুষ্ঠানের একটা ছবির লিংক দিলাম, উনার গলায় মালার সাথে ডানদিকে যে হাতটা ওইটা আমি

  )

Photo: সোহাগ কমিউনিটি সেন্টারে দুবাই ফেরত আজিজ ভাইয়ের বিয়ে হচ্ছে আর আমি বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে পালিয়ে থাকার জন্য আমি মোবাইল ফোন সাইলেন্ট মোডে নিয়ে অফিস থেকে মতিঝিলে মনির ভাইয়ের অফিসে গিয়ে বসে থাকলাম।   আজিজ ভাই হল আমার বন্ধু মাহাবুবের ইমিডিয়েট বড় ভাই, মাঝে মাঝেই মাহাবুবের বাসায় গিয়ে রাত থাকার সুবাদে তার সাথে খাতির হয়ে গিয়েছিল। উনার সাথে পরিচয়ের বছর দেড়েক পরে তিনি দুবাই চলে যান, সেখানে বছর দুয়েক চাকরী করে কিছুদিন আগে দেশে ফিরে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দুবাই ফিরে যাবেন না। বিলেত থেকে ফিরলে যদি বিলেতফেরত হতে পারেন, দুবাই থেকে ফিরলে তবে কেন দুবাইফেরত হবেন না - আমাদের এই কারণ দর্শানো নোটিশের সন্তোষজনক জবাব দেয়ার আগেই আজিজ ভাইয়ের নাম হয়ে গেল 'দুবাইফেরত আজিজভাই', আজ উনার বিয়ে।  দুবাইফেরত আজিজভাই যে আমার গার্লফ্রেন্ডকে বিয়ে করছেন তা না, বিয়ের অনুষ্ঠান আমার কাছে কেমন গ্যাঞ্জাম গ্যাঞ্জাম লাগে।বহুদিন দেখা সাক্ষাত হয় না এমন মানুষজনের সাথে দেখা হয়ে যায় - আমার কেমন অস্বস্তি লাগে। প্রায় সব বিয়ের অনুষ্ঠানের দিনই আমার হয় শরীর খারাপ করে, নাহয় পরেরদিন পরীক্ষা বা অ্যাসাইনমেন্ট সাবমিশন টাইপের জরুরী কাজ পড়ে যেত স্টুডেন্ট লাইফে, এখন অফিসে কাজের চাপ বেড়ে যায়, নয়তো বসের সাথে মিটিং করা লাগে। আজকে বসের সাথে মিটিং।   মনির ভাই আমাকে তাদের ক্যান্টিনে চা খাওয়াতে নিয়ে গেল। ক্যান্টিনটা তাদের পাচঁতলা বিল্ডিং এর টপ ফ্লোরে। সম্ভবত ক্যান্টিনের ইজারাদারের আজকেই প্রথমদিন, ব্যারাছ্যাড়া অবস্থা। বারো তেরো বছরের কিশোর ছেলেটা চা দিয়ে গেল। চা বলতে গরম পানিতে একটা টিব্যাগ ডুবানো, নিজে নেড়ে চেড়ে লিকার ঠিক করে নিতে হবে। টিব্যাগের মাথা ধরে বেশী নাড়াচাড়া করছিলাম সম্ভবত, হঠাৎ ব্যাগটা খুলে চায়ের কাপে পড়ে গেল। কি মুশকিল। ছেলেটাকে ডেকে বললাম, 'ব্যাগটা ভেতরে পরে গেছে, একটা চামচ দাও' - সে হাতে করে চামচের বদলে আরেকটা টি-ব্যাগ নিয়ে এল। নতুন টিব্যাগটা রেখে তাকে বুঝিয়ে বলতে হল - তারপর সে চামচ নিয়ে এল। আমি চায়ে ডুবিয়ে পরোটা খেতে শুরু করলাম।  মনিরভাই এতক্ষন চায়ে চুমুক দেয় নি, আমি চায়ে পরোটা ডুবাতে তিনিও মুখে দিলেন। 'অ্যাক! একফোটা চিনিও দেয় নাই' - ছেলেটাকে আবার ডাকা হল - 'চায়ে চিনি কই?'  ছেলেটা সরল হেসে চায়ের কাপ নিয়ে গেল। চিনি দিয়ে ফেরত দিয়ে দাড়িয়ে থাকল। মনির ভাই চুমুক দিয়েই কাপ নামিয়ে রাখল - 'এইবার শরবত বানায়া ফেলছস' - ছেলেটা এইবারও দাঁত দেখিয়ে হাসল। 'আজকে পরথম বানাইলাম' - প্রথমদিনের তুলনায় তার স্ট্যাটাস ভালো, চায়ে টি-ব্যাগ দিতে ভুলে নাই!  চা খেতে খেতে মনিরভাই আমার মোবাইল নিয়ে দেখছিল। হঠাৎ 'ইরে, রিসিভ করে ফেলছি'  বলে ফোনটা বাড়িয়ে দিল। আমি হাতে নিয়ে দেখি দুবাইফেরত আজিজভাইয়ের কল, উনি হ্যালো হ্যালো করছেন।   আমি মোবাইল কানে নিয়ে ফিসফিস করে বললাম, 'আজিজভাই, আমি মিটিং এ, বসের সাথে! আপনারে পরে ফোন দিতেছি।'  'দাঁড়া খারাশিকো' - মোবাইলে আজিজভাইয়ের চিৎকার শুনলাম। 'তোর বস ডঃ আইয়ূব না? সে আমার শ্বশুরের সাথে কথা বলতেছে, তোরে দেখি না ক্যান? তোর বসরে জিগামু?'  আমি কেশে গলা পরিস্কার করে নিলাম - 'আরে কি যে বলেন, আমি আইসা পড়লাম প্রায়, একটু মজা নিতেছিলাম আরকি!'  সোহাগ কমিউনিটি সেন্টারে পৌছাতে মিনিট বিশেক লাগল, by বাইসাইকেল। পাগড়ি পড়া দুবাইফেরত আজিজ ভাইয়ের সাথে কোলাকুলি করার সময় তিনি আমার ডান কান টেনে ধরে বাম কানে বললেন - 'তোর গায়ে চাপাতির গন্ধ ক্যান? মনে হচ্ছে কফিন থেকে উঠে আসছস।' সর্বনাশ! মনিরভাইয়ের ক্যান্টিনে ছেলেটা যে টি-ব্যাগটা দিয়েছিল সেটা কখন যেন শার্টের পকেটে ঢুকিয়ে ফেলেছিলাম - এখন ভুর ভুর করে গন্ধ বের হচ্ছে!   'চাপাতি না, সেন্ট। দার্জিলিং থেকে আনছে, আজকে প্রথম ইউজ করলাম। আপনার পাগড়িটা দেন তো, একটা ছবি তুলি' - দুবাইফেরত আজিজভাইয়ের পাগড়িটা মাথায় দিয়ে কয়েকটা ছবি তুললাম, সিঙ্গল একটা, আর মাহাবুব সহ অন্যান্য বন্ধুবান্ধব সহ কয়েকটা।   রাত দেড়টার দিকে দুবাইফেরত আজিজভাই'র ফোনে আমার ঘুম ভাংল - হারামজাদা তুই আমার পাগড়ির মধ্যে টি ব্যাগ রাখছস ক্যান! আমি তাড়াতাড়ি মোবাইলটা বালিশের নিচে ঢুকিয়ে ফেললাম!   (পাগড়ি পরা ছবিটা হারায়া ফেলছি। দুবাইফেরত আজিজভাইয়ের প্রি-বিবাহ অনুষ্ঠানের একটা ছবির লিংক দিলাম, উনার গলায় মালার সাথে যে হাতটা ওইটা আমি ;) )


দারাশিকো

নাজমুল হাসান দারাশিকো। চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখক ও ব্লগার। কোঅর্ডিনেটর, বাংলা মুভি ডেটাবেজ (বিএমডিবি) যোগাযোগ - [email protected]

You may also like...

ফেসবুক মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares