রাসূলুল্লাহ (স) এর জীবন থেকে নেয়া নেতৃত্বের শিক্ষা

রাসূলুল্লাহ-স-এর-জীবন-থেকে-নেয়া-নেতৃত্বের-শিক্ষা-Leadrship-lessons-from-the-life-of-Rasoolullah

 রাসূলুল্লাহ-স-এর-জীবন-থেকে-নেয়া-নেতৃত্বের-শিক্ষা-Leadrship-lessons-from-the-life-of-Rasoolullah

রাসূলুল্লাহ (স) এর জীবন থেকে নেয়া নেতৃত্বের শিক্ষা কোন মৌলিক রচনা নয়। এটি মীর্জা ইওয়ার বেগ রচিত বই Leadership Lessons from the life of Rasoolullah বইয়ের অনুবাদ।সরাসরি অনুবাদ বলা যাবে না, অনুবাদ প্রচেষ্টা বলা যেতে পারে। চেষ্টা করবো সম্পূর্ণ বইটি অনুবাদ করতে। তখন হয়তো এই অংশটুকু পুনরায় লেখা হবে। আপাতত অনুবাদের কাজ শুরু করি।

সূচিপত্র

  • শুরুর কথা
  • অসাধারণ হবার উপায়
  • অসাধারণ বিশ্বাস কি
  • এক্সট্রাঅর্ডিনারী লক্ষ্য
  • এক্সট্রাঅর্ডিনারী অঙ্গীকার
  • এক্সট্রাঅর্ডিনারী দল
  • এক্সট্রাঅর্ডিনারী গুণাবলী
  • বিশ্বাস ও বার্তায় পূর্ণ নিশ্চয়তা
  • বার্তায় আপসে রাজী না হওয়া
  • নিজেকে সারিতে স্থাপন করা
  • Resilience: কঠিন সত্যের মুখোমুখি হওয়া এবং সফলতায় নিশ্চিত বিশ্বাস
  • ব্যক্তিগত পছন্দের আগে লক্ষ্য
  • বার্তায় বেঁচে থাকা
  • ঝুঁকি গ্রহণ
  • বৃহৎ উদ্দেশ্যের জন্য ক্ষুদ্র উদ্দেশ্য সমর্পন
  • মহানুভবতা ও ক্ষমাপরায়নতা
  • ব্যক্তি-পরিচালনা থেকে প্রক্রিয়া-পরিচালনায় স্থানান্তর
  • উত্তরাধিকার পরিকল্পনা এবং নেতৃত্ব তৈরি
  • শেষ কথা

শুরুর কথা

If greatness of purpose, smallness of means and astounding results are the three criteria of human genius then who could dare to compare any great man in history with Muhammad?

Lamartine, French historian and educator

২০০৮ সালে হজ্জের তিন দিন পরের ঘটনা। সৌদী আরবের হজ্জ মন্ত্রনালয় আয়োজিত বার্ষিক হজ্জ কনফারেন্সে আমাকে দাওয়াত দেয়া হয়েছে। কনফারেন্স এবং হজ্জের শেষে আমি এবং আমার স্ত্রী মক্কা থেকে মদীনা ঘুরেছি। মদীনাতুর-রাসূল, রাসূলুল্লাহর শহর। যখন তিনি এখানে থাকার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন, তিঁনি এর নাম দিয়েছিলেন মুনাওয়ারাহ (ব্রিলিয়ান্ট, জাজ্জ্বল্যমান)। খুবই বিশিষ্ট একটি জায়গা যা আপনি কখনোই ছেড়ে যেতে চাইবেন না। আমি খুব অবাক হয়ে ভাবি, তিঁনি যখন জীবিত ছিলেন এবং এখানে ছিলেন তখন কেমন ছিল। এমনকি এখনো, যখন তিনি কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত, তাঁর মহিমা ও উপস্থিতি পুরোটা জুড়ে রয়েছে এবং এই শহর ও তার লোকদের এমন বৈশিষ্ট্য দান করেছে যা একে আমি যত শহরে ঘুরে বেড়িয়েছি তা থেকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে। একজন মুসলমানের জন্য মদীনায় আসা মানে হল নিজের ঘরে আসা। এমন ঘর যা তার জন্মস্থানের চেয়েও প্রিয়। এই ঘরেই সে মৃত্যুবরণ এবং কবরস্থ হতে চায়। কোন মুসলমানের কাছে মদীনা সৌদী আরব না। এটা ইসলাম, এটা তার হৃদয়, এমন একটি জায়গা যেখানে যেতে সে ব্যাকুল, এমন জায়গা যেখানে মোহাম্মদ (স) এর বাড়ি। মদীনার জন্য এই আকুলতা নিয়ে কত কবি যে কত কবিতা লিখেছে তার ইয়ত্তা নেই!

ভোর থেকেই তাঁকে ভালোবেসে দেখতে লক্ষ লক্ষ লোকের উপস্থিত হওয়ার অনেক আগেই তাহাজ্জুদ নামাজে তাড়িয়ে আমি তাঁর প্রতি সালাম পৌছালাম। কেমন ছিল সেই সময় যখন অন্যান্যরা তাঁর কাছে আসতো এবং তিনি এখানে সশরীরে উপস্থিত থেকে তাদের সালামের জবাব দিতেন এবং তাদের মিষ্ট হাসি উপহার দিতেন যে হাসি তাদের কাছে জীবনের চেয়েও বেশি দামী। যারা তাঁর পেছনে দাড়িয়ে নামাজ পড়েছে, যার উপর কোরআন নাযিল হয়েছে তার মুখ থেকেই কুরআন শুনেছে তারা কতইনা ভাগ্যবান!

১৪৩৫ বছর পরে বর্তমান সময়ে আমরা যারা তাকে দেখিনি এবং তার সুমধুর কণ্ঠস্বরও শুনতে পাইনি তারা তাঁকে অন্য যে কেউ বা যে কোন কিছুর তুলনায় অনেক বেশি ভালোবাসি। আমি যখন আল্লাহর কাছে তাঁর প্রতি রহমত বর্ষণের জন্য এবং আমাদেরকে ইসলামের দিকে পথ দেখানোর জন্য তাঁকে সর্বোচ্চ পুরস্কার দেয়ার দোয়া করছিলাম, আমার দু’চোখ ভেসে যাচ্ছিল। মদীনা হল রাসূলুল্লাহ (স)। আরবরা একে বলে মদীনাতুর-রাসূল বা রাসূলের শহর। এখানে যারা বসবাস করে তারা অনেক গর্বিত। অন্য অনেক জায়গার চেয়ে অনেক কম আয় করার পরও বহু লোক এই শহরকে বসবাসের জন্য বেছে নিয়েছে শুধুমাত্র এ কারণে যে তারা মদীনা ছেড়ে যেতে চান না। তিঁনি যে আলো জ্বালিয়েছিলেন, বহু বছর, প্রজন্ম, শতাব্দী ধরে তা আজও জ্বলছে, পৃথিবীতে আলো ছড়িয়েছে এবং যারা তাঁর আহবানকে গ্রহণ করতে রাজী হয়েছে তাদের কাছ পর্যন্ত পৌছে গেছে।

আমি রাসূলুল্লাহর (স) পাঁচটি অসাধারণ গুণের উল্লেখ করবো যা রাসূল (স) তার জীবনে পালন করেছেন এবং তার অনুসারীদের মধ্যে এত সফলভাবে বদ্ধমূল করে দিয়েছেন যে তা তাদেরকে এমন একটি দলে পরিনত করেছিল যা পৃথিবী আগে কখনো দেখেনি। সম্পূর্ণ বিসদৃশ কিছু উপজাতি যারা খুব তুচ্ছ কারণে নিজেদের মধ্যে মারাত্মক যুদ্ধ-বিগ্রহে জড়িয়ে পড়ার জন্য পরিচিত ছিল তাদেরকে একত্রিত করেছিলেন, এবং তারা পৃথিবীর যেখানেই গিয়েছেন সর্বোৎকৃষ্ট আচরণ এবং পথপ্রদর্শকের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

এ গুণগুলো হল:

leadership-qualities-from-the-life-of-rasoolullah

অসাধারণ হবার উপায়

কেন অসাধারণ হতে হবে? কারণ ‘যথেষ্ট ভালো’ হওয়া কখনোই যথেষ্ট নয়।

শুরুতেই ব্যাখ্যা করি আমি ‘এক্সট্রাঅর্ডিনারি’ বা অসাধারণ বলতে কি বুঝাচ্ছি, কারণ এর উপর ভিত্তি করেই বাকীটুকু বলবো। বিখ্যাত ফরাসী শিক্ষাবিদ আলফনসো ডি ল্যামারটিন (Alphonse de Lamartine) এর একটি উক্তি আছে,

‘যদি উদ্দেশ্যের শ্রেষ্ঠত্ব, উপকরণের ক্ষুদ্রতা এবং স্তম্ভিত করার মত ফলাফল মানবিক অসাধারনত্বের তিনটি শর্ত হয়, তাহলে ইতিহাসে মুহাম্মদের সাথে তুলনা করার মত আর কে আছে? দার্শনিক, ধর্মপ্রচারক, আইনপ্রণেতা, যোদ্ধা, চিন্তার বিজয়ী, যৌক্তিক বিশ্বাসের পুনস্থাপনকারী, বিশটি স্থলজ এবং একটি আধ্যাত্মিক রাজ্যের স্থপতি – তিনিই মুহাম্মদ। মানবিক শ্রেষ্ঠত্ব পরিমাপক যে কোন সূচকের বিবেচনায় যদি আমরা জিজ্ঞেস করি, তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠতর আর কে আছে? [Historie de le Turquie, Paris 1854, Vol:11, Pages 276-77]

অন্যরা যা চিন্তা করে তার চেয়ে বেশি কিছু করা জ্ঞানের পরিচয়ক, যুক্তিসঙ্গত বা যৌক্তিক। অসাধারণ হতে হলে যে কোন উপায়ে অস্বাভাবিক রকম সেরা হতে হবে। মনের গহীনে এমন ডাক শুনতে পারা যা অন্যরা বড়জোর চিন্তা করতে পারে, সেই তালে পথ চলা যা অন্যরা শুনতেও পারে না, তাসত্ত্বেও তাদের পা বাড়াতে উৎসাহ জোগায়। এ ধরনের লোক তারাই যারা এক্সট্রাঅর্ডিনারি, যারা খুবই ইন্সপায়ারিং। শুধু শ্বাস নেয়ার জন্য বেঁচে থাকা নয়। তাই কেউ যদি নেতৃত্ব দিতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই টিকে থাকার চেয়ে বেশি কিছু করতে হবে। এমন কিছু করতে হবে যা অন্য কেউ করেনি, লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে নয়, বরং সবাই যেন বুঝতে পারে তাদের পক্ষেও এমনটি করা সম্ভব। There is nothing sublime in pretending to be less than you are. নেতা হতে হলে ক্রমাগত নিজের ধ্যান-ধারনা এবং নিজের তৈরী সীমারেখা পেরিয়ে যেতে হয় কারণ শীর্ষে পৌছানোর ক্ষেত্রে বাধা একটিই, তা হলো তার নিজের মন।

নেতা হতে হলে মানুষের মন এবং আধ্যাত্মিক দুনিয়ার এমন গহীনে যাওয়ার সাহস অবশ্যই থাকতে হবে যেখানে কেউ অভিযান চালানোর সাহসই করে নি। সবসময় সঠিক বলে বিবেচনা করা হয়েছে এমন বিষয়কেও প্রশ্ন করতে হবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে ধরনাকে সত্য বলে গ্রহণ করা হয়েছে তাকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে। যত মূল্যই দিতে হোক না কেন তাকে অবশ্যই সত্যের পক্ষে দাড়াতে হবে। তাকে অবশ্যই নির্যাতিত, দুর্বল এবং বঞ্চিতদের পক্ষে এবং অত্যাচারীর বিপক্ষে দাড়াতে হবে তা সে যে কেউ হোক না কেন। এ সকল বিষয় একজন নেতাকে বিশ্বাস অর্জন করতে সাহায্য করে যা, বিশ্বাস হল নেতৃত্বের ভিত্তি। একজন নেতাকে কেবল ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বস্ত হতে হবে তা নয়, বরং জনগণের মধ্যে এই বিশ্বাস থাকতে হবে যে তাকে অনুসরণ করার মধ্যে কল্যাণ আছে। সংজ্ঞানুযায়ী, নেতৃত্ব সম্মুখে থেকেই দিতে হয়। তাই নেতৃত্ব প্রদান বিশাল সাহসের ব্যাপার। প্রত্যাশা সামান্য হলে মানুষ জেগে উঠে না,  তারা জাগে যখন প্রত্যাশা বেশি হয়। তাদের এমন নেতা প্রয়োজন যে এগিয়ে নিতে পারে, পিছিয়ে নিতে নয়।

নেতাকে একইসাথে অবশ্যই লক্ষ্য এবং কৌশল সম্পর্কে পরিষ্কার ধারনা রাখতে হবে। কেবল বড় বড় স্বপ্ন দেখা যথেষ্ট নয় যদি সেগুলো কিভাবে অর্জন করা হবে সে ব্যাপারে কোন ধারনা না থাকে। একজন নেতাকে স্বপ্ন দেখার মত যোগ্য হতে হবে এবং তার অনুসারীদেরকে এমন এক পথ ধরে নিয়ে যেতে হবে যেই পথ শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে পারবে। এক্সট্রাঅর্ডিনারী বা অসাধারণ হতে হলে একই সাথে স্বপ্ন দেখার মত ক্ষণস্থায়ী কাজ এবং সেই স্বপ্নকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মত দীর্ঘস্থায়ী কাজও করার মত যোগ্য হতে হবে। এজন্য বিভিন্ন ধরনের কাজের জন্য বিভিন্ন রকমের লোক প্রয়োজন হয় এবং এ ধরনের লোক খুঁজে বের করাও একটি কাজ, কারণ একজন নেতা একই সবকিছু করতে পারে না। কৌশল বাস্তবায়নের জন্য খুবই যোগ্য এবং অনুগত একদল লোক তৈরী করা না হলে সবচে উত্তম স্বপ্নটিও আকাঙ্খার রাজ্যে নির্বাসিত হতে বাধ্য। একদল অনুসারীকে জোগাড় করা, তাদেরকে নিজেদের সর্বোচ্চ ত্যাগে অনুপ্রাণিত করা, তাদেরকে প্রশিক্ষিত ও পরিচালনা করা এবং সবশেষে তাদের পাশে থেকে প্রশিক্ষণ অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের কাজগুলো ঠিকমত করছে কিনা তা নজরদারি করার মত কাজগুলো একজন অসাধারণ নেতার অবশ্য পালনীয় কাজ।

সবার শেষে একজন অসাধারণ নেতাকে অবশ্যই এমন একটি ব্যবস্থা তৈরী করে যেতে হবে যা তার দীর্ঘ অনুপস্থিতি সত্ত্বেও তার কাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। কোন অসাধারণ প্রতিভাকে যদি কোন প্রক্রিয়ার মধ্যে রূপান্তর করা না যায় তাহলে নেতার মৃত্যুর সাথে সাথে তারও মৃত্যু অবধারিত – নষ্টালজিয়া হিসেবে হয়তো পরে একসময় স্মরণ করা হবে কিন্তু নেতার পরবর্তী প্রজন্ম তার প্রতিভা থেকে কোনভাবে উপকৃত হবে না। কোন মহৎ সংগঠনকে সফল হতে হলে নেতাকে ব্যক্তি-পরিচালনাধীন থেকে কার্য-পরিচালনাধীনে রূপান্তর করতেই হবে। তা না হলে নেতার কাজ জেনারেশনকে পরিবতর্ন করার মত কিছু হবে না।

রাসূলুল্লাহ (স) এক্সট্রাঅর্ডিনারি লিডারশিপের মানদণ্ড এত প্রাণবন্ত ও স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেছেন যে তার সবচে খারাপ শত্রুও তার পক্ষে কথা বলে বাধ্য হবে। এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণক ঘটনা হল রাসূলুল্লাহ (স) এর চিঠি পাওয়ার পর বাইজেন্টাইন সম্রাজ্যের রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াসের সাতে আবু সুফিয়ানের কথোপকথনের ঘটনা। আমি পরবর্তীতে এই ঘটনা সবিস্তারে উল্লেখ করেছি।

অসাধারণ হওয়া নেতার ইচ্ছাধীন বিষয় নয়। এটা নেতা হতে চাওয়া যে কোন লোকের জন্য অত্যাবশ্যকীয় কাজ। এমন সব দিকে অসাধারণ হতে হবে যা লোকদের অনুপ্রেরনা দিবে, শক্তিমান করবে, তাদের মধ্যে শক্তি সঞ্চার করবে এবং তাদের ক্ষমতায়ন করবে। সাহসীরাই অন্যদেরকে সাহস দিতে পারে এবঙ মানবজাতির ইতিহাসে এমন কেউ নেই যে মুহাম্মদ (স) এর মত জীবনের সকল ক্ষেত্রে অসাধারণ নেতৃত্বের উদাহরণ দেখিয়েছে। এ কারণেই তার সাথীরা তার প্রতি আনুগত্যের এক উদাহরণীয় ভিন্ন মাত্রা প্রদর্শন করেছিল। তারা তাঁকে ভালোবেসেছিল এবং তিনিও তাদেরকে।

অসাধারণ বিশ্বাস কি?

রাসূলুল্লাহ (স) এর মধ্যে যে অসাধারণ গুণাবলীর সন্নিবেশ ঘটেছিল তার মধ্যে প্রথমটি হল ‘বিশ্বাস বা ফেইথ। বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বারবারা উইন্টার্সের ভাষায় বলি – ঝুঁকি নেয়ার জন্য যথেষ্ট ভরসা করার যোগ্যতা।

‌‍”When you come to the end of the light of all that you know and are about to step off into the darkness of the unknown, faith is knowing that one of two things will happen. There will be something firm to stand on or you will be taught how to fly.” ~ Barbara Winters

যখন তুমি আলোর শেষ প্রান্তে পৌছে যাবে এবং অজানা অন্ধকারের দিকে পা বাড়াবে তখন এমন শক্ত কিছু পাবে যেখানে পা রাখা যাবে অন্যথায় উড়তে শিখে যাবে – এই দুটি জিনিসের যে কোন একটি ঘটবে এমন ধারনা করাটাই বিশ্বাস। – বারবারা উইন্টার্স

শব্দগুলোর ব্যবহার খেয়াল করুন। তিনি কিন্তু বলেন নি, Faith is believing. তিনি বলেছেন, ‘Faith is knowing’ এবং এই দুইয়ের মধ্যে বিশাল ফারাক রয়েছে। to know বা জানা কোন প্রকার সন্দেহের অবকাশ ছাড়াই সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত বিশ্বাস জ্ঞান করা। এটাই যে কেউকে ঝুঁকি নিতে সাহায্য করে। শেষ প্রান্তে পৌছে পা বাড়ানোর সময় বিশ্বাস করা –  আপনি ধ্বংস হবেন না বরং তার পরিবর্তে জ্ঞান ও আল্লাহর সাথে যোগাযোগের এমন স্তরে পা রাখবেন যা কখনো ভাবতেও পারেন নি।

বিশ্বাস খুবই জরুরী কারণ এটা ছাড়া মানুষের হৃদয়কে পরিবর্তন করার মত কঠিনতম কাজ করা অসম্ভব। এটি একটি ক্ষুদ্র শব্দ কিন্তু এর অর্থ বিশাল। একেক মানুষের কাছে এর অর্থ একেক রকম। তাই আমি ‘ফেইথ’ বলতে কি বুঝাচ্ছি তা বরং ব্যাখ্যা করি।

Extraordinary Faith Chart by Mirza Yawar Baig

আমার মতে ফেইথ হল একটি ডায়নামিক প্রসেস যেখানে তিনটি বিষয়ের মিথষ্ক্রিয়া ঘটে। এগুলো হল: কঠিন সময়ে ধৈর্য্য ধারণ করা এবং আল্লাহর নেয়ামতের জন্য শুকর-গুজার হওয়া, আমাদের পাপ ও ভুলগুলোর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং প্রার্থনার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য কামনা করা কারণ আমরা তাকে ভালোবাসি।

বারবারা উইন্টার্স যেভাবে বলেছে ফেইথ হল এমনভাবে জানা যখন কে সঠিক তার কোন চিহ্ন থাকে না। ফেইথ বস্তুবাদী দুনিয়ার মত অন্ধভাবে বিশ্বাস করা নয়। বিশ্বাস হল বস্তুকে অতিক্রম করে এমন কিছু দেখতে পারা যা খালি চোখ দিয়ে দেখা যায় না বা বর্ণনা করা যায় না কিন্তু হৃদয়ের চোখ দিয়ে পুরোপুরি অনুভব করা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি ঘটনা দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি।

জার্মানদের সাথে তীব্র এক যুদ্ধের পর একজন সৈনিক তার অফিসারের কাছ থেকে নো ম্যান’স ল্যান্ড এলাকায় গিয়ে সহযোদ্ধার দেহ নিয়ে আসার অনুমতি চাইল। অফিসার তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। বললেন, দেখো সে মরে গেছে। এখন তোমার নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তার দেহ নিয়ে আসার কি দরকার? কিন্তু সৈনিক তার অবস্থানে অনড়, ফলে অফিসার এক পর্যায়ে তাকে অনুমতি দিলেন এবং কোম্পানীকে নির্দেশ দিলেন সৈন্যটি সহযোদ্ধার দেহ নিয়ে ফেরত আসা পর্যন্ত তাকে কাভার দিতে। কয়েক মিনিট পরে সৈন্যটি অক্ষত অবস্থায় ফিরে এল, তার কাঁধে সেই বন্ধুটি। অফিসারটি জিজ্ঞেস করলেন, নিজের জীবনের ঝুঁকি নেয়ায় কি লাভ হল? বাঁচাতে তো আর পারলে না?

সৈন্যটি বলল, স্যার, আমি যখন তার কাছে পৌছে দেখলাম সে তখনো বেঁচে আছে। আমাকে দেখে সে বলল, আমি জানতাম তুমি আসবে। সে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল এবং সে আমার কাঁধেই মারা গিয়েছে। লাভ এটুকুই।

বিশ্বাস অন্ধ নয়। এটি এমন কিছু দেখতে পায় যা বিশ্বাসহীনতা দেখতে পারে না। এটি ভালোবাসা, নিষ্ঠা, বিনাস্বার্থে করা সহযোগিতার লেন্স দিয়ে দেখতে পায়। ভালোবাসার মানুষের সাথে থাকার তীব্র আকাঙ্খাই বিশ্বাস। বিশ্বাস তীব্র প্রচেষ্টায় হতাশার অন্ধকার রাস্তাকে আলোকিত করে কারণ এটি জানে এই পথে সফলতা ও ব্যর্থতা মাইলের হিসাবে মাপা হয় না বরং যিনি অন্তরের খোঁজ রাখেন তাকে সন্তুষ্ট করার অভিপ্রায়ে উঠে দাড়ানো ও প্রচেষ্টা চালানোর ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। যখন সবাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তখনও যে সামনের দিকে এগিয়ে যায় তার মুখের হাসিই বিশ্বাস কারণ সে এমন কিছু শুনতে পেয়েছে যা অন্যরা পায় নি।

সে যখন হাঁটে, অন্যরা থেমে গিয়ে তাকে দেখে এবং বিস্মিত হয়, তারপর ধীরে ধীরে তারাও ঘুরে দাড়ায় এবং তার সাথে যোগ দিতে থাকে এবং এটি একটি কাফেলায় রূপ নেয়। তারা তাকে অনুসরণ করে কারণ এর মধ্যেই তারা জীবনের অর্থ এবং নিজেদের পরিপূর্ণতা খুঁজে পায়।

ইসলামের ভাষায় বিশ্বাস হল ‘তাওয়াক্কুল’। এ ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেছেন,

আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্যে নিস্কৃতির পথ করে দেবেন। এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিযিক দেবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে তার জন্যে তিনিই যথেষ্ট। (সূরা তালাক ৬৫: ২-৩)

তাওয়াক্কুল বা বিশ্বাস উপরে বর্ণিত তিনটি কাজের ফলাফল।

তওবা (ক্ষমা প্রার্থনা)

আল্লাহ তায়ালা আমাদের অপরাধের জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার আদেশ করেছেন। তওবা হল পথনির্দেশনা পাবার প্রথম শর্ত কারণ তওবা হল কোন কিছু পরিবর্তনের আগ্রহ নির্দেশ করে। কোন ব্যক্তি যদি কোন পরিবর্তনের ব্যাপারে সচেতন না হয় বা প্রয়োজন অনুভব না করে তাহলে কোন পরিবর্তন বা সংশোধন সম্ভব নয়। তাই আমরা যখন তওবা করি তার মানে হল আমরা আমাদের মনোভাব এবং পথের পরিবর্তনের ব্যাপারে সচেতন হয়েছি।

আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম (আ) এবং হাওয়া (আ) কে প্রথম যে শিক্ষা দিয়েছিলেন তা হল তওবা। আদম – হাওয়া (আ) এবং ইবলিশ উভয়েই আল্লাহকে অমান্য করেছিল। কিন্তু পার্থক্য তৈরী হল তাদের মনোভাবে যখন তারা তাদের ভুল সম্পর্কে সচেতন হল। আদম ও হাওয়া (আ) অতিসত্বর অনুতপ্ত হলেন এবং বললেন,

তারা উভয়ে বললঃ হে আমাদের পালনকর্তা আমরা নিজেদের প্রতি জুলম করেছি। যদি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করেন, তবে আমরা অবশ্যই অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যাব। (সূরা আ’রাফ ৭: ২৩)

আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাদেরকে ক্ষমা করে দেন এবং সঠিক পথের নির্দেশনা দেন এবং তাদেরকে অন্যদের পথ নির্দেশনার উৎস বানিয়ে দেন।

অন্যদিকে ইবলিশ অনুতপ্ত ছিল না বরং সে আল্লাহর কাছে সময় চেয়ে নিল, বললঃ

সে (ইবলিশ) বললঃ আমাকে কেয়ামত দিবস পর্যন্ত অবকাশ দিন। (সূরা আ’রাফ ৭: ১৪)

আজ আমাদেরকে যদি আমাদের খারাপ কাজ ছেড়ে দিতে বলা হয়, তবে আমরা সময় চেয়ে নেই। আমাদের ভেবে দেখা উচিত আমরা কার মনোভাবের পুনরাবৃত্তি করছি – হযরত আদম ও হাওয়া (আ) নাকি ইবলিশ (শয়তান) এর? অন্যায়ের উপর অটল থাকা (Israar ala al ma’asee) খারাপ পরিণতির কারণ (Soo al Khaatima)।

আরবীতে বলা হয়, ‘La kabeera ma’al Istighfaar wa la Shagheera ma’al Israar’ অর্থ্যাৎ তওবার চেয়ে বড় এবং গোয়ার্তুমির চেয়ে ছোট কোন গুনাহ নেই। পাপের উপর অটল থাকার ফলে হেদায়াতের রাস্তা বন্ধ হয়ে যায় এবং আমাদের উপর আল্লাহর ক্রোধ পতিত হয়। যারা নিজেদেরকে সংশোধনকে প্রত্যাখ্যান করে পাপের উপর অটল থাকে তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেনঃ

অতঃপর তারা যখন ঐ উপদেশ ভুলে গেল, যা তাদেরকে দেয়া হয়েছিল, তখন আমি তাদের সামনে সব কিছুর দ্বার উম্মুক্ত করে দিলাম। এমনকি, যখন তাদেরকে প্রদত্ত বিষয়াদির জন্যে তারা খুব গর্বিত হয়ে পড়ল, তখন আমি অকস্মাৎ তাদেরকে পাকড়াও করলাম। তখন তারা নিরাশ হয়ে গেল। (সূরা আল আনআম ৬: ৪৪)

আল্লাহ তায়ালা হলেন ঘায়ুর (গর্বিত, সম্মানিত) এবং আমাদের নিজেদেরকে সংশোধনের একাধিক সুযোগ দেয়ার পরেও যখন আমরা তার বিরোধিতাকে আঁকড়ে ধরে থাকি,  তখন তিনি হেদায়াতের দরজা বন্ধ করে দেন। পরিবর্তে তিনি তার জন্য বিরুদ্ধাচরনের সকল দরজা খুলে দেন যাতে সে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয় এবং তারপর যখন হঠাৎ একসময় মৃত্যু তার সামনে উপস্থিত হয় তখন তার কাছে তওবা করার কোন সুযোগ অবশিষ্ট থাকে না। আল্লাহ আমাদের এমন করুণ পরিণতি থেকে হেফাজত করুক।

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সকল প্রকার অবাধ্যতা ও পাপ থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন। কোন পাপকেই ছোট বা ক্ষুদ্র জ্ঞান করা উচিত নয় কারণ যে কোন পাপই আল্লাহর অবাধ্যতার নিদর্শন এবং এ ধরনের মনোভাব খুবই গুরুতর। তাই নির্দিষ্ট কোন কাজ নয় বরং আমাদের মনোভাব বা দৃষ্টিভঙ্গীর ব্যাপারে সচেতন হওয়া উচিত কারণ এটিই জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।

সকল পাপের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হল শিরক করা এবং কেউ যদি এর উপর মৃত্যুবরণ করে তাহলে আল্লাহ তার সকল পাপ ক্ষমা করলেও এই পাপ ক্ষমা করবেন না।

দ্বীনের যে সকল বিষয় আমাদের ভালো লাগে সেগুলো পালন করা এবং যেগুলো ভালো লাগে না তা ত্যাগ করার দৃষ্টিভঙ্গী সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আমাদেরকে বিশেষভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন। এটি অহংকারের চুড়ান্ত রূপ এবং আল্লাহর ক্রোধের কারণ। বর্তমান সময়ে এমন অনেক মুসলমান রয়েছে যারা ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে এমন সব কিছুকে বৈধ করে নিয়েছে এবং তারা প্রার্থনাও করে। যারা আল্লাহ যা অপছন্দ করেন তা ত্যাগ করে না তারা কিভাবে তার সামনে দাড়িয়ে বলে, ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন (আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং তোমার কাছেই সাহায্য চাই)। এ ধরনের ঔদ্ধত্য – নিজেদের ইচ্ছামত বেছে নেয়া – এই দুনিয়া এবং আখিরাত দুদিকেই শাস্তির দিকে নিয়ে যায়।

তাই আল্লাহর অবাধ্যতা এবং রাসূল (স) এর সুন্নাহের বিপরীত এমন সব কিছু আমাদের অবিলম্বে পরিত্যাগ করা উচিত এবং দ্রুত তওবা করা ও ইস্তেগফার করা খুবই জরুরী। কতদিন ধরে এই কাজ করা উচিত? যতদিন আমরা বেঁচে থাকার আশা করি ততদিন।

তওবা মানে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার দিকে ফিরে আসা এবং ইস্তেগফার হল আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে ফিরে আসার উপায়। এ দুটি সম্পর্কযুক্ত এবং একটি আরেকটিকে অনুসরণ করে। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম এ বিষয়ে খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, আমি সেটি এখানে উল্লেখ করছি।

তওবা ও ইস্তিগফারের অর্থ

স্কলাররা তওবা (ক্ষমাপ্রার্থনা) বলতে নিন্মলিখিত বিষয়গুলোকে বুঝিয়েছেন: ১) পাপকে পরিত্যাগ করা ২) পাপের দিকে পুনরায় ফিরে না আসার ব্যাপারে দৃঢ় ইচ্ছা ও প্রতিজ্ঞা ৩) কৃত পাপের জন্য অনুশোচনা করা, এবং, যদি পাপটি অন্য কোন মানুষের অধিকারের বিপরীত হয়, তাহলে ৪) তার ক্ষতিপূরণ করা। এগুলো তওবা বা ক্ষমাপ্রার্থনার শর্ত হিসেবে বিবেচিত। তবে, আল্লাহ ও তার রাসূল (স) বর্ণিত তওবার অর্থ আরও ব্যাপক, এবং উপরের উল্লিখিত বিষয়গুলো ছাড়াও ধৈর্য্যসহকারে আল্লাহর সকল নির্দেশ মেনে চলাও এর অন্তর্ভূক্ত। যারা তওবা করতে অনাগ্রহী তাদের অপছন্দ করা এবং তাদের সঙ্গ পরিত্যাগ করা, তাদেরকে তওবার জন্য উদ্বুদ্ধ করা এবং ক্ষমা চাওয়ার অভ্যাসকে উপেক্ষা না করার ব্যাপারে পরামর্শ দেয়াও তওবার অন্তর্ভূক্ত। তাও তওবা হল প্রতিদিন পাপ সংগঠনের বিপরীত এবং সাধারনভাবে শুধু পাপ ত্যাগ করা এবং এর জন্য অনুশোচনা করা নয়।

তওবার সারমর্ম হল আল্লাহর কাছে ফিরে আসা এবং তিনি যা পছন্দ করেন তা পালন করা এবং যা অপছন্দ করেন তা ত্যাগ করা। তওবা হল অপছন্দনীয় থেকে পছন্দনীয়ের দিকে, অবাধ্যতা থেকে বাধ্যতার দিকে, আল্লাহর ক্রোধ থেকে দয়ার দিকে প্রত্যাবর্তন (হিজরত) করা।

ইস্তিগফার এবং তওবা

ইস্তিগফার মানে ক্ষমা চাওয়া এবং তওবা মানে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন। যখন কেউ তার ভুল বুঝতে পারে তখন সে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় এবং তারপর আল্লাহর বাধ্যগত হয়ে যায় এবং তার কাজের মাধ্যমে সে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী যে কারোর জন্য দুটোই করণীয়। তাকে অবশ্যই আল্লাহর সামেন তার ভুল, পাপ এবং খারাপ কাজ স্বীকার করতে হবে এবং তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। একই সাথে তাকে অবশ্যই শর্তহীনভাবে খারাপ কাজগুলো ত্যাগ করতে হবে এবং ্আল্লাহর অনুগত হতে হবে। যেমন কেউ যদি নামাজ না পড়ে তাহলে সে সে সবচেয়ে খারাপ কাজগুলোর একটি করার দোষে দুষ্ট। যখন সে তার কৃতকর্মের গুরুত্ব সম্পর্কে উপলবদ্ধি করতে সক্ষম হবে, তখন সে তওবা করবে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে। তারপর সে নিয়মিতভাবে নামাজ পড়া শুরু করবে। অর্থ্যাৎ সে ক্ষমা চাইল (ইস্তিগফার) করল এবং নামাজ পড়া শুরু করলো (তওবা)। নিয়মিত নামাজ পড়াই হল তার তওবা যা ছাড়া তার ইস্তিগফারের কোন গুরুত্বই নেই।

কোরআনে ইস্তিগফার, যার অর্থ ক্ষমা প্রার্থনা, শব্দটি দুইভাবে বর্ণিত হয়েছে। হয় শুধু ইস্তিগফার অথবা তওবার সাথে মিলে। শুধুমাত্র ইস্তিগফারের ব্যবহার পাওয়া যাবে নিচের আয়াতে যেখানে হযরত সালেহ তার জাতির উদ্দেশ্যে বলেছে,

সালেহ বললেন, হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা কল্যাণের পূর্বে দ্রুত অকল্যাণ কামনা করছ কেন? তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছো না কেন? সম্ভবত: তোমরা দয়াপ্রাপ্ত হবে।(সূরা নামল ২৭:৪৬)

আল্লাহ আরও বলেন,

আর আল্লাহর কাছেই মাগফেরাত কামনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাকারী, করুনাময়। (সূরা বাকারা ২:১৯৯)

এবং তিনি বলেছেন ক্ষমাপ্রার্থনা কোন মানুষকে তার ক্রোধ থেকে রক্ষা করে:

অথচ আল্লাহ কখনই তাদের উপর আযাব নাযিল করবেন না যতক্ষণ আপনি তাদের মাঝে অবস্থান করবেন। তাছাড়া তারা যতক্ষণ ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে আল্লাহ কখনও তাদের উপর আযাব দেবেন না। (সূরা আনফাল ৮:৩৩)

তওবার সাথে মিলে ইস্তেগফারের ব্যবহার নিচের আয়াতগুলোতে পাওয়া যায়:

আর তোমরা নিজেদের পালনকর্তা সমীপে ক্ষমা প্রার্থনা কর। অনন্তর তাঁরই প্রতি মনোনিবেশ কর। তাহলে তিনি তোমাদেরকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উৎকৃষ্ট জীবনোপকরণ দান করবেন এবং অধিক আমলকারীকে বেশী করে দেবেন আর যদি তোমরা বিমুখ হতে থাক, তবে আমি তোমাদের উপর এক মহা দিবসের আযাবের আশঙ্কা করছি।(সূরা হুদ ১১:৩)

আর হে আমার কওম! তোমাদের পালন কর্তার কাছে তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর তাঁরই প্রতি মনোনিবেশ কর; তিনি আসমান থেকে তোমাদের উপর বৃষ্টি ধারা প্রেরণ করবেন এবং তোমাদের শক্তির উপর শক্তি বৃদ্ধি করবেন, তোমরা কিন্তু অপরাধীদের মত বিমুখ হয়ো না।(সূরা হুদ ১১:৫২)

আর সামুদ জাতি প্রতি তাদের ভাই সালেহ কে প্রেরণ করি; তিনি বললেন, হে আমার জাতি। আল্লাহর বন্দেগী কর, তিনি ছাড়া তোমাদের কোন উপাস্য নাই। তিনিই যমীন হতে তোমাদেরকে পয়দা করেছেন, তন্মধ্যে তোমাদেরকে বসতি দান করেছেন। অতএব; তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর অতঃপর তাঁরই দিকে ফিরে চল আমার পালনকর্তা নিকটেই আছেন, কবুল করে থাকেন; সন্দেহ নেই। (সূরা হুদ ১১:৬১)

কেউ যদি পাপ করতেই থাকে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় (এর শর্তসমূহ পূরণ না করেই), তবে এটি সত্যিকারের ইস্তিগফার নয় এবং এটা তাকে শাস্তি থেকে রক্ষা করবে না। ইস্তিগফারের মধ্যে তওবা অন্তর্ভূক্ত, এবং তওবার মধ্যে ইস্তিগফার: প্রত্যেকটি অন্যটির মধ্যে উহ্য আছে।

ইস্তিগফার শব্দের এই যে ব্যপকতা এর মধ্যে বর্ম বা আড়ালের জন্য ক্ষমা চাওয়ার এ অর্থও অন্তর্ভূক্ত – আমাদের মানবিক ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং ক্ষতিকর এবং ধ্বংসাত্মক ভুল থেকে আড়াল বা রক্ষা করা। মানুষের সবচে বড় এবং ক্ষতিকর ত্রুটি-বিচ্যুতি হল অজ্ঞতা এবং পাপ। এই অজ্ঞতা এবং পাপের কারণে মানুষ এমন পর্যায়ে নেমে যায় যা তাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। এই দুই ধরনের ত্রুটি থেকে রক্ষা করার বর্ম হল নিজের ভুল সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং নিজের মধ্যে স্রষ্টা প্রদত্ত জ্ঞান, সুবিচার এবং ধার্মিকতা স্পষ্ট করা। আল্লাহ মানুষের মধ্যে রূহ ফুঁকে দেয়ার মাধ্যমে যে মর্যাদা দান করেছেন মানুষ যত তা ভুলে যাবে ততই সে নিজেকে পশুর পর্যায়ে নামিয়ে আনবে এবং ততই তার অজ্ঞতা এবং পাপ বৃদ্ধি পাবে।

যখন তওবা এবং ইস্তিগফার শব্দ দুটো একত্রে ব্যবহৃত হয় (ইস্তিগফার এর পরে তওবা), তখন একটির (ইস্তিগফার) অর্থ হল যা ঘটে গেছে তার মন্দ ও ক্ষতি থেকে প্রতিরক্ষা চাওয়া এবং দ্বিতীয়টির (তওবা) অর্থ হল আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এবং ভবিষ্যতের মন্দ থেকে সুরক্ষা প্রার্থনা করা। এখানে দুটো বিষয় দেখা যাচ্ছে – একটি হল সেই পাপ যা  ইতোমধ্যেই সংগঠিত হয়েছে, ইস্তিগফার হল তার ক্ষতি থেকে সুরক্ষা প্রার্থনা এবং অন্যটি হল,  একই পাপের ভবিষ্যত পুনরাবৃত্তি যার ভয় আমরা করছি, তওবা হল তা আর না করার দৃঢ় সংকল্প। আল্লাহর দিকে সম্পূর্ণরূপে ফিরে যাওয়ার (রূজু) ক্ষেত্রে এ দুটোরই প্রয়োজন – ইস্তিগফার এবং তওবা। যখন একত্রে ব্যবহৃত হয়, তখন দুটোই আলাদাভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার গুরুত্ব প্রকাশ করে, অনথায়, যখন একাকী ব্যবহৃত হয়, তখন প্রত্যেকটি অন্যটিকেও বুঝিয়ে থাকে।

তওবার সবচে বড় উপকার হল এটি নিজেই আমাদেরকে আল্লাহর সাথে সংযুক্ত করে, নিজেই আমাদের জীবনের প্রতি আমাদের মনযোগ নির্দিষ্ট করে, কারণ তওবা করার সময় আমরা আমাদের জীবনে কৃতকর্মের হিসাব করে নেই। তওবা আমাদের মধ্যে নম্রতা প্রতিষ্ঠিত করে এবং সেই সত্যের প্রতি আমাদের মনযোগ আকর্ষন করে যে একদিন আমরা মৃত্যুবরণ করবো এবং আল্লাহর দিকে ফিরে যাবো।

তবে কোনভাবেই আল্লাহর দয়া থেকে হতাশ হওয়া যাবে না। তিনি বলেছেন,

বলো, (আল্লাহ বলেছেন) ‘হে আমার বান্দারা! তোমরা যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তারা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সকল গুনাহ মাফ করে দেবেন। তিনি অতীব ক্ষমাশীল, পরমদয়ালু।’ (সূরা জুমার ৩৯:৫৩)

আমাদের আক্বীদা হল যতক্ষন পর্যন্ত কেউ নিষ্ঠার সাথে ক্ষমা চায় আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সকল গুহান ক্ষমা করে দেবেন এবং তাই ্আমাদের কখনোই আল্লাহর দয়া থেকে নিরাশ হই না।যখন আমরা অনুশোচনা করতে অস্বীকার করি এবং বিরোধিতা ও মাত্রাতিরিক্ত এবং পাপ করতে শুরু করি তখন হিদায়াতের দরজা বন্ধ হয়ে যায় এবং এ ধরনের কাজ আমাদেরকে কুফরের দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ বলেছেন,

নিশ্চিতই যারা কাফের হয়েছে তাদেরকে আপনি ভয় প্রদর্শন করুন আর নাই করুন তাতে কিছুই আসে যায় না, তারা ঈমান আনবে না। আল্লাহ তাদের অন্তকরণ এবং তাদের কানসমূহ বন্ধ করে দিয়েছেন, আর তাদের চোখসমূহ পর্দায় ঢেকে দিয়েছেন। আর তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। (সূরা বাকারা ২:৬-৭)

তওবা কবুল হওয়ার তিনটি শর্ত রয়েছে।

১. যিনি তওবা করছেন তাকে প্রকৃতভাবেই অনুশোচনাকারী ও অনুতপ্ত হতে হবে এবং যে কাজের জন্য তওবা করছে তাকে ঘৃণা করতে হবে। আদম এবং হাওয়া (আ) এর ক্ষেত্রে তারা আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হন এবং তৎক্ষনাত আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। তারা তাদের কাজকে ন্যয়সঙ্গত প্রমাণ করার কোন চেষ্টা করেন নি। তারা দেরী করেন নি কিংবা সময় চান নি। তারা আল্লাহকে অমান্য করার গুরুত্ব অনুভব করেছিলেন কারণ তারা আল্লাহর মহিমা এবং শ্রেষ্ঠত্ব অনুভব করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই দৃষ্টিকোন থেকে কোন পাপই ‘ক্ষুদ্র’ নয় কারণ সকল পাপই আল্লাহর অবাধ্যতা আর তিনি ‘ক্ষুদ্র’ নন।

২. যিনি তওবা করছেন তাকে একই কাজের পুনরাবৃত্তি না হওয়া নিশ্চিত করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। আদম এবং হাওয়া (আ) কতবার আল্লাহকে অমান্য করেছিলেন? একবার। তারা তাদের দীর্ঘ জীবনে সেই একবারের পর আর কখনো পাপ করেন নি। পাপের পুনরাবৃত্তি না করা ক্ষমা চাওয়ার আন্তরিকতার চিহ্ন।

৩. যিনি তওবা করছেন তাকে পাপের কারণে কারও ক্ষতি হলে তা সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে, যেমন তাদের কাছে ক্ষমা চাওয়া, তাদের সম্পদ ফিরিয়ে দেয়া বা ক্ষতিপূরণ করা। কখনো কখনো পাপের প্রকৃতি এমন হয় যে তা অন্যের বস্তুগত বা অন্যভাবে ক্ষতি সাধণ করে। এ ক্ষেত্রে তাকে অবশ্যই সংশোধণ করতে হবে এবং উক্ত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণ করতে হবে ও তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। এ কাজটি ছাড়া আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না কারণ সে যার প্রতি অন্যায় করেছে সে আল্লাহ নয়, অন্য কেউ। যখন মানুষের অধিকার ভঙ্গ করা হয়, তখন যার অধিকার ভঙ্গ করা হয়েছে সে প্রথমে ক্ষমা না করলে আল্লাহ ভঙ্গকারীকে ক্ষমা করবেন না। এটা করা না হলে, শেষ বিচারের দিন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা অধিকার ভঙ্গকারীর ভালো কাজগুলোকে ক্ষতিগ্রস্থকে দিয়ে দিবেন এবং ক্ষতিগ্রস্থের খারাপ কাজগুলোকে অধিকার ভঙ্গকারীর উপর চাপিয়ে দিবেন এবং তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করবেন।

যারা তওবা করেন, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ সুহাবানাহু তায়ালার দয়ার দৃষ্টান্ত এরকম:

যারা আরশ বহন করে এবং যারা তার চারপাশে আছে, তারা তাদের পালনকর্তার সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করে, তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং মুমিনদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে, হে আমাদের পালনকর্তা, আপনার রহমত ও জ্ঞান সবকিছুতে পরিব্যাপ্ত। অতএব, যারা তওবা করে এবং আপনার পথে চলে, তাদেরকে ক্ষমা করুন এবং জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন। হে আমাদের পালনকর্তা, আর তাদেরকে দাখিল করুন চিরকাল বসবাসের জান্নাতে, যার ওয়াদা আপনি তাদেরকে দিয়েছেন এবং তাদের বাপ-দাদা, পতি-পত্নী ও সন্তানদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করে তাদেরকে। নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। এবং আপনি তাদেরকে অমঙ্গল থেকে রক্ষা করুন। আপনি যাকে সেদিন অমঙ্গল থেকে রক্ষা করবেন, তার প্রতি অনুগ্রহই করবেন। এটাই মহাসাফল্য। (সূরা আল মু’মিনুন ৪০:৭-৯)

যারা তওবাকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করবে মহান রাব্বুল আলামীন তাকে কেবল মাফ করে দেয়াই নয় বরং তার পাপকে পূণ্যে রূপান্তরিত করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

কিন্তু যারা তওবা করে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের গোনাহকে পুন্য দ্বারা পরিবর্তত করে এবং দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা আল ফুরক্বান ২৫:৭০)

রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে তওবা করা এবং প্রতিনিয়ত তার ক্ষমাপ্রার্থনার তৌফিক দিন। তিনি আমাদের ইস্তিগফার কবুল করুন এবং আমাদের এমন জীবন যাপনে সহায়তা করুন যেন তার সামনে অপমানিত অবস্থায় উপস্থিত হতে না হয় এবং তার দয়া যেন তার ক্রোধ থেকে সুরক্ষাকারী হয়। সকল আধ্যাত্মিক উন্নতি শুরু হয় আল্লাহর দিকে ফেরার মাধ্যমে এবং এ কারণে আমি প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করলাম।

সবর এবং শোকর (ধৈর্য্য এবং কৃতজ্ঞতা)

দ্বিতীয় পদক্ষেপ হল আল্লাহর দেয়া নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। মানুষ কেবল তখনই সন্তুষ্ট এবং অন্তরের শান্তি লাভ করে যখন যে আল্লাহর দেয়া নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ হয়। এ কৃতজ্ঞতা সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

যখন তোমাদের পালনকর্তা ঘোষণা করলেন যে, যদি কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর, তবে তোমাদেরকে আরও দেব এবং যদি অকৃতজ্ঞ হও তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি হবে কঠোর। (সূরা ইব্রাহিম ১৪:৭)

তওবা করার তাওফিক এবং সুযোগ দেয়ার জন্য আল্লাহ তায়ালার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। যদি আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তওবার পথ খোলা না রাখতেন তাহলে আমাদের কি হত? একজন মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতের জন্য যত বেশি শোকর গুজার হবে, তত বেশি সে এই নেয়ামত সম্পর্কে জানবে এবং আল্লাহকে ভালোবাসবে। কৃতজ্ঞতা আল্লাহর বিশালতা ও গরিমা সম্পর্কে এবং এই পৃথিবীর স্রষ্টা ও মালিক যে মানুষের প্রতি দয়াবান সেই সচেতনতা বৃদ্ধি করে। কৃতজ্ঞতার সবচে বড় পুরস্কার হল মানুষ যে কারণে কৃতজ্ঞ তা আরও উপভোগ্য হয় এবং অকৃতজ্ঞতার প্রথম শাস্তি হল তার আনন্দ কেড়ে নেয়া, ফলে মানুষ তার যা আছে তা নিয়ে সুখী হতে পারে না এবং স্ব-নির্যাতনের যন্ত্রনায় ভুগতে থাকে।

শোকর বা কৃতজ্ঞতা সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা স্পষ্টভাবে বলেছেন, আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো এটা তা অধিকার এবং তিনি এর পুরস্কার দিবেন তার নেয়ামতকে আরও বাড়িয়ে দিয়ে। পবিত্র কুরআনে বিসমিল্লাহ’র পর একদম প্রথম আয়াতটিই শোকরের আয়াত: আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন (সকল প্রশংসা এবং কৃতজ্ঞতা পৃথিবীর রব আল্লাহ’র প্রতি)। আল্লাহ কেবল কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ‌উপকারের কথাই বলেন নি, আল্লাহ এ কথাও বলেছেন যে এমনটি না করার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে বলেছেন এবং এজন্য তিনি ‘কুফর’ (অস্বীকার করা) শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এ ধরনের কাজের জন্য তিনি তাঁর শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছেন।

মজার ব্যাপার হল, আল্লাহ তায়ালা যারা সবর (ধৈর্য্য) করবে তাদেরকে সাহায্য করা এবং পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হবে শোকর। এ কারণে সবর এবং শোকর পারস্পরিক-সম্পর্কযুক্ত।

হে মুমিন গন! তোমরা ধৈর্য্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চিতই আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের সাথে রয়েছেন। (সূরা বাকারা ২:১৫৩)

আর আল্লাহ তা’আলার নির্দেশ মান্য কর এবং তাঁর রসূলের। তাছাড়া তোমরা পরস্পরে বিবাদে লিপ্ত হইও না। যদি তা কর, তবে তোমরা কাপুরুষ হয়ে পড়বে এবং তোমাদের প্রভাব চলে যাবে। আর তোমরা ধৈর্য্যধারণ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা রয়েছেন ধৈর্য্যশীলদের সাথে।(সূরা আনফাল ৮: ৪৬)

সবর (ধৈর্য্য) আর শোকর (কৃতজ্ঞতা) অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। ইসলামে সবর বা ধৈর্য্যের ধারনাটি অদ্বিতীয়। সাধারণভাবে ধৈর্য্য বলতে যা বোঝায়, অর্থ্যাৎ কঠিন সময়কে নিরবে সহ্য করা, সবর তা বোঝায় না। এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, ইসলামে ধৈর্য্য বা সবর মানে যা ঘটছে তাকে অদৃষ্ট ধরে নেয়া নয়। এর মানে হল নিজের সর্বশক্তি এবং সামর্থ্য দিয়ে আল্লাহর জন্য প্রচেষ্টা চালানো এবং ফলাফলের জন্য তার উপর নির্ভর করাকে বোঝায়। আল্লাহ তায়ালা অনেক জায়গায় ‘মুজাহিদুন’ বোঝানোর জন্য ‘সাবিরুন’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। একজন মুজাহিদ শুধু আল্লাহর সাহায্যের জন্য বসে থাকে না। সে তার কাছে যা আছে তাই নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় প্রচেষ্টা চালায় এবং আল্লাহর সাহায্যের জন্য দোয়া করতে থাকে। যে যুদ্ধ করছে সে কখনো বসে থেকে কষ্ট সহ্য করে না। সে সর্বদা সম্পূর্ণ জাগ্রত থাকে, বিভিন্ন কাজে জড়িত থাকে, চিন্তা ও পরিকল্পনা করে এবং যুদ্ধে জয়ের জন্য তার সর্বোচট্ট প্রচেষ্টা চালায়। সকল প্রচেষ্টার শেষে তে তার রবের দরবারে সাহায্যের জন্য প্রার্থনা করে কারণ সে জানে তার সাহায্য ছাড়া কোন কিছু অর্জন করা সম্ভব নয়।

সবর মানে কাজ করা; সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানো এবং তারপর আল্লাহর উপর নির্ভর করা। সবরের এই ধারনাটি রাসূলুল্লাহ (স) এর জীবনে বদরের যুদ্ধে দেখতে পাওয়া যায় যখন তিনি সামান্য উপকরন দিয়ে তাঁর পক্ষে যতটুকু সম্ভব সকল ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করার পর আল্লাহর দরবারে দাঁড়ান এবং তার বিখ্যাত দুয়াটি করেন। রাসুলুল্লাহ (স) আল্লাহর কাছে সাহায্যের জন্য নিরন্তর দোয়া করেন এবং বলেন, “হে আল্লাহ! আত্মাভিমানী এবং উদ্ধত কুরাইশরা  তোমার স্পর্ধা করে এবং তোমার রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এখানে উপস্থিত হয়েছে। হে আল্লাহ, আপনি যে বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আমি তার প্রতীক্ষায় রয়েছি। আমি আপনার কাছে মিনতি করছি, আল্লাহ আপনি তাদের পরাজিত করে দিন। হে আল্লাহ! আজ যদি মুসলমানদের এই দল পরাজিত হয়, তাহলে এই দুনিয়ায় তোমার ইবাদত করার জন্য আর কেউ অবশিষ্ট থাকবে না।”

তিনি কিবলার দিকে মুখ করে দুই হাত ছড়িয়ে তাঁর রবকে ডাকতে লাগলেন যতক্ষন না পর্যন্ত তার চাদর কাঁধ থেকে পড়ে গেল। তখন আবু বকর (রা) এসে চাদরটি তুলে রাসূলুল্লাহ (স) এর কাঁধে পড়িয়ে দিলেন এবং বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (স), আপনি আপনার রবের নিকট যথেষ্ট কান্নাকাটি করেছেন। তিনি অবশ্যই তার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবেন।”

অবিলম্বেই আল্লাহর সহায়তা পাওয়া গেল, তিনি বেহেশত থেকে ফেরেশতাদের পাঠালেন রাসূল (স) এবং তার সাথীদেরকে সহায়তা করার জন্য। আল্লাহ বলেন,

যখন নির্দেশ দান করেন ফেরেশতাদিগকে তোমাদের পরওয়ারদেগার যে, আমি সাথে রয়েছি তোমাদের, সুতরাং তোমরা মুসলমানদের চিত্তসমূহকে ধীরস্থির করে রাখ। আমি কাফেরদের মনে ভীতির সঞ্চার করে দেব। কাজেই গর্দানের উপর আঘাত হান এবং তাদেরকে কাট জোড়ায় জোড়ায়। (সূরা আনফাল ৮:১২)

তোমরা যখন ফরিয়াদ করতে আরম্ভ করেছিলে স্বীয় পরওয়ারদেগারের নিকট, তখন তিনি তোমাদের ফরিয়াদের মঞ্জুরী দান করলেন যে, আমি তোমাদিগকে সাহায্য করব ধারাবহিকভাবে আগত হাজার ফেরেশতার মাধ্যমে। (সূরা আনফাল ৮:০৯)

(চলবে)

Shares